somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

তবে কি ইবিএম ভোটিং এক টি ডিজিটাল প্রতারণা?

২৩ শে ডিসেম্বর, ২০১০ রাত ৯:১২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অনূদিত-
আধুনিক ইলেকট্রনিকস যুগে মানুষ জীবনকে সহজ করে নিয়েছে কলাকৌশল ব্যবহার করে। তেমনি এর ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কেও অবহিত হচ্ছে। এর একটি উদাহরণ হলো ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম)। ভারতে ১৯৮২ সালে কেরালা রাজ্যে এটি প্রথম ব্যবহার করা হয় ভোট গ্রহণের জন্য। তারপর অনেক সময় কেটে গেছে এর ওপর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। একই সময় বিশ্বের অন্যান্য দেশেও ইভিএম’র ওপর গবেষণা চলেছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ কয়েক শ’ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে এ গবেষণায়। আর গবেষণা করা হয়েছে এর টেকনিক্যাল ও ট্রান্সপারেন্সিন্ধ এই দুই দৃষ্টিকোণ থেকে। গবেষণায় যতটা ছিল টেকনিক্যাল দিক, ততটা বা তার বেশি ছিল এর ভোট গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও অস্বচ্ছতার দিকটি। বাংলাদেশ ইলেকশন কমিশন (বিইসি) প্রথমবারের মতো ইভিএম ব্যবহার করতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একটি ওয়ার্ডে। তাই ইভিএম বিষয়ে কিছু লেখার তাগিদ অনুভব করছি। লন্ডন ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার বিজ্ঞানে শিক্ষা গ্রহণের সময় ইনফরমেশন টেকনোলজির তথ্য নিরাপত্তার দিকগুলো গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলাম। তথ্যের নিরাপত্তা বোঝার একটি সাধারণ সত্য হচ্ছে, তথ্যটির মূল্য যদি তথ্যের নিরাপত্তা বেষ্টনী ভাঙার খরচের চেয়ে কম হয়, তাহলে তথ্যটি নিরাপদে থাকবে এবং কেউ সেটা চুরি বা নষ্ট করবে না। অর্থাৎ তথ্য নিরাপত্তার বিষয়টি আপেক্ষিক। নিরঙ্কুশ নিরাপত্তা বলতে ইনফরমেশন টেকনোলজিতে কিছু নেই। অন্য দিকে রাজনীতির চেয়ে উচ্চমূল্যের কিছু পৃথিবীতে নেই। ইভিএম ২৮ বছর পুরনো একটি টেকনোলজি, যার ওপর আজ পর্যন্ত হাজার গবেষণা করা হয়েছে বিভিন্ন দেশে এবং শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হয়েছে, এটি একটি অস্বচ্ছ ভোট গ্রহণ পদ্ধতি যা গণতন্ত্র চর্চার জন্য সহায়ক নয়। যতগুলো দেশে ইভিএম বিষয়ে গবেষণা করা হয়েছিল এবং এর কিছু ব্যবহারও হয়েছিল, ভারত ছাড়া অন্য সব দেশে ইভিএম ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দেশগুলো হচ্ছে নেদারল্যান্ডস, আয়ারল্যান্ড, জার্মানি, ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্র। ব্রিটেনেও এবার ভোট গ্রহণ করা হয়েছে ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে। ইউরোপ ও আমেরিকার টেকনোলজিস্টরা এ বিষয়ে ভারতের চেয়ে অনেক বেশি গবেষণা করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, ইভিএমকে যত নিরাপদভাবেই তৈরি করা হোক না কেন, এটি সহজে টেম্পার করা যায়, অর্থাৎ ইভিএম ব্যবহার করে নির্বাচনে বিশ্বাসযোগ্য ফলাফল পাওয়া অসম্ভব। কারণ ইলেকট্রনিক এবং ইনফরমেশন টেকনোলজির সব মডিউল বাজারে সহজলভ্য এবং এগুলো ব্যবহার করার মতো কয়েক মিলিয়ন দক্ষ হাত পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে। এর মধ্যে শুধু দুই মিলিয়নের বেশি আছে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে। শুধ তা-ই নয়ন্ধ চীন, ভারত, কোরিয়া ও তাইওয়ানে ইলেকট্রনিক সারকুইট চিপ ফেব্রিকেশনের ছোট-বড় কোম্পানি আছে, যেখান থেকে প্রয়োজনমাফিক এই চিপ তৈরি করিয়ে নেয়া যায়, হোক এটি কোনো নতুন সারকুইট অথবা হুবহু নকল সারকুইট চিপ কিন্তু নতুন প্রোগ্রামসহ। কেউ যদি ইভিএমকে টেম্পার করতে চায় তাহলে তার জন্য সব পথ খোলা আছে। নেট্ ইন্ডিয়া (প্রা.) লিমিটেডের কর্ণধার হ্যারি কে প্রসাদ এ সত্যটি প্রমাণ করেছেন একটি গবেষণায়। সেখানে ছিলেন আমেরিকার মিশিগান ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সিকিউরিটি বিষয়ক প্রফেসর ডক্টর আলেকস হালডারমেন এবং নেদারল্যান্ডসের বিখ্যাত কম্পিউটার হ্যাকার রপ-গন্গগ্রিজিপ, যিনি নেদারল্যান্ডসে ইভিএম নিষিদ্ধ হওয়ার জন্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন।
২০০৪ ও ২০০৯ সালের ভারতের জাতীয় নির্বাচনে কিছু রাজ্যে দেখা গেছে, কিছু নতুন মুখের প্রার্থী ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ভোট পেয়েছেন, অথচ তারা নির্বাচনী এলাকার বাসিন্দাও নন এবং লোকজন তাদের আগে থেকে চিনতও না। তাদের কাছে পরাজিত প্রার্থীরা অভিযোগ করেছেন এটি ইভিএম’র কারসাজি। ভারতের নির্বাচন কমিশন দাবি করেছিল, তাদের ইভিএম টেম্পার প্রুফ। কারণ এর প্রোগ্রাম কোডগুলো ইলেকট্রনিক চিপের ভেতর খোদাই করা আছে, যা পরিবর্তন করতে পারবে না কেউ। এ কথাগুলো একজন টেকনোলজিস্টের কাছে শিশুর কথার মতো মনে হয়। ভারতের তৈরি ইভিএমকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মনে করা হতো। আসলে সেটি ইউরোপ ও আমেরিকার তৈরি ইভিএম থেকে অনেক দুর্বল। ডক্টর আলেকস হালডারমেন আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে ইভিএম’র ওপর গবেষণা করে প্রমাণ পেয়েছেন, আমেরিকায় ইভিএম টেম্পারপ্রুফ নয়। ফলে ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যেও ইভিএম ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। আমেরিকার ২২টিরও বেশি অঙ্গরাজ্যে এটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং বাকিগুলোতেও তা নিষিদ্ধ হওয়ার পথে। ড. টিল জাইগের জার্মান সুপ্রিম কোর্টে ইভিএম’র অস্বচ্ছতার বিষয়টি প্রমাণসহ উপস্খাপন করে ল’ স্যুট করেছিলেন এটিকে নিষিদ্ধ করার জন্য। সুপ্রিম কোর্ট শেষ পর্যন্ত ইভিএম’র ব্যবহারকে নিষিদ্ধ করে একটি দিকনির্দেশনা দেয় যে, ভোট গ্রহণ পদ্ধতি এতটা স্বচ্ছ হতে হবে, একজন সাধারণ ভোটার যাতে ভোট গ্রহণের শুরু থেকে ভোট গণনা পর্যন্ত ধাপগুলো স্পষ্ট বুঝতে পারেন।
ভারতেও এখন ইভিএম-বিরোধী কার্যক্রম বেশ তুঙ্গে। ২০০৯ সালের শেষ দিক থেকে এটি বেশ গতি লাভ করেছে। ভারতে বিভিন্ন এনজিও এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা সুপ্রিম কোর্টে ল’ স্যুট করেছেন ইভিএম নিষিদ্ধ করার জন্য। সে দেশের টেকনোলজিস্টরা এখন ইভিএম’র বিরুদ্ধে সোচ্চার।
ইভিএমকে অনেকভাবে টেম্পার করা যায়। মাত্র তিনটি উল্লেখ করছি;
ইভিএম’র ডিসপ্লে ইউনিটটি পরিবর্তন করে : নতুন ডিসপ্লে ইউনিটটি ভুল অঙ্ক দেখাবে পছন্দের প্রার্থীকে জিতিয়ে দেয়ার জন্য। ২. মেমরি চিপস ওভাররাইট করে : আসল মেমরি চিপের ওপর আলতোভাবে একটি মেমরি ওভাররাইট সারকুইট চিপ বসিয়ে দেয়া যায়, যেটি মেমরির আগের তথ্যগুলো মুছে ফেলে নতুন তথ্য লিখে আনুপাতিক হারে সব প্রার্থীর মধ্যে ভোটসংখ্যা বিতরণ করে পছন্দের প্রার্থীকে জিতিয়ে দেবে। ৩. সারকুইট চিপের সাথে আরেকটি ব্লু টুথ চিপ সংযোগ করে ওপরের দু’টি কাজ একটি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দূর থেকে করা যাবে।
এভাবে সবার অগোচরে একটি ইভিএমকে টেম্পার করতে মাত্র ১ মিনিটের বেশি সময় লাগে না।
নির্বাচনে জেতার জন্য একজন প্রার্থী মানসিক, শারীরিক ও আর্থিক-সব শক্তিই নিয়োগ করে থাকেন। নির্বাচনে বিজয় লাভ তাঁর কাছে কোহিনূর হীরার চেয়েও মূল্যবান। অথচ ইলেকট্রনিক নিরাপত্তাব্যবস্খা কোনো কাজে আসবে না ভোট গ্রহণের ক্ষেত্রে।
যে সময় সারা দুনিয়ায় ইভিএম নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং হচ্ছে ঠিক সেই সময় বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশন ইভিএমকে নতুন টেকনোলজি হিসেবে গ্রহণ করতে চাচ্ছে। এর কারণ বোধগম্য নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কেয়ারটেকার সরকারের আমলে ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে গুরুত্ব দিয়ে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স ব্যবহার করার দাবি করেছিলেন এবং নির্বাচন কমিশন সেটি ব্যবহারও করেছিল। এখন প্রমাণিত ইভিএম একটি অস্বচ্ছ পদ্ধতি। আশা করি, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে সচেতন হবে অবিলম্বেই।
মূল-
৪টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×