পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে জামায়াতের ছাত্র সংগঠনের গুণ্ডামি
পহেলা এপ্রিল পাকিস্তানের লাহোরে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক তার অফিসে কাজ করছিলেন। এসময় একটি জঙ্গি ইসলামি ছাত্র সংগঠনের কয়েকজন সদস্য তার অফিসের দরজা ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করে। জঙ্গি ছাত্ররা লোহার রড দিয়ে তাকে মারধর করে এবং একটি ভারি ফুলদানি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে। তার মাথায় ত্রিশটি সেলাই দিতে হয়েছে। এ শিক্ষকের নাম ইফতেখার বালুচ। পরিবেশ বিজ্ঞানের অধ্যাপক বালুচ উচ্ছৃখল আচরণের জন্য জঙ্গি ইসলামি ছাত্র সংগঠনের কয়েকজন সদস্যকে বহিষ্কার করেছিলেন। তার প্রতিশোধ গ্রহণে তাকে রক্তাক্ত করা হয়। প্রহৃত হয়ে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। তাকে প্রহার করায় শিক্ষকরা একজোট হয় এবং তারা তিন সপ্তাহব্যাপী ধর্মঘট পালন করেন।
যে ছাত্র সংগঠনটি একজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষককে লাঞ্ছিত করেছে তার নাম ‘ইসলামি জমিয়ত তালাবা’। এ ছাত্র সংগঠন জঙ্গিবাদী ইসলামি ধ্যান- ধারণায় বিশ্বাস করে। ইসলামি জমিয়ত তালাবা হলো পাকিস্তানের বৃহত্তম ধর্মীয় দল জামায়াতে ইসলামির অঙ্গ সংগঠন। জামায়াতে ইসলামির সঙ্গে দেশের মূল স্রোতের রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রায়ই আঁতাত করতে হয় বলে ইসলামি জমিয়ত তালাবা উদ্ধত আচরণ করার সুযোগ পাচ্ছে। এই অসহিষ্ণু ছাত্র সংগঠনটি গোটা পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়কে জিম্মি করে রেখেছে। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রের সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার। এ বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে পাকিস্তানের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ছাত্রদের অধ্যয়নের একমাত্র পীঠস্থান। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাস গোটা দেশের ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগের একটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিক্ষোভ প্রদর্শনকারী শিক্ষকদের মাঝে দাঁড়িয়ে কলা বিভাগের শিক্ষিকা মালিহা এ. আগা ছাত্র নামধারী এ সংগঠনের কার্যকলাপ সম্পর্কে বলেছেন, ‘তারা হচ্ছে তালেবান মানসিকতার গুণ্ডা এবং অবিলম্বে তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে। তা না হলে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্ব রক্ষা করা অসম্ভব হবে।’ মূল সংগঠন জামায়াতে ইসলামির মতো ইসলামি জমিয়তে তালাবা কট্টর পাশ্চাত্য বিরোধী, জঙ্গিবাদী এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি অসহিষ্ণু। গত বছর জনপ্রিয়তা হ্রাস পাওয়ার আগ পর্যন্ত ছাত্র সংগঠনটি তালেবানের ঘোর সমর্থক ছিল। ইসলামি জমিয়তে তালাবার সদস্যরা সঙ্গীতের ক্লাসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে,পাশ্চাত্যের কোমল পানীয় নিষিদ্ধ করার পক্ষে এবং বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মেয়েদের সঙ্গে কথা বললে কিংবা তাদের পাশে বসলে ছাত্রদের মারধর করে। শিক্ষকরা ইসলামি জমিয়তে তালাবাকে ফ্যাসিবাদী হিসাবে আখ্যায়িত করছেন এবং অভিযোগ করছেন যে, প্রতিটি সরকার তাদের কার্যকলাপ এড়িয়ে গেছে। ইসলামি জমিয়ত তালাবা আগ্রাসী মন-মানসিকতা পোষণ করলেও তারা সংখ্যায় মুষ্টিমেয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তাদের জনপ্রিয়তা হ্রাস পাচ্ছে। তবে তারা তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ইসলামকে ব্যবহার করছে এবং তাদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণকারীদের তারা ইসলাম বিরোধী হিসাবে অ্যাখায়িত করছে। রক্ষণশীল দেশ পাকিস্তানে ধর্মকে ব্যবহার করার কৌশল কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। ইসলামি জমিয়ত তালাবার সদস্যদের সঙ্গে মানবাধিকার নিয়ে কথা বলা শক্ত। মানবাধিকার নিয়ে কথা বলতে গেলে কোরআনের উদ্ধৃতি দিতে হয়। নয়তো তাদের সঙ্গে কথা বলা যায় না। ইসলামি জমিয়ত তালাবার এ ধরনের আচরণের একটি ঐতিহাসিক পটভূমি রয়েছে।
আশির দশকে আমেরিকার সমর্থনপুষ্ট সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল মোহাম্মদ জিয়াউল হক নিজের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় ছাত্র সংগঠনগুলোকে তৎপরতা চালানোর সুযোগ দিয়েছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামি জমিয়ত তালাবা নিজেদের অবস্থান মজবুত করে নেয়। পাকিস্তানের মতো দেশে ক্ষমতার জন্য চাই অর্থ ও সম্পদ। গ্রুপটির কাছে এ দু’টিই রয়েছে। শিক্ষক ও ছাত্রদের মধ্যে তারা প্রচুর সমর্থক সৃষ্টি করায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাদের বহিষ্কার করা কঠিন। গ্রুপটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সমান্তরাল প্রশাসন কায়েম করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে তারা ৫টি অঞ্চলে ভাগ করেছে। প্রতিটি অঞ্চলের জন্য রয়েছে একজন নাজিম বা মেয়র। ছাত্রাবাসগুলো হচ্ছে তাদের অভয়ারণ্য। নাজিমগণ ছাত্রাবাসগুলোতে ছাত্রদের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে। গ্রুপের কর্মীরা কোরআনের ওপর আলোচনার আয়োজন করে এবং এভাবে কর্মী রিক্রুট করে। গ্রুপটি শক্তিশালী হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দুর্বল। ছাত্রাবাসে প্রবেশের জন্য পরিচয়পত্র দেখাতে হয়। কিন্তু পরিচয়পত্র তদারকি করার কোনো গরজ নেই। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের জন্য আলাদা হল রয়েছে। সেখানেও ইসলামি জমিয়ত তালাবার কর্তৃত্ব। বিশ্ববিদ্যালয়ে অজনপ্রিয় হলেও কর্মী রিক্রুটমেন্টে গ্রুপটি কোনো বাধার মুখোমুখি হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত ছাত্ররা লাজুক। তারা গ্রামের অস্বচ্ছল ঘরের ছেলেমেয়ে। গ্রুপটি ছাত্র-ছাত্রীদের আর্থিক দৈন্যতার পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করছে। তারা অস্বচ্ছল ছাত্রদের পড়াশোনার ব্যয় ভার বহনে সহায়তা করে। টিউশনি যোগাড় করে দেয়।
ইসলামি জমিয়ত তালাবার এসব কর্মকান্ডে শিক্ষকরা পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ। অতীতে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন ছাত্র নোবেল পুরস্কার বিজয়ের গৌরব অর্জন করলেও এখন আর সে পরিবেশ নেই। ইসলামি জমিয়ত তালাবার অন্যতম নেতা নাদিম আহমদ শিক্ষককে লাঞ্ছিত করার ঘটনার নিন্দা করে বলেছেন, ‘অভিযুক্ত ছাত্রদের সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।’ তবে তিনি গ্রুপটিকে ‘শান্তিপ্রিয়’ হিসাবে দাবি করেছেন। তিনি আরো দাবি করেছেন, জমিয়ত তালাবা নবীনবরণ এবং বইমেলার মতো নির্দোষ কর্মকান্ড পরিচালনা করে। অন্যদিকে শিক্ষক ও ছাত্ররা বলছে যে, ক্ষমতায় যাওয়াই গ্রুপটির মূল লক্ষ্য এবং ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তারা সহিংতার আশ্রয় নিচ্ছে। প্রতিশোধমূলক হামলার আশংকায় একজন শিক্ষিকা তার পূর্ণ নাম গোপন রেখে শুধুমাত্র ‘মিসেস তায়েব’ পরিচয় দিয়ে বলেছেন, তিনি দু’টি ক্রীড়ানুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। কিন্তু এ ছাত্র সংগঠনের সদস্যরা অনুষ্ঠান দু’টি ভণ্ডুল করে দেয়। একটি অনুষ্ঠানে তার দিকে চেয়ার ছুঁড়ে মারা হয়েছিল। সম্প্রতি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে সঙ্গীত বিভাগ খোলা হয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো ক্লাস নেয়া সম্ভব হয়নি। জঙ্গি ছাত্ররা সঙ্গীতকে পাপ বলে গণ্য করে। সংক্ষেপে ‘নাজিয়া’ নামে পরিচয়দানকারী আরেকজন তরুণ শিক্ষিকা ইসলামি জমিয়ত তালাবাকে শিক্ষকদের জন্য একটি হুমকি হিসাবে অভিহিত করে বলেছেন, ‘তাদের তৎপরতায় শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষুণœ হচ্ছে।’ লাঞ্ছিত শিক্ষক ইফতেখার বালুচ জমিয়ত তালাবার বিরুদ্ধে একটি শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেছেন। তিনি তার ওপর হামলার মূল হোতার নাম প্রকাশ করেছেন। তার নাম ওসমান আশরাফ। ভূতত্ত্ব বিভাগের স্নাতক শ্রেণীর ছাত্র ওসমানের ছবি ক্যাম্পাসের প্রতিটি বিভাগে টাঙ্গিয়ে দেয়া হয়েছে। তার অপকর্মের অভিযোগ করে অনেকে অধ্যাপক ইখতেখারের কাছে দরখাস্ত করছে। ছাত্রের হাতে লাঞ্ছিত শিক্ষক ইফতেখার বালুচ বিশ্বাস করছেন, তার ওপর হামলা হওয়ায় জমিয়ত তালাবার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হচ্ছে এবং এ ঘটনা গ্রুপটিকে রুখে দাঁড়াতে সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করবে। তিনি মনে করেন, দেরিতে হলেও সত্যের জয় একদিন হবেই। তবে অন্য শিক্ষকরা তত আশাবাদী নন। এপ্রিলের শেষদিকে ইফতেখার বালুচের ওপর হামলাকারীদের কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হলেও মূল হোতা আশরাফ গ্রেফতার হয়নি। এছাড়া ক্যাম্পাসে গ্রুপটির শীর্ষ নেতা হলো একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদের তনয়।
সূত্র: দৈনিক সংগ্রাম

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

