নিতাই চন্দ্র দাশ এখন পঞ্চাশোর্ধ এক মোটামোটি স্বাবলম্বী কৃষকে পরিণত হয়েছে। তার দুই ছেলে কিরণ দাশ ও লঘু দাশ, ২ জনই বিবাহিত, নিজেদের বিঘা দশেক জমিতে চাষাবাদ করে, তাছাড়া মৌসুমে আরও কিছু জমি বর্গা নেয়। যা ফসল হয় তা দিয়ে সারা বছরের খোড়াকি মিটিয়েও আরও বাড়তি লাভ থাকে। যা দিয়ে এই যৌথ পরিবার হেসে খেলেই কাটিয়ে দিতে পারে। ৩ মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে অনেক আগে। তারাও ভাল কৃষক পরিবারে আছে। নিতাইয়ের মতই। মেঝ মেয়েটা খড়ার মৌসুমে হালকা কষ্টে থাকলেও নিতাই এখান থেকেই টুকটাক পাঠিয়ে সাহায্য সহযোগিতা করে থাকে। ৩ টি দুধেল গাভী, হাঁস-মুরগী এবং বেশ কিছু ছাগল নিয়ে তার সময় বেশ কেটে যায়।
নিতাইয়ৈর স্ত্রী মারা গেছে বছর সাতেক হল। তার আগে পাঁচ বছরের মত রোগে কষ্ট করেছে। তখন নিতাইয়ের এত রমরমা অবস্থা ছিল না যে ভাল চিকিৎসা করাবে। বদ্যি-কবিরাজ দিয়ে যা করার করেছে। কিন্তু শেষের দিকে এসে প্রচন্ড কষ্ট করে মারা গেছে তার স্ত্রী। নিতাই তাকে প্রচন্ড ভালবাসত! স্ত্রীর শোক এখনও তাকে মাঝে মাঝে ব্যাতিগ্রস্ত করে।
প্রতিদিন সকালে নিতাই গাভীর দুধ দুয়ায় (সঠিক বাংলা শব্দটা খেয়াল নাই), এর পর সবজি বাগানে কিছু কাজ কর্ম করে তার ছাগলগুলিকে নিয়ে অনেক দূরে মাঠে চড়াতে নিয়ে যায়। সেখানে সে দুপুর পর্যন্ত ছাগলের সাথেই সময় কাটায়। তার এখন বারোটার মত ছাগল আছে, ২টা পোয়াতি। প্রতি বছর পূজোর সময় ৫-৭ টা ছাগল বিক্রি করে, ভালই লাভ হয়। আগামী বছর থেকে তার এই বিক্রির পরিমাণও বাড়তে পারে।
ছাগলগুলার মধ্যে তার একটা প্রিয় ছাগল আছে। অনেক আগে থেকেই তার সাথে সাথে থাকে। মূলত তার স্ত্রী মারা যাওয়ার বছর খানেক আগে থেকেই তার এই পালে ঐ রামছাগলটা বসবাস করতেছে। ছাগলটাকে সে বেবী বলে ডাকে। ডাকলে কাছে আসে, পাশে বসে মাথা ঘসে। আদুরে টাইপ!
প্রতিদিনের মত এরকম কোন এক সকালে নিতাই এসেছে ছাগল চড়াতে, সাথে আছে তার রামছাগল বেবী। বেবীকে দেখে তার স্ত্রীর কথা মনে পরে গেল। আহ, কি সুন্দর মুখশ্রীই না ছিল তার! আস্তে আস্তে সে স্মৃতিকাতর হয়ে যায়, তাদের প্রথম দেখা, বিয়া, প্রথম বাসর রাত... এরপর ... এরপর... মেয়ের জন্ম, ছেলেদের জন্ম... ইত্যাদি ইত্যাদি। স্ত্রীর সাথের দীর্ঘ রাতের অভিসারের কথা মনে পড়তেই সে খেয়াল করে দেখে যে তার ভিতর থেকে কি যেন একটা জেগে উঠছে। সে উত্তেজিত বোধ করে। আজকে অনেকদিন পর সে তার পুরোনো যৌবনে ফিরে গেছে.... মাঝে মাঝে এরকম হয়, কিন্তু আজকের মত এত ব্যাপক আর গত ১২ বছরে হয় নাই!
বেবী (রামছাগল) তার পাশেই ঘুরাঘুরি করে একটু পরপর তাকে ঘষছিল। হঠাৎ নিতাইয়ের সকল মানবিক বোধ লোপ পায়। সে পশু হয়ে উঠে। ঝাঁপিয়ে পরে বেবীর উপর..... প্রথমে কিছুক্ষণ বেবী প্রচন্ড প্রতিবাদ করে ম্যাৎকার করে, কিন্তু পরে এক সময় সে মেনে নেয় তার মালিকের এই নৃশংস অত্যাচার। এভাবে দিন যায়, মাস যায়, আর নিতাই পশু থেকে পশু হয়। বেবী এখন আর কোন প্রতিবাদ জানায় না। সে সবকিছুকে মেনে নিয়েছে।
কিন্তু এখবর আর চাপা থাকেনা। বাতাসেরও কান আছে। আলোর বেগে এ অত্যাশ্চর্য খবর গ্রামে ছড়িয়ে পরে। গোপন কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীও জোটে যায়। চারিদিকে ছিঃ ছিঃ রব পরে যায়। গ্রামের লোকজন তাকে গণধোলাই দেয়, ছেলেরা পরিত্যাগ করে। সালিশ বসে, কিন্তু কিছুক্ষণের মাঝেই পুলিশের আগমন। তাকে আর বেবীকে নিয়ে যাওয়া হয় থানায়। সেখান থেকে কোর্টে।
কোর্টে নিতাইয়ের পক্ষে কোন উকিল নেই। এটা খুব স্বাভাবিক, গ্রামের সহজ সরল কৃষক যে কিনা কোনদিন জেলাশহরের বাহিরে যায় নি তাকে নিয়ে এসেছে খোদ কেন্দ্রীয় রাজধানীতে! তাকে দাঁড় করানো হল কাঠগোড়ায়। ওপর পাশে তার প্রিয় রামছাগল 'বেবী'। আনুষ্ঠানিকতা সমপন্ন হবার পর পিপি বিমান বোস উঠে নিতাইকে জিজ্ঞাস করল,
- আপনে নিতাই চন্দ্র দাশ?
- আজ্ঞে।
- ওপাশে যে একটা রামছাগল দেখা যাচ্ছে, সেটা কি আপনার পালিত?
- আজ্ঞে।
- হুমম। কয়দিন ধরে পালছেন?
- আজ্ঞে, বছর ১০-১২ হবে।
- হুমমমমমম (একটু আশ্চর্য হওয়ার ভান করে)। ১০-১২? এত বছর ধরে আপনি এই নিরীহ ছাগলটা উপর অত্যাচার করে আসছেন?
(নিতাই একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়, পরে মিনমিন করে বলে)
- আজ্ঞে না।
- তাহলে? তাহলে বলুন আপনি কি করেছেন, কতদিন ধরে নিরীহ গরু, ছাগল, ভেড়ার উপর অত্যাচার করে আসছেন.... ... ...!
(বিমানের গমগম গলার শব্দে সম্পূর্ণ কোর্ট কেঁপে উঠে। লোকজন ফিসফাস শুরু করে দেয়)
অর্ডার অর্ডার...। জজের হাতুরি বেজে ওঠে! লোকজনের ফিসফিসানি বন্ধ হয়ে যায়।
এবার নিতাই মিনমিন কণ্ঠে বলে, - আজ্ঞে না। ২/৩ মাস যাবৎ বেবীর সাথে এই কাম করতাছি।
- বেবী? (বিমানের চোখে বিস্ময়!) বেবী কে?
- আজ্ঞে আমার ছাগল!
অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে সমস্ত এজলাস। আবারও অর্ডার অর্ডার.....
বেশকিছুক্ষণ শুনানী শেষে বিমান সর্বশেষ বক্তব্যে বিচারকের কাছে নিতাইকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে এ রকম পাশবিকতা দমনের দাবী পেশ করে।
"অবজেকশন ইউর অনার!" এই বলে দাঁড়িয়ে পরেন এক তারুন্যদীপ্ত ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন সুন্দর মুখশ্রীর ল'য়ার। বিচারক বললেন "আপনার পরিচয়"?
- আমি ল'য়ার অন্জনা ব্যানার্জী! হোমোন্যাস্টি ইন্টারন্যাশনালে (Homonesty International) কর্মরত। এর প্রধান জাইরিন খান আমাকে পাঠিয়েছেন।
হোমোন্যাস্টি ইন্টারন্যাশনাল একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন। এর নাম শুনে সবাই একটু নড়ে চড়ে বসল। এটার বস স্বয়ং জাইরিন খানের কানে এই ঘটনা চলে গেছে।
বিমান বোস একজন জাদঁরেল উকিল, তাঁর মারপ্যাচে এই ছোকরী কি বা এমন করতে পারে তা দেখার জন্য তিনি একটি কোনাচে হাঁসি দিয়ে আয়েশ করে চেয়ারে বসলেন। মিস ব্যানার্জী বলেন, ইউর অনার, আমরা জাস্টিস চাই, এবং আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস আপনার পক্ষে সেটা করা সম্ভব। এই নিরীহ গ্রামের কৃষকটিকে (নিতাইয়ের দিকে আঙ্গুল তুলে) এখানে এনে শাস্তি প্রদানের কথা বলা হচ্ছে অথচ আপনি জানেন, এই একবিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে এসে দুইটি জীবের পাস্পরিক সম্মতিতে যৌন সম্ভোগ বৈধ করা হয়েছে!
সবাই বিস্ফোরিত নেত্রে চেয়ে আছে..... - অবজেকশন ইউর অনার (বিমান বোস দাঁড়িয়ে উঠে।) - নিতাই জোড় করে তার হীন স্বার্থ চরিতার্থ করেছে!
- তাহলে প্রমাণ করুন। ছাগলটাতো কোর্টেই আছে! তাকে জিজ্ঞাস করুন। মিস ব্যানার্জীর ঠোঁটে শ্লেষের হাসি। সবাই খিক খিক করে ওঠে কোনমতে হাসি ধামাচাপা দেয়। বিমান রাগে ফুলতে থাকে। এই বাচ্চা মেয়েটা তাকে অপমান করল।
এবার ব্যানার্জী বিচারকের দিকে তাকিয়ে বলে, - ইউর অনার, এমনি এমনি তো আর কিছু প্রমাণ করা যাবে না। আপনি একটি বিশেষজ্ঞ বোর্ড গঠনের নির্দেশ প্রদান করুন। যাদের পরামর্শের ভিত্তিতে রায় প্রদান করা হবে।
অবশেষে বিজ্ঞ বিচারক একটি বোর্ড গঠন করে দ্রুত রিপোর্ট প্রদান করে পরবর্তী শুনানীর দিন ধার্য করে ততদিন পর্যন্ত বিচারকার্য মুলতবি ঘোষণা করেন। বিশেষজ্ঞ বোর্ডে একজন করে চিকিৎসক, পশু চিকিৎসক, মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ, সমাজত্বত্তবিদ, এম্ব্রায়োলোজিস্ট, হেমাটোলজিস্ট এবং জিন ত্বত্তবিদ রাখার নির্দেশ প্রদান করা হয়।
সুনির্দিষ্ট দিনে সকল পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হল। এবং আদালতে রিপোর্ট পেশ করা হল!
সর্বশেষ শুনানি শেষে বিজ্ঞ আদালত এক ঐতিহাসিক রায় দিলেন। বিশেষজ্ঞদের রিপোর্টে প্রমাণিত হয়েছে যে নিতাই জোড় করে কিছু করে নাই। বেবীর (রামছাগলের) পূর্ণ সহযোগীতা ছিল। এবং এর ফলে কোন প্রকার রোগ ছড়ানোর কোন আলামত এখন পর্যন্ত পাওয়া যায় নি। কাজেই সব কিছু বিবেচনা করে আদালত নিতাইকে বেকসুর খালাস প্রদান করে এবং এসকল কর্মকান্ড যদি ২ ভিন্ন প্রাণীর সদিচ্ছায় হয় তাহলে তা বৈধতা প্রদান করল!
(এই কল্পকাহিনীর সব চরিত্র, অবস্থান, বর্ণনা কাল্পনিক। বাস্তবতার সাথে এর কোন মিল নেই। যদি কোন ব্যক্তি, সমাজ, দেশের প্রেক্ষাপটের সাথে মিলে যায় তাহলে সেটা হবে একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা এবং কাকতাল মাত্র!)
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই জুলাই, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


