somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

টিপাই মুখে বাঁধ: কালের কাছে এক বাঙালির স্বীকারোক্তি

২৬ শে জুন, ২০০৯ রাত ১১:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

টিপাইমুখ গড়িয়ে অনেক পানি সুরমা কুশিয়ারা হয়ে মেঘনায় গড়াল। তবে এই বোধ হয় ইতি। প্রথমে স্রোতে পড়বে টান, তারপর পানির পরিমানে তারপর শুধু ধুঁ ধুঁ বালুচর। একেবারেই হারিয়ে যাবে অনিন্দ সুন্দর প্রকৃতি, নদী কেন্দ্রিক বাংলা হয়ে যাবে স্মৃতি। ভাবতে কষ্ট হয়, নদী বিহীন এই বিশ্বের বুকে কোন বাংলার অস্তিত্ব!


আজপর্যন্ত যা বুঝলাম, তার সারমর্ম হল টিপাই মুখে একটি বাঁধ বা কারো কারো ভাষায় ড্যাম হতে চলছে। এটা হবেই, আমরা যাই বলি না কেন। আমাদের জাতির মহান নেতা শেখ মুজিব। তিনি ভারতের ফারাক্কা বাঁধ নির্মানে সম্মতি দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের প্রতি শেখ মুজিবের দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন তোলার ক্ষমতা আমার নেই, তাই ধরে নিচ্ছি ভারতের প্রতি সরল বিশ্বাসেই তিনি ফারাক্কায় বাধ নির্মানে সম্মত হন। এই সম্মতির ফলাফল যে ভয়ংকর হবে তা সেদিন মাওলানা ভাসানী বুঝতে পেরেছিলেন বলেই হয়েছিল তার ঐতিহাসিক লংমার্চ। তিনিও এ জাতির এক মহান নেতা। শেখ মুজিবের ভুল বিশ্বাস, মাওলানা ভাসানীর ব্যর্থ প্রচেষ্টা সর্বোপরি আমাদের অসাড়তার ফলাফল আজ গড়াই নদী ইতিহাসের পাতায়, পদ্মার বুকে বালুচর।


সেদিন শেখ মুজিবের সামনে বাঁধের ভয়াবহতার এবং ভারতের চুক্তিভঙ্গের কোন উদাহরণ ছিল না। অথচ, আজ সংসদের তিন চতুর্থাংশ আসন জয় করে ক্ষমতায় অসীন বঙ্গবন্ধু কন্যার কাছে পিতার আমলের ভুল সিদ্ধান্তের উদাহরণ আছে। অথচ, তিনি, তার দেশপ্রেমিক মন্ত্রী, এমপি (কেউ কেউ বীর মুক্তিযোদ্ধা) তারা কেউই ফারাক্কা বাঁধের ভয়াবহতাকে আমলে নিচ্ছেন না। চোখের সামনে মরা পদ্মা রেখে যারা আজ টিপাই মুখ সমর্থন করে গলাবাজি করছেন তাদের উদ্দেশ্য সৎ বলে ধরে নিতে ব্যর্থ হলাম। সরকারই যখন দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিতে বদ্ধপরকর তখন আম জনতা আর কি করতে পারে। হায়! এখন ভাসানীর ন্যায় কেউ আর নেই। বিএনপি প্রতিবাদ করছে, কিন্তু সেটাতো নাকি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে! মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হওয়া এই বঙ্গদেশে আমরা দেশপ্রেমিক জনগন বিএনপির ফাঁদে পা দিয়ে টিপাই মুখের বিরোধিতা করে তো আর রাজাকার সীল লাগাতে পারি না! টিপাই মুখে বাঁধ হবে বা হয়ে যাচ্ছে। বাঁধের নয়নাভিরাম দৃশ্য উপভোগ করতে যাচ্ছেন দেশপ্রেমিক (!) আওয়ামী প্রতিনিধি দল। ফিরে তারা বলবেন, “চিন্তার কিছু নেই, সুন্দর বাঁধ হচ্ছে। দেশ এগিয়ে যাবে”। “দেশ” বলতে কোন দেশ বোঝাবেন তা ইতিহাস সাক্ষীদেবে।


আন্তর্জার্তিক আইন, পানি বন্টন, নদীর পানির ইউনিট কিউসেক, বাঁধ বা ড্যামের পার্থক্য এত কিছু আমি বুঝি না। শুধু বুঝি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা পড়লে, দু’তীরে হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে উঠা প্রাকৃতিক সম্পদ, জনজীবন সব বিনষ্ট হবে। বরাক নদী হতে বাংলাদেশে সৃষ্টি হয়েছে সুরমা আর কুশিয়ারা, এ দুটো মিলে মেঘনা নদী। মানুষের লিখিত ইতিহাসে বাংলাকে প্রথম পরিচিত করে মেঘনা নদী। টলেমি লিখে গেছেন, সম্রাট আলেকজান্ডার সেই মেসিডোনিয়া হতে ভারত পর্যন্ত জয় করে এসে বাধা পেয়েছিলেন তৎকালীন ভারতের গঙ্গাঋধি রাজ্যে, যা বর্তমান বাংলা। সামরিক বিশেষজ্ঞরা আলেকজান্ডারকে বর্ণনা দিয়েছিলেন গঙ্গাঋধির বিশাল হস্তিবাহিনীর। মেগাস্থেনাসের ইন্ডিকাতে বর্ণনা আছে, গঙ্গাঋধির বিশাল মাঘোন (আমাদের মেঘনা) নদীর কথা। যার এক তীর হতে অন্য তীর দেখা যায় না। দু পাশে প্রচুর ধান উৎপন্ন হয়, সেই ধান হতে তৈরি মদ খাওয়ানো হয় সেনাবাহিনীর যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হাতিদের। এই হাতির ভয়ে আলেকজান্ডারের সৈন্যরা এগিয়ে যেতে অস্বীকার করলে, আলেকজান্ডার মেসিডোনিয়ার দিয়ে ফিরতি যাত্রা শুরু করেন। এসব ইতিহাসের সাক্ষি মেঘনা এবার হয়ত নিজেই ইতিহাস হবে।


পদ্মা, মেঘনা এই নদী গুলোই সব নয়। আছে এদের শাখা প্রশাখা। জালের মত বিস্তৃত এই বাংলার মানুষের সংস্কৃতি, সাহিত্য, আচার আচরণ সব কিছুরই ভিত্তি নদী। বাঙ্গালিকে নাকি শাসন করা খুব কঠিন। এরা নিজেই নিজের রাজা। ইতিহাসে কেউই বাংলাকে শান্তিতে শাসন করতে পারে নি। জালের মত এই অঞ্চলের ভুখন্ডগুলোকে নদী আলাদা করে রেখেছে। নদীর ভাঙ্গনে ভৌগলিক সীমারেখা কখনই স্থির হয়নি। বিধায় দৃঢ় কোন সামাজিক সংগঠনও আমাদের এই অঞ্চলে তেমন দেখা যায় না। শাসিত হতে আমাদের বড় ভয়। কেউ জোড় করতে এলেই আমরা বিগড়ে যাই। এবার মনে হচ্ছে বাঙ্গালি নামের পাগলা ঘোড়াকে বেঁধে ফেলা গেল। হাজার হোক ভারত বর্ষের এই জাতিটিই স্বাধীন দেশের অধিকারি।


আজ যারা ভারতের কাছে স্বেচ্ছায় মাথা নত করে টিপাই মুখ মেনে নিল তারা শুধু আগামী পাঁচ বছরের জন্যই অপরাধ করল না। তারা অপরাধ করল এই নদীর দ্বারা পুষ্ট হাজার হাজার বছর অতীতের এবং আগত ভবিষত্যের কাছে। আজ হতে হাজার বছর পর জন্ম নেওয়া বাঙ্গালিটি যখন নিঃশেষ হয়ে যাওয়া মেঘনার উপহার থেকে বঞ্চিত হবে, তার কাছে অপরাধী হবে এই বিশ্বাসঘাতকরা।


একাত্তরের রাজাকারেরা একাত্তরের অপরাধী। তাদের তৎকালীন যুদ্ধাপরাধের জন্য আমরা তাদের বিচার করার জন্য আইনের আশ্রয় নিতে পারি। কিন্তু যাদের অপরাধ কাল নিরপেক্ষ কোন আইনে তাদের বিচার করব? রাজাকারদের রাজাকার বলি কারন তারা স্বেচ্ছায় জন্মভূমির স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে বিশ্বাস ঘাতকতা করেছিল। আজকের এই বিশ্বাসঘাতকেরা কি স্বেচ্ছায় বিশ্বাস ঘাতকতা করছে না? তবে রাজাকার গালি এদের কেন দেব না?


দীর্ঘশ্বাস ফেলে, হতাশাভরে লিখতে হচ্ছে, নিকট ভবিষ্যতে সুরমা, কুশিয়ারা, মেঘনা আর এভাবে প্রবাহিত হবে না। তার বুকে রইবে ধুঁ ধুঁ বালুচর। তবে সময়ের কাছে সাক্ষি দিয়ে যেতে চাই, “আমি এই বিশ্বাসঘাতকদের সাথি ছিলাম না। মুক্তিযুদ্ধের বিশ্বাস ঘাতকদের যেমন আমি রাজাকার বলে ঘৃণা করেছি, তেমনি বাংলার বর্তমান বিশ্বাসঘাতকরাও রাজকার ভিন্ন আমার কাছে আর কিছুই না”।

সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জুন, ২০০৯ রাত ১১:৩৪
৩১টি মন্তব্য ২৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এডলফ হিটলার এর ইহুদী নিধন একটি সময়োপযোগী সীদ্ধান্ত এবং কিছু কথা।

লিখেছেন দেশ প্রেমিক বাঙালী, ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ দুপুর ১:১৩



এডলফ হিটলার আক্ষেপ করে বলেছিলেন- "ইহুদীরা বেইমান জাতি, এদের কখনও বিশ্বাস করতে নাই, একদিন বিশ্ববাসী বুঝবে ওদের (ইহুদিদের) সম্পর্কে আমার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল কিনা"।

এডলফ হিটলার শুধু নয় মধ্যপ্রাচ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

জলকাব্য- ২৩ - সমুদ্র নেশা তখন... (গান)

লিখেছেন ভ্রমরের ডানা, ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ দুপুর ১:৫৫




ও এমন যাদু রে তোর... স্বপন আঁকে যখন...
ভ্রমর ডানায় জুড়ে দেখি.. তোরই নেশা তখন.....


ও হাতের চুড়ি রে তোর
রিনিঝিনি বেজে
কেড়ে নিল এ মন____
সমুদ্র উথলি উঠে হায় কি করি... ...বাকিটুকু পড়ুন

» স্নিগ্ধতার প্রতিচ্ছবি....জলের আয়নায় দেখি মুগ্ধতা (মোবাইলগ্রাফী-২২)

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ দুপুর ২:১৫



স্নিগ্ধতার প্রতিচ্ছবি....জলের আয়নায় দেখি মুগ্ধতা । এর আগেও এসব বৃষ্টি ভেজা পাতার ছবি দিয়েছি। কিন্তু পাতা তো সারা বছরই ভিজে । করবাম টা কি......ভাল্লাগে যে..... ছবি উঠায়ে ফেলি। অবশ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

হরর গল্পঃ যাত্রী

লিখেছেন মন থেকে বলি, ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ দুপুর ২:৩২

বাসে বাসায় ফিরছি উত্তরা থেকে। যাব সেই নারায়নগঞ্জ। জসিমের সাথে আড্ডাটা এমন জমেছিল যে কখন ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছাড়িয়েছে, খেয়ালই করিনি। তড়িঘড়ি এসে যে বাসটা পেলাম সেটাই মনে হয় শেষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যেখানে আমরা রোহিঙ্গাদের কাছে হেরে যাই...

লিখেছেন পদ্ম পুকুর, ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ দুপুর ২:৫৯


অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সাথে সামাজিক-পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন করার কোন সম্পর্ক আছে কি না, সেটা সমাজবিজ্ঞানী বা নৃবিজ্ঞানীদের ভালো জানার কথা। খোলা চোখে আমরা দেখি উন্নত দেশগুলোতেই নিউক্লিয়াস ফ্যামিলি, ওল্ডহোমের মত ধারণা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×