প্রপাগান্ডা (Propaganda) শব্দটির অধিক নেতিবাচক ব্যবহারের কারণে এর কৌশলগত দিক নিয়ে আলোচনার সুযোগ হারিয়েছি। বরং শব্দটি শুনলে অবধারিতভাবে মহামান্য হিটলার এবং তার প্রপাগান্ডা মন্ত্রী গোয়েবলসকে (Goebbels) দু’চারটে গালি দিতেই হয়। অবচেতন মনে আধুনিক মিথ্যাচারের সুচারু প্রয়োগ এবং এর শৈল্পিক সৌন্দর্যকে পাশ কাটিয়ে চলে যাই। অথচ সৃজনশীলতার সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহন করেই কেবল একটি সফল প্রপাগান্ডার জন্ম দেয়া যায়। আর নির্বোধরা প্রপাগান্ডাকে শয়তানের কর্ম বলে ধরে নিয়ে অভিশাপ দিতে ব্যস্ত থাকে। ইতিহাস প্রমাণ করে কেবলমাত্র প্রপাগান্ডার সফল প্রয়োগ করে দৃশ্যত অনৈতিক হয়েও অনেক কুকর্মে সফলতা এসেছে নৈতিকভাবেই। আবার প্রপাগান্ডাকে পাত্তা না দিয়ে অনেক ক্ষমতাধর শাসক তার ক্ষমতা হারিয়েছে, নিশ্চিহ্ন হয়েছে তার রাজনৈতিক দল। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয়ও ঘটে। কোন কোন ব্যক্তি নিজ অযোগ্যতা কিংবা সীমাহীন দুর্নীতির কারণে ক্ষমতা হারিয়েও বিরোধী শিবিরের প্রপাগান্ডাকে দায়ী করে থাকে। বাংলাদেশের বর্তমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রেক্ষিতেও চলছে এরকম প্রপাগান্ডা। ১৯৭১ সনে প্রয়োগকৃত যাবতীয় প্রপগান্ডাকে আরো আধুনিক এবং শাণিত করে যুদ্ধাপরাধীরা এখন জনমতকে কলুষিত করার চেষ্টায় লিপ্ত। অনেক ক্ষেত্রে তারা সফলও। বর্তমান সরকার যদি এ বিষয়ে সতর্ক না হয় তবে অন্য কোন ব্যর্থ রাষ্ট্রের মতোই পতিত হবার সমূহ সম্ভাবনা আছে।
না, প্রপাগান্ডা নিয়ে লেখার উদ্দেশ্য নেই। উদ্দেশ্য বাংলাদেশের বর্তমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইস্যু। একের পর এক চমকপ্রদ ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। কোনটি প্রকাশ্যে, কোনটি গোপনে; যার অনেক কিছুই আমরা জানতে পারি না। আশাকরি এ লেখায় তেমন অনেক অজানা বিষয় তুলে ধরতে পারবো।
২০ জুলাই ২০১০ তারিখে চৌকষ গোয়েন্দাদের একটি দল শীর্ষ এক রাজাকারকে গ্রেফতারের জন্য তার বাসায় অভিযান চালায়। কিন্তু ধূর্ত এ ব্যক্তি গোয়েন্দাদের আগমন টের পেয়ে নিজ থেকেই অন্তর্ধান করেন এবং এখন পর্যন্ত নিখোঁজ আছেন। পরবর্তীতে গোয়েন্দা দল তার বাসায় তল্লাশী চালিয়ে কিছু কাগজপত্র এবং দলীয় প্রকাশনা জব্দ করে ফিরে আসে।
জব্দকৃত কাগজপত্রের মধ্যে ওই শীর্ষ রাজাকারের ব্যক্তিগত দিনলিপি লেখার খাতাও (ডায়েরী) ছিলো। তথ্য মন্ত্রনালয়ের ওয়েব সাইটে ২১ জুলাই মধ্য রাতে উদ্ধারকৃত ডায়েরী থেকে কয়েকটি পৃষ্ঠার স্ক্যানকৃত জেপিইজি ফরম্যাট ইমেজ আপলোড করে। কিন্তু শেষরাতে আবার তা ওয়েব থেকে সরিয়ে নেয়া হয়। ভাগ্য ভালো আমি তখন ফেসবুকে বন্ধুদের সাথে চ্যাট করার ফাঁকে কিছু তথ্য নেয়ার জন্য তথ্য মন্ত্রনালয়ের ওয়েবে যাই।
কি লেখা আছে সে ডায়েরীতে !
অনেক কিছু লেখা ছিলো। বেশিরভাগই ভয় এবং সাহায্য প্রার্থনা বিষয়ক। আমি চেষ্টা করবো উল্লেখযোগ্য অংশ তুলে ধরতে।
৯ জুলাই, ২০১০
আজ পবিত্র জু্ম্মাবার। নামাজ পড়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে প্রাণ খুলে কান্নাকাটি করেছি। কিন্তু আমাদের প্রার্থনা তাঁর কানে পৌঁছায় বলে মনে হয় না। তা নাহলে নিজামী ছাহেব, মুজাহিদ ছাহেব এবং মৌলানা ছাহেবকে কখনোই মুরতাদ সরকারের হাতে তুলে দিতেন না। হে আল্লাহ! এ কোন কঠিন পরীক্ষায় ফেললে! সেদিন মুহতারাম শাহ আল ছাহেবের পত্রিকায় এসেছে মৌলানার গুহ্যদ্বারে নাকি ক্ষত হয়ে গেছে। আহারে! বেচারা এমনিতেই রোগা মানুষ। আল্লাগো! তুমি তোমার খলিফাদের রক্ষা করো।
১০ জুলাই, ২০১০
হিন্দুদের শনির দশা, রবির দশায় বিশ্বাস না করলেও আজ আমার ঈমান ছুটে যেতে পারতো। চারদিকে কাফের মুরতাদরা আমাদের পেছনে লেগেই আছে। পাশের বাড়ির দারোয়ান এখন আর আমাকে দেখে সালাম দেয় না। বাজারের দোকানদারের কর্মচারী আমাকে দেখে সহকর্মীর কানে ফিসফিস করে রাজাকার রাজাকার বলে। না জানি সামনে কি আছে কপালে। হে আল্লাহ তোমার এ প্রিয় বান্দাদের হেফাজতের দ্বায়িত্ব তোমার নিজেরই। মাবুদগো, তুমি তোমার নালায়েক বান্দাদের জানিয়ে দিও “একাত্তরে আমরা কেবল এসলাম রক্ষা করার জন্যই তোমার নির্দেশে যা যা করার করেছি”। এ বানী তুমি তাদের দিলে পৌঁছিয়ে দাও।
১১ জুলাই, ২০১০
বলা হচ্ছে দলের নেতৃত্ব নিতে। কিন্তু ঘরে দু দু’টি সুন্দরী ছেলের বৌ রেখে জেলখানায় যেতে দিল আগায় না। ছেলের বৌদের দিকে তাকালেই পরোয়ার্দেগারের প্রতি ভক্তি বেড়ে যায় কয়েকগুন। এই ইহলোকে নিজগৃহেই কতোইনা অপরূপা হুরের বন্দোবস্ত করে রেখেছেন। নিশ্চয় এসলাম রক্ষার জন্য একাত্তরে আমার ভূমিকার পুরস্কার দিলেন! না, আমি দলের নেতৃত্ব দিবো না।
১২ জুলাই, ২০১০
আজ ১২জুলাই সোমবার। ১২ রবিউল আউয়াল সোমবারে আল্লাহর পেয়ারা নবী (স: ) নূরের ঝলক নিয়ে এ পৃথিবীতে আসেন। কিন্তু আজকের এ দিনে একবারের জন্যও দুরুদ পড়ার সুযোগ পেলাম না। হে আল্লাহ তুমিতো সব দেখেছো, এ অসহ্য গরমে সারাদিন আলমারির ভেতরে শুয়ে থেকে এ বৃদ্ধ শরীরে ইয়া নাফসী, ইয়া নাফসী করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিলো কি! পারিনি জরুরত সারতে, রিজিকে ছিলো না এক ফোটা পানি! এ কোন পরীক্ষায় ফেললেগো মাবুদ, এর কোন শেষ নেই? তবুও তোমার শুকরিয়া আদায় করে শেষ করা যায় না। অন্তত সারাদিন এ ঢাকা শহরের যানজট আর কালনাগিনী সরকারের লোডশেডিং দেখার হাত থেকেতো রক্ষা করেছো। তুমি মহান, সুবহানআল্লাহ।
১৩ জুলাই, ২০১০
আজ আমার আরো দু’ভাইকে জালিম সরকারের পুলিশ বাহিনী ধরে নিয়ে গিয়েছে। আইয়্যামে জাহেলিয়াতের সময় কি আবার ফিরে এলো? হে আল্লাহ, তথাকথিত এ বাংলাদেশকে পুনরায় পাকিস্তান বানানোর স্বপ্ন কি বাস্তব হতে দিবে না? খেলাফায়ে রাশেদীনরা বন্দী হয়ে গেলেতো এ দেশ থেকে ইসলাম মুছে ফেলবে! তুমি এবার তোমার খেলা থামাও। আমরা জানিনা আমাদের ভুল কোথায়, জানিনা কি দোষ করেছি। তুমি নিজগুনে ক্ষমা করে দাও। ইসলাম কায়েম করে নেয়ার পর তোমার যতো পরীক্ষা আছে সাব চালিয়ে দিও। এবার থামো মাবুদ, এবার থামো।
১৪ জুলাই, ২০১০
না, অন্যের জন্য দোয়া করে কি হবে? কোনদিন যে আমাকেই ধরে নিয়ে যায়। আল্লাহগো, জীবনে যতো নামাজ কাজা করেছি, যতো রমনীর দিকে কু-দৃষ্টিতে তাকিয়েছি, সবকিছুর কাফফারা দিয়ে দিবো। হে আল্লাহ তুমি যদি এ ভয়াবহ রিমান্ডের হাত থেকে আমাকে বাঁচাও, তবে আমি ২টি উট আর ১০টি দুম্বা কোরাবান দেবো। খোদার কসম দিবো।
ডাউনলোডকৃত অন্য ইমেজগুলোয় এখন আর কোন কন্টেন্ট প্রদর্শিত হচ্ছে না।
প্রপাগান্ডা নিয়ে সামান্য একটু বলি। আমি নিশ্চিত সেদিন তথ্য মন্ত্রনালয়ের ওয়েব সাইট থেকে যুদ্ধাপরাধীদের প্রযুক্তিবিদরাই ডায়েরীর স্ক্যান কপিগুলো সরিয়ে ফেলেছে। এমনকি আপলোডকৃত ইমেজগুলোতে ভাইরাস ছড়িয়ে দিয়েছে, যা কিনা ধীরে ধীরে ইমেজ ফাইলগুলো থেকে কন্টেন্ট রিমুভ করে নিচ্ছে। কারণ এখন আর ইমেজে কিছু দেখা যায় না। শুধু একটি সাদামাটা ডায়েরীর পাতায়ই দেখা যায়। বিষয়টি অত্যন্ত দুশ্চিন্তার। এতো উন্নত প্রযুক্তি তারা কোথায় পায়, খতিয়ে দেখা দরকার। সরকারকে এসব মোকাবেলার জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিতে হবে। নইলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া থেমে যেতে পারে। আমরা চাইনা রাষ্ট্রের বিপক্ষে আর কোন ইতিহাসের জন্ম হোক।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



