somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আঁতুর ঘর ফিরে দেখা/৬

০৯ ই মে, ২০০৯ রাত ১২:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১৯৭০ সাল । বিশ শতকের বাঙালিদের ইতিহাসে এই সালটি একটি মাইল স্টোন বিশেষ । আর ঐ সময় বয়সটা যাদের জটিল তারুণ্যের তাদের কাছে সন'টা আরো এক বিশেষ তাৎপর্য্যের । কারণ বস্তুগত ভাবে পৃথিবীকে জানার চেনার পর্বটি শুরু হয় সেই শৈশবেই, আর বিষয়গত ভাবে পৃথিবীটাকে জানার পর্বটি শুরু হয় এই তারুণ্যেই । এই বয়সেই তৈরী হয় অজানাকে জেনে ফেলার, ধরে ফেলার এক অপ্রতিরোধ্য খিদে । ফলে আহত বিক্ষিপ্ত হওয়ার কালটা এই তারুণ্যেই বেশী ।

এই ১৯৭০ সালেই পৃথিবীর ইতিহাসে বিভক্ত দুই বাংলা দুটি পৃথক লড়াইয়ে অবতীর্ণ । একটি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম-যুদ্ধ । অন্যটি একটি বিপ্লব প্রয়াস । দুটিই সশস্ত্র অভ্যুত্থান । কালক্রমে একটি সফল । স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের মধ্য দিয়ে । অন্যটি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে রাস্ট্র- শক্তির হাতে ।

এইরকম একটি সময়ে আমি আমার কিছুটা রং চটে যাওয়া ফুল তোলা টিনের বাক্সটি নিয়ে ফিরে এলাম শিলিগুড়ি । এই এক বছরে যেন আমার অনেক বয়স বেড়ে গেছে । তারুণ্যের নমনীয়তা পেছনে ফেলে ততদিনে কিছুটা রূঢ় যুবক হয়ে পড়েছি । সেই বছরেই ভর্তি হয়ে গেলাম কলেজে । একই কলেজে ফুলদার তখন ডিগ্রি সেকেন্ড ইয়ার । ভর্তির পর আমাকে সে পই পই করে বোঝালো কলেজ এবং শহরের পরিস্স্থিতি । আমি যেহেতু নিজেকে তখন বেশ অভিজ্ঞ মনে করছি তাই ফুলদার কথায় বিশেষ গুরুত্ব দিলাম না ।

প্রথম প্রথম কলেজে যাওয়া ক্লাস করা ঠিক মতো চললেও কিছুদিনের মধ্যেই দেখলাম কলেজে প্রায়শঃই কোনো না কোনো বিষয় নিয়ে গোলমাল , মারামারি, বন্দ্‌-ইত্যাদি শুরু হয়ে গেল । এত গুন্ডা মস্তান কলেজে পড়ে? পরে জানলাম কলেজের ছাত্র নয় এমন অনেক গুন্ডা মস্তান কলেজটাকেই তাদের লীলা ক্ষেত্র করে ফেলেছে । সুবিধে হলো তখনও বিনা নোটিশে কলেজে পুলিশ ঢুকতে পারেনা । ফলে যায়গাটা তাদের কাছে বেশ নিরাপদ । তখনকার শিলিগুড়ি শহরে যেহেতু একটাই কলেজ ছিলো তাই ভিড় সামলাতে সেটা তিন সিফ্‌টে চলতো । মর্নিং ডে এবং ইভ্‌নিং । ইভ্‌নিং এর অবস্থা তখন আরো খারাপ । ক্লাসে ক্লাসে অনেক আর্মড স্টুডেন্ট থাকতো । তারা পড়াশুনার চেয়ে বেশী রাজনীতি করতো । তাদের মধ্যে অনেকেই নক্সাল রাজনীতির কর্মী ছিলো ।

এতদিন আমরা দূর থেকে রাজ্যটার বিষয়ে জানতে পারছিলাম । এবার একেবারে চাক্ষুষ । মাঝে মাঝে প্রায় আমাদের ঘাড়ের উপরও পড়ছে পুলিশের হাত । খবরের কাগজে প্রতিদিন খুনের খতিয়ান । কোন জেলায় কত খুন। বাইরের দু'একটা রাজ্যেও এমন খবর কিছু তৈরী হচ্ছে । কিন্তু আমাদের রাজ্যে সর্বত্র । দেয়ালে দেয়ালে বিপ্লবের ডাক । আন্ডারগ্রাউন্ড সাংগঠনিক কাজ । কোথায় কখন কি হবে বোঝার উপায় নেই । নিয়ম করে কলেজে যাই । গিয়েই শুনি কাল রাতে অমুককে পুলিশে তুলে নিয়ে গেছে । কলেজ বন্দ । অমুককে তিনদিন পাওয়া যাচ্ছেনা । কলেজ হরতাল । ঐ সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়া মানে মৃত্যুর মুখোমুখি থাকা । অথচ সেই সময় একদিন শুনলাম কলেজে আমাদের সারাক্ষণের সঙ্গী শিবাজী কে ভোর রাতে পুলিশ তুলে নিয়ে গেছে । সবচেয়ে নিরিহ, রামকৃষ্ণ মিশনে পড়া ছেলে শিবাজী কে কেন তুলল ---আমরা বিভ্রান্ত এবং আতংকিত । যতদূর জানি শিবাজীর একটি ছোট বোন আছে । মা বিধবা । নার্সিং হোমে আয়ার কাজ করে সংসার চালায়, ছেলেকে পড়ায় । আমার স্কুল জীবনের সহপাঠিও সে ।

পরিস্থিতি ক্রমে আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে । এবার শুনছি খুন । আজ মানস খুন হচ্ছে ত কাল খুন হচ্ছে রঞ্জন । আর একটু একটু করে বুক ভাঙছে আমাদের । আমরা যারা এই রাজনীতির আবর্তে পড়ে গেছি, অথচ জানিনা এর উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য কোনোটাই । এই বিবদমান মূল তিনটি দল হলো একটি মার্কসবাদী কম্যুনিস্ট, একটি মাওবাদী কম্যুনিস্ট এবং আর একটি তখনকার জাতীয় কংগ্রেস । সেই সময় এই তিন দলের সমীকরণ সাজানো ভীষণ কঠিন হয়ে পড়েছিলো । ছোট্ট করে বললে বলা যায় ভারতে বিপ্লবের স্বপ্ন দেখা পার্টি ছিলো কম্যুনিস্ট পার্টিই । বিপ্লবের পথ ও পন্থার প্রশ্নেই তারা প্রথম ভাগ হয় । তারপর ১৯৬৪ সনে তারা আবার ভাগ হয় । এবারের ভাগ হওয়ার মধ্যে অন্যতম বিষয় ছিলো সশস্ত্র বিপ্লব । ভাগ হওয়া একটা অংশই হলো মাওবাদী কম্যুনিস্টদের দল । তারা ১৯৬৭ সনেই শিলিগুড়ির কাছে নক্সালবাড়িতে সশস্ত্র বিপ্লবের সূচনা করে । ক্রমে এই দল তার ডালপালা ছড়িয়ে দেয় সারা প:বঙ্গে এবং অন্যান্য কয়েকটি রাজ্যে ।
ষাট/সত্তর দশকে রাজনীতি বলতে এই ধরণের বাম রাজনীতিই আমরা বুঝতাম । সেই বয়সে যেমন মার্কসবাদ আমি পড়িনি তেমনি পড়িনি বিপ্লবের ম্যানিফেস্টো । পড়েছি সে সব অনেক পরে । তথাপি শোষিত মানুষের কথা বিপ্লবের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পাবে --ক্রমে শোষণ মুক্তি ঘটবে ---এই আশায় এই সব রাজনৈতিক তৎপরতার প্রতি আমাদের একটা নীরব সহানুভুতি, সমর্থন তৈরী হতে লাগলো । (ক্রমশঃ)




২টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×