আমার প্রিয় পোস্ট

অতীত খুড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ করোটি

গল্প : একের ভিতর দুই (পুন:প্রকাশ)

১৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ বিকাল ৪:১৮

শেয়ারঃ
0 0 0

লেখকের কথা :গল্প-কবিতা কয়েকটা লেখা হয়েছিল। এর আগে কবিতা সমগ্র নামে একটা পোস্টে তুলে দিয়েছিলাম কিছু। কাল আগের কিছু পোস্ট রি-ইনস্টল করতে গিয়ে কয়েকটা লেখা পেলাম। এর মধ্যে দুটো গল্পও ছিলো। হালের পাঠকদের কোনো ব্লগারের আর্কাইভ খোজার তাগিদ নেই- এটা উপলব্ধি করেই তুলে দিলাম।
গল্প ১ : খচ্চর

১.
ওসি বেশ মনযোগ দিয়ে ইলাস্টিকটা টেনে টুনে দেখছেন। 'হুমম, মহিলাতো বেশ মোটা মনে হচ্ছে। আচ্ছা এই ৩৯ ব্যাপারটা বুঝলাম না। ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস তো জোড় সংখ্যায় হয় জানি। ও থাইল্যান্ড! ওরা তাহলে বেজোড় মাপে'- বলেই নিজের রসিকতায় হো হো করে হাসলেন। থামলেন। এবার সেই ফিচকে হাসির রেশটা মুখে লাগিয়ে প্রশ্ন করলেন, 'তারপর শামীম সাহেব। লাশটা কোথায়?'
শামীম দরদরিয়ে ঘামছে। মিনমিনিয়ে কোনোমতে বলল, ‌'কিসের লাশ? কী বলছেন এইসব'। এই ঠাণ্ডাতেও তার গরম লাগছে। পিঠ ভিজে গেছে। আবার তলপেটে কামড় ও দিচ্ছে খুব। পেশাব পেয়েছে। ইচ্ছা করছে উঠে একটা ভো দৌড় দিতে। আসলে অনেক চিন্তা একসঙ্গে মাথায় জট পাকিয়ে গেছে। নিপা যদি জানতে পারে কী হবে! ও কি বাপের বাড়ি চলে যাবে? ডিভোর্সের মামলা করবে? সাদিয়াই বা জানলে কী ভাববে? ও যে মেয়ে, তাতে তসলিমা নাসরিন টাইপ একটা স্ক্যান্ডাল দাড় করিয়ে দিতে পারে। নিজেকে ওঠাতে গপ্পো বানাতে ওর জুড়ি নেই। ভাবতেই মেজাজটা এবার খিচড়ে গেলো। ক্যানো সে কাজটা করতে গেলো। এবার আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করছে শামীমের।

২.
আজ একটু আগেই অফিস থেকে বেরিয়েছিল। বসকে মিথ্যে বলেই। সাদিয়ার বাসায় একটা সাহিত্যসভা হওয়ার কথা। সে নতুন কিছু লিখলেই বাসায় একটা সভা বসায়। খাওয়াদাওয়ার আয়োজন থাকে। উপস্থিতদের করণীয় একটাই- জটিল হয়েছে, দারুণ লিখেছ, বাংলা সাহিত্যে নতুন এক সূর্য্যর দেখা আমরা পেয়ে গেছি।' কথাগুলো শোনার সময় সাদিয়ার এক্সপ্রেশন খেয়াল করে শামীম। জুলজুলে চোখে তাকিয়ে থাকে, গদগদ ভাব। অর্গাজমিক আনন্দ পায় বুঝি! একটা সাহিত্য ফোরামেই পরিচয়। শামীম অবশ্য নিজে লেখে কম, তবে সমালোচক হিসেবে ইদানিং নাম করেছে। বেশ কিছু পত্রিকায় বই-পত্রের রিভিউ করে পয়সা আসে ঘরে। আজো সেরকমই এক সভা। সাদিয়া নতুন কবিতা লিখেছে। গিয়ে দেখে অতিথি সে একাই। একটু অস্বস্তি লাগে। সাদিয়ার সবচেয়ে বদগুণ হচ্ছে বেমক্কা মন্তব্য। হাসির ছদ্মবেশে এমন একটা কিছু বলবে যে ভিত নাড়িয়ে দেয়। সেদিন ভরমজলিশে বলল- শামীম ভাই আপনি অমন ঝুকে হাটেন ক্যান। কার্টুনের কচ্ছপরা দাড়িয়ে যেমন হাটে তেমন। হিহিহিহি।'
মেজাজ খারাপ হয়, তারও বলতে ইচ্ছে করে- আমারো তোমাকে দেখলে ভেটকি মাছের কথা মনে পড়ে। ট্যাগরা চোখ মুখের দুইপাশে ছড়ানো। গলা নাই, ঘাড়ের উপর মাথা বসানো। বুক-পেট-পাছা একাকার। কার্টুনে যেমন ব্যাটারির দুটো পা লাগিয়ে দেয়, তোমাকে দেখলে আমার সেই ছবি মনে আসে। হাহাহাহা।' বলে না। মুখ বুজে সয়ে যায়। কবিতা না ছাই। বাচ্চারা যেমন হাত দিয়ে প্লেন ওড়ানোর ভঙ্গি করে, অনেকটা কালোয়াতি ঢংয়ে কবিতাটা আবৃত্তি করে সাদিয়া। তার কণ্ঠ ভালো। কিন্তু কবিতাটা জঘন্য। ভিড়ভাট্টা নেই বলেই শামীম ধরিয়ে দেয় ঘাটতিগুলো- সাদিয়া তোমার বক্তব্য পরিষ্কার। কিন্তু ধারাবাহিকতা নেই। তুমি নারীর সামাজিক বৈষম্য তুলে ধরতে চেয়েছো। তবে এই জায়গাটা দেখো এখানে তোমার গাথুনী যতটা সবল শুরু বা শেষে সেটা নেই।' সাদিয়া গম্ভীর হয়ে যায়। 'চা খাবেন শামীম ভাই? বসুন এনে দিচ্ছি। আচ্ছা চলুন বারান্দায় বসি। ওখানে জোসনা দেখতে দেখতে চা খাওয়া যাবে।'

৩.
চিপা বারান্দা। এখনকার ফ্লাট বাড়িগুলোয় যেমন হয় আর কি। কাপড় শুকানোর জন্য সানশেডটা একটু গ্রিল দিয়ে ঘিরে বারান্দা বানিয়ে দিচ্ছে ডেভেলপাররা। পিঠ কোনোমতে ঠেকিয়ে পা গুটিয়ে জড়োসড়ো বসতে হয়। জোসনার কোন ঠাহর শামীম পায় না। বরং আশেপাশের কোনো বাড়ির বাতির ছটাই গায়ে পড়ছে বলে মনে হয়। বসার জায়গা করতে গিয়ে দেখে সারসার কাপড় ঝুলছে। একটা কালো ব্রার সাথে মুখ বাড়ি খায়। সরিয়ে বসে শামীম। সেই আধো-আধারে দুহাতে কাপ নিয়ে আসে সাদিয়া। 'চিনি একটু কম দিলাম। আপনার তো ভুড়ি হয়েছে, এখন থেকে ব্লাডসুগার কন্ট্রলে রাখার চেষ্টা করবেন।' শামীম একটু ঘাবড়ে যায়। না ভুল ধরিয়ে দেওয়াটা ভুল হয়েছে। এবার সাদিয়া তাকে হেনস্থা করা শুরু করবে।
আন্দাজ সঠিক। 'শামীম ভাই, আপনি কি জানেন আপনার মধ্যে একটা ছোকছোক ভাব আছে? আপনার তাকানোর স্টাইল হচ্ছে যাকে বলে চোরা চাউনি। আমার ধারণা আপনি সংসার জীবনে অসুখী। তো কবিতার কথা যা বলছিলেন। আপনি আসলে কবিতার ক-ও জানেন না। এর কোনো ধারাবাহিকতা নেই? একটা মেয়ে জন্মানোর পর সে ভালো করে হাটতে পারেনা, নাজুক থাকে। যখন যুবতী তখন সে সবল। আবার যখন সে বৃদ্ধা আবারো দুর্বল। কবিতাটায় আমি এটাই ফুটিয়ে তুলেছি। আপনি বুঝতেই পারলেন না। আবার সমালোচনা করেন। আপনাদের এই প্রবলেম, বোঝেন ঘণ্টা রাধেন ঘন্ট।' এক নিশ্বাসে বলে দম নেয় সাদিয়া। ক্ষোভ-অপমান-বিতৃষ্ণা সব একসঙ্গে খেলা করে শামীমের মনে। 'ভাবীর জন্য একটা গিফট কিনেছিলাম। আপনি দিলেন মুডটাই নষ্ট করে। আমি আপনাকে কত বড় লেখক ভাবতাম। আপনার জন্য আমার মনে কত শ্রদ্ধা, আর আপনি কিছু না বুঝেই আমার কবিতাটা ফালতু বানিয়ে দিলেন। কী কুক্ষণে যে আপনাকে শোনাতে গিয়েছিলাম। আর জ্যোতি দা'টা যেন কেমন। প্রতিদিন সকাল-বিকাল ফোন করবে- কি লিখলে সাদিয়া। আসতে বললাম অমনি সব আহ্লাদ উধাও, ওনার কাজ আছে! ব্যস্ত। আসতে পারবেন না। কাদের সঙ্গে মিশি!' সব আগুন উগড়ে দিয়ে থামে। শামীম কোনোমতে বলে, 'আমি ওভাবে ভেবে দেখিনি আসলে। আচ্ছা তাহলে উঠি আজ?' 'যাবেন? ঠিক আছে যান। দেখি কবিতাটা নিয়ে আবার বসতে হবে। ফোন করব আপনাকে। চলেন।' সাদিয়ার পিছু পিছু বেরুতে গিয়ে ওঠার সময় আবার মাথায় বাড়ি খায় ব্রাটা। কী এক অদ্ভুত প্রতিহিংসায় সেটা খপ করে পকেটে পুরে ফেলে শামীম।

৪.
ঠিক কী কারণে ভেবে পায়না। রিকশায় বসার সময় পকেটে হাত ভরে মুঠো করে ধরে রেখেছে কাপড়টা। দাম্পত্য জীবনে দারুণ সুখী শামীম। নিপার মতো মেয়েই হয় না। সব অর্থেই কথাটা খাটে। একবার ভাবে ব্রাটা নিয়ে মাস্টারবেট করলে ক্যামন হয়? মনে মনে হাসে। সাদিয়া যে টাইপ মেয়ে, তাতে কামভাব জাগে না। উল্টো পালাই পালাই করবে। ঠিক এমন সময় রিকশা থামায় টহল পুলিশ। 'নামেন, রিকশা চেক করব।' শামীম ভয় খায়। অদ্ভুত এক আতঙ্ক নিয়ে নেমে দাড়ায়। একজন কনস্টেবল সিট খুলে চেক করে। শামীম মুঠো আকড়ে থাকে পকেটের পাশে এক সেপাই। ফেলতেও পারছে না। 'উনারে সার্চ করব স্যার? - ওয়ারল্যাস হাতে দাড়ানো এক এএসআইকে জিজ্ঞেস করে সে।
অফিসার তাকান শামীমের দিকে। 'কী করেন?' ‌'জ্বী, কিছু করি নাই- আউলে যায় শামীমের। তার মুখে কী আসলেই চোর চোর ভাব। সাদিয়া কী এই চোরা চাউনির কথাই বলেছিল? ‌'কিছু করি নাই মানে? পকেটে হাত দিয়ে রাখছেন ক্যান? পকেটে কী?' 'কিছু না কিছু না' বলে পকেট থেকে হাত বের করতে গিয়েও করেনা। বরং ঠেসে ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে যেন। অফিসার এইবার সন্দীহান। ‌'চেক করোতো ব্যাটাকে।' শামীম বলে, 'স্যার আমি ভদ্রলোক। এক কোম্পানিতে চাকরি করি। আপনে খোজ নিয়ে দেখেন।' 'চুপ ব্যাটা হাত বাইর কর'- ধমকে উঠে এইবার সেপাই। বডি সার্চে যায় না। সরাসরি হাত দেয় পকেটে। বের করে আনে দুটো ত্রিভুজ জোড় লাগানো কাপড়খানা। 'স্যার মাইয়া মাইনষের ব্রেসিয়ার।' ‌'আচ্ছা!'- কিছুটা কৌতুক, কিছুটা কৌতুহল অফিসারের মুখে। 'তা মিস্টার ভদ্দরলোক। মাগীবাড়ি থেকে আসতেছেন নাকি। আসার সময় টাকা উসুল করতে বউয়ের জন্য গিফট- নাকি! গাড়িতে ওঠেন।' সামনে অন্ধকারে পার্ক করা পিকআপটার দিকে আঙুল তোলে। শামীম বলে, 'বিশ্বাস করেন স্যার আমি কিছু করি নাই।' অফিসারের এক ধমক, ‌'চুপ। একদম চুপ। কারে খুন কইরা কাপড় খুইলা নিয়া আসছস বিশ্বাস নাই। তোর মুখ দেইখাই বোঝা যায় তুই ক্রিমিনাল। চুপচাপ গাড়িতে ওঠ। যা ক'বি থানায় গিয়া, এখন চুপ।'

৫.
গাড়িতে কেউ ছিল না আর। ঝেড়ে একটা দৌড় দেওয়ার চিন্তা এসেছিল। কিন্তু পায়ে সাড়া পায়নি। মাথায় চিন্তার ঘুরপাক। জানাজানি হলে কী হবে। কীভাবে সাহায্য পাবে? ফোন করতে পারে বসকে। সেখানে চাকুরি হারানোর ভয়। মোবাইলেও বড়জোর মিসকল দেয়া যাবে। নিপাকে ফোন করার প্রশ্নই আসে না। সাদিয়াকে তো না-ই। একবার ভাবে অফিসারের পা জড়িয়ে কান্নাকাটি করে। কিন্তু তাতে রেহাইর বদলে সন্দেহটা আরো পাকাপোক্ত হ ওয়ার জোর সম্ভাবনা। শুনেছে পুলিশ ঘুষ খায়। কিন্তু তার পকেটে কেচেকুচে পঞ্চাশ টাকাও হবে না। দিশেহারা লাগছে শামীমের।
থানার ওসি ব্যস্ত মানুষ। তাকে বসতে দিয়ে ফোনে কথা বলছেন এখানে ওখানে। ওয়ারল্যাসে নির্দেশ দিচ্ছেন। দর্শনার্থীও আছে কয়েকজন। আসামী ছাড়াতে এসেছে। ধান্দাবাজিটা প্রকাশ্যেই হচ্ছে। এক ফাকেই তাকে আবার বললেন কথাটা- 'লাশটা কই।' শামীমের রা সরছে না মুখে। কোনো উত্তর নেই। যা হবে হবে। সংসার ভেঙ্গে যাবে। চাকুরি হারাবে। জেল খাটবে। তাতেও যদি প্রায়শ্চিত হয়। কিন্তু সে আর চাপ নিতে পারছে না। ভেবেই মনের জোরটা যেন জুড়ে বসে। এখন আর কোনো কিছুতেই কিছু এসে যায় না।

৬.
শেষটা অনেকভাবেই হতে পারত। এখানে অস্বাভাবিক কিছু হয়নি। ওসি একটু পর বললেন, 'ফরেনসিকে পার্ভারশন নানারকম হয়। এর একটা হচ্ছে ফেটিশ। মেয়েদের আন্ডার ওয়ার নিয়ে যৌন কল্পনা। পারলে ট্রিটমেন্ট করান, সাইকোলজিস্ট দেখান।' শামীমের ইচ্ছে হচ্ছিল বলে, ‌'ব্যাপারটা মোটেই তা নয়। আর সাইকোলজিস্ট না, সাইক্রিয়াটিস্ট।' চুপ থাকে। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার আনন্দটা পেল ওসি যখন শেষ করলেন এই বলে- 'আপনারা উচু তলায় অদ্ভুত সব ফ্যাসিনেশন নিয়া ঘোরাফেরা করেন। ক্রাইমের লেভেল পাল্টাচ্ছে দিনকে দিন। যান, বাসায় যান। আর যাওয়ার আগে এই মুচলেকাটায় সই করে যান। নাম-ঠিকানা ঠিকঠাক লিখবেন।' মুচলেকা বলতে একটা ডিমাইসাইজ সাদা কাগজ। কিছু লেখা নেই। নিচে এক কোনায় নাম-ধাম লেখে শামীম। এরপর বেরিয়ে যায়। যাওয়ার আগে একটু বেগ কমায়। ব্রাটা নিয়ে যাবে? থাক, ভেবে জোর হাটা দেয়। সেদিকে তাকিয়ে হাসেন ওসি। ড্রয়ারে ব্রা'টা রাখতে রাখতে বলেন, ‌'খচ্চর। এখনো মাথায় ফাউল চিন্তা।'


গল্প ২ : ফিকশান : উৎসর্গ রাসেল (........)


মগবাজার : সকাল ১১টা

ব্যস্ত হাতে কেডসের ফিতে বাঁধছে ইমন। ভ্রুজোড়া কুচকে আছে। সিগেরেটের ধোয়াটা সরাসরি চোখে লাগছে বলে ঘাড়টা কাত করল। একই সঙ্গে দেখে নিল আয়নায়। না, জেলটা ভালই। স্পাইক হয়েছে। ওয়েট বলেই অনেক্ষণ থাকে, শুধু বৃষ্টি না হলেই হলো। এবার স্পেয়ার ম্যাগটা ঢোকালো বাঁপায়ের মোজায়। টেনে টুনে দেখল ইলাস্টিক। ঠিকই আছে। এখন অপেক্ষা।

রাজাবাজার : আগের দিন, রাত ১০টা

-কামটা কী করতেই হইব ভাই?
-ক্যান, কোনো সমস্যা! তোর কী আজকাল হাত কাঁপে, নাকি মুরগি হইতাছস। প্রেম করস নাকি?
মাথাটা চুলকে নিল শায়েক। দুর্দান্ত সাহসের জন্য ওর আরেক নাম কমান্ডো। এখনো কোনো কামে ফেইল মারে নাই, একাই। ওরে তাই ভাই বিশেষ স্নেহ করে, জটিল কাম ছাড়া দেয় না। আজকের কাজটায় ওর নিজের মনটা সায় দিচ্ছে না। এমন না ইমনের সঙ্গে ওর খুব দোস্তি। কিন্তু পোলাটার সাহস আছে। একবার নিজে অ্যাকশনে দেখেছে। ওয়ান পিস। এরকম কেউ থাকবে না, তাও একই দলের। খারাপই লাগছে। ইমনের দোষ ভাইয়ের সঙ্গে তর্ক করেছে। ভাইয়ের মনে হচ্ছে এটা বিপদ সংকেত। কারণ ওখানে রাকিব-টোকনরাও ছিল। যদি দেখে এরকম বেয়াদবি করে ইমন পার পেয়ে গেছে, তাহলে ওরাও করবে। আর তাহলেই বিপদ। এসব ব্যাপারে কেয়ারলেস হলে মুশকিল। এতদিনের সাম্রাজ্যটা টিকে আছে এরকম ঠিক সময়ে ঠিক কাজটি করাতেই। মেশিন হাতে পেলে যে কেউই গুন্ডা হতে পারে। ওরকম ১০০ ছেলে ভাই রোজ বানাতে পারেন, তাই এক ইমনে কিছু এসে যায় না।
-ঠিকাছে ভাই। ফোন দিমুনে।
-বুঝিছ কইলাম, ও আবার সেয়ানা পোলা। তোর লগে নজরুলরেও লইয়া ল। একা তোরে দেখলে সন্দেহ করতে পারে।
- না, লাগব না ভাই।
-যা কই শোন।
কথা বাড়ায় না শায়েক।

বেগুনবাড়ি : আগের দিন রাত ১০ টা

কোনো আওয়াজ ছাড়াই বাইকটা থামে অলির গ্যারেজে। সেলিম বাইর হচ্ছে ডেনিশের একটা কৌটা হাতে, চা আনবে বোধহয়। কৌটা হাত বদল করে সালাম দেয়, আগবাড়িয়েই বলে-
আছে ভাইজান। একটু আগেই আসছে।
ঘাড়লক করে নামে ইমন। শট শার্টটা টেনে দেয় নিচে। টিটুর সঙ্গে আগেও লেনদেন করেছে, তাই তেমন সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু লাইনটা এমন, শালার কে যে কখন কাঠের চশমা পড়ে ঠিক নাই। সন্ধ্যায় ভাইয়ের সঙ্গে তর্ক মতো হলো। আসলে রাকিব-টোকনকে দেখেই ওর মেজাজটা খিচড়ে গেছিল। এত কষ্ট করে টেম্পু স্ট্যান্ডের দখল করল সে, এখন সেটার টাকাটা নিবে শালারা। ওরা জানে, একটু হলেই সেদিন যেত ইমন! লোকমানের মেশিন না ফাঁসলে ওর জায়গায় ইমনের লাশটাই পড়ত। আবছা অন্ধকার ঠেলে এগিয়ে যায়। টিটু একাই।
-এত দেরি করলা ক্যান?
-দেরি মানে, তুমিও তো এখনই আসলা।
টিটু চুপ মেরে যায়। কোমরে হাত দেয়, হাত দেয় ইমনও। হাসে টিটু, একটা ন্যাকড়ার পুটলি বের করে।
-তাওরাস। অরজিনাল। ৬৫ হইলে ছাড়ব।
হাতে তুলে নেয় ইমন। ওর একই জিনিস আছে। বেশ নির্ভরযোগ্য। সবচেয়ে বড় কথা গুলি ফাঁসেনা। বুড়ো আঙ্গুলে টিপে ম্যাগাজিনটা স্লাইড করে। খালি। ট্রিগার টেনে, ছেড়ে দেয়। এরপর একবার কক করে। না, ঠিকই আছে। পকেটে হাত দিয়ে বোন্দাটা বের করে আনে।
-৬০ আছে।
-আরে না মামা। আমি অনেক বার্গেনিং করছি। ওরা ছাড়তে চায় না। অন্য পার্টিও আছে। আমি কী তোমার লগে লাভ খামু নাকি।
খেচরম্যাচর সহ্য হয় না ইমনের।
-টিট্যা, টাকাটা গুন, তারপর ফুট। তুই যে ফর্মাগিরি করছ, এইডা বহুদিন ধইরা জানি। কবে ভাইয়ে হান্দাইয়া দিব, তখন বুঝবি সাপের খেইল। ভাইল দাও খালি- মাদারি।
কোন কথা না বলে উঠে পড়ে টিটু। যাওয়ার আগে শুধু বলে
-হুনলাম ভাইয়ের লগে ঝগড়া হইছে তোমার?
_ঝগড়া মানে? কেডা কইছে! অবাক হয় ইমন।
-না হুনলাম।
বেরিয়ে যায় টিটু। সেলিম ঢুকে।
-হেই বেডা কই গেল! মামা আপনারে জিতু মামা খুঁজতাছে। কী বলে কথা আছে। কথাটা শুনেই রিং করে ইমন। ফোন বাজছে। ধরছে না জিতু।

মোহসিন হল : সকাল ৮টা
সারারাত কার্ড খেলেছে জিতু। নাম জিতু, কিন্তু হারু পার্টি। ক্যাশ হেরেছে ২৫, ধার হয়েছে আরো ১২। ইমন বহু মানা করেছে, কিন্তু তারপরও নেশাটা ছাড়তে পারে না। ইমনের কথা মনে হতেই মনে পড়ে যায়। আয় হায়। সঙ্গে সঙ্গে ফোন করে। দেখে মিস কল উঠে আছে অনেকগুলো। ইমনের নম্বর। ও ভাইব্রেশনে দিয়ে রেখেছিল বলে টের পায়নি। ফোন বাজছে ধরছে না ইমন। তাড়াতাড়ি সেন্টুর কাছ থেকে চাবি নেয়। একটানে মগবাজার যেতে হবে। দেরি হলেই সর্বনাশ।

মগবাজার : সকাল ৮ টা

ইচ্ছে করেই ফোনটা ধরছে না ইমন। শালা, তুমি জুয়া খেলবা, আমি ফোন করলে ধরবা না। টাকা শর্ট, এহন ফোন কর। কাটতেই আবার কল। ভাইয়ের ফোন। এত সক্কালে!
-জি ভাই!
-ইমন, রাইগা আছস না?
-না ভাই।
-শোন আমি বুঝি সব। আরে একটা বড় কাম আছে তাই রাকিব-টোকনগো লাগব আমার।
-ভাই, ওরা অ্যান্টি, পল্টি দিব যেকোনো দিন।
-দাদারে আদা পড়া দেছ নাকি! হোন আমি সব বুজি। ভালো কথা। ফ্রি আছছ?
-ক্যান ভাই!
-কমান্ডোরে পাঠাইতাছি। ও অবশ্য একাই পারে। তুই খালি বাইকে ওরে লিফট দিবি। ফরহাদের ট্রেস পাইছি। হুনলাম তাওরাস লইসছ। মেশিন ভালো তো!
এবার সত্যি চমকায় ইমন! ভাইয়ের 4টা চোখ আটটা কান কথাটা তাইলে সত্যি!
-জি ভাই।
-একটা নতুন ম্যানুয়েল আনাইছি। কামটা সাইরা আইয়া লইয়া যাইছ। বেরেটা।
-আইচ্ছা ভাই। শাইক্কা কহন আইব।
-ধর ১১টা সাড়ে ১১টা। ডেমরা। সমস্যা নাই। নাম্বার প্লেট লাগাইছ না।
-জি ভাই। ফোন কেটে যায়। বেল বাজে। শাইক্কা না, কেডা আইল। কি হোলে চোখ রাখে ইমন। জিতু, ঘামাচ্ছে। দরজায় রীতিমতো ধাক্কা। খোলে ইমন।
-ওফ। সিরিয়াস ক্যাচাল। তুই ফোট।
-মানে।
-তরে লইয়া গুটি হইছে।
-ক্যাডায়?
-ভাইয়ে।
-কী? -হ, শাইক্কা কামডা করব।
দুয়ে দুয়ে চার মেলায় ইমন
-তুই শুনলি কইত্যে?
-ফারাবিরে চিনস না, ৪০৮ নম্বরের?
- না।
-যাক, চিননের কাম নাই। শাইক্কার মেশিন ওর কাছে থাকে। ও জিগাইছে, কেডা। শাইক্কা তোর নাম কইছে। ও আবার জানে না আমি তোর দোস্ত।
-হুমম। বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে ইমন। জিতু এসব ব্যাপারে রিলায়েবল।
-যা তুই। দেখি, কী করা যায়।
-তুই সিলেট যাগা, কামরানগো কাছে।
- যা তুই।

মগবাজার : সোয়া ১১টা
কল দিয়েছিল কমান্ডো। বাইকে চড়ে রেডি ইমন। শার্টের নিচের বোতামটা খোলা। নায়লনের যে হোলস্টারটা কিনেছিল, আজ কাজে লাগছে। শোল্ডার হোলস্টার। বাটটা উল্টো দিকে ঘুরিয়ে আটকে নিয়েছে। 10 সেকেন্ডেই ফায়ার করতে পারবে মেশিন বের না করে। শায়েক পেছনে উঠে বসে। আলতো হাত ছোয়ায় শার্টের পেছনে। মনে মনে হাসে ইমন। হাত দুটো কোমরে যায় এবার। ইমন নড়ে ওঠে।
-দুর মিয়া কুতকুতি লাগে। সোজা হইয়া বস। যেমন বইছ মনে হয়...। কথা শেষ না করেই স্টার্ট দেয়। সামনে ধাক্কা খায় শায়েক। ইমন টের পায়, কোমরেই মেশিনটা রেখেছে ও।
বিশ্বরোডে উঠতেই শায়েক বলে, 'খিলগাও মাটির মসজিদটা ঘুইরা যাও তো। একটা কাম আছে। ফোর্থ গিয়ারেই টার্ন নেয় ইমন। বাইক ঘুরে। আবুল হোটেলের উল্টো দিকের গলিতে ঢুকতেই হঠাৎ কাধে হাত পড়ে। 'থামো'।
নড়াচড়াটা টের পায় ইমন। ওর হাত হ্যান্ডেল ছেড়ে কোমরে নামে, একইসঙ্গে ঘাড় কাত করে বাইকও শুইয়ে দেয়। গুলিটা ঠিক গলা বরাবর লাগে শায়েকের। মেশিন এবার হাতে নিয়ে ওর কপালে ঠেকায় ইমন। সাইলেন্সার লাগে না। ধপ করে আওয়াজ। বাইক তোলে ইমন। না, তাওরাস আসলেই চিজ! স্টার্ট নিয়ে ফের টান দেয় আগের পথে। হাওয়ার ঝাপটায় পতপতিয়ে উড়ছে শার্ট। বোতাম আটকে নেয় ইমন। একবার রিয়ার ভিউ মিররে চোখ বোলায়। নাহ্ জেলটা আসলেই ভালো।

 

বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ১৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ বিকাল ৪:২০
উদাসী স্বপ্ন বলেছেন: পড়ি নাই, তয় মনে হইলো জীনের বদলে হুইচকি!
১৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ বিকাল ৪:২৮

লেখক বলেছেন: কথা সইত্য ;) গা গরম দিয়া কথা, খালি বোতল পুরুষ মানুষের কি কামে লাগে

৩. ১৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ বিকাল ৪:২৭
প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব বলেছেন: আবার যে কবে থেকে এরম লেখা লিখবেন :(
৪. ১৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ বিকাল ৫:০১
পুতুল বলেছেন: খুব শক্তিশালী লেখা! ভীষন ভাল লাগল।
৫. ১৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ বিকাল ৫:১৩
দ্বিধা বলেছেন: "নাহ্ জেলটা আসলেই ভালো..."

কিয়ের যেন গন্ধ শুনলাম...
৬. ১৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ বিকাল ৫:৩২
জ্বিনের বাদশা বলেছেন: হা হা হা হা হা ... জটিলস ...
১৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ বিকাল ৫:৪০

লেখক বলেছেন: থ্যাঙ্কু :)

৭. ১৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ বিকাল ৫:৪৬
রাশেদ বলেছেন: ফাটাফাটি হইছে।

পরতিবাদ জানাই!! আমি পুরান পোস্ট পইড়া বেড়াই। :)
৮. ১৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:৫৯
শফিউল আলম ইমন বলেছেন: ফাটাফাটি লেখা...........
তয় আমি ও রাশু'দার মত পরতিবাদ জানাচ্ছি.......পুরান লেখা আমিও পড়ি।
১৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ৮:১৬

লেখক বলেছেন: তাইলে তো ঠিকাছে

৯. ১৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ১০:৫৩
ফারহান দাউদ বলেছেন: পরেরটা তো কালকেই পড়সিলাম,পয়লাটাও আজকে পড়লাম। সেইরকম জোশ ২টাই,তবে কিনা,আমি থ্রিলারের পোকা,পরের গপ্পোটার মত আরো ২-১ টা ছাড়েন বস:)
২০ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ দুপুর ২:৫৩

লেখক বলেছেন: ঠিকাছে, চেষ্টা করবো

 

মোট সময় লেগেছে ০.৯৩৬০ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
বন্ধুত্বে উদার, শত্রুতায় নির্মম : কিছু করার নাই, রাশির দোষ
........................
জামাতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র শিবির সম্পর্কে মহানবীর (দঃ) সতর্কবাণী :

শেষ...
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ