সন্ধ্যার মুখে যখন বিয়ে বাড়ি জমজমাট হঠাৎ টের পেলাম আমি দুপুরে খাইনি । খাওয়ার কথা কেউ বলেওনি । আর এই সময় সবাই এত ব্যস্ত যে--। লক্ষ্য করলাম বাড়ি ভর্তি সব প্রায় অচেনা । বড়পিসি ছাড়া অন্য দুই পিসি যে কে কোথায় কে জানে ! তার মধ্যে এসে গেছে বর এবং বরযাত্রী।
সারাদিন অনবরত ফাই ফরমাস খাটার জন্য এবং অধিকাংশ সময়টাই বাইরে বাইরে যাতায়াতের জন্য এই অবস্থা ! যদিও ভাবার মত আর অবস্থা নেই । একে শীত তায় ক্ষিদে--কখন যে ঘরের এক কোনে বেঞ্চিতে গিয়ে শুয়ে পড়েছি মনে নেই । ঘুম যখন ভাঙল দেখি মাথার কাছে মনুকাকু। শুনতে পেলাম বিয়ে বাড়ির আওয়াজ ছাপিয়ে তার গলা ---হারামজাদা শুয়র---সারাবাড়ি তরে খুইজ্যা মরতাছি--আর তুই এইহানে গুমাইতাছস--কাজের বাড়ি---এইডা গুমানির সময়--উড অহনি--দুগ্গামন্ডপ থাইক্যা মাডি আনন লাগব, যা অহনি --
মনুকাকুর এই রূপ আগে কখনো দেখেছি বলে মনে পড়ছেনা । গলা শুনে কেউ কেউ কাছে এলো বটে, কিন্তু সবাই চুপ ।
বিয়ের মাঝ পথে যজ্ঞ হওয়ার কথা । পুরোহিত হঠাৎ মন্ডপের মাটির খোঁজ করতেই জানা গেল যে মন্ডপের মাটি আনা হয়নি । ব্যস্ হুলুস্থুল পড়ে গেল । আর খোঁজ পড়ে গেল আমার ।
যেন একটি ফাউ কাজের ছেলে পাওয়া গেছে । আসলে অনুরুদ্ধ হয়ে যারা আশ্রয় দেয়, পড়াশুনার সুযোগ দেয়, তারা বুঝি এভাবেই পুষিয়ে নেয় । পরবর্তীতে আমার দাদাদের ক্ষেত্রেও এমন অভিজ্ঞতার কথা শুনেছি যে নিয়মিত গরুর ঘাস কাটা, গোয়াল পরিস্কার করা, ছোট বাচ্চা থাকলে তার পরিচর্যা বা নিচের ক্লাসের ছাত্র হলে তাকে পড়াশুনা করানো---সবই করতে হতো । অবশ্য এর বিপরীতও যে শুনি নাই এমন নয় ।
এক সময় হাতে একটি হ্যারিকেন নিয়ে আমি প্রায় মধ্যরাতে বেরিয়ে পড়েছি শুনশান আলোহীন নেত্রকোনা শহরে দুগ্গামন্ডপের মাটির জন্য । বেরোনোর সময় কানে এলো, মনে হলো কোনো বরযাত্রীর কথা হবে,---এই এত রাইতে এই পোলাডারে ফাডাইতাছুইন ?
যেতে যেতে শীতের হাওয়ার ঝাপ্টায় বিহ্বল আমি ভুলে গিয়েছিলাম ক্ষিদে তৃষ্ণা ভয় অভিমান সব । শুধু মা'র কথা মনে পড়াতে মাত্র একবারের জন্যই আমি কঁকিয়ে উঠেছিলাম ।
যেতে আসতে আমার সময় লাগলো বেশ । ফিরে খেয়াল করলাম সারা বিয়ে বাড়ি চুপচাপ । বোঝা গেল একটা বিবাদ হয়েছে । তখনো বুঝতে পারিনি বিবাদের কারণ আমি । বুঝতে পারলাম যখন আমাকে ছোট পিসি এসে হাত ধরে ঘরের এক কোনে নিয়ে গেল । বলল----তুই নাহি খাছ্ নাই? আছিলি কই ? আর এই ঠান্ডাডার মইদ্যে তুই খালি পায় ক্যান ? তরে না তর বাপে আইয়া জুতা কিইন্যা দিয়া গেছে ?--------
এমন অজস্র প্রশ্ন । উত্তরে আমি শুধু নাক চোখ মুছে গেছি জামার হাতা দিয়ে । কিন্তু কেউ আমাকে আর খাওয়াতে পারেনি । শুধু বিয়ে শেষ হয়ে যাওয়ার পর বড়পিসি যখন এসে খেতে বলল তখন আর না করতে পারিনি। আসলে তার কনে-সাজ কোনের ঘরের এই আলো আঁধারিতে আমাকে বুঝি অনেকটা তরল করে দিয়েছিল ।
তারপর থেকে কেন জানিনা আমি অনেকটা আদরণীয় হয়ে উঠলাম সবার কাছে। বড় পিসির শ্বশুর বাড়ি গমনে আমাকেই তার সঙ্গী হতে হলো । এটা একটা বেশ সম্মানের ব্যাপার বলেই আমার মনে হলো । কিন্তু ওখান থেকে ফিরতে না ফিরতেই আমার বাড়ি থেকে জরুরী তলব ।
যত যাই হউক, একটা এত বড় বৈবাহিক কর্মকান্ডের অংশীদার হিসেবে আমার ধারণা ছিলো যে বাড়িতে গেলে সবাই আমার কাছে একটা বিবরণী শুনতে চাইবে । কিন্তু কোথায় কী । বাড়িতেও একটা চাপা পরিবেশ । ক'দিন পর মা'র কাছে জানতে চাইলাম যে-- নেত্রকোনা কবে যাবো । এতগুলো নতুন বই সেখানে রয়ে গেছে । স্কুলও খুলে গেছে ।
কিন্তু ক্রমশঃ যা শুনতে পারলাম তাতে আমার পড়া এবারের মত বন্ধ । মনুকাকুর বাড়িতে আমাকে আর রাখবেনা । সেখানে এখন থেকে বড়পিসির দেওর থেকে পড়াশুনা করবে । বিয়ের নাকি এটা একটা শর্ত ছিলো । নবীন এই আত্মীয়তার কাছে হেরে গিয়ে আমার মা যেন কিছুটা বিমর্ষ
তাহলে প্রিয় নেত্রকোনায় কি আমি আর যেতে পারবোনা ? দত্ত হাই স্কুল, মনতোষ, সিনেমা দেখা-----আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না । তাই মা'কে প্রায়শঃই জ্বালাতন করি নেত্রকোনা যাওয়া নিয়ে । পাশ করা সত্ত্বেও শুধু থাকার জায়গার অভাবে বছরটা নষ্ট হচ্ছে ---মা এটা একদম মানতে পারছিলেননা । (চলবে)
লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): ফেলে আসা--, ফেলে আসা-- ;

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


