somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোট গল্পঃ মিরুর পাওয়া

১৩ ই আগস্ট, ২০১৭ রাত ১২:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ঘড়িতে নটার ছুই ছুই করছে । মীরু কি করবে ঠিক বুঝতে পারছে না । আগেই জানতো আজকে দেরি হবে তবে এতো দেরি হয়ে যাবে ভাবতেও পারে নি । এখনও হাতের কাজ শেষ হওয়ার নাম নেই । আজকে ব্যাংক ক্লোজিং । রায়হানকে আসার সময় বলে এসেছিলো যে একটু দেরি হতে পারে । কিন্তু এতো দেরি হবে সেটা বুঝতে পারে নি ।

সমস্যা যদিও রায়হান না । সমস্যা হচ্ছে তার শ্বশুর মশাই । মীরু আর রায়হানের বিয়ে হয়েছে ছয় মাসও হয় নি । রায়হানদের বাসায় মীরুকে সবাই পছন্দ করে কেবল ওর চাকরি করার ব্যাপার টা বাদ দিয়ে । মীরুর শ্বশুর মশাই পছন্দ না যে তার বাড়ির বউয়েরা বাইরে চাকরি করুক । রায়হানের বড় দুই ভাইয়ের বৌয়েরা কেউ ই চাকরি করে না । কিন্তু মীরু করে । সরাসরি কিছু না বললেও মীরুর বুঝতে মোটেই কষ্ট হয় না যে তারা ঠিক কেউ ই ব্যাপারটা পছন্দ করছে না ।

মীরু একবার ভেবেছিলো চাকরিটা ছেড়ে দিবে । কিন্তু রায়হানই নিজেও ওকে চাকরি ছাড়তে মানা করলো । বলল যে মীরু যদি নিজ ইচ্ছা থেকে চাকরি ছাড়তে চায় তাহলে ওর কিছু বলার নেই কিন্তু অন্য কে পছন্দ করলো না এই জন্য যেন মোটেই চাকরি না ছাড়ে । তখনই মীরু একটু বুকে সাহস পেল । ততদিনে মীরু বুঝে গেছে তার ঠান্ডা স্বভাবের স্বামীকে পরিবারের অন্য সবাই কেমন একটু ভয় করে । সমীহ করে চলে । এমন কি শ্বশুর মশাই রায়হানের সামনে কিছু বলে না ।

কিন্তু আজকে আর সম্ভবত আর শেষ রক্ষা হল না । এতো দিন মীরু চেষ্টা করেছে যাতে করে কোন কাজের জন্য কারো কাছে কথা শুনতে না হয় । কিন্তু এতো রাত করে আজকে বাসায় গেলে নিশ্চিত কথা শুনতে হবে । একটু মনটা খারাপই হল । আজকে নিশ্চয়ই রায়হানের কোন কথা বলার থাকবে না । আর আজকের দিনে কাজ শেষ না করে ওঠাও যাবে না ।
নাহ ! মীরু সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল । এই চাকরিটা আর করবে না । ব্যাংকের চাকরি ঝামেলা এর থেকে অন্য চাকরি খুজে দেখবে !

যখন হাতের সব কাজ শেষ হল তখন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো সাড়ে দশটা বাজে । আজকে সত্যিই বাসায় গেলে কত কথা শুনতে হবে কে জানে ! সব ফাইল পত্র এক সাথে করে পিসি অফ করে দিল । একবার মনে হল রায়হানকে ফোন দেয় । তারপর মনে হল থাক । ওকে ফোন দিয়ে আর লাভ নেই । ও একটু আরাম প্রিয় । অফিস থেকে বাসায় এসে শুয়ে শুয়ে বই পড়তে পছন্দ করে খুব । আজও মনে হয় তাই করছে । সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যখনই ও গেট দিয়ে বের হয়ে এল তখন যেন একটু মেঘ ডাকা শুরু করেছে । আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে তেমন একটা মেঘ করে নি । বৃষ্টি হতে দেরি আছে । তবে রাতে বৃষ্টি হবে সেটা নিশ্চিত করেই বলা যায় । কালকে ছুটি । সকালে আরাম করে ঘুমানো যাবে ।

সকালের ঘুমের কথা মনে হতেই আবারও বাসার কথা মনে পড়লো । রাতে কি হবে সেটার ঠিক নেই ও পড়ে আছে সকালের ঘুম নিয়ে । গেট দিয়ে যখনই বের হতে যাবে তখনই মীরু অবাক হয়ে দেখলো ওদের অফিসের সামনে যে চায়ের দোকানটা আছে সেখানে রায়হান বসে আছে । হাতে একটা চায়ের কাপ আর চোখটা মোবাইলের দিকে । মীরু কিছুটা সময় চুপ করে গেটের কাছে দাড়িয়েই রইলো । এখনও ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না । রায়হানের চোখ তখনও মোবাইলের দিকেই নিবদ্ধ । ওকে এখনও দেখে নি । মীরু অনুভব করলো ওর চোখটা খানিকটা যেন সিক্ত হয়ে উঠেছে । তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে হাটতে হাটতে ঠিক রায়হানের সামনে গিয়ে দাড়ালো । দেখলো রায়হানের পাশে কয়েকটা শপিং ব্যাগ ! খানিকটা অবাক না হয়ে পারলো না । রায়হান কখনও মার্কেটে যায় না । কেনা কাটা একদম করতে চায় না । আজকে কি এমন দরকার পড়লো যে নিজে নিজেই মার্কেটে কি এমন কি নে আনলো ?

মোবাইল থেকে চোখ তুলে তাকিয়ে দেখে মীরু ওর দিকে তাকিয়ে আছে ! এক চুমুকে বাকি চা টুকু শেষ করে দিয়ে বলল
-কাজ শেষ ?
মীরু সে প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বলল
-কত সময় ধরে বসে আছো ? কখন এসেছো ?
চেহারাতে একটু বোকাবোকা ভাব এনে রায়হান বলল
-এই বেশি না । ঘন্টা খানেক !
-একবার আমাকে ফোন দেওয়া যায় নি ? বলা যায় নি আমি অপেক্ষা করছি !
রায়হান আবারও হাসলো । বলল
-তুমি কাজে ব্যস্ত ছিলে তাই ভাবলাম কি দরকার ! এখানে সময় ভালই কাটছিলো !
-বুঝতে পারছি কেমন ভাল সময় কেটেছে ! তা মার্কেটিং এ গেছিলে মনে হচ্ছে !

রায়হান ততক্ষনে উঠে উরেছে । এদিক ওদিক তাকিয়ে সিএনজি কিংবা রিক্সা খুজতে লাগলো । মীরু মনে মনে বলল সিএনজি যেন না পায় । রিক্সাই ভাল । আজকে রায়হানের সাথে খুব রিক্সাতে চড়তে ইচ্ছে করছে । রিক্সাই পাওয়া গেল ।

একটু একটু বাতাস দেওয়া শুরু করেছে । মীরুর সত্যিই খুব ভাল লাগছিলো । হয়তো বাসায় গিয়ে ওকে কথা শুনতে হবে । তা শুনতে হোক । কিন্তু এখন এই রিক্সা ভ্রমনটা ওর কাছে অন্য রকম ভাল লাগছে । একটু পরেই যেন বৃষ্টি নামবে । প্রিয় মানুষটার হাত ধরে ওর রিক্সায় বসে আছে । মনে হয় এই ভ্রমন যে আর শেষ না হয় । সারা জীবন ধরেই যেন চলে ।
কিন্তু তখনও অবাক হওয়ার খানিকটা বাকি ছিল । মীরু ভেবে ছিলো সরাসরি বোধহয় বাসাতেই যাবে কিন্তু রায়হান যখন ২৭ নম্বরের আলফ্রেস্কোর সামনে রিক্সা থামাতে বলল তখন মীরু অবাক হয়ে বলল
-এখানে থামাতে বললে কেন ?
-ডিনারটা সেরে যাই ।
-কি দরকার ? বাসায় গিয়ে করি । চলে এসেছি তো !
রায়হান বলল
-দরকার আছে !

মীরু অবশ্য আর আপত্তি করলো না । আজকে ওর কেন জানি সব কিছুই ভাল লাগছে । রাতের খাবার শেষ করে যখন ওরা আবারও রিক্সায় উঠলো তখন আসলেই একটু রাত হয়ে গেছে । তবে খুব একটা চিন্তার কোন কারন নেই ।

বাসায় ঢুকার সাথে সাথেই মীরুর শ্বাশুড়ি প্রশ্ন করলো
-এতো দেরি কেন ?
মীরু কি বলবে সেটা প্রথমে ভেবে পেল না । সোফার উপর বসে শশুর মশাই টিভি দেখছে । চোখ টিভির দিকে হলেও তার খেয়াল যে এদিকে সেটা বুঝতে মীরু মোটেই কষ্ট হল না । কেন দেরি হয়েছে সেটা তো ওর জানা আছে । কিছু না বলে রায়হানের দিকে তাকালো ! রায়হান তখন জুতার ফিতে খুলতে শুরু করেছে । মায়ের দিকে না তাকিয়েই রায়হান নির্বিকার কন্ঠে বলল
-মা মার্কেটে গেছিলাম একটু । ওখানে দেরি হয়েছে । আর রাতের খাবার খেয়ে এসেছি । তোমরা খেয়ে নাও ।

মীরুর অফিসে যে দেরি হয়েছে সেটা একবারও মুখেও আনলো না । ব্যাপারটা এমন দাড়ালো যে রায়হান মিতুকে ওর অফিস থেকে নিয়ে গিয়েছে মার্কেটে । সেখান থেকে রাতের খাবার খেতে গিয়ে দেরি হয়েছে । মীরু বুঝতে পারলো কেন তখন রায়হানের কাছে শপিং ব্যাগ দেখেছিলো ! কারো কিছু বলার রইলো না । ছেলের বউকে নিয়ে ছেলে শপিং এ গেছে বাইরে খেয়ে এসেছে । এখানে কেউ কিছু বলতেও পারবে না । মীরু যা ভেবেছিলো তার কিছুই হল না সব কিছু রায়হান আগে থেকে ভেবে রেখেছিলো ।

নিজেকেদের ঘরে ঢুকতে ঢুকতে মীরু কিছু না ভেবে রায়হানে জড়িয়ে ধরলো !
-আরে কি হল ?
-থ্যাঙ্কিউ ফর ডু দিস ফর মি !
-আরে তুমি কি অন্য কেউ নাকি !
-আজকে তুমি না থাকলে কি যে হত !

মীরু জানে তাকে অনেক গুলো কথা শুনতে হত । সেটা মীরু মোটেই ভাল লাগতো না । বিয়ের সময়ই মীরুর মনে হয়েছিলো যেমন ছেলে ওর পছন্দ তার কোন কিছুই রায়হানের ভেতরে নেই । কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে ততই মীরুর মনে হচ্ছে ওর ধারনা মোটেই ঠিক ছিল না । বরং মীরু যেমনটা চেয়েছিলো রায়হান যে তার থেকেও আরও অনেক বেশি কিছু ! এমন স্বামীর সবার কপালে জোটে না ! যতই দিন যাচ্ছে রায়হানকে যেন আরও নিজের মত করে ও পেতে শুরু করেছে ।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই আগস্ট, ২০১৭ রাত ১২:০৬
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমার দেশ

লিখেছেন স্নিগ্দ্ধ মুগ্দ্ধতা, ১৮ ই অক্টোবর, ২০১৭ সকাল ১০:০০


সবুজ ঘাস,
ফুলের বাস,
মেঘের রাশ
জুড়ায় মন

ফুলের ঘায়
অবশ হায়!
গহীন কোন
... ...বাকিটুকু পড়ুন

:):)ট্রুথ এক্সপ্লোরেশন: কপি পেস্টার, হিট সিকার, মাল্টি ব্লগার বিলিয়ার রহমানের মুখোশ উন্মোচন: ইহা ক্যাচাল নয় বরং প্যাচাল: সিরিয়াসরা দূরে থাকেন :):)

লিখেছেন বিলিয়ার রহমান, ১৮ ই অক্টোবর, ২০১৭ দুপুর ১২:৩৭



বিলিয়ার রহমান ব্লগে ফালাফালি কম করে নাই! কার লেখা চুরি গেছে কার পোস্ট কপি হইছে, কে পোস্ট পড়ে কমেন্ট করে কে পোস্ট না পড়ে করে এরকম বিষয়ে উনি নাকটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

খান আতাউর রহমান রাজাকার বিতর্কের নতুন ডালপালা

লিখেছেন সজীববুরী, ১৮ ই অক্টোবর, ২০১৭ দুপুর ১২:৫৫



খান আতাউর রহমান বিতর্কে আজ ১৮ অক্টোবর ২০১৭ তারিখের বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় চিত্রনায়ক ফারুক বলেন “তখন পাকিস্তানি সরকার বাঙালি মেধাবীদের বিপদে ফেলে রাজাকারের তালিকায় জোর করে স্বাক্ষর নিয়েছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

মেঘের আড়ালে ১৪

লিখেছেন ইবরাহীম ওবায়েদ, ১৮ ই অক্টোবর, ২০১৭ দুপুর ১:১৮



১৮

ঘটনা খুব দ্রুত ঘটতে লাগলো। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে বড় বড় কয়েকটা ঘটনা ঘটে গেলো। হাজারিবাগের ঘুপচি গলি থেকে আক্কাাসকে গ্রেফতার করলো পুলিশ। আক্কাাসকে গ্রেফতার করার পর তিনদিনের মাথায় কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

মৌলিক লেখার ধরণ: কোবতে বা কবিতাদের দুর্গতি

লিখেছেন বেনামি মানুষ, ১৮ ই অক্টোবর, ২০১৭ বিকাল ৩:০৫


কবিতাকে এবার আঁখ ক্ষেতে নিয়ে কি যেনো করে দিয়েছে পাড়ার কিছু উঠতি ছেলেপুলে।

বিকালে খুঁড়াতে খুঁড়াতে তার ঘরে ফিরলে পরে কবিতার মা ছন্দবালা মেয়েকে জিগ্যেস কি হয়েছে জিগ্যেস করলে
জবাবে কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

×