চৈত্র সংক্রান্তিতে বাদশাহী মেজাজে আছেন ইলিশ টুকরির মালিকরা। রাস্তায় পিড়ি পেতে চেগাইয়া তারা বসে আছেন। গামছা নেড়ে বাতাস করতে করতে কথা বলেন অন্য দিকে তাকিয়ে। ক্রেতার ভূমিকা নিতান্তই ক্রেতার, দরদাম করতে গেলে তাকে দুটো হ্যান্ড সিগনাল দেখতে হবে। হাত তুলে, তালুদেখিয়ে তাকে বোঝানো হবে- থামেন। এরপর সেটা ঘড়ির কাটার দিকে নামবে ১৮০ ডিগ্রি, ফের উল্টো দিকে ঘুরবে। অর্থাত- রাস্তা মাপেন, নেক্সট। তাই কালচারে থাকতে নো মুলোমুলি- বোশেখী বাঙালী হতে যেভাবেই হোক ইলিশ কিনুন।
এই কর্পোরেট কালচারের যুগে যখন রেইন ড্রপস আর ফলিং অন মাই হেডের সঙ্গে সেনোরা কিংবা এই পথ যদি না শেষ হয়কে মেলানো হয় গাড়ির ব্যাটারির সঙ্গে- তখন বেচারা ইলিশের আর কি উপায়! আগে যৌবন উপভোগ করতে পারতো, এখন তারুণ্যেই শেষ। আমার ব্যক্তিগত ধারণা ছিলো ইলিশ বর্ষার মাছ। প্রসঙ্গেই মনে পড়ছে ন্যাশনাল জিওগ্রাফির একটা ডকুমেন্টারি। বছরে একটা সময় স্যামন মাছের ঝাক যায় আর্কটিক সাগর দিয়ে। তখন আকাশ থেকে পাখী, মাটি থেকে পেঙ্গুইন, সাগর পার থেকে সিল, সাগরপাতাল থেকে হাঙরেরা ছুটে আসে মহা এক ভোজে। সব শত্রুদের ভেদাভেদ ভুলে স্যামন খাওয়ার উৎসব।
আমরা গাঙ্গেয়রা সেরকমই এক ভাগ্য নিয়ে জন্মেছি। আমাদের উপকুলে ঢুকে পড়ে বিরল এই সুস্বাদু মাছটি। ডিম ছাড়ে, মরে শেষ করে তার জীবন চক্র। এই চক্রটাতেই বাদ সাধছে আমাদের পান্তা-ইলিশ নামের মেন্যুটি যা কোনো যুগেই বাঙালীর হেশেলে বোশেখী ডিশ ছিলো না। এখন মোবাইল কোম্পানিগুলোর বিশেষ প্যাকেজের সঙ্গে তাল মেলাতে কোনো এক স্টুপিডের মাথা থেকে বেরিয়েছে ইলিশ চক্রকে বিপন্ন করার এই উদ্যোগ। সুবাদেই এখন হুজুগে বর্ষবরণকারীদের পাতে উঠছে জাটকা।
কতদিন চলে এভাবে! প্রকৃতি অনাচার সয় না। নিজেকে বাচাতেই সে হয়তো ভিন্ন পথ বেছে নেবে, পথ পাল্টে চলে যাবে মায়ানমার কিংবা হুগলিতে। দাদাদের ষড়যন্ত্র! হাহাহাহা, হতেও পারে। এই ব্লগেই কে জানি লিখেছিলো এমনই কিছু। কিংবা কারেন্ট জাল ব্যবসায়ীদের অস্তিত্ব বাচাতেই হয়তো জন্ম এই প্রতিবেশঘাতক চক্রান্তের।
আক্ষেপে ভরপুর এই লেখাটার পরতে পরতে রয়েছে আমারও একটি চক্র না ভাঙার চরম আকুতি। আমি কোনো কালেই বোশেখী ইলিশের ভক্ত ছিলাম না। ডাইনিংয়ে ইলিশের ডিম নিয়ে হোস্টেল বন্ধ হওয়ার মতো সংঘাতে জড়িয়েছি, মারামারি করেছি হোটেলে। কিন্তু আমাকেও বাধ্য করা হচ্ছে। অচেনা সেই ষড়যন্ত্রীরা আমার আশপাশ, আমার পরিবেশ, আমার প্রিয় মুখদেরে কনভিন্স করিয়ে আমাকে বাধ্য করছে এই যজ্ঞে যোগ দিতে। আমি চেচিয়ে ক্লান্ত হয়ে আত্ম সমর্পণ করি তাদের কালচারে মানিয়ে নিতে। মেনে নিতে।
এই আমি অসহায় দূরে দাড়িয়ে থাকা এক ক্রেতা, অপেক্ষায় থাকি বিক্রি শেষের ঝুটোর। টুকরিওয়ালার দয়ার। কাল পয়লা বৈশাখ। শুভ নববর্ষ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


