১৯৬৯ এ আমি স্কুল ফাইনাল পাশ করলাম । আগের বছর পাশ করলো ফুলদা । তখন এগার ক্লাসের হায়ার সেকেন্ডারীই বেশী স্কুলে চালু । আর এগুলো ছিলো ভালো স্কুল । কিন্তু কিছু দুস্থ স্কুলও ছিলো যেগুলোতে পুরোনো স্কুল ফাইনাল (দশ ক্লাশের) চালু ছিলো । আমরা দুই ভাই দরিদ্র রিফিউজি হওয়ার কারণে ভর্তি হয়েছিলাম তেমনই এক স্কুলে । অধিকাংশই সেখানে আমাদের মত ছাত্র । যাক্ পড়াশুনোয় ভালো হওয়ার কারণে আমাদের দুই ভাইয়ের স্কুলে খরচ ছিলোনা । তখনকার সময়ে আমাদের এই স্কুলটার রেজাল্ট খুব খারাপ হতো । কেউ জিগ্গেস করলে বলতে পারতামনা । বিভিন্ন স্কুলের ফেল করা ছাত্ররা এসে এখানে ভর্তি হতো । আমার সময়ে মোট ৪২ জন ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে পাশ করেছিলাম মোটে ২ জন, ১জন কম্পার্টমেন্টাল । আমার রেজাল্ট ভালো হওয়া সত্তেও স্কুলের বাকি রেজাল্ট কেউ জানতে চাইলে বলতাম 'ঠিক জানিনা '।
কিন্তু পাশ করা সত্তেও কলেজে যাওয়ার আগ্রহ নেই । সংসারে অনটন এতটাই তীব্র যে দুই ভাইকে একসংগে কলেজে পড়ানোর সামর্থ বড়দার নেই । দিনকয় কেটে যাওয়া সত্তেও কলেজে ভর্তির ব্যাপারে কারোর কোনো উচ্চবাচ্য নেই দেখে আমার কিছুটা অভিমানও হলো । কী করবো বুঝতে পারছিনা যখন তখন আমার এক ফেল করা সহপাঠি খবর দিলো যে আই টি আই ট্রেনিংএর জন্য শিলিগুড়ি কোর্টের রিফিউজি ডিপার্টমেন্টে লোক নিচ্ছে । থাকা খাওয়া ফ্রি । ট্রেনিং শেষে চাকরি । কোথায় আই টি আই ? না মধ্যপ্রদেশ, রায়পুর । আমার তো হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো অবস্থা । গিয়ে নাম লিখিয়ে ফেললাম তাড়াতাড়ি । অতঃপর সগর্বে বাড়িতে জানিয়েও দিলাম ।
দিন কয়েক পরেই আমরা শিলিগুড়ির জনা পনের জন ছেলে একজন অফিসারের তত্ত্বাবধানে রওনা হয়ে গেলাম রায়পুরের উদ্দেশ্যে । অফিসার আমার কাগজপত্র দেখে আমাকে একফাঁকে বলেও ফেললেন"তুমি বাপু এদের সংগে কেন? এত সুন্দর রেজাল্ট--কলেজে না পড়ে আই টি আই পড়তে যাচ্ছ "! আমি মাথা নিচু করে শুনে গেলাম । উত্তর দিইনি ।
আমাদের আই টি আই যেখানে সে জায়গাটার নাম "মানা ক্যাম্প" । রায়পুর রেল স্টেশন থেকে মাইল তিনেক দূর । জায়গাটা বর্তমানে 'ছত্তিশগড়' রাজ্যে পড়ে । এই অংশটুকুর অবতারনাও আমার মানা ক্যাম্প সম্পর্কে বলার জন্য ।
সন্ধ্যাবেলার দিকে বোম্বে মেইল থেকে রায়পুর স্টেশনে সময়মতোই নামলাম আমরা । আমাদের নামিয়ে বোম্বে মেইল চলে গেল । নেমে আমরা সব এক জায়গায় জড়ো হলাম । সংগের অফিসার বললেন -'বাইরে গাড়ি আছে, সবাই এক এক করে গাড়িতে গিয়ে উঠবে'। সত্যি বাইরে বেরিয়ে দেখলাম একটা মিলিটারি ছাউনি দেয়া ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে । গায়ে ঝুলানো বোর্ডে লেখা "মানা ক্যাম্প" । আমরা তাতে উঠে বসলাম মালপত্র নিয়ে । মালপত্র বলতে যার যার ব্যাগ, টিনের বাক্স । আমারটা নতুন কেনা ফুল তোলা টিনের বাক্স । দামে সস্তা । অফিসার ড্রাইভারের পাশে বসলেন । গাড়ি চলতে শুরু করলো । আমরাও যথেচ্ছ হৈ চৈ শুরু করে দিলাম । রায়পুর শহর পার হয়ে কিছুটা যাওয়ার পরই লক্ষ্য করা গেল যে বিস্তির্ণ রুক্ষ প্রান্তর । আমাদের গ্রাম বাংলার সংগে কোনো মিল নেই ।
দেখতে দেখতে চলে এলো মানা ক্যাম্প । এতদিন আমাদের ধারণা ছিলো মানা ক্যাম্প মানে পুলিশ বা মিলিটারির কোনো ক্যাম্প হবে হয়তো । কিন্তু দেখা গেল বিশাল রুক্ষ প্রান্তরের মাঝে এটা একটা রিফিউজি ক্যাম্প । বাসিন্দারা সকলেই পূর্ববঙ্গ থেকে আগত । মনে মনে ভাবলাম আমার মতো । শিলিগুড়িতে বড়দা না থাকলে আমাদেরও হয়তো বলা যায়না এখানে চলে আসতে হতো । ক্যাম্প মানেই সেই দুধনৈতে দেখা ক্যাম্পের মতোই । তবে এটা শুকনো যায়গা । একই রকম ব্যারাক । এক একটা ব্যারাকে দশটা বারটা করে পরিবার । তবে মানতে হবে এই ক্যাম্প অনেক উন্নত । দেখে যতটুকু মনে হয় মানুষজন কিছুটা ভালো আছে ।
আমাদের ক্যাম্পে রেখে একদিন পর সেই অফিসারটি ফিরে গেলেন । যাওয়ার আগে আমাদের হোস্টেল এসে সবার সংগে দেখা করে গেলেন । এত ভালো মানুষ অফিসার পরবর্তী জীবনে খুব কম দেখেছি ।
হোস্টেল মানে আমাদেরও সেই ব্যারাক । লম্বা । অন্ততঃ গোটা চল্লিশ ছাত্র থাকতে পারে । দু পাশে সারি করে তক্তপোশ পাতা । নিজের নিজের বিছানা পেতে তাতে শুয়ে পড়ো । দুবেলা খাওয়া । নিরামিষ । ভাত ডাল সবজি । ডাল বলতে টক ডাল । কারণ হোস্টেলে প্রায় হাজার স্টুডেন্টের মধ্যে শ'তিনেকের মতো দক্ষিণভারতীয় ছিলো । ওরা সব ব্রহ্মদেশের উদ্বাস্তু । ওদের জন্য টক ডাল, যাকে 'সম্বারা' বলতো । সবজি বলতে কুমড়োর ঘ্যাঁট একটা । আর এই বিশেষ কুমড়োগুলো দন্ডকারণ্যের । বিশাল আকৃতির হতো । সকালে জলখাবারও দিত। এক বাটি চিঁড়ে সংগে এক দলা গুড় । এটা অনেকেই নিতো না । কিন্তু ঘুম থেকে উঠেই আমার খিদে পেত । তাই আমি ওটা খেতাম রোজ জলে ভিজিয়ে ।
যদিও এই প্রথম বাংলার বাইরে পা' রাখা তবু মানা'কে একটা ছোট্ট পূর্ববঙ্গ বলেই মনে হতো । ফলে অচেনা ভাষা বা অচেনা প্রকৃতি জনিত কষ্ট কিছুটা লাঘব হয়ে গিয়েছিলো ।(ক্রমশঃ)
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা মে, ২০০৯ বিকাল ৫:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


