স্বাধীনতার এই ৩৮ বছর পরে এসে অবশেষে সরকারী পর্যায়ে ঘোষণা এসেছে একাত্তরের ঘাতক-দালালদের বিচারের। ধর্মের নামে হত্যা, ধর্ষণ, লুন্ঠনে খুনী পাকিস্তানীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায় যে যুদ্ধাপরাধ করেছিলো তারা, সেই পাপের। ১৯৭৫ সালে জাতীর জনক হত্যার পর থেকে যখন পুনর্বাসিত হচ্ছিলো এইসব স্বাধীনতাবিরোধীরা, জনতা বিস্ময়ভরে দেখে গেছে। যার ডাকে কোটি বাঙালী একাট্টা হয়েছিলো, তাকেই যখন হত্যা করা হলো তখন আবারও সেই পাকিস্তানের উপনিবেশে পরিণত হওয়ার আতঙ্ক ভর করেছিলো তাদের। রাইফেল আর বুটে ঢাকা পড়েছিলো তাদের চাপা ক্রোধ। আশঙ্কাটা সত্যি হওয়ার সব নর্মগুলোই পুরো করতে শুরু করেছিলেন সামরিক শাসক জিয়া। দালাল অধ্যাদেশ বাতিল এবং গোলাম আযমকে দেশে ফিরে আসার সুযোগ করে দিয়ে সর্বনাশের ষোলকলাই পূর্ণ করেছেন মুক্তিযুদ্ধের এই সেক্টর কমান্ডার। পাকিস্তানের নাগরিক হয়েও স্বাধীনতার বিরোধিতা করে লাখো শহীদের রক্তে হাত রাঙানো জামাতে ইসলামীর আমির হয়ে গেলো এই নরপিশাচ। জাতির পতাকা খামচে ধরলো সেই পুরানো শকুন।
কিন্তু ওই যে বললাম আগে, এই দুর্যোগেই জননীর রূপে সামনে এলো আমাদের প্রিয় জন্মভূমি। পিঠ বাচাতে ব্যস্ত ও উর্দি তোষনে দিশেহারা রাজনীতিকদের হতভম্ব করে ডাক দিলেন প্রতিরোধের। মুক্তিযুদ্ধ শেষ করতে হবে। বিচার করতে হবে এইসব খুনীদের। শুধু দাবি নয়, করেও দেখালেন। ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারী গঠিত হলো একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি। ২৬ মার্চ সোহরাওর্দী উদ্যানকে জনসমুদ্রে ভাসিয়ে বিচার করলেন শীর্ষ দালাল ও যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের। ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াইয়ের চেয়েও তার কাছে গুরুত্বপূর্ন ছিলো এইসব খুনী লুটেরাদের সদর্প পুনর্বাসনের প্রতিবাদ।
ইতিহাসে তাদের স্থানটা নির্ধারণের লড়াইয়ে নেমেছিলেন আম্মা। জামাতি শুয়োরেরা তাকে জাহান্নামের ইমাম বলে ব্যাঙ্গ করেছে। আর তাদের পৃষ্টপোষক বিএনপি সরকার উল্টো তাকেই ঘোষণা করেছে রাষ্ট্রদ্রোহী। কিন্তু অন্যায় কতদিন চাপা থাকে! মৃত্যুতেও তাই থেমে থাকেনি আন্দোলন। যুদ্ধাপরাধীদের জাহান্নামে পাঠানোর কাফেলায় ইমামতিটা ঠিক মতোই সেরেছেন আপামর মুক্তিযোদ্ধার প্রিয় আম্মা। মৃত্যুর আগে শেষ নির্দেশনামায় লিখেছিলেন :
প্রিয় সহযোদ্ধারা,
গত তিন বছর ধরে আপনার গোলাম আযম ও তার সহযোগী ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের এবং স্বাধীনতার শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছেন। বাঙালী জাতির প্রেক্ষাপটে আপনাদের একতা এবং সাহস ছিলো অতুলনীয়। আমাদের এই সংগ্রামের শুরুতে আমি আপনাদের সঙ্গী ছিলাম। আমাদের প্রতিজ্ঞা ছিলো যতক্ষণ না লক্ষ্য অর্জন হচ্ছে ততক্ষণ এই যুদ্ধ চলবে। মরণব্যাধি ক্যান্সারে শয্যাশায়ী হয়ে আমি আমার জীবনের শেষ দিনগুলো গুনছি।
আমি আমার প্রতিজ্ঞা রেখেছি। আমি লড়াই থেকে পিছু হটিনি। কিন্তু মৃত্যুর দিকে এই অবশ্যম্ভাবী যাত্রা আমি ঠেকাতে অক্ষম। সে কারণেই আমি লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার শপথটা আপনাদের আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। আপনাদের অবশ্যই এই অঙ্গীকার পূরণ করতে হবে। আপনাদের অবশ্যই একতাবদ্ধ থাকতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত লড়তে হবে। যদিও আমি আপনাদের সঙ্গে থাকতে পারব না। কিন্তু নিশ্চিত জানব- আমার লাখো বাঙালী ছেলেমেয়ে- একটি স্বাধীন সোনার বাংলায় সন্তানদের নিয়ে সুখে বাস করছে।
আমাদের সামনের পথ এখনও দীর্ঘ এবং বন্ধুর। এই যুদ্ধে আমরা সর্বস্তরের জনগণকে পাশে পেয়েছি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক সংগঠন, মুক্তিযোদ্ধা, নারী, ছাত্র এবং যুবকরা এই লড়াইয়ে সামিল হওয়ার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছে। আর আমি জানি জনগণের চেয়ে দৃঢ়চেতা আর কেউ নয়। জনগণই সব শক্তির মূলে। তাই আমি গোলাম আযম এবং ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ভার ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখার দায়িত্ব তুলে দিয়ে যাচ্ছি আপনাদের হাতে- বাংলাদেশের জনগণের হাতে। নিশ্চিত জানবেন, জয় আমাদের হবেই।
আজ সেই জয়োৎসবের মঞ্চে খুটি লাগতে শুরু করেছে। মরিয়া ঘাতকেরা নানা কূটচালে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টিতে তৎপর। ওদের মাথায় এখনও ঢুকছে না যে এটা রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, এটা জনতার আন্দোলন। সেই জনতার, যারা নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে শুদ্ধ রাখতে চায়। তাদের কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না।
শুনতে পাচ্ছেন আম্মা?
(মাদার রাশিয়া নামে সেই বিখ্যাত পোস্টারটি একটু ক্যারিকেচার করলাম প্রচ্ছদের ছবিতে। শিল্পী হলে এমন একটা একেই ফেলতাম। )
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে জুন, ২০০৯ রাত ৩:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


