চাকুরীটা আমার শেষ পর্যন্ত হয়ে গেল। যদি ও বেতন কম তবু কতৃপক্ষ কথা দিয়েছে যে কিছুদিনের মাঝেই আমার বেতনটা বাড়াবে। ইন্টারভিউ রুম থেকে বেরিয়ে বাবাকে ফোন দিলাম। বাবার উচ্ছাসের সীমা ছিল না। বলছিল আমি জানতাম “তোর হবেই” আরে আমার ছেলেত! রিজেক্ট করার মত কোন দোষ নেই। বাবা বরাবরই এই রকম তার ছেলে সবার সেরা। তার ছেলের মত ব্রেইন কারো নেই। তার ছেলে ইচ্ছে করলেই উন্নতির আকাশ ছুতে পারে। মাঝে মাঝে এইগুলো আমাকে বিরক্ত করত কারন আমি জানতাম আমার থেকে অনেক ব্রেইন ওলা ছেলে দেশে পচে মরছে। কিন্তু কোনো একটা পরীক্ষা দিতে গেলেই আমার থেকে বাবার টেনশন থাকত বেশী। এই কলম দুটো নিয়েছিস ত? এই এডমিট কার্ড টা পকেটে আছে ত? প্রথমে যেগুলো সোজা মনে হয় সেগুলোর আগে উত্তর লিখবি তারপর আস্তে আস্তে বাকিগুলো লিখবি। শেষ পর্যন্ত যখন সালাম করতাম তখন বাবার আলিঙ্গন ছিল আমার সত্যিকারের অনুপ্রেরনা। এখনো আমি চাকুরীর জন্য পরীক্ষা দিতে যাই কিন্তু বাবার সেই কথাগুলো এখন ভীষন মিস করি। সেই উষ্ণ আলিঙ্গনের জন্য আমার সারা শরীর মন অপেক্ষা করে কিন্তু নেই। বাবা আজ শুধুই ছবি। তার ছবির দিকে তাকিয়ে আমার আকুতি বাবা ছবি থেকে বেরিয়ে এসে একবার বুকে তুলে নাও!! কিন্তু বাবা এখন আমার আকুতি শুনতে পায়না। কোথায় হারিয়ে গেল! অল্প কিছুদিনের মাঝেই আমার স্বপ্নদ্রষ্টা আমার জনক, আমার বন্ধু আমাকে নিঃসংগ ফেলে চলে গেল কোন এক অজানা উদ্দেশ্যে! চাকুরীটা পাওযার পর থেকে আমি নিঃসংগ হয়ে গেলাম আর ওই প্রান্তে বাবা। বাবা প্রতিদিন ফোন করতেন। দুপুরবেলা কি খেয়েছিস? নাকি খাসনি? তোর ত আবার না খেয়ে থাকার অভ্যাস আছে। বাবা এখন আমি কতদিন কতবেলা না খেয়ে কাটিয়ে দেই কিন্তু তোমার ফোন পাইনা। চাকুরী পাওযার পর বাড়িতে যাওযা কমে গেল। প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা হলেই বাবা আমাকে ফোন করত জিজ্ঞেস করত কোথায় আছিস? কিন্তু কখনো জিজ্ঞেস করত না “আজকে আসবি না?” কারন কারন কোনো কোনো সপ্তাহে আমাকে বৃহস্পতিবার শুক্রবার কাজ করতে হত। কাজেই বাড়িতে যাওযা হত না। বাবা মনে মনে প্রচন্ড চাইতেন যে আমি বৃহস্পতিবার যেন বাড়ি আসি। কিন্তু কক্ষনো এটা প্রকাশ করতেন না। বৃহস্পতিবারে ফোন রিসিভ করেই বাবা কান পেতে থাকতেন গাড়ির আওযাজ পাওযা যায় কিনা? কারন অনেক সময় আমি বাবাকে সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য বলতাম বাবা এই সপ্তাহে আসতে পারছিনা অনেক কাজ! কিন্তু বাবাকে সারপ্রাইজ দেয়া হতনা। কারন আমি বাসে থাকলে বাবা কিভাবে যেন বুঝে যেতেন দৌড়ে বাজারে চলে যেতেন আমার প্রিয় সব খাবার রান্না করাতেন। বাসায় এলে তিনি এমন ভাব করতেন যে আমাকে দেখে খুব আশ্চর্য হয়েছেন!! কিন্তু খেতে বসে খাবারের আইটেম দেখে আমি ঠিকই বুঝে যেতাম যে বাবা আগেই বুঝতে পেরেছিল যে আমি আসব। আজ প্রায় পাচ বছর হতে চল্ল বাবা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে এখনো বৃহস্পতিবার আসে এখনো সন্ধ্যা হলে আমি অপেক্ষা করি। কিন্তু আমি ত জানি বাবা নেই তবু কেন অপেক্ষা করি? মারা যাওযার কিছুদিন আগে থেকেই বাবার মাঝে একটা অস্থিরতা দানা বাধে ফোন করলেই খালি বলত এই বাসায় আর একা একা ভাল লাগেনা। তুই আমাকে তোর কাছে নিয়ে যা। এই বাবাকে আমার অচেনা মনে হত। এত দুর্বল আমার বাবা কখনোই ছিল না। আমি ব্যচেলর থাকতাম। বাবার এই কথাগুলো কয়েকবার শোনার পর ব্যস্ত হয়ে গেলাম একটা বাসা খুজার জন্য। খুজে খুজে দুই রুমের একটা বাসা বের করলাম। বাবাকে নিয়ে এলাম। বাবার চোখে মুখে যে খুশি আমি দেখলাম তা একটা শিশুর মত। হাসছেন হাসছেন আর কতক্ষন পরে পরেই বলে উঠছেল খুব সুন্দর বাসা নিয়েছিস। আমার খুব পছন্দ হয়েছে। এখন থেকে আমি এখানেই থাকব। আমি গিয়ে আমার বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম। বাবা আমার কানে কানে বল্ল তোকে ছাড়া আমার থাকতে খুব কষ্ট হয়ে মনা। বাবা এখন ত তুমি নেই আমার পাশে। এখন আমার কষ্ট হয়না? তোমাকে ছাড়া থাকতে আমার অনেক কষ্ট হয় বাবা!
বাবা আমার সাথেই থাকতেন কিন্তু তাকে আমার সময় দেয়া হতনা বাবার দোয়াতে আমার চাকুরীতে আমার পদোন্নতি হয়েছিল সাথে সাথে বেড়েছিল অফিস টাইম। কখনো রাত নয়টা কখনো দশটা। আমি মাঝেই মাঝেই অফিস থেকে আসার পথে দেখতাম বাবা দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখে এমন একটা ভাব করতেন যেন হাটতে বেরিয়েছন। মাঝে মাঝে আমি জিজ্ঞেস করতাম বাবা তুমি এখানে? এত রাতে? বাবা লাজুক ভাবে বলতেন বিকেলে ঘুমিয়ে ছিলাম হাটতে পারিনি তাই একটু হাটতে বেরোলাম। কিন্তু তার মুখে দুশ্চিন্তার রেখা আমার চোখ এড়াত না। বাবা এখনো অফিস থেকে ফেরার পথে গলির মুখে আমার নজর থাকে যদি তোমাকে দেখতে পাই। যদি ও জানি তুমি নেই। তবু তুমি যে জায়গায় হাটতে মাঝে মাঝে সেই জায়গায় আমি তোমার পায়ের ছাপ খুজি। বাবা এখন আমি রাতের পর রাত বাইরে থাকলে ও টেনশন করার কেউ নেই। কি স্বাধীন আমি কিন্তু কত অসহায়!!!
হঠাৎ একদিন বাসায় এসে দেখি বাবা ভীষন অসুস্থ। চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছেন। বাবাকে ডাকতে গিয়ে দেখি জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে গা। ডাকলাম কিন্তু হুশ নেই। তাড়াতাড়ি বালতি এনে মাথার নিচে রেখে মগ দিয়ে পানি ঢালতে লাগলাম। যেমনটা আমার বাবা করতেন যখন আমার ছোট বেলায় জ্বর হত। কিছুক্ষন পরে চোখ মেললেন। বল্লেন খোকা এসেছিস? আমি তখন অভিমানী স্বরে বল্লাম শরীর খারাপ লাগছে অথচ একটা ফোন করতে পারলেনা? এর পরের দিন বাবাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম। ডাক্তার অনেক চেক আপ করলেন। চিন্তিত মুখে আর ও কতগুলো টেষ্ট দিলেন। সেগুলো করার পর ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম। চিন্তিত মুখে তিনি বল্লেন বাবার সিরোসিস অফ লিভার বা হ্যাপাটাইসিস সি হয়েছে। বল্লেন সময় বেশি নেই। মাত্র দু মাস। আমার পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছিল। আমি বল্লাম ডাক্তার কোন উপায় নেই কি? ডাক্তার বল্লেন একমাত্র উপায় লিভার ট্রান্সফার। এদেশে সম্ভব নয়। ৪০ লাখ টাকা লাগবে। এত টাকা কোথা থেকে আনব? এইসব চিন্তা নিয়ে বাসায় ফিরে এলাম। বাবা বল্ল কিরে ডাক্তার কি বলেছে? আমি নিশ্চয় ভাল হয়ে যাব!! এটা একটা সাধারন জ্বর। তুই শুধু শুধু টেনশন করছিস। আমি বাবাকে বল্লাম বাবা তোমাকে ভারত যেতে হবে। ভাল ডাক্তার দেখাব। এখানকার ডাক্তার কিছুই বুঝতে পারছেনা। ইচ্ছে করেই মিথ্যা বল্লাম। বাবা রেগে গেলেন কি বলিস তুই ভারত যাব? মরলে আমি এখানেই মরব। কিছুতেই মানলেন না। ডাক্তার বলেছিলেন দুই মাস আর শেষ কয়েকদিনে ব্লিডিং হবে ষ্টুল এর সাথে কিংবা বমির সাথে। আমি পাসপোর্ট রেডি করে ফেলেছি। কিন্তু সাতদিনের মাথায় বাবা পেট ফুলে গেল...চরম ব্যাথায় বাবা রাতের রাতের পর রাত কুকাতে লাগল। আমি যখন কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করতাম বাবা ব্যাথা করছে? বাবা চোখ মুখ স্বাভাবিক রেখে বলতেন কই না ত! তুই গিয়ে ঘুমা। তোর কালকে অফিস আছে না? আমার রুমে চলে আসার পর আবার সেই তার যন্ত্রুনার শব্দ। আমি ও ঘুমাতে পারতাম না আমার প্রানপ্রিয় বাবা এমনভাবে কষ্ট পাচ্ছে আর আমি কি ঘুমাতে পারি। একদিন সকাল বেলা বাবা আমাকে ডেকে তার স্থাবর অস্থাবর সমস্ত হিসাব বুঝে নিতে বল্লেন। বাবা চোখে মুখে অদ্ভুত এক ধরনের শক্ত ভাব। যেন সব কিছুর মায়া ত্যাগ করেছেন। রবিবারে বাবাকে নিয়ে ইন্ডিয়ান এম্বেসীতে যেতে হবে। শুক্রবার সকাল এগারটার দিকে বাবা নাস্তা করার পর পরই রক্ত বমি করলেন। বেসিনটা লাল হয়ে গেল। নিজেই ডেটল দিয়ে রক্ত পরিষ্কার করলেন। আমাকে কাছে আসতে না করলেন। ইস্ত্রি করা জামা কাপরগুলো পরলেন। আরো কয়েকপ্রস্থ ব্যাগে গুছালেন। আমাকে বল্লেন আমাকে হাসপাতালে নিয়ে চল। আর আমার বাকী জামা কাপর গুলো বাড়ীতে পাঠিয়ে দিস। আমি ঘর তালা দিয়ে সিড়ি দিয়ে বাবাকে নিয়ে নামতে লাগলাম। আমি বাবাকে ধরে রেখেছিলাম। বাবা আমাকে ধমক দিয়ে দূরে সরে যেতে বল্ল “ বাবারে মানুষ আপন হতে পারে কিন্তু রোগ আপন নয়”। নিজে নিজেই নামল তারপর সিএনজি তে উঠে আমরা হাসপাতালে গেলাম। বাবা হাসপাতালে তিনদিন ছিলেন। এক মুহুর্তের জন্য ও কোথাও যেতে পারিনি। সবসময় কাছে রেখেছিলেন। শেষ মুহুর্তগুলো ছিল খুব বেদনাদায়ক। হাসপাতালে শুয়ে বাবা বাচতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি বাচাতে পারিনি আমার মত এমন দুর্ভাগা সন্তান খুব কমই আছে। এমন রোগ বাবার শরীরে দানা বেধেছিল যার নিরাময় নেই। বাবা যেদিন মারা যান সেদিন আমার মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন “আশির্বাদ করি তোমার কর্ম জীবনে অনেক উন্নতি হোক” বাবার আশির্বাদে এখন আমি কর্ম জীবনে মোটামুটি ভাল একটা অবস্থানে আছি। কিছুদিন আগে খবরে শুনলাম লিভার ট্রান্সফার এখন বাংলাদেশে ও করা যায়। আমার ভাগ্য খারাপ ৫ বছর আগে ও এই টেকনোলজি দেশে থাকলে আমি আমার বাবাকে ধরে রাখতে পারতাম। বাবা যেমন বলত আমার সন্তান সেরা। তেমনি মনে মনে আমি ও জানি আমার বাবা সবার সেরা। যদি আমার আবার জন্ম হয় তাহলে বাবা তোমকেই যেন বাবা হিসাবে পাই। এই বাবা দিবসে তোমার প্রতি এই অধম সন্তানের আকুতি রইল।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

