somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ফিরে দেখা আঁতুড় ঘর/১৭

০৯ ই জুন, ২০০৯ রাত ১০:৩৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

নেত্রকোনা স্টেশনে আসতে আসতে নেমে গেল সন্ধ্যারাত । ফিরে দেখা --- বলতে প্রকৃত অর্থে বোধহয় এখান থেকেই শুরু হলো । ভীড়ে ঠাসা স্টেশন, তবু যেন আঁতিপাতি করে খুঁজছি কই সেই ইস্টিশনটা কই । রাতে তেমন বোঝাও যাচ্ছেনা । সেই সময়কার ফাঁকা জায়গাগুলো দেখছি ভর্তি হয়ে আছে দোকানপাটে । ঠাহর করাই মুষ্কিল ।

এই শহরেই আমার বাল্যকালের রঙীন কিছুটা সময়টা রেখে গিয়েছিলাম । খেয়াল নেই যে এক জায়গায় দাড়িয়ে পড়েছি । হঠাৎ সম্বিত ফিরলো রুন্টুর কথায়--কী হলো দাঁড়িয়ে পড়লে যে ? যা দেখতে চাও কাল দিনের আলোতে হবে । এখন চলোতো । আগে রাতে থাকার আস্থানাটা ঠিক করি ।
এর মধ্যে ঠিক হয়েছিলো যে আজ রাতটা আমরা রুন্টুর আত্মীয় বাড়ীতে কাটিয়ে আগামীকাল আমাদের মধ্যে ছাড়া ছাড়ি হবে । আমরা যে যার মতো যাব । আমি যাব মোহনগঞ্জ হয়ে শ্রীমন্তপুর । রুন্টু যাবে নেত্রকোনা থেকে উত্তরে হাঁটা পথে তার গ্রাম 'বেতাডি' । বেশীদূর না । তারপর দিন পাঁচেক পর নির্দিষ্ট দিনে আমরা আবার নেত্রকোনায় দেখা করে ঠিক করে নেবো পরবর্তী সুচি ।

এইবার রিকসায় উঠে আমরা চললাম শহরের ভেতরের দিকে। যেতে যেতে যা দেখি তাই আমি প্রায় ধারাবিবরণী দিতে দিতে চলেছি । দেখ দেখ রুন্টু এখান থেকে ডান দিকে রাস্তাটা গেছে সাতপাই । সাতপাই ছিলো আমার সময়ে নেত্রকোনা শহরের বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্র । বিশাল আকারের দুটো জেনারেটর চালানো হতো । যেতে যেতে আবার-এইতো তেরীবাজার-----আমার কথা শুনে শুনে রুন্টু একসময় একটু নাটকীয় ভাবে বলল--হে অগ্রজ আপনার বাল্যকাল আর এই অধমের তরুণ বয়স এই শহরেই কেটেছে একথা সত্য এবং এটাও সত্য যে শহরটাকে আপনার চেয়ে এই অধম একটু বেশীই চেনে । তাছাড়া শুনেছি আপনি খাঁটি ভাইট্যা । আর এই অধম শহর থেকে পা'য়ে হাঁটা দূর‌ত্বেই থাকত । তাছাড়া আপনি ৬৪তে ছেড়ে গেছেন আর এই অধম গেছে ৭১এ । সুতরাং আপনার চেয়ে এই অধমের স্মৃতি অনেক সতেজ ।

রুন্টুর এই ডায়লগের মধ্যেই দেখলাম নিভে গেল আলো । খোলা গলায় এবার আমরা একটু হেসে নিলাম । দেখলাম আলো নিভে গেলেও অন্ধকার ততটা নয় । চাঁদের আলো ঝরছে । আর দেখলাম এই আলোতে একটা বাস্তব শহর কীভবে তার বস্তু খোলস ছেড়ে লকলকিয়ে জেগে উঠে । আমাদের রিকসার গতি তাতে এতটুকু কমেনি । চড়াইউৎরাইময় ভাঙাচোরা রাস্তা আর নেই । সবকিছুই কেমন মসৃণ হয়ে গেছে । ডানায় চাঁদের আলো মেখে রিকসাটা যেন ভেসে ভেসেই যাচ্ছে । কোথায় যাচ্ছে---গন্তব্য কোথায়---কেউ আর কিছু বলছেনা । এইতো নাম ভুলে যাওয়া সিনেমা হলটা না? মাইকে গান বাজছে না?---মধুমালতী ডাকে আয়--ফুল ফাগুনে ---এখান থেকে পুকুর পার ধরে আর একটু এগোলে বাঁদিকে মনতোষদের বাড়ী আর ডান দিকে আমার পিসির বাড়ী । ডানা কাত করে রিকসাটা আবার ঘুরে গেল কেন? দেখতাম পিসিমারা কেমন আছে--তাদের বাড়ীতে থেকে যে পোলাটা দত্ত হাই স্কুলে পড়তো সে আছে কিনা । সে কি এখনও খালি পা'য়েই ইস্কুলে যায়? আরে এইটাইতো সেই দত্ত হাই স্কুল--মৌলবী স্যারের বেত কে না খেয়েছে । যে খেত সেদিন তার ছুটি হয়ে যেত । কারণ অনেকেরই তাতে হাফ প্যান্ট ভিজে যেত । এখানে এসেই রিকসাটা একচক্কর মেরে চলে এলো হাসপাতালে । এই কি সেই হাসপাতাল যেখানে সেই সাহসী পোলাটা একা একা সকালে খালি পেটে আসতো ইনজেকশান নিতে ? কুকুরের কামড়ের ইনজেকশান ? নাভির গোড়ায় নিতে হতো সেই ইনজেকশান । কত বড় বড় ছেলেরা ইনজেকশানের সুঁই দেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠতো । পোলাডা কাঁদতো না । গ্রামের বাড়ী গিয়ে যখন এই সাহসের কথা পোলাটা তার মা'কে বলতো তখন তার মা বলতো ছেরাইনের ভয়ডর কম থাহন বালা।

হঠাৎ মনে হলো রিকসাটা থেমে আছে । রুন্টু বলছে--ও রাজাদা কী হলো --নামো--এসে গেছি । দেখি একটা বাড়ীর সামনে দাঁড়িয়ে রিকসাটা । আমরা রাত্রিবাসের জন্য রুন্টুর আত্মীয়ের আতিথ্য নিলাম । প্রাথমিক আপ্যায়নের পর এবার আমরা সিগারেট খাওয়ার জন্য উস্‌খুস্‌ করছি । এক ফাঁকে বরিয়েও পড়লাম । রুন্টুকে বললাম চল আমার কাকা যে ফার্মাসী দোকানে কাজ করতো তার খোঁজ করি । গিয়ে দেখি দোকান বন্ধ । আমাদের সবকিছুই এমন হয়, এটা আমরা ধরে নিয়েছি । মন খারাপ বা ভালো কোনোটাই নয় এমন একটা ভাব নিয়ে দু'জনে জ্যোৎস্নালোকিত নেত্রকোনা শহরে যখন আনমনে হাঁটছি তখন বোধ হয় রাত আট'টা ন'টা হবে । হঠাৎ সামনে একজন মানুষকে দেখে আমার মনে হলো এতো 'বিকাশ' । দত্ত হাই স্কুলের আমার সহপাঠি । নেহাৎ রসিকতা করেই রুন্টুকে বললাম --রুন্টু দেখ সামনের লোকটা, এর নাম বিকাশ, আমার সংগে ইস্কুলে পড়তো । কুড়ি কুড়ি নয় তেইশ বছর পরেও মনে আছে । রুন্টু বলল সত্যি! আমি বললাম সিওর । বুঝতে পারিনি যে এই কথার পর ও ডেকে বসবে । --ও বিকাশ বাবু । বিকাশ বাবু না ? দেখলাম সত্যি মানুষটা সাড়া দিলো --বলল -কে? চাঁদের আলোয় কে কাকে আর চিনতে পারে । যখন ডেকেই ফেলেছে তখন আমিই বাধ্য হলাম এগিয়ে যেতে । বললাম তুমি নিশ্চই বিকাশ --দত্ত হাই স্কুলে পড়তে---। উত্তরে বিকাশ বলল --হ্যাঁ, কিন্তু আপনে--। তখন বিশদ পরিচয়টাই দিতে হলো । আবছা চিনতেও পারলো মনে হয়। ততক্ষণে দু'জন দু'জনের হাত ধরে । এবার বিকাশ আর কিছুতেই ছাড়েনা । বলে--চলো বাসায় চলো, রাইতে আমার ঐখানে খাওয়া দাওয়া কর--অসুবিধে নাই কিছু । তারপর লগে কইরা আগাইয়া দিব । ভয় নাই ।
অনেক কষ্টে বিকাশের হাত থেকে এই কড়ারে ছাড়া পেলাম যে ফেরার পথে তার বাড়ীতে একবেলা । আসলে হঠাৎ এইরকম একটা পরিচয়ের ঘাত সইতে তার তখনও বেশ অসুবিধা হচ্ছিলো । (চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই জুন, ২০০৯ রাত ১০:৩৯
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×