somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছেলেটা আমাকে আজ ফোন করেছিল

১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১১ রাত ১:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

(মনটা আজকে ভীষণ খারাপ। মাঝে মাঝে মনে হয় বিষয়টা ঈশ্বরের ইচ্ছাকৃত।ইচ্ছে করেই তিনি আমার জীবনটাকে অসংখ্য করুন গল্পে সাজিয়ে তুলেছেন । গল্পগুলো গল্পের মতই অথচ সত্য।)

ছেলেটা আমার কাছে ভাত খাওয়ার জন্য টাকা চেয়েছিল। এরকম অনেকেই চায়।রাস্তা-ঘাটে বাসে,ট্রেনে, সিগনালে গাড়ী থামলে। আমি এসব পাবলিককে কখনোই প্রশ্রয় দেইনা।আমার কাছে মনে হয় চেয়ে খাওয়া একটা কুঅভ্যাস।এ অভ্যাস যার একবার হয়েছে সে মজা পেয়ে যায় , কাজে তার আর মন লাগেনা। ছেলেটার বয়স অল্প, দশ কি বারো।এই বয়সে সে কেন ভিক্ষা করবে? অবশ্য এই বয়সের ছেলেরা অনেকেই এখন ভিক্ষা করে। ভিক্ষার পয়সা দিয়ে ডান্ডি খায়।
আমি ওকে বললাম, ভাত খাওয়াতে পারবো, পয়সা দিতে পারবোনা। ও তাতেও রাজি।
ভাত খাওনাই কেন?বাড়ী কই? কই থেইকা আসছ?
শায়েস্তাগঞ্জ।
শায়েস্তাগঞ্জে বাড়ী?
ওইখানে আমার খালাম্মার বাড়ী। আমার আম্মা থাকে চিটাগাঙ বায়েজীদ বোস্তামীর মাজারে।
মাজারে কি করে?
কইতে পারি না। থাকে আরকি?
আমার সাথে ছিলেন আলী ভাই, ব্লগার আলী মাহমেদ। আমি আলী ভাইয়ের মুখের দিকে তাকালাম-
“ভ্যাগাবন্ড ফ্যমিলি আর কি”? আলী ভাই বললেন “ কত রকম প্রবলেম! এই সোসাইটিটারে স্বয়ং ঈশ্বর ও ঠিক করতে পারবে না।”
সেটা ঈশ্বরের কাজ, সে ই ভালো বলতে পারবেন।
আলী ভাই মানুষের প্রবলেম সলভ করেন। সেই সময় তিনি অন্য একটা সাবজেক্ট নিয়ে ভাল রকম পেঁচিয়ে ছিলেন।তাই তাকে নতুন কোন পেইন যাতে নিতে না হয় তার জন্য এক রকম জোর করে ওকে আমি আমার দখলে নিয়ে নিলাম। আমার কোয়ার্টারে নিয়ে গেলাম। একটু বলে রাখি সরকারী চাকরীর কারনে আমাকে সপ্তাহের বেশ কয়েকটি দিন ঢাকার বাইরে একটি থানা শহরে থাকতে হয়। অফিসের কোয়ার্টারে একা থাকি। ওকে যখন কোয়ার্টারে নিয়ে যাচ্চিলাম শুভাকাংক্ষী আলী ভাই বললেন সাবধানে সব কিছু দেখে শুনে রাখতে “এই সব পোলাপাইনের হাতটানের অভ্যাস আছ ”। আলী ভাই বিদায় নিলেন।
ওকে চোখে চোখে রাখার আগে ওর সাথে আমি আলাপ জুড়ে দিলাম।
তুমি পড়ালেখা কর?
না, শায়েসাতাগন্জে রেলইস্টিশনে মিষ্টি পান বেচি।
মার সাথে থাকনা কেন?
অনেক শীত তো।আম্মা কইছে মাজারে থাকলে শীতে মইরা যাব। তাই শীতের সিজন খালাম্মার কাছে রইছি্।
এইখানে কেন আইছো্ ?
আমারে এক ছেলে বলছে “ল চিটাগাং যাই। তর মা’রে দেইখখা আইবি।” হের লগে ট্রেনে কইরা শায়েস্তাগন্জ থেইকা রওনা দিছি। ট্রেনে ঘুমাইয়া পড়ছিলাম। আমার পকেটে আছিল ৪০০ টাকা।মিষ্টি পান বেইচা কামাই করছিলাম।পোলা টাকাটা লইয়া ভাইগা গেছে।
অরে তুমি কই পাইছিলা।
শায়েস্তাগন্জ রেল ইস্টিশানে পরিচয়।
পুরো ব্যাপারটা মোটামুটি বোঝা হয়ে যায়। আমি ওর মুখের দিকে তাকাই। একটা অদ্ভুত সারল্যমাখা মলিন মুখ।ক্ষুধা আর তৃষ্ণা ওর চেহারার শিশুসুলভ মিষ্টতাকে ঢাকতে পারেনি।
আলী ভাইয়ের কথাটা আবার মাথায় আসে-“এই সব পোলাপাইনের হাতটানের অভ্যাস আছ ”। বাড়তি সচেতনতা হিসেবে আমি ওর দুটো ছবি তুলে রাখি। বলাতো যায়না।
ওকে আমার কোয়ারটারে নিয়ে গেলাম। খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে আমি ‘রহিমা নির্ভর’ । রহিমা রেঁধে হট কেরিয়ারে করে আমার খাবার দিয়ে যায়। আমি ওকে সেটাই খেতে দিলাম। টয়লেটে হাতমুখ ধুয়ে ছেলেটি খেতে বসলো। আমি ওর খাওয়া দেখছিলাম আর টুকটাক কথা জিজ্ঞাসা করছিলাম।
তোমার আব্বা নাই?
উহু।
আব্বা সংক্রান্ত কথা আর বাড়ালাম না। কি না কি শুনি?
এখন কি করবা?
চিটাগাং যাব। বিকালে নাকি একটা ট্রেন আছে। ট্রেনে কইরা চিটাগাঙ ইস্টিশানে নাইমা তারপর বাস ধরবো।
তোমার তো লগে টাকা পয়সা নাই, কেমনে যাইবা?
দেখি।
ছেলেটা ভাত খেতে থাকে একমনে। আমি ওর পাতে দ্বিতীয় বাটির ভাতটাও তুলে দেই।ও খুব তৃপ্তি করে খায়।
তোমার খালাম্মা টেনশন করবেনা? তুমি যে না বইলা আসছো?
ছেলেটা উত্তর দেয় না।নির্লিপ্ত। বুঝলাম এদের নিয়ে কেউ টেনশন করেনা্।ছেলেটা খাওয়া শেষ করে। আমি ওকে জিজ্ঞেস করি –তুমি একলা যাইতে পারবা?
হুম, আগে ও গেছি। আম্মারে না দেইখা বেশীদিন থাকতে পারি না।আমার আম্মার লেইগা আমার পরান পোড়ে।
শেষ কথাটা বুকে লাগে। ছেলেটার মধ্যে কিছু একটা আছে। মায়া ধরে যায়।
আমি ওকে দাঁড়াতে বলি । ওকে কিছু টাকা দেই। আর আমার ভিজির্টং কার্ড।
এখানে আমার ফোন নাম্বার আছে। তুমি চিটাগাং গিয়া আমারে ফোন দিবা।ছেলেটা চলে যায়।আমি দরজায় দাঁড়িয়ে ওর চলে যাওয়া দেখি।

গত সপ্তাহে একবার ওর কথা মনে হয়েছিল।আচ্ছা এত কথা বলা হল কিন্তু ছেলেটার নাম জানা হলনা! তিন সপ্তাহ হয়ে গেল, ছেলেটা তো আর ফোন দিল না! এই সব পোলাপান এরকমই হয়। হয়তো ওর সব গল্পই বানানো। ট্রেনে ট্রেনে ঘুরে বেড়ানো ভাসমান ধান্দাবাজ। খাওয়া আর টাকা কটাই ওর লাভ। হতেই পারে। কাজের চক্করে ছেলেটার কথা ভুলে যাই।
গত রাতটা খুব ধকল গেছে।সারা রাত একটার পর একটা রোগী এসেছে। সকালেও একই অবস্থা।টানা ৪৮ ঘন্টা ইমারজেন্সী ডিউটি করার মজাটা টের পাই হাড়ে হাড়ে। দুপুরে খাওয়ার পর মনে হল পরিস্থিতি কুল।এবার রেস্ট নেব। একটা কড়া ঘুম দেওয়া দরকার। চোখটা লেগে এসেছে। এমন সময় ফোনটা এলো “মামা, আমি মনির।”
কোন মনির?
একদিন শুক্কুরবারে যে আপনে আমারে ভাত কাওয়াইসলেন,টাকা দিসিলেন…।
হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়ছে,তুমি চিটাগাং ঠিকমতো পৌঁছেছিলে তো।আমার আনন্দ লাগে ওর গলা শুনে।
হ মামা , পৌছাইছিলাম। (একটু থেমে) , মামা আমার ….
পরের কথাটা ভালো ভাবে বুঝতে পারি না।নেটওয়ার্ক প্রব্লেম করে।
আমি বুঝতে পারছিনা তোমার কথা।
আফনে আমার আম্মার লগে কথা কন।
ওর আম্মা ফোন ধরে-হ্যালো ভাই, আমার পোলা আপনের লেইগ্গা জান দিয়া ফালাইতেসে।আপনার লগে কথা কইতো চায়। হ্যায় এখন চিটাগাং মেডিকেলে। ভর্তি আছে।
আমি বললাম-কি হয়েছে ওর?
ট্রেনে উঠতে গিয়া ওর পা কাটা পড়ছে। একটা পা পুরাপুরি গ্যাছেগা। হ্যায় আপনারে দেখতে পাগল ওইয়া গেছে। আপনে কি আইবেন? ভর্তি আছে ২৬ নম্বর ওয়ার্ড, পাঁচতলায়। আপনে কি আইবেন ভাই?
আমার গলা কেঁপে ওঠে।কথা বলতে পারি না।শুধু বলতে পারি “আমি তো অনেক দুরে থাকি, দেখি।”
ফোনটা কেটে যায়, আমি আর ঘুমাতে পারি না । হায় আল্লা আমার জীবনে এত জটিল আর করুন গল্প তুমি কেন তৈরী করে রাখ একটার পর একটা।আমি হতভম্ব হয়ে যাই। আমার স্ত্রীকে ফোন দেই। মনের আবেগটা ঢেলে দেই ওর কাছে। শিশু হয়ে যাই।
আধঘন্টা পর আবার ফোন দেই ওই নাম্বারে।
হ্যালো! একটা লোক ফোন ধরে। এখানে কি মনির আছে?
মনির?
হ্যাঁ। আমাকে এই নাম্বার থেকে আধঘন্টা আগে ফোন দেয়া হয়েছিল ।
ও আচ্ছা , আমি আমার এক আত্মীয়কে দেখতে গেসিলাম মেডিকেলে।ওইখানে একটা পঙ্গু ছেলে আমার কাছে রিকোয়েস্ট করে আপনারে ফোন করসিল ।
আবার কি যাবেন মেডিকেলে?
আজকে না।
কবে যাবেন?
বলতে পারি না।
আচ্ছা ঠিক আছে। গেলে আমাকে একটা মিস কল দিয়েন।
ফোন কেটে যায়। আমি মোবাইলে তোলা মনিরের ছবিটা দেখি।কল্পনায় দেখি মনিরের চলে যাওয়া ,আমার কোয়ার্টার থেকে খেয়ে দেয়ে মনির চলে গিয়েছিল। তার দুই পায়ে ভর করে।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১১ রাত ১:০৮
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৯ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?

কর্মসংস্থান? না।

বিনিয়োগ? না।

ডলার সংকট? না।

গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।

ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×