somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ফিরে দেখা আতুঁড় ঘর/২

০৩ রা মে, ২০০৯ বিকাল ৫:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১৯৬৯ এ আমি স্কুল ফাইনাল পাশ করলাম । আগের বছর পাশ করলো ফুলদা । তখন এগার ক্লাসের হায়ার সেকেন্ডারীই বেশী স্কুলে চালু । আর এগুলো ছিলো ভালো স্কুল । কিন্তু কিছু দুস্থ স্কুলও ছিলো যেগুলোতে পুরোনো স্কুল ফাইনাল (দশ ক্লাশের) চালু ছিলো । আমরা দুই ভাই দরিদ্র রিফিউজি হওয়ার কারণে ভর্তি হয়েছিলাম তেমনই এক স্কুলে । অধিকাংশই সেখানে আমাদের মত ছাত্র । যাক্‌ পড়াশুনোয় ভালো হওয়ার কারণে আমাদের দুই ভাইয়ের স্কুলে খরচ ছিলোনা । তখনকার সময়ে আমাদের এই স্কুলটার রেজাল্ট খুব খারাপ হতো । কেউ জিগ্‌গেস করলে বলতে পারতামনা । বিভিন্ন স্কুলের ফেল করা ছাত্ররা এসে এখানে ভর্তি হতো । আমার সময়ে মোট ৪২ জন ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে পাশ করেছিলাম মোটে ২ জন, ১জন কম্পার্টমেন্টাল । আমার রেজাল্ট ভালো হওয়া সত্তেও স্কুলের বাকি রেজাল্ট কেউ জানতে চাইলে বলতাম 'ঠিক জানিনা '।

কিন্তু পাশ করা সত্তেও কলেজে যাওয়ার আগ্রহ নেই । সংসারে অনটন এতটাই তীব্র যে দুই ভাইকে একসংগে কলেজে পড়ানোর সামর্থ বড়দার নেই । দিনকয় কেটে যাওয়া সত্তেও কলেজে ভর্তির ব্যাপারে কারোর কোনো উচ্চবাচ্য নেই দেখে আমার কিছুটা অভিমানও হলো । কী করবো বুঝতে পারছিনা যখন তখন আমার এক ফেল করা সহপাঠি খবর দিলো যে আই টি আই ট্রেনিংএর জন্য শিলিগুড়ি কোর্টের রিফিউজি ডিপার্টমেন্টে লোক নিচ্ছে । থাকা খাওয়া ফ্রি । ট্রেনিং শেষে চাকরি । কোথায় আই টি আই ? না মধ্যপ্রদেশ, রায়পুর । আমার তো হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো অবস্থা । গিয়ে নাম লিখিয়ে ফেললাম তাড়াতাড়ি । অতঃপর সগর্বে বাড়িতে জানিয়েও দিলাম ।

দিন কয়েক পরেই আমরা শিলিগুড়ির জনা পনের জন ছেলে একজন অফিসারের তত্ত্বাবধানে রওনা হয়ে গেলাম রায়পুরের উদ্দেশ্যে । অফিসার আমার কাগজপত্র দেখে আমাকে একফাঁকে বলেও ফেললেন"তুমি বাপু এদের সংগে কেন? এত সুন্দর রেজাল্ট--কলেজে না পড়ে আই টি আই পড়তে যাচ্ছ "! আমি মাথা নিচু করে শুনে গেলাম । উত্তর দিইনি ।

আমাদের আই টি আই যেখানে সে জায়গাটার নাম "মানা ক্যাম্প" । রায়পুর রেল স্টেশন থেকে মাইল তিনেক দূর । জায়গাটা বর্তমানে 'ছত্তিশগড়' রাজ্যে পড়ে । এই অংশটুকুর অবতারনাও আমার মানা ক্যাম্প সম্পর্কে বলার জন্য ।

সন্ধ্যাবেলার দিকে বোম্বে মেইল থেকে রায়পুর স্টেশনে সময়মতোই নামলাম আমরা । আমাদের নামিয়ে বোম্বে মেইল চলে গেল । নেমে আমরা সব এক জায়গায় জড়ো হলাম । সংগের অফিসার বললেন -'বাইরে গাড়ি আছে, সবাই এক এক করে গাড়িতে গিয়ে উঠবে'। সত্যি বাইরে বেরিয়ে দেখলাম একটা মিলিটারি ছাউনি দেয়া ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে । গায়ে ঝুলানো বোর্ডে লেখা "মানা ক্যাম্প" । আমরা তাতে উঠে বসলাম মালপত্র নিয়ে । মালপত্র বলতে যার যার ব্যাগ, টিনের বাক্স । আমারটা নতুন কেনা ফুল তোলা টিনের বাক্স । দামে সস্তা । অফিসার ড্রাইভারের পাশে বসলেন । গাড়ি চলতে শুরু করলো । আমরাও যথেচ্ছ হৈ চৈ শুরু করে দিলাম । রায়পুর শহর পার হয়ে কিছুটা যাওয়ার পরই লক্ষ্য করা গেল যে বিস্তির্ণ রুক্ষ প্রান্তর । আমাদের গ্রাম বাংলার সংগে কোনো মিল নেই ।

দেখতে দেখতে চলে এলো মানা ক্যাম্প । এতদিন আমাদের ধারণা ছিলো মানা ক্যাম্প মানে পুলিশ বা মিলিটারির কোনো ক্যাম্প হবে হয়তো । কিন্তু দেখা গেল বিশাল রুক্ষ প্রান্তরের মাঝে এটা একটা রিফিউজি ক্যাম্প । বাসিন্দারা সকলেই পূর্ববঙ্গ থেকে আগত । মনে মনে ভাবলাম আমার মতো । শিলিগুড়িতে বড়দা না থাকলে আমাদেরও হয়তো বলা যায়না এখানে চলে আসতে হতো । ক্যাম্প মানেই সেই দুধনৈতে দেখা ক্যাম্পের মতোই । তবে এটা শুকনো যায়গা । একই রকম ব্যারাক । এক একটা ব্যারাকে দশটা বারটা করে পরিবার । তবে মানতে হবে এই ক্যাম্প অনেক উন্নত । দেখে যতটুকু মনে হয় মানুষজন কিছুটা ভালো আছে ।

আমাদের ক্যাম্পে রেখে একদিন পর সেই অফিসারটি ফিরে গেলেন । যাওয়ার আগে আমাদের হোস্টেল এসে সবার সংগে দেখা করে গেলেন । এত ভালো মানুষ অফিসার পরবর্তী জীবনে খুব কম দেখেছি ।

হোস্টেল মানে আমাদেরও সেই ব্যারাক । লম্বা । অন্ততঃ গোটা চল্লিশ ছাত্র থাকতে পারে । দু পাশে সারি করে তক্তপোশ পাতা । নিজের নিজের বিছানা পেতে তাতে শুয়ে পড়ো । দুবেলা খাওয়া । নিরামিষ । ভাত ডাল সবজি । ডাল বলতে টক ডাল । কারণ হোস্টেলে প্রায় হাজার স্টুডেন্টের মধ্যে শ'তিনেকের মতো দক্ষিণভারতীয় ছিলো । ওরা সব ব্রহ্মদেশের উদ্বাস্তু । ওদের জন্য টক ডাল, যাকে 'সম্বারা' বলতো । সবজি বলতে কুমড়োর ঘ্যাঁট একটা । আর এই বিশেষ কুমড়োগুলো দন্ডকারণ্যের । বিশাল আকৃতির হতো । সকালে জলখাবারও দিত। এক বাটি চিঁড়ে সংগে এক দলা গুড় । এটা অনেকেই নিতো না । কিন্তু ঘুম থেকে উঠেই আমার খিদে পেত । তাই আমি ওটা খেতাম রোজ জলে ভিজিয়ে ।

যদিও এই প্রথম বাংলার বাইরে পা' রাখা তবু মানা'কে একটা ছোট্ট পূর্ববঙ্গ বলেই মনে হতো । ফলে অচেনা ভাষা বা অচেনা প্রকৃতি জনিত কষ্ট কিছুটা লাঘব হয়ে গিয়েছিলো ।(ক্রমশঃ)
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা মে, ২০০৯ বিকাল ৫:৩৪
১০টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×