সবাই যখন নতুন জামাকাপড় পরে নতুন বই নিয়ে নতুন শ্রেণীতে পড়ালেখা ও সহপাঠীদের সাথে হাসি আর আড্ডায় ব্যস-। ছোট ফুটফুটে চেহারার এই মেয়েটি মলিন মুখ নিয়ে স্কুলের গাছ ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। তার নাম সুদিপ্তা। তার দু’চোখ গড়িয়ে পানি পড়ছে। কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতেই কান্নার শব্দ আরো বেড়ে যায়। একটু পরে সে চোখ মুছে বলে, স্যারেরা আমাকে স্কুলে ভর্তি করে নিচ্ছেন না। কেন তোমার টাকার অভাব? প্রশ্ন করতেই সে বলে, না আমার পিতার টাকার কোনো অভাব নেই। বিষয়টি নিয়ে রহস্য আরো বেড়ে যায়। স্কুলের শিক্ষকদের সাথে কথা বললেই বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
স্কুলের ম্যানেজিং কমিটিতে ঢোকার পথ বন্ধ করতেই রীতিমতো রেজুলেশন করে সুদিপ্তার ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তির ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ম্যানেজিং কমিটি। এমনকি তাকে ভর্তি না করার সিদ্ধান- সংবলিত রেজুলেশনের কপি পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে শিক্ষাবিষয়ক সব দফতরে। স্কুলে প্রায় প্রতিদিনই ভর্তিকার্যক্রম চলছে। অথচ সুদিপ্তার ভর্তির কোনো সুযোগ নেই। বিস্ময়কর এই ঘটনাটি ঘটেছে মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলা ধুলজোড়া চুড়ারগাতি স্কুলে। গত শনিবার বেলা ১১টায় সরেজমিন স্কুলে গিয়ে এ তথ্য জানা গেছে।।
জানা গেছে, এ স্কুলের জমিদাতা হিসেবে দীর্ঘ দিন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ছিলেন ডা: সুখময় বিশ্বাস। পরে সভাপতি হন তার ছেলে সুদিপ্তার বাবা দিপুল চন্দ্র বিশ্বাস। স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির ধারণা, সুদিপ্তা ভর্তি হলে তার বাবা দিপুল চন্দ্র বিশ্বাস অভিভাবক সদস্য হিসেবে আবার ম্যানেজিং কমিটির সদস্য হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে আটকে যেতে পারে স্কুলের প্রধান শিক্ষকের জামাতা শ্রীকান- বিশ্বাসের প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্তি। ঘটনার অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্কুলের বর্তমান প্রধান শিক্ষক শানি-রাম মিত্রের চাকরির মেয়াদ আছে আর মাত্র চার মাস। তিনি চাইছেন অবসরে যাওয়ার আগে একই স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক বাবুখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শ্রীকান- বিশ্বাসকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে যেতে। আর সেটা বর্তমান ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমেই। যেহেতু এই কমিটির মেয়াদ আছে মাত্র দুই মাস। সে কারণে সুদিপ্তা স্কুলে ভর্তি হলে পরে যে ম্যানেজিং কমিটি হবে সেখানে তার বাবা অভিভাবক হিসেবে যদি সদস্যপদ পায় কিংবা অতীতের মতো ম্যানেজিং কমিটির শীর্ষ কোনো পদে আসীন হন। তাহলে সেক্ষেত্রে তার ইচ্ছা পূরণ নাও হতে পারে। মূলত এ কারণেই সুদিপ্তার ভর্তি নিয়ে এ ধরনের ষড়যন্ত্র চলছে।
সুদিপ্তার মা বাবুখালী ইউপি সদস্য অঞ্জলী রানী এ প্রসঙ্গে জানান, মেয়ে সুদিপ্তাকে নিয়ে তিনি ঢাকায় ছিলেন। সেখানে মিরপুর ল্যাবরেটরি হাইস্কুল থেকে সুদিপ্তা সমাপনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। এলাকাবাসীর চাপে তিনি ইতোমধ্যে স'ানীয় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংরক্ষিত মহিলা আসনে সর্বাধিক ভোট পেয়ে সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। স'ানীয়ভাবে তারা অনেক আগ থেকে এলাকায় সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। প্রতিটি ভালো কাজের সাথেই তারা থাকেন। পাশাপাশি অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতিবাদ করেন। তার স্বামী ওই স্কুলে সভাপতি থাকাকালীন সব ধরনের অনিয়মের বিপক্ষে থাকতেন। পাশাপাশি জোর করে চাপিয়ে দেয়া কোনো সিদ্ধান- মেনে নিতেন না। যে কারণে বর্তমান ম্যানেজিং কমিটি তাকে ভয় পাচ্ছে। পাশাপাশি তার মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করছে না। অথচ তাদের এই সিদ্ধান- সম্পূর্ণ অবৈধ।
সুদিপ্তার বাবা দিপুল চন্দ্র বিশ্বাস একই মত পোষণ করে বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান- তারা নিতে পারেন না। আমার অবুঝ মেয়েটা প্রতিদিনই স্কুলের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। যদি বিরোধ থাকে আমাদের সাথে আছে। আমার নিষ্পাপ মেয়ের সাথে তাদের কিসের বিরোধ। আমার মেয়ের জন্য চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে সবাই সুপারিশ করেছে। কিন' তারা কোনো কথাই শুনছেন না।
কথা প্রসঙ্গে বাবুখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান বাকি মিয়া বলেন, আমার ৭৫ বছরের ব্যক্তিজীবনে এই ধরনের নির্দয় সিদ্ধান- কোনো স্কুলকে নিতে দেখিনি। কিসের জোরে তারা এসব করছেন বুঝতে পারছি না। আমি নিজে সুপারিশ করেছি। চারজন ইউপি সদস্য অনুরোধ পাঠিয়েছে। তবু প্রধান শিক্ষক তাকে ভর্তি করছেন না।
এ ব্যাপারে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার রুহুল আমিন খান বলেন, আমি এসংক্রান- একটি রেজুলেশন হাতে পেয়েছি। যেখানে সুদিপ্তা নামে ওই মেয়েটির প্রতিবন্ধকতা হিসেবে বাবাকে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের অজুহাতে কোনো শিশুকে তার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার এখতিয়ার কারো নেই। বিষয়টি সম্পর্কে দ্রুত তদন- করে ওই শিক্ষার্থীর ভর্তি নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে চিঠি ও মহম্মদপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে স্কুলের প্রধান শিক্ষক শানি-রাম মিত্র বলেন- ‘এটি ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান-। আমাকে সবাইকে নিয়ে চলতে হয়। স্কুলে ভর্তি তো আর ইচ্ছে হলে হওয়া যায় না। সুদিপ্তার বাবা খুবই ভয়ঙ্কর মানুষ। তার মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করলেই সে এখানে এসে ঝামেলা করবে।
এ বিষয়ে ভর্তিচ্ছ শিক্ষার্থী সুদিপ্তা জানায়, পাড়ার সবাই যখন স্কুলে যায় তখন স্কুলে যেতে না পেরে তার খুব কান্না আসে। এ কারণে সে বাড়িতে থাকতে পারে না। প্রতিদিনই স্কুলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকে।
এ বিষয়ে মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোহাম্মদ সামছুদ্দৌজা বলেন, সুদিপ্তার ভর্তি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দেয়া হয়েছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


