somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যুদ্ধ শিশু '৭১ : ডঃ জিওফ্রে ডেভিসের সাক্ষাৎকার-২

১৩ ই নভেম্বর, ২০০৬ রাত ১২:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




বীনা : যুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে ক্লিনিকের নারী-পুরষ বা সমাজকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন কখনো? নির্দিষ্ট করে বললে ধর্ষণের শিকার মেয়েদের সঙ্গে?
ডেভিস : হ্যাঁ, প্রায় সবসময়ই শুনতাম। তাদের কিছু গল্প ছিল মর্মস্পর্শী। বিশালাকৃতির পাঠান সৈন্যরা একের পর এক ওদের ধর্ষণ করে যাচ্ছে। বিশ্বাসই হয় না কেউ অমন করতে পারে। স্বচ্ছল ঘরের এবং সুন্দরী মেয়েদের অফিসারদের জন্য রেখে দেওয়া হতো। বাকিদের বাটোয়ারা করে দেওয়া হতো অন্যদের মাঝে। আর মেয়েদের ওপর বর্বরতার কোনো সীমা ছিল না। ওদের ঠিকমতো খেতে দেওয়া হতো না, অসুস্থ্য হলে ওষুধ ছিল না। অনেকেই ক্যাম্পেই মরে গেছে। পুরো ব্যাপারটা নিয়ে অবিশ্বাসের একটা আবহ ছিল। কেউ স্বীকার করতে চাইত না ঘটনাগুলো সত্যি ঘটেছে! কিন্তু চাক্ষুস প্রমাণ বলে দিচ্ছিল কী ঘটেছিল, সত্যিই ঘটেছিল।

বীনা : বুঝতে পারছি আপনি কী বলতে চাইছেন। কারণ আমি গত চারবছর ধরে এদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। যেহেতু সংখ্যাটা বিশাল ছিল তাই তাদের অনেককেই পাওয়ার কথা। কিন্তু অনেক খেটে মাত্র কয়েকজনের দেখা পেয়েছি।
ডেভিস : সেটাই, কেউ স্বীকার করার কথা না। তারা স্রেফ চেপে গেছে, ভুলে গেছে। এমনটাই হয়।

বীনা : কিন্তু তখন কি ব্যাপারটা অন্যরকম ছিল, মানে যুদ্ধের পরপর? কেউ কী তাদের দুঃস্মৃতির কথা বলেছিল?
ডেভিস : না, কেউই ব্যাপারটা নিয়ে মুখ খলতে চায়নি। প্রশ্ন করলে একটা উত্তরই মিলত। বেশিরভাগ সময়ই তা ছিল তাদের মনে নেই। আর পুরুষরাও এ ব্যাপারে একদমই কথা বলতে চাইত না! কারণ তাদের চোখে এসব মেয়ে ভ্রষ্টা হয়ে গেছে। আর বাংলাদেশে এমনিতেও মেয়েদের অবস্থান সামাজিক পর্যায়ে অনেক নিচে। ভ্রষ্টা হয়ে যাওয়া মানে তাদের এমনিতেই আর কোনো মর্যাদা রইল না। তাদের মরে যাওয়াই ভালো। আর পুরুষরা তাদের মেরেও ফেলত। বিশ্বাস হচ্ছিল না। এটা পশ্চিমা সমাজের একদমই বিপরীত! একদমই উল্টো!

বীনা : আপনি নিশ্চয়ই বাংলা জানতেন না। যোগাযোগে সমস্যা হতো না?
ডেভিস : না, আমার একজন দোভাষী ছিল। তারা খুব দ্রুতই সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন করেছিল। আমাকে একটা ল্যান্ড রোভার, একজন ড্রাইভার ও ফিল্ড অফিসার দেওয়া হয়েছিল যিনি দোভাষীর কাজও করতেন। ড্রাইভারের নাম মমতাজ। ফিল্ড অফিসার একজন সরকারী কর্মকর্তা ছিলেন, নাম মনে নেই। তাছাড়া ওদের বেশিরভাগই ভালো ইংরেজি বলতে পারত।

বীনা : আপনার মতে মেয়েগুলো কেনো নির্বাক থাকত?
ডেভিস : বুঝতেই পারছেন, আতঙ্কে। তারাই সবই দুঃস্বপ্নে ছিল। সেটা সামলে ওঠা তো কঠিন কাজ! বেশিরভাগই ছিল চরম উদ্বেগে। কারণ আমরা ছিলাম বিদেশী এবং ওরা কেউই বিদেশীদের বিশ্বাস করত না। আমরা ওদের কী করব সেটাই ওরা বুঝতে পারছিল না...

বীনা : রেপ ক্যাম্প ছিল এমন জায়গাগুলোতে গিয়েছেন কখনো?
ডেভিস : ধর্ষন শিবিরগুলো বিলুপ্ত হয়েছিল, পুনর্বাসন কর্মীরা মেয়েদের তাদের গ্রামে বা শহরে পাঠানোর চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু এমন ঘটনা অনেক ঘটেছে যে কোনো মেয়েকে তার স্বামীর কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার পর সে তাকে মেরে ফেলেছে। কারণ সে ভ্রষ্টা। অনেক ক্ষেত্রে তারা জানতেই চাইত না কী হয়েছে। এছাড়া দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোয় নদীতে (ডেভিস শুধু যমুনার উল্লেখ করেছেন) প্রচুর লাশ পাওয়া যেত। এসব ঘটনাই ইউরোপের মানুষকে উৎকণ্ঠিত করে তুলেছিল।

বীনা : মেয়েগুলোর কথা মনে আছে? কতজনের গর্ভপাত করিয়েছেন?
ডেভিস : সঠিক পরিসংখ্যান মনে করা কঠিন। তবে দিনে শ’খানেক তো বটেই।

বীনা : ঢাকায় নাকি অন্যান্য শহরেও?
ডেভিস : আসলে একটা নির্দিষ্ট সংখ্যায় আনাটা কঠিন ব্যাপার। ঢাকায় প্রতিদিন শ’খানেক আর ঢাকার বাইরে এর কম-বেশি হতো। আর অনেকেই কলকাতায় গিয়েছিল।

বীনা : আপনার কী আনুপাতিক হারটা মনে আছে? যেমন ধরুণ শ্রেণী ভেদে, ধর্মভেদে কতজন নারীকে দেখেছেন আপনি?
ডেভিস : শ্রেণীভেদ ঠিক আছে, কিন্তু কারো ধর্ম আমরা বিবেচনায় আনিনি। আমাদের একটাই লক্ষ্য ছিল তাদের বিপদমুক্ত করা। সাধারণভাবে ধনী পরিবারের মেয়েরা যুদ্ধ থামার পরপরই কলকাতায় চলে গিয়েছিল গর্ভপাত করাতে।

বীনা : মেয়েদের কী জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তারা গর্ভপাত চায় কীনা? তাদের কী কোনো মতামত নেওয়া হয়েছিল?
ডেভিস : হ্যা অবশ্যই। আমাদের কাছে আসা সব মেয়েই গর্ভপাত ঘটাতে চেয়েছিল। আমাদের তো মনে পড়ে না এর ব্যতিক্রম কখনো ঘটেছে। অন্তত আমার চোখে পড়েনি। যাদের বাচ্চা হয়েছে, তারা শিশুদের তুলে দিয়েছে পুনর্বাসন কর্মীদের হাতে। এভাবেই এসব শিশু আইএসএস এর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে আশ্রয় পেয়েছে। কতজন, সংখ্যাটা বলতে পারব না।

বীনা : ক্ষমা চাইছি এ ব্যাপারে আরেকটু খুটিনাটি জানতে। কিন্তু আমি খুবই আগ্রহী এটা জানতে যে মেয়েরা এই পুনর্বাসনের ব্যাপারটায় সত্যিই সম্মত ছিল কীনা। আপনার কী মনে পড়ে কোনো মেয়ে গর্ভপাত ঘটাতে না চেয়ে কান্নাকাটি করেছিল কীনা?
ডেভিস : না, কেউ কাঁদেনি। তারা এ ব্যাপারে খুবই কঠোর ছিল। একদমই চোখের জল ফেলেনি। চুপচাপ সয়ে গেছে। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমাদের কাজ অনেক সহজ হয়েছে তাতে! (চলবে)


সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জুলাই, ২০০৮ দুপুর ১২:০৮
৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রাজনীতি ও ইবাদত কোন পথে?

লিখেছেন শাহাদাৎ হোসাইন (সত্যের ছায়া), ২১ শে জুন, ২০১৮ রাত ৮:২৯


আল্লাহ দুটি ইবাদত করার জন্য টাকা পয়সা থাকার জন্য শর্ত আরোপ করেছেন:
এক. হজ্জ।
দুই. যাকাত।

অর্থাৎ এই দুইটি ইবাদত গরীব চাইলেও করতে পারবেনা! গরীবের এই ইবাদত করার যোগ্যতা অর্জণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

কাইকর

লিখেছেন সনেট কবি, ২২ শে জুন, ২০১৮ রাত ১২:৫৬



অভিনেতা আব্দুল্লাহ আল মামুনকে
দেখার পর এখন সে নামে নতুন
এক সাহিত্যিক দেখে ভরেগেছে মন;
যে চলে দূর্বার বেগে সবে ভালবেসে।
ব্লগপাড়া তোলপাড়ে সে সর্বদা থাকে
সকলের সাথে মিশে। সবার আপন
স্বগুণে সে হতে চায়। জীবন... ...বাকিটুকু পড়ুন

রম্যঃ আমি নাম বললে চাকরী থাকবে না :P

লিখেছেন কুঁড়ের_বাদশা, ২২ শে জুন, ২০১৮ রাত ২:২৬




খানিকটা সমবেদনা। :P

(এবার দার্শনিক কুঁড়ের বাদশা নিরপেক্ষ লুক।)
...বাকিটুকু পড়ুন

তুষার দেশে এক বাংলাদেশী কিশোরীর দিনরাত্রি - পর্ব (৮) - কানাডার প্রথম খারাপ অভিজ্ঞতা!

লিখেছেন সামু পাগলা০০৭, ২২ শে জুন, ২০১৮ সকাল ৯:৫৪

পূর্বের সারসংক্ষেপ: কানাডিয়ান স্কুলে ভর্তির পরে কাউন্সিলর আমাকে পুরো স্কুল ঘুরে দেখালেন আন্তরিকতার সাথে। তারপরে ওনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে স্কুল থেকে বাড়ির পথে রওয়ানা দিলাম বাবা মার সাথে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

টগরের হোমওয়ার্ক (গল্প)

লিখেছেন কাওসার চৌধুরী, ২২ শে জুন, ২০১৮ বিকাল ৪:৩৮


লন্ডন ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ছাত্র টগর। এর আগে আরো তিনটা ক্লাস পাশ করে রীতিমতো নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে ক্লাস টুতে প্রমোশন পেয়েছে সে। বয়স ৭ বছর ৪ মাস ২৩ দিন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×