রাজনৈতিক ভাষ্যকার : আবারও দেশের বিচার বিভাগের সঙ্গে দ্বনেদ্ব জড়িয়ে পড়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। এবার আইনমন্ত্রী ও তার প্রতিমন্ত্রী নেমেছেন সুপ্রিম কোর্টের একজন সিনিয়র বিচারপতির বিরুদ্ধে। এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত উল্লেখের আগে জানানো দরকার, আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিচার বিভাগের দ্বনদ্ব নতুন নয়। দ্বনদ্ব লেগে থাকে সব সময়- তা দলটি ক্ষমতায় থাকুক কিংবা থাকুক বিরোধী দলে। যেমন ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার সময় মন্ত্রীদের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সর্বোচ্চ আদালতের মাননীয় বিচারপতিদের বিরুদ্ধে লাঠি মিছিল করেছিল। শীর্ষ আওয়ামী আইনজীবীরা মাননীয় প্রধান বিচারপতির চেম্বারের দরজায় লাথি পর্যন্ত মেরেছিলেন। বিচারপতিরা কেন জামিন দিয়েছেন সে প্রশ্ন তুলে আওয়ামী লীগ নেতারা বানোয়াট পরিসংখ্যানও হাজির করেছেন। আওয়ামী লীগের ওই আমলে সব মিলিয়ে অবস্থা এমন হয়েছিল যে, এক রায়ে মাননীয় বিচারপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘রং হেডেড মানুষের সাথে তুলনীয় মনে করেছিলেন।
বর্তমান পর্যায়ে কথা ওঠার কারণ হলো, আওয়ামী লীগ সরকারের লোকজন কোন গভীর বিবেচনা ছাড়াই একজন মাননীয় বিচারপতির বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে বিষোদগার চালিয়ে যাচ্ছেন। এ ব্যাপারে নেতৃত্ব দিচ্ছেন আইনমন্ত্রী ও আইন প্রতিমন্ত্রী। তারা দু'জনই আবার আইনের মানুষ- একজন ব্যারিস্টার, অন্যজন এডভোকেট। ঘটনার শুরু হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। গত ১৯ ডিসেম্বর মানবাধিকার সংস্থা অধিকার আয়োজিত এক সেমিনারে বিচারপতি চৌধুরী বলেছিলেন, জনগণের মঙ্গলের জন্য আইন তৈরি করা সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব। আইনের খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে বিতর্ক করাও তাদের দায়িত্ব। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, পাস হওয়ার আগে অনেক সদস্য আইনটি পড়েও দেখেন না। কেরানীরা আইনের ড্রাফট তৈরি করে আনবে আর সংসদ সদস্যরা হো হো করে ও তালি বাজিয়ে তা পাস করে দেবেন এটা উচিত নয়। ব্যাস, আর যাবেন কোথায়? কথাগুলো বলে শেষ করতে না করতেই মাননীয় বিচারপতির বিরুদ্ধে রীতিমতো ‘আদা-জল' খেয়ে নেমে পড়েছেন ক্ষমতাসীনরা। পরদিন ২০ ডিসেম্বরই নিজের দফতরে সাংবাদিকদের ডেকে নিয়েছেন আইন প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলাম টুকু। বলেছেন, সংসদ সদস্যদের ব্যাপারে ‘অশালীন' মন্তব্য করে বিচারপতি চৌধুরী ‘ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ' করেছেন। তিনি তার সীমা ও চাকরিবিধি লঙ্ঘন করেছেন, ‘গর্হিত অন্যায়' করেছেন।
এটা কোনো অবস্থাতেই ‘বরদাশ্ত' করা যায় না। তার বিরুদ্ধে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ নেবেন তারা। বিচারপতির ওই মন্তব্যে সংসদ সদস্যরা নাকি ‘সংক্ষুব্ধ' হয়েছেন। তার এই ‘অপরাধকে' কোনো অবস্থাতেই ‘ক্ষমা' করা হবে না। সংসদের আসন্ন শীতকালীন অধিবেশনেই বিচারপতি চৌধুরীর বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে। এটুকুই সব নয়। এরপর নিজের অধীনস্থ প্রতিমন্ত্রীকে অনুসরণ করেছেন ‘ফুল' মন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ। প্রতিমন্ত্রী যেখানে বলেছিলেন, আমরা যদি ‘মূর্খ'ই হয়ে থাকি তাহলে বিচারপতি চৌধুরী রায়ের মাধ্যমে ব্যাখ্যা তুলে ধরতে পারেন, সেখানে ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেছেন, বিচারপতি চৌধুরীই ‘অজ্ঞতার' পরিচয় দিয়েছেন। আইনমন্ত্রী সেই সাথে আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া সম্পর্কে ‘জ্ঞান'ও দিয়েছেন জনগণকে। জানিয়েছেন, কোনো আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় কিভাবে ‘চুলচেরা বিশ্লেষণ' ও ‘যাচাই-বাছাই' করা হয় এবং তারপর সেটা সংসদে উপস্থাপন করা হয়। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কার্যক্রম সম্পর্কেও ‘জ্ঞান' দিয়েছেন আইনমন্ত্রী। আইনমন্ত্রী লম্বা অনেক কথা বললেও এবং জনগণকে ‘জ্ঞান' দিলেও জনগণ কিন্তু এমন কোনো আইন পাস হওয়ার ঘটনা জানে না, যে আইনটি পাস করার আগে যুক্তিসংগত সময় নিয়ে সংসদ সদস্যরা ‘চুলচেরা বিশ্লেষণ' ও ‘যাচাই-বাছাই' করেছেন। এর উল্টো উদাহরণই বরং দেশের ইতিহাসকে কলংকিত করে রেখেছে। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি যখন সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী পাস করার মাধ্যমে বাকশালের একদলীয় শাসন কায়েম করা হয়েছিল তখন কি সদস্যরা আদৌ ‘চুলচেরা বিশ্লেষণ' ও ‘যাচাই-বাছাই' করেছিলেন, নাকি তারা তা করার মতো অবস্থায় ছিলেন? এত পেছনেই বা যাওয়া কেন? ফখরুদ্দিন-মইন উ'দের অসাংবিধানিক সরকারকে বৈধতা দেয়ার লক্ষ্যে এই যে এতগুলো- শতাধিক অধ্যাদেশ পাস করা হয়েছে সে প্রক্রিয়ায় কবে এবং ঠিক কোন অধ্যাদেশের বেলায় সদস্যরা ‘চুলচেরা বিশ্লেষণ' ও ‘যাচাই-বাছাই' করেছেন? একটি উদাহরণও কি আইনমন্ত্রী বা তার সুযোগ্য প্রতিমন্ত্রী দেখাতে পারবেন? পারবেন না, কারণ, আসলেও সংসদে অনেক এমপি কোনো আইন নিয়েই মাথা ঘামান না। সে যোগ্যতা তাদের রয়েছে কি না- অমন প্রশ্ন তুলে কাউকে বিব্রত করার পরিবর্তে বলা দরকার, এভাবেই আমাদের দেশে চলে এসেছে। এমপিরাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ ব্যবস্থাতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। কেরানী না অন্য কারা আইনের ড্রাফট করে দেন সেটা বড় কথা নয়, আসল কথা হলো, কোনো আইন নিয়েই বিশেষ করে সংবিধান বা আইনগত বিষয় পাস করার আগে সংসদে সাধারণত খুব একটা বিতর্ক বা আলোচনা হয় না- ‘চুলচেরা বিশ্লেষণ' ও ‘যাচাই-বাছাই' করার তো প্রশ্নই ওঠে না। সেদিক থেকে বিচারপতি চৌধুরী মোটেও বাড়িয়ে বলেননি। তাছাড়া, তিনি কিন্তু সকল সদস্যের কথা বলেননি, বলেছেন ‘অনেক সদস্য' আইনটি পড়েও দেখেন না। এটা একটি নীতিগত বক্তব্য, বলেছেন প্রচলিত সিস্টেম বা ব্যবস্থা সম্পর্কে। সুতরাং সংসদ সদস্যদেরও ঢালাওভাবে ‘সংক্ষুব্ধ' হয়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়নি- মাননীয় বিচারপতিও ‘ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ' কিংবা ‘গর্হিত অন্যায়' করে বসেননি। একই কারণে কোনো অবস্থাতেই ‘বরদাশ্ত' ও ‘ক্ষমা' করা যায় না বলে মন্তব্য করারও কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। পর্যালোচনায় বরং অনস্বীকার্য হয়ে উঠবে যে, ‘ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ' থেকে ‘বরদাশ্ত' করা যায় না ধরনের কঠোর মন্তব্য করার এবং নজরুল ইসলাম চৌধুরীর মতো সিনিয়র একজন মাননীয় বিচারপতিকে ‘অজ্ঞ' বলার মধ্য দিয়ে আইনমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীই বাস্তবে সৌজন্যের সীমা লংঘন করেছেন। তার বিরুদ্ধে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ নেয়ার হুমকিকেও স্বাভাবিকভাকে নেয়ার উপায় নেই। এমন হুমকি কেবল আওয়ামী লীগের লোকজনের পক্ষেই দেয়া সম্ভব। উল্লেখ্য, সাবেক বিচারপতিসহ আইন বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে যাওয়ার মতো কোনো বক্তব্যই বিচারপতি চৌধুরী রাখেননি। হুমকি দেয়ার মাধ্যমে ক্ষমতাসীনরাই বরং বুঝিয়ে ছেড়েছেন- কে প্রকৃতপক্ষে ‘অজ্ঞ' এবং ‘মূর্খ'! উল্লেখ্য, বিচারপতি চৌধুরী কিন্তু ‘কোনো কোনো' অর্থে ‘অনেক' সংসদ সদস্য সম্পর্কে মন্তব্য করার আগে-পরে অন্য কিছু কথাও বলেছিলেন। এসবের মধ্যে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের তীব্র বিরোধিতা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেছিলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। কারণ, এটা বিচার বিভাগের জন্য বড় ধরনের আঘাত। কথাটা বলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানাতে গিয়ে বিচারপতি চৌধুরী বলেছিলেন, আমরা বিচারপতিরা জনগণের অধিকার রক্ষার শপথ নিয়েছি। আমাদের সামনে যখন বিনা বিচারে কাউকে হত্যা করা হয় তখন তা আমাদের জন্য আঘাতস্বরূপ। তিনি আরো বলেছিলেন, কোনো আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হাতে কাউকে হত্যার ক্ষমতা তুলে দেয়া যায় না। এটা জাতির জন্যও আত্মঘাতী। সম্ভবত এই ক'টি কথাতেই মাথা ঘুরে গেছে ক্ষমতাসীনদের। তারা এমনকি কান্ডজ্ঞান পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছেন। আক্রমণ করে বসেছেন এমন একজন মাননীয় বিচারপতিকে, যাকে তারাই তাদের আগের আমলে বিচারপতি পদে নিযুক্তি দিয়েছিলেন। পার্থক্য হলো, তখন খুবই যোগ্য, বিজ্ঞ ও জ্ঞানী ছিলেন বিচারপতি চৌধুরী। কিন্তু সে তিনিই এখন ‘অজ্ঞ' হয়ে পড়েছেন এবং অপরাধও এমন করেছেন যা নাকি ক্ষমারও অযোগ্য!
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে ডিসেম্বর, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




