প্রেক্ষাপট: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
আগস্ট ১৯৯৭ য়ের মাঝামাঝি আমাদের স্নাতক ১ম বর্ষের ক্লাশ শুরু হয়। ১৫ দিন না গুজরাতেই ৩রা সেপ্টেম্বর যথারীতি গোলমাল শুরু হল। সকাল থেকেই এটা ওটা কানে আসছে। পত্রিকার ভাষায় পরিস্থিতি থমথমে, টানটান উত্তেজনা, গোলাগুলি, ধাওয়া, পাল্টা ধাওয়া, পুলিশ, ক্যাডার ইত্যাদি। লীগের ২ জন, শিবিরের ১ জন মারা গেছে..ভার্সিটি বন্ধ হবে এসব গুজব দিনভর তটস্থ রাখল সবাইকে। সন্ধ্যাবেলায় মোটামুটি পরিস্কার খবর এল- আমিনুল ইসলাম বকুল নামে শিবিরের, মতান্তরে লীগের, মতান্তরে দলের, মতান্তরে তবলীগের এক ছেলে মারা গেছে। রাত ১০ টার মধ্যেই কাংখিত সে সংবাদ এসে গেল। অনির্দ্দিস্ট কালের বন্ধ। ফার্স্টইয়ারের কচিরা এতে টেনশন বোধকরলেও, পুরানা বড়ভাইরা দেখলাম নিশ্চিন্ত মনে বিড়ি ফুকছে! ঘটনা হৈল- ক্যাম্পাসে সেদিন সাকাচৌ এসেছিল, এনিয়ে ছাত্রদলের ২ গ্রুপের ..ফাঁকতালে ছাত্রলীগের আক্রমন শিবিরের উপর ও শিবিরের পাল্টা মাইর। এ ধরনের ভজঘটে কটেজে বসবাসকারী ভৈরবের ছেলে, গনিতের ছাত্র বকুলের উপর গোলাবর্ষন ও মৃত্যু। -অদ্যাবধি এ হত্যাকান্ডের নূন্যতম বিচার হয়নি।
পরের বছর ১৯৯৮ পুরোটাই যুদ্ধ চলল। এপ্রিলের ২৫ ও ২৬ তারিখ ছাত্রলীগ বৃহত্তর চট্টগ্রামের পদাতিক, গোলন্দাজ বাহিনী নিয়ে সর্বাত্নক আক্রমন করল শিবিরের সম্মুখ ঘাটি শাহজালাল ও শাহপরান হলে। ১৯৯০ য়ের পর প্রথম শিবিরের আংশিক পতন হল। রেলস্টেশন থেকে সোহরাওয়ার্দী হলের খাল পর্যন্ত কৌশলগত গুরুত্বপূর্ন এলাকা তাদের হাতছাড়া হয়ে গেল পরবর্তী ৩ বছরের জন্য। ২০০১য়ের ইলেকশন লীগ হারলে রাতারাতিই ছাত্রলীগ পালিয়ে যায় এবং.....। যাহোক, এপ্রিলে শুরু হল শিবিরের অবরোধ। এরই মধ্যে অবরোধ অমান্য করে চবির বাস শহরের উদ্দেশ্য রওনা হলে মাঝপথে ব্রাশফায়ারের পাল্লায় পড়ে। মারা যায় মুশফিকুর নামে এক মেডিক্যাল ছাত্র, তার বাবা চবির শিক্ষক ছিলেন। শিবিরের ব্রাশফায়ারে মুশফিক মারা গেছে মতান্তরে লীগ ফায়ার করে শিবিরকে কালার করেছে (!)- এ তর্ক চলতে লাগল। তবে সত্য হল- মুশফিক নামে এক হবু ডাক্তারকে হত্যা করা হয়েছে এবং অদ্যাবধি কোন বিচার হয়নি।
পরের বছর ১৯৯৯ আরো ঘোলাটে। মে মাসের সম্ভবত: ১৫ তারিখে অর্থনীতির মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়ে হল থেকে বের হবার পর শিবিরের সদস্য যোবায়ের কে লীগের কয়েকজন অপহরন করে। সন্ধ্যার পরপর তার লাশ পাওয়া যায় ক্যাম্পাস সংলগ্ন ধানক্ষেতে। -অদ্যাবধি এ হত্যাকান্ডের কোন বিচার বা তদন্ত কিছুই হয়নি।
একই বছরের ডিসেম্বরে আবার সংঘর্ষ বাধে। লীগ বনাম শিবির। মারা যায় শিবিরের ২ জন রহিম ও আরেকজন। ইতোমধ্যে আমানত হলে শিবির কোনো একদিন রাতে ব্যাপক হামলা করে। মারা যায় আইয়ুব আলী নামক এক বহিরাগত বা মেহমান বা সন্ত্রাসী বা গাঁজা সরবরাহকারী। তবে সে মানুষ ছিল। -এবং এ হত্যাকান্ডের কোনো বিচার হয়নি।
সন মনে নেই। সে সময়েই সন্জয় তলাপাত্র নামে ছাত্রইউনিয়নের এক কর্মী, সে চারুকলার ছাত্রছিল, তাকে বটতলী রেলস্টেশনে ট্রেনের লোহার সাথে মাথা থেতঁলিয়ে মেরে ফেলে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কোনো একটি গ্রুপ। তার নাকি দাড়ি ছিল এবং ঝগড়া বাধলে কে যেন উস্কে দেয় ব্যাটা শিবির। ব্যাস..। মতান্তরে তাকে শিবিরই মেরেছে বলে বিচার চাইছিল তার স্ব-গোত্রীয় লোকেরা। -যাহোক সন্জয়ের হত্যার বিচারও হয়নি।
আরো এক ছাত্রলীগ কর্মী মারা যায় ক্যাম্পাস থেকে অদুরে নাম মনে নেই- প্রেক্ষাপট সেগুন গাছ বিক্রির টাকা ভাগাভাগি নিয়ে কোন্দল। তবে দ্বিমত ও আছে যে ঘটনার সুবাধে শিবিরই তাকে....।- কোনো বিচার হয়নি।
চারবছর মেয়াদি স্নাতক কোর্স (বাস্তবে ৬ বছর) শেষ করতে করতে ৮ জন মানুষ নিহত হয়, কোনো দুর্ঘটনা নয় পরিস্কার নির্মম হত্যাকান্ড। কোনো বিচার বা উল্লেখযোগ্য তদন্ত অদ্যাবধি হয়নি, সাজাতো দুরের কথা। অপরাপর ঢাবি, রাবি, ইবি, কৃবির ক্ষেত্রেও সেম কথা প্রযোজ্য।
বলাই যায়, এ এক জায়গায় নিশ্চিন্তে মানুষ খুন করা যায়।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মার্চ, ২০১০ বিকাল ৪:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



