কয়েক বছর আগে হতে নানা কারনে নিজেকে এই ব্যস্ত ঢাকা শহরে বড় একা লাগত। বন্ধু খোঁজার প্রয়োজন ছিল, যদিও কপালে বন্ধু জুটল না তখন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত নিঃসঙ্গতাকে জীবনের অভিশাপ মনে করতাম। কিন্তু, আজ প্রিয় নিঃসঙ্গতা আমার কাছে ধরা দিয়েছে এক নতুন রুপে। এক আশির্বাদ রুপে।
আজ আমি ২০ টি ঘন্টা পেয়েছিলাম একাকী নিজেকে নিয়ে কাটাবার জন্যে। ছিলাম সম্পূর্ণ একাকী, ছিল না কোন তাড়া, এমনকি কারও ফোন রিসিভ করারো বাধ্যবাধকতা ছিল না। একাকী এ সময়ে ভোগ করলাম, আমার প্রিয় নিঃসঙ্গতার সঙ্গ। একাকী সময়ে মনের খুব কাছে পেয়েছি আকাশ, চাঁদ, কুয়াশা, শিশির, শীত, উষ্ণতা, সূর্যের আলো, রাতের অন্ধকার আরও কত কি! কারও সঙ্গ তো আমাকে একত্রে জীবনের এত গুলো উপাদানকে ভোগ করতে অনুমতি দেয় না। কেউ সাথে থাকলে, সে আমার যতটা মনোযোগ কাড়ে, এ বিশ্বমন্ডল হতে আমার মনযোগ ততটাই সরে আসে। একটি মানুষের সঙ্গ যদি এতগুলো নৈসর্গিক আনন্দ হতে বঞ্চিত করে তবে, কেন চাইব সে সঙ্গ?
প্রিয় নিঃসঙ্গতাকে সাথে করেই তো আমি বইপড়ে ঢুকে গেছি উপন্যাসের চরিত্রে অথবা হাজার লোকের মাঝে ডুবে গেছি সংগীতের জগতে। পদার্থবিদ্যা পড়বার কালে ঘুরেছি মহাবিশ্বের গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে, অনুর পরমানু থেকে পরমানুতে, জীব কোষের ভেতর ঢুকেছি, প্রোটিনের একএকটি অ্যামিনো এসিড থেকে অপরটিতে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়িয়েছি। প্রিয় নিসঙ্গতা আমাকে খুঁজে দিয়েছিল, কম্পাস দিয়ে আঁকা বৃত্তের মাঝে সৃষ্টিকর্তাকে। নিসঙ্গতা আমাকে ভালবাসতে দিয়েছে একই সাথে “লা নুই বেঙ্গলির” মৈত্রয়ীকে, অথবা গোরার (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) ললিতাকে। খানিকের জন্য ভালবেসে ছিলাম শেষের কবিতার লাবন্যকেও। যদিও তা দুদিনের বেশি টিকেনি।
প্রিয় নিঃসঙ্গতা আমাকে বুঝতে বলেছে পৃথিবীকে, বুঝতে বলেছে জীবনকে, দেখতে শিখিয়েছে বাংলাদেশকে, এর মানুষকে। নিসঙ্গতার এ আশির্বাদ, কি শুধু আমার জন্যই? না, মানুষের যা কিছু মহান তার মাঝেই আছে প্রিয় নিসঙ্গতার ছোঁয়া। যখন চিন্তা করি মহাবিজ্ঞানী নিউটনের কথা, একাকী প্রিয় নিসঙ্গতার সাথে না থাকলে কি আপেল পতন তার দৃষ্টি সেভাবে কাঁড়তে পারতো, অথবা শ্রদ্ধেয় বিজ্ঞানী ডারউইন যদি গ্যালাপাগোস দ্বীপে নিজ নিঃসঙ্গতাকে সাথে নিয়ে প্রকৃতির মাঝে ডুবতে না পারতেন, তবে আজ এ বিবর্তনবাদী কোথা হতে উদয় হত। নিঃসঙ্গতা আমাদের উপায় করে দিয়েছে জগতের সব কিছুর মাঝে এক আনন্দ, এক সুখ, এক প্রেম খুঁজে নিতে। খানিকের জন্য প্রিয় নিসঙ্গতা আমার কাছ থেকে সরে গেলেই, ডুবে যেতে চাই কোন একজনের প্রেমে, জগতের সব আনন্দ, সুখ, প্রেম খুজতে চাই সেই একেরই মাঝে। সেখানে পান থেকে চুন খসলেই, প্রিয় নিঃসঙ্গতার এক বিকৃতরুপ আমাদের সামনে ভাসতে শুরু হয়। প্রতিনিয়ত সাথির কাছে সঙ্গ প্রার্থনা বা সাথি খোজার ছলে হত্যা করি প্রিয় নিঃসঙ্গতাকে। মনের কাছে নিসঙ্গতা ধরা দেয় এক অভিশাপ রুপে।
আমার প্রিয়াকে বলেছিলাম, “তুমি আমার হও কায়মনোবাক্যে, আমি তোমার হব বিনা শর্তে”। কিন্তু আজ আর শর্ত আরোপ না করে পারছিনা। প্রিয়াকে আজ শর্ত দেব, “আমার মন যখন চাইবে, তখনই আমাকে ছেড়ে দিতে হবে প্রিয় নিসঃঙ্গতাকে উপভোগ করতে, কোন প্রকার টালবাহানা চলবে না”।
আজ অনেক অনেক দিন পর এক অতিইন্দ্রিয়িক আনন্দের স্বাদ পাচ্ছি, প্রিয় নিসঙ্গতাকে নতুন রুপে আবিস্কার করে। জোরে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করছে, “ভালবাসি, নিঃসঙ্গতা তোমায় আমি ভালবাসি”।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ বিকাল ৩:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





