somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাংলাভাষী ব্রিটিশ সাংবাদিকের ধৃষ্টতা

১৩ ই আগস্ট, ২০১০ ভোর ৫:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ধৃষ্টতা ইদানীং মাত্রাছাড়া রূপ নেয়ায় কেউ কেউ হয়তো ভাবতে পারেন তিনি উন্মাদ হয়ে গেছেন। এ ধরনের ভাবনা তাদের, যারা তাকে ভালোমত চেনেন না। যারা গাফ্ফার চৌধুরীকে দীর্ঘদিন ধরে জানেন এবং তার লেখার সঙ্গে পরিচিত, তারা বুঝতে পারেন যে খিস্তিখেউড় করাই হচ্ছে তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। এতে লেখার বিষয়বস্তু নিয়ে খুব বেশি চিন্তা-ভাবনা করতে হয় না। তদুপরি রগরগে রচনার একশ্রেণীর পাঠক আছে। তাই কলামিস্ট গাফ্ফার চৌধুরীর কদরও আছে। এর জোরে তিনি গোটাপাঁচেক পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখছেন এবং তার বিনিময়ে বছরে হাজার হাজার পাউন্ড স্টার্লিং বাংলাদেশ থেকে রেমিট্যান্স আকারে লন্ডনে তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হচ্ছে। এটা একটা সাফল্য। লন্ডনে তেলে-ঝোলে খেয়ে তিনি ভালোই আছেন।
সম্প্রতি তিনি একাধিক পত্রিকায় অত্যন্ত অশালীন ভাষায় প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ বদরুদ্দীন উমর, বিশিষ্ট কবি ও লেখক ফরহাদ মাজহার, জনপ্রিয় সম্পাদক ও কলামিস্ট শফিক রেহমান এবং আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের চরিত্র হনন করে একের পর এক কলাম লিখে চলেছেন। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন যে, এদের কেউ তার এসব কুিসত লেখার জবাব দেবেন এবং সেই জবাবের পিণ্ডি চটকে তিনি মাসতিনেক গড়গড়িয়ে চালিয়ে যাবেন তার কলম-বাণিজ্য। তেমনটি না ঘটায় তিনি যে হতাশ হয়েছেন তা প্রকাশও করেছেন সাম্প্রতিক এক লেখায়। আসলে গাফ্ফারীয় ভঙ্গিতে লেখাগুলোর জবাব দিতে গেলে যে কোনো ভদ্র মানুষের রুচি ও দীর্ঘদিনের লালিত মূল্যবোধ বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তারপরও আমি নিরুপায়। কারণ লেজ ধরে মোচড় দেয়া ছাড়া অন্য কোনো ভাষা বলদ বোঝে না।
সরকার গত ১ জুন আমার দেশ-এর প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়। ওইদিন প্রায় মাঝরাতে পুলিশ গিয়ে আমার দেশ-এর প্রেস সিলগালা করে দেয় এবং মাঝরাতের পর ঝাঁকে ঝাঁকে পুলিশ রীতিমতো অভিযান চালিয়ে আমার দেশ অফিস লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে অফিসে অবস্থানরত ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করে। ব্রিটিশ আমলে, পাকিস্তান আমলে এবং বাংলাদেশ আমলে এমন ঘটনা এই ভূখণ্ডে এর আগে কখনও ঘটেনি। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিক এক যুক্ত বিবৃতিতে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান। বিষয়টি নিয়ে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর একটা লেখা ৪ জুন দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয়েছিল। সে লেখায় তিনি “কিন্তু ‘আমার দেশ’ পত্রিকাটি ডিক্লারেশন সংক্রান্ত কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া ঠিক হয়েছে বলে আমার মনে হয় না”—জাতীয় মন্তব্য করলেও মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করায় এবং পত্রিকাটি সরকার বন্ধ করে দেয়ায় তার উল্লাস গোপন থাকেনি।
গাফ্ফার চৌধুরী ওই লেখায় ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন শেখ মুজিব সরকার রাষ্ট্রীয় মালিকানায় যে ৪টি দৈনিক পত্রিকা রেখে আর সব সংবাদপত্র বাতিল করে দিয়েছিল সে প্রসঙ্গ টেনে উল্লেখ করেছেন, “বাকশাল শাসন ব্যবস্থায় যখন দেশে সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণের এ ব্যবস্থাটি নেয়া হয়, তখন আমি বাংলাদেশ সংবাদপত্র-সম্পাদক পরিষদের সভাপতি। বঙ্গবন্ধুর কাছে ছুটে গিয়ে বলেছিলাম, ১৯৬৬ সালের ১৬ জুন আইয়ুব-মোনায়েম সরকার দৈনিক ইত্তেফাক বন্ধ করেছিল। বর্তমান বাংলাদেশ সরকার কেন সেই তারিখটিই সংবাদপত্র বন্ধ করার জন্য বেছে নিল? বঙ্গবন্ধু হতচকিত হয়ে বলেছিলেন—তাই নাকি?... যা হোক, আদেশ তখন জারি এবং কার্যকর হয়ে গেছে। আমাদের আর কিছুই করার ছিল না।” লক্ষণীয়, বঙ্গবন্ধুর কাছে যখন ছুটে গেলেন তখন তিনি ‘আমি’—অর্থাত্ একবচন; আর ‘করার যখন কিছুই ছিল না’ তখন তিনি ‘আমাদের’ অর্থাত্ বহুবচন। এটা কি সম্মানার্থে বহুবচন হিসেবে আমরা ধরে নেব? আরও লক্ষণীয় : সংবাদপত্র বন্ধ করার ব্যাপারে গাফ্ফার চৌধুরীর কোনো আপত্তি ছিল না। তার আপত্তি ছিল শুধু ১৬ জুন তারিখটির ব্যাপারে। বঙ্গবন্ধুকে যারা চিনতেন তারা এক বাক্যে স্বীকার করবেন যে সহজে ‘হতচকিত’ হওয়ার বান্দা তিনি ছিলেন না। অবশ্য গাফ্ফার চৌধুরী আসলেই সেদিন বঙ্গবন্ধুর কাছে ‘ছুটে’ গিয়েছিলেন কিনা, গেলেও বঙ্গবন্ধু তার কথা শুনে ‘হতচকিত’ হয়েছিলেন নাকি তাকে ধমক দিয়ে বের করে দিয়েছিলেন—তা যাচাই করার কোনো সুযোগ এখন আর অবশিষ্ট নেই।
এ প্রসঙ্গ টেনে গাফ্ফার চৌধুরী লিখেছেন, “অবশ্য ১৯৬৬ সালে ইত্তেফাক এবং ১৯৭৫ সালে ঢাকার অধিকাংশ দৈনিক বন্ধ করা হয়েছিল রাজনৈতিক কারণে। বর্তমানে আমার দেশ দৈনিকটি বন্ধ করা হয়েছে এবং ভারপ্রাপ্ত সম্পাদককে গ্রেফতার করা হয়েছে অন্য কারণে। বলা হয়েছে, প্রতারণা ও অন্যান্য অভিযোগে মামলা-মোকদ্দমার কারণে এই গ্রেফতার।... যতদূর জানি, মাহমুদুর রহমান খুব সুশীল চরিত্রের লোক নন। তাকে উত্তরা ষড়যন্ত্রের নায়কও বলা হয়। সম্প্রতি রাজনীতি ও সাংবাদিকতার নামে তিনি যা শুরু করেছিলেন, তাকে এক কথায় অনেকে ‘দুর্বৃত্তপনা’ আখ্যা দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে প্রতারণা বা অন্য কোনো গুরুতর অভিযোগ থাকলে এবং মামলা-মোকদ্দমা হয়ে থাকলে অবশ্যই তিনি গ্রেফতার হতে পারেন।”
দেখা যাচ্ছে, আমার দেশ যে রাজনৈতিক কারণে বন্ধ করা হয়েছে তা গাফ্ফার চৌধুরী মানতে রাজি নন। মাহমুদুর রহমানকে যে রাজনৈতিক কারণে গ্রেফতার করা হয়েছে তা মানতেও তার আপত্তি আছে। মামলা-মোকদ্দমার কারণে পত্রিকা বন্ধ ও সম্পাদক গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে—এই গাফ্ফারীয় তত্ত্ব যদি আমরা মেনে নিই, তবে একই তারিখে রাতে মামলা হলো, গভীর রাতে জেলা প্রশাসন আদেশনামায় সই করলেন, প্রায় মাঝরাতে পুলিশ ছুটল প্রেস বন্ধ করতে, মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করতে—এমন তত্পরতা সরকারি দফতরগুলোতে রাজনৈতিক কারণ ছাড়া সম্ভব, একথা ছাগলেও বিশ্বাস করবে না। এছাড়া এক নিঃশ্বাসে তিনি যেভাবে কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়া মাহমুদুর রহমানকে দুর্বৃত্ত আখ্যা দিয়ে সুশীল চরিত্রের লোক নন বলে মন্তব্য করেছেন, তাতে আসলে গাফ্ফার চৌধুরীর নিজের চরিত্রই ফুটে উঠেছে। অবশ্য তিনি কৌশলে এটাকে ‘অনেকের’ মন্তব্য বলে চালিয়ে দিয়েছেন। আমরা জানি, গাফ্ফার চৌধুরী খালি গলায় গান করেন না। তার সঙ্গে তবলা, হারমোনিয়াম আর ডুগডুগি বাজানোর কিছু লোক আছে। তিনি যে অনেকের কথা বলেছেন তারা সম্ভবত এরাই। দেশে এখন সুশীলদের ঘোর দুর্দিন! গত কয়েক বছরে সুশীল বলে কথিত লোকজন নিজেদের এমনভাবে উন্মোচিত করে ফেলেছেন যে, মাঝেমধ্যে হাসি-তামাশার পাত্র হওয়া ছাড়া তারা এখন প্রায় অস্তিত্বহীন। মাহমুদুর রহমান এই সুশীল গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত নন এটা তার জন্য অসম্মানের নয়। কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বৃত্তপনাই যার জীবিকা, তেমন কেউ যখন মাহমুদুর রহমানকে দুর্বৃত্ত আখ্যা দেয় তখন ‘ভূতের মুখে রামনাম’ আপ্তবাক্যটি মনে পড়ে যায়। রাজনীতি ও সাংবাদিকতার নামে মাহমুদুর রহমান যা শুরু করেছেন তাতে গাফ্ফার চৌধুরী সন্তুষ্ট নন। কিন্তু কী শুরু করেছেন তা তিনি বলছেন না। তাহলে কি আমরা ধরে নেব যে, এ ব্যাপারে আসলে তার বলার কিছু নেই? মাহমুদুর রহমান গত দু’বছরের বেশি সময় ধরে দৈনিক পত্রিকায় স্বনামে লিখে চলেছেন। এসব ‘আপত্তিকর’ একটি লেখারও জবাব গাফ্ফার চৌধুরী বা তার কোনো সাঙ্গাতকে দিতে দেখা যায়নি। এ অপারগতাই কি তার গোস্বার কারণ?
‘চোরের মায়ের বড় গলা’—আপ্তবাক্যটি বাংলা ভাষায় দীর্ঘদিন ধরে চালু আছে। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী দৈনিক কালের কণ্ঠে দুই কিস্তির এক লেখায় বরেণ্য বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমরের চরিত্র হনন করতে গিয়ে যে ছাইপাশ লিখেছেন তা পড়ে যে কোনো পাঠকের ওই প্রবাদ মনে পড়ে যাবে। বদরুদ্দীন উমরের লেখা পড়ে তার নাকি পাগলা মেহের আলীর কথা মনে পড়ে গেছে; যে কিছুক্ষণ পর পর বলে উঠত—‘সব ঝুট হ্যায়!’ কিন্তু দুই কিস্তির ওই লেখায় গাফ্ফার চৌধুরী যে গালাগালি, মিথ্যা অভিযোগ এবং কয়েক হাজার ভৌতিক টেলিফোন কলের গালগপ্প বাদ দিলে ‘সব রাজাকার হ্যায়’ বলে হুংকার দেয়া ছাড়া আর কিছুই পাঠকদের দিতে পারেননি—এ বিষয়টি কি তিনি নিজে খেয়াল করেছেন?
লেখাটির দ্বিতীয় কিস্তির শুরুতে গাফ্ফার চৌধুরী স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে দাবি করেছেন যে, প্রথম কিস্তি প্রকাশিত হওয়ার পর তার কাছে টেলিফোন কলের ঢল নেমেছিল। ‘শুধু বাংলাদেশ থেকে নয়, ভারত, মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই, কাতার, ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন শহর, এমনকি সুদূর নাইজেরিয়া থেকেও বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশীদের কাছ থেকে বিপুল সাড়া পেয়েছি। এত রেসপন্স পাব তা আগে ভাবতে পারিনি। সবারই এক কথা, একাত্তরের রাজাকার-আলবদর এবং তাদের নব্য কোলাবরেটরদের অবিরাম মিথ্যা প্রচারের সমুচিত জবাব দেওয়া উচিত এবং আমার লেখাটি তাদের এই প্রত্যাশা যিকঞ্চিত পূর্ণ করেছে।’ বেশ ভালো কথা। ‘নব্য কোলাবরেটরদের’ অবিরাম মিথ্যা প্রচারের জবাব না হয় গাফ্ফার চৌধুরী দিলেন। কিন্তু পুরনো কোলাবরেটরদের নিয়ে কী করতে হবে সে ব্যাপারে কি টেলিফোনকারীরা কিছুই বলেনি? তিনি নিজে যে এক সময় রাজাকার-আলবদরের কোলাবরেটরের ভূমিকা পালন করে গর্ববোধ করতেন, এ খবর কি তারা রাখেন? খুব বেশিদিন আগের কথা তো নয়! টেলিফোনকারীদের পরিচয় নিয়েও পাঠকদের মনে সংশয় জাগার কথা। তিনি তাদের পরিচয় দিয়েছেন বাংলাদেশী হিসেবে। বাঙালি বলে নয়। তাহলে আমরা ধরে নিতে পারি, ভারত থেকে যারা তাকে টেলিফোন কল করেছিল তারাও বাংলাদেশী। ভারতীয়রা সে দেশের বাংলাভাষী নাগরিকদের বাঙালি বলে পরিচয় দেয়, বাংলাদেশি নয়। ভারতে প্রচুর বাংলাদেশী লেখাপড়া করতে যায়। তারা যোগাযোগ করলে গাফ্ফার চৌধুরী অবশ্যই নিজের গুরুত্ব বাড়ানোর জন্য তাদের উচ্চ শিক্ষালাভে অধ্যয়নরত পরিচয়টা তুলে ধরতেন। তা যখন তিনি করেননি, তখন অবশিষ্ট থাকে বাংলাদেশে আইনের তাড়া খেয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়া সন্ত্রাসীরা। এরাই কি গাফ্ফার চৌধুরীর লেখা পড়ে আনন্দে গদগদ হয়ে তার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেছিল?
গাফ্ফার চৌধুরীর লেখা থেকে জানা যায়, দুনিয়ার বিভিন্ন স্থান থেকে তার কাছে টেলিফোন করা এই বঙ্গসন্তানরা শুধু তার লেখার প্রশংসা করেই ক্ষ্যান্ত হয়নি, তারা গভীর মর্মবেদনাও প্রকাশ করেছে। তাদের দুঃখবোধের কারণ হচ্ছে : ‘আওয়ামী লীগ অনেক ভালো কাজ করেও তাদের প্রচার ও মিডিয়া শক্তি অত্যন্ত দুর্বল বিধায় জনসাধারণের সামনে প্রকৃত সত্য তুলে ধরতে পারে না। ... যেসব মুক্তমনা দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবী ও কলামিস্ট দেশের বৃহত্তর স্বার্থে গায়ে পড়ে বিচ্ছিন্নভাবে যুদ্ধাপরাধী ও ঘাতক দালালদের মিথ্যা প্রচারণার বিরুদ্ধে যুদ্ধরত, আওয়ামী লীগ দল ও সরকার তাদের সমর্থন ও শক্তি জোগানোর ব্যাপারেও উদাসীন এবং এর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করার ব্যাপারেও সম্ভবত অপারগ।’ একেই বলে পাকা কলমের মুন্সিয়ানা। গাফ্ফার চৌধুরী একজন ‘মুক্তমনা দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবী ও কলামিস্ট’। তিনি ‘দেশের বৃহত্তর স্বার্থে গায়ে পড়ে যুদ্ধাপরাধী ও ঘাতক দালালদের মিথ্যা প্রচারণার বিরুদ্ধে যুদ্ধরত।’ অথচ দল হিসেবে এবং সরকার হিসেবে আওয়ামী লীগ তাকে ‘সমর্থন ও শক্তি’ জোগানোর ব্যাপারে একেবারেই ‘উদাসীন’! তাহলে আওয়ামী লীগকে এখন কী করতে হবে! বেশি কিছু নয়, রাজাকারবিরোধী যুদ্ধের অংশ হিসেবে তিনি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বড় বাজেটের একটা সিনেমা বানাবেন। এর জন্য সরকার অথবা আওয়ামী লীগের নেতারা মোটা অংকের টাকার জোগান দিলেই বোঝা যাবে, এতদিনে তাদের উদাসীনতা রোগ কেটে গেছে! তবে আওয়ামী লীগ অনেক ‘ভালো কাজ’ করলেও সেগুলো ঠিকমত প্রচার পাচ্ছে না বলে গাফ্ফার চৌধুরী যে হায় আফসোস করেছেন তা একেবারে মোক্ষম হয়েছে। আওয়ামী লীগের একটা ‘ভালো কাজের’ খবর গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হলেও গাফ্ফার চৌধুরীর সঙ্গে আমি একমত যে, সেটা ভালো প্রচার পায়নি। একটি পত্রিকায় ‘সূত্রাপুরে আওয়ামী লীগ নেতার নেতৃত্বে প্রাচীন মন্দিরে হামলা, প্রতিমা ভাঙচুর’ শিরোনামে প্রকাশিত ওই খবরে বলা হয়েছে : ‘রাজধানীর সূত্রাপুরে দুই আওয়ামী লীগ নেতার নেতৃত্বে অর্ধশতাধিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী দুই শ’ বছরের প্রাচীন একটি মন্দিরে হামলা চালিয়ে পাঁচটি প্রতিমা ভেঙে চুরমার করেছে। সন্ত্রাসীরা শাবল ও রামদা দিয়ে হামলা চালিয়ে মন্দিরটি ভেঙে ফেলেছে। মন্দিরের জমিতে বসবাসকারী ১৫টি হিন্দু পরিবারকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আরও ১০-১২টি পরিবারকে ঘিরে রেখেছে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। যে কোনো সময় তাদের তাড়িয়ে দিয়ে মন্দিরের প্রায় ১১-১২ কোটি টাকা মূল্যের সাড়ে ১৬ কাঠা জমি তারা দখল করে নিতে পারে বলে মন্দির কমিটি আশঙ্কা করেছে।’
এ ধরনের ‘ভালো কাজ’ আওয়ামী লীগ দেশজুড়ে প্রায় প্রতিদিন করে চলেছে। এ ব্যাপারে দলটি একেবারে খাঁটি ধর্মনিরপেক্ষ, হিন্দু-মুসলমান বাছ-বিচার করে না। অথচ তাদের এই ভালো কাজগুলো ঠিকমত প্রচার পাচ্ছে না! আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা আলোচ্য ক্ষেত্রে যে পরিবারগুলোকে উচ্ছেদ করেছে এবং করতে চলেছে তাদের মধ্যে ভোটারের সংখ্যা শ’খানেক হওয়ার কথা। আওয়ামী সুশাসন থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে এ পরিবারগুলো যদি গোপনে দেশত্যাগ না করে, তবে আগামী সাধারণ নির্বাচনে অবশ্যই তারা ভোট দেবে। কিন্তু তখন ভোটব্যাংক, স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি ইত্যাদির দোহাই দিয়ে গাফ্ফার চৌধুরী কি তাদের কপালে পিস্তল ঠেকিয়েও আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে সিল মারাতে পারবেন? তাদের আওয়ামী লীগকে ঘৃণা করা ‘শেখানোর জন্য’ কি বদরুদ্দীন উমরকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ লেখালেখি করতে হবে? আমার তো মনে হয় স্থানীয় আওয়ামী লীগাররাই এর জন্য যথেষ্ট!
গাফ্ফার চৌধুরী লিখেছেন, পাঠকরা নাকি তাকে বলেছেন যে, তিনি সমালোচনা করে বদরুদ্দীন উমরের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছেন। যারা বদরুদ্দীন উমর এবং গাফ্ফার চৌধুরী উভয়কে চেনেন তারা অবশ্যই আমার সঙ্গে একমত হবেন যে, পাণ্ডিত্য, মেধা, বুদ্ধিবৃত্তিক সততা, চারিত্রিক দৃঢ়তা ইত্যাদি প্রশ্নে যদি গাফ্ফার চৌধুরীর সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে এর চেয়ে বড় অপমান বদরুদ্দীন উমরের জন্য আর বেশি কিছু হতে পারে না। কেন পারে না তা বিস্তারিত বলতে গেলে গাফ্ফার চৌধুরীর এমন অনেক ব্যক্তিগত দৃষ্টান্ত টানতে হয়, যা একান্ত বাধ্য না হলে করা অনুচিত। শুধু নমুনা হিসেবে একাটা তথ্য দিচ্ছি। একসময় ঢাকা থেকে ‘শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য’ ‘নর-নারী’ নামে একটি মাসিক যৌন পত্রিকা প্রকাশিত হতো। গাফ্ফার চৌধুরী ছিলেন ওই পত্রিকার নিয়মিত লেখক। তার লেখা ‘কালো ঘোড়া’ নামের একটি উপন্যাস ‘নর-নারী’র ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। বদরুদ্দীন উমরের গুরুত্ব বাড়া-কমা যদি এহেন গাফ্ফার চৌধুরীর লেখালেখির ওপর নির্ভর করে, তবে হে ধরণী দ্বিধা হও ছাড়া আর বলার কিছু থাকে না।
গাফ্ফার চৌধুরী বলেছেন, একসময় তিনি বদরুদ্দীন উমরের লেখার ভক্ত ছিলেন। উমর সাহেব নাকি কালক্রমে প্রথমে তার প্রতিপক্ষ এবং পরে শত্রুতে রূপান্তরিত হয়েছেন। শত্রুর সঙ্গে আচরণে কোনো ধরনের ন্যায়নীতির ধার ধারতে হয় না—এটাই তার দাবি। গাফ্ফার চৌধুরী যদি আসলেই এ তত্ত্বে বিশ্বাসী হন, তবে তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি করেন কোন আক্কেলে! যাদের আমরা যুদ্ধাপরাধী বলছি, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তারা ছিল আমাদের শত্রু। আমরাও ছিলাম তাদের শত্রু। গাফ্ফার চৌধুরী স্বনামে লিখিতভাবে দাবি করছেন যে, শত্রুর সঙ্গে যে কোনো ধরনের আচরণ করা যায়। এটাই নাকি নিয়ম। আসলেই যদি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এদেশে অনুষ্ঠিত হয়, (এখন যার আয়োজন চলছে সেটা হচ্ছে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার) তবে গাফ্ফার চৌধুরীর এ লেখা অবশ্যই একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে এক গুরুত্বপূর্ণ অ্যাভিডেন্স হিসেবে কাজে লাগবে। বাহ গাফ্ফার চৌধুরী বাহ!

(পরবর্তী অংশ রোববার)-স ঞ্জী ব চৌ ধু রী
১০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

লিখেছেন নতুন নকিব, ১১ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০৩

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

মানুষের জীবন মূলত অসংখ্য ছোট-বড় সিদ্ধান্তের সমষ্টি। প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি মোড়ে আমাদের কোনো না কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

লিখেছেন আঘাত প্রাপ্ত একজন, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:২৬

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

[সম্ভাবনার ক্রমানুসারে নয়ঃ]

আর্জেন্টিনা: আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ তার ডিফেন্স আর ইনজুরি । ৩৮ বছরের তরুণ(!) সেন্টারব্যাক ওতামেন্দি আর কমপক্ষে এক হালি হাফ-ফিট ফুটবলার নিয়ে ১৯ জুলাই পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ শরৎ বন্দনা

লিখেছেন ইসিয়াক, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:৫৯


শরৎ এলেই আকাশ জুড়ে সাদা মেঘের ভেলা
দিনমণি আর মেঘমালার লুকোচুরি খেলা।

রুম ঝুমঝুম নূপুর পায়ে ছুটছে নদীর ঢেউ
ভাটিয়ালি গাইছে গান অচিন সুরে কেউ।

বিলে ঝিলে শাপলা পদ্ম... ...বাকিটুকু পড়ুন

×