somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিজয়ের চাপা গুঞ্জন শুনতে পাচ্ছেন আম্মা?

২৬ শে জুন, ২০০৯ বিকাল ৫:১০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ছোটবেলায় রাশান বই খুব পড়া হতো। বাংলায় অনুবাদ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রুশদের বীরত্বগাঁথা খুবই আলোড়িত করতো। তবে রোমাঞ্চিত হতাম একটি পোস্টারে। তোমার মাতৃভূমির জন্য যুদ্ধে এসো- এক মায়ের দৃপ্ত আহবানের ছবি। মনে হতো এমন করে কোনো মা ডাক দিলে আমিও ঠিক যুদ্ধে যাবো। ডাক দিয়েছিলেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। ঢাকার বুকে দুরন্ত সব অপারেশন করে কাঁপিয়ে দেওয়া ক্র্যাক প্লাটুনের বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ রুমির মা। আমাদের এই প্রিয় দেশটাই যেনো মায়ের রূপ নিয়ে ভর করেছিলো তার ওপর। মুক্তিযুদ্ধকে পূর্ণাঙ্গতা দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছিলেন আমাদের প্রিয় আম্মা। আজ তার মৃত্যু দিবসে জানাই অশেষ শ্রদ্ধা।

স্বাধীনতার এই ৩৮ বছর পরে এসে অবশেষে সরকারী পর্যায়ে ঘোষণা এসেছে একাত্তরের ঘাতক-দালালদের বিচারের। ধর্মের নামে হত্যা, ধর্ষণ, লুন্ঠনে খুনী পাকিস্তানীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায় যে যুদ্ধাপরাধ করেছিলো তারা, সেই পাপের। ১৯৭৫ সালে জাতীর জনক হত্যার পর থেকে যখন পুনর্বাসিত হচ্ছিলো এইসব স্বাধীনতাবিরোধীরা, জনতা বিস্ময়ভরে দেখে গেছে। যার ডাকে কোটি বাঙালী একাট্টা হয়েছিলো, তাকেই যখন হত্যা করা হলো তখন আবারও সেই পাকিস্তানের উপনিবেশে পরিণত হওয়ার আতঙ্ক ভর করেছিলো তাদের। রাইফেল আর বুটে ঢাকা পড়েছিলো তাদের চাপা ক্রোধ। আশঙ্কাটা সত্যি হওয়ার সব নর্মগুলোই পুরো করতে শুরু করেছিলেন সামরিক শাসক জিয়া। দালাল অধ্যাদেশ বাতিল এবং গোলাম আযমকে দেশে ফিরে আসার সুযোগ করে দিয়ে সর্বনাশের ষোলকলাই পূর্ণ করেছেন মুক্তিযুদ্ধের এই সেক্টর কমান্ডার। পাকিস্তানের নাগরিক হয়েও স্বাধীনতার বিরোধিতা করে লাখো শহীদের রক্তে হাত রাঙানো জামাতে ইসলামীর আমির হয়ে গেলো এই নরপিশাচ। জাতির পতাকা খামচে ধরলো সেই পুরানো শকুন।

কিন্তু ওই যে বললাম আগে, এই দুর্যোগেই জননীর রূপে সামনে এলো আমাদের প্রিয় জন্মভূমি। পিঠ বাচাতে ব্যস্ত ও উর্দি তোষনে দিশেহারা রাজনীতিকদের হতভম্ব করে ডাক দিলেন প্রতিরোধের। মুক্তিযুদ্ধ শেষ করতে হবে। বিচার করতে হবে এইসব খুনীদের। শুধু দাবি নয়, করেও দেখালেন। ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারী গঠিত হলো একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি। ২৬ মার্চ সোহরাওর্দী উদ্যানকে জনসমুদ্রে ভাসিয়ে বিচার করলেন শীর্ষ দালাল ও যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের। ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াইয়ের চেয়েও তার কাছে গুরুত্বপূর্ন ছিলো এইসব খুনী লুটেরাদের সদর্প পুনর্বাসনের প্রতিবাদ।

ইতিহাসে তাদের স্থানটা নির্ধারণের লড়াইয়ে নেমেছিলেন আম্মা। জামাতি শুয়োরেরা তাকে জাহান্নামের ইমাম বলে ব্যাঙ্গ করেছে। আর তাদের পৃষ্টপোষক বিএনপি সরকার উল্টো তাকেই ঘোষণা করেছে রাষ্ট্রদ্রোহী। কিন্তু অন্যায় কতদিন চাপা থাকে! মৃত্যুতেও তাই থেমে থাকেনি আন্দোলন। যুদ্ধাপরাধীদের জাহান্নামে পাঠানোর কাফেলায় ইমামতিটা ঠিক মতোই সেরেছেন আপামর মুক্তিযোদ্ধার প্রিয় আম্মা। মৃত্যুর আগে শেষ নির্দেশনামায় লিখেছিলেন :
প্রিয় সহযোদ্ধারা,

গত তিন বছর ধরে আপনার গোলাম আযম ও তার সহযোগী ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের এবং স্বাধীনতার শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছেন। বাঙালী জাতির প্রেক্ষাপটে আপনাদের একতা এবং সাহস ছিলো অতুলনীয়। আমাদের এই সংগ্রামের শুরুতে আমি আপনাদের সঙ্গী ছিলাম। আমাদের প্রতিজ্ঞা ছিলো যতক্ষণ না লক্ষ্য অর্জন হচ্ছে ততক্ষণ এই যুদ্ধ চলবে। মরণব্যাধি ক্যান্সারে শয্যাশায়ী হয়ে আমি আমার জীবনের শেষ দিনগুলো গুনছি।
আমি আমার প্রতিজ্ঞা রেখেছি। আমি লড়াই থেকে পিছু হটিনি। কিন্তু মৃত্যুর দিকে এই অবশ্যম্ভাবী যাত্রা আমি ঠেকাতে অক্ষম। সে কারণেই আমি লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার শপথটা আপনাদের আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। আপনাদের অবশ্যই এই অঙ্গীকার পূরণ করতে হবে। আপনাদের অবশ্যই একতাবদ্ধ থাকতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত লড়তে হবে। যদিও আমি আপনাদের সঙ্গে থাকতে পারব না। কিন্তু নিশ্চিত জানব- আমার লাখো বাঙালী ছেলেমেয়ে- একটি স্বাধীন সোনার বাংলায় সন্তানদের নিয়ে সুখে বাস করছে।

আমাদের সামনের পথ এখনও দীর্ঘ এবং বন্ধুর। এই যুদ্ধে আমরা সর্বস্তরের জনগণকে পাশে পেয়েছি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক সংগঠন, মুক্তিযোদ্ধা, নারী, ছাত্র এবং যুবকরা এই লড়াইয়ে সামিল হওয়ার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছে। আর আমি জানি জনগণের চেয়ে দৃঢ়চেতা আর কেউ নয়। জনগণই সব শক্তির মূলে। তাই আমি গোলাম আযম এবং ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ভার ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখার দায়িত্ব তুলে দিয়ে যাচ্ছি আপনাদের হাতে- বাংলাদেশের জনগণের হাতে। নিশ্চিত জানবেন, জয় আমাদের হবেই।


আজ সেই জয়োৎসবের মঞ্চে খুটি লাগতে শুরু করেছে। মরিয়া ঘাতকেরা নানা কূটচালে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টিতে তৎপর। ওদের মাথায় এখনও ঢুকছে না যে এটা রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, এটা জনতার আন্দোলন। সেই জনতার, যারা নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে শুদ্ধ রাখতে চায়। তাদের কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না।

শুনতে পাচ্ছেন আম্মা?

(মাদার রাশিয়া নামে সেই বিখ্যাত পোস্টারটি একটু ক্যারিকেচার করলাম প্রচ্ছদের ছবিতে। শিল্পী হলে এমন একটা একেই ফেলতাম। )
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে জুন, ২০০৯ রাত ৩:৫৪
৯টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×