নেত্রকোনা স্টেশনে আসতে আসতে নেমে গেল সন্ধ্যারাত । ফিরে দেখা --- বলতে প্রকৃত অর্থে বোধহয় এখান থেকেই শুরু হলো । ভীড়ে ঠাসা স্টেশন, তবু যেন আঁতিপাতি করে খুঁজছি কই সেই ইস্টিশনটা কই । রাতে তেমন বোঝাও যাচ্ছেনা । সেই সময়কার ফাঁকা জায়গাগুলো দেখছি ভর্তি হয়ে আছে দোকানপাটে । ঠাহর করাই মুষ্কিল ।
এই শহরেই আমার বাল্যকালের রঙীন কিছুটা সময়টা রেখে গিয়েছিলাম । খেয়াল নেই যে এক জায়গায় দাড়িয়ে পড়েছি । হঠাৎ সম্বিত ফিরলো রুন্টুর কথায়--কী হলো দাঁড়িয়ে পড়লে যে ? যা দেখতে চাও কাল দিনের আলোতে হবে । এখন চলোতো । আগে রাতে থাকার আস্থানাটা ঠিক করি ।
এর মধ্যে ঠিক হয়েছিলো যে আজ রাতটা আমরা রুন্টুর আত্মীয় বাড়ীতে কাটিয়ে আগামীকাল আমাদের মধ্যে ছাড়া ছাড়ি হবে । আমরা যে যার মতো যাব । আমি যাব মোহনগঞ্জ হয়ে শ্রীমন্তপুর । রুন্টু যাবে নেত্রকোনা থেকে উত্তরে হাঁটা পথে তার গ্রাম 'বেতাডি' । বেশীদূর না । তারপর দিন পাঁচেক পর নির্দিষ্ট দিনে আমরা আবার নেত্রকোনায় দেখা করে ঠিক করে নেবো পরবর্তী সুচি ।
এইবার রিকসায় উঠে আমরা চললাম শহরের ভেতরের দিকে। যেতে যেতে যা দেখি তাই আমি প্রায় ধারাবিবরণী দিতে দিতে চলেছি । দেখ দেখ রুন্টু এখান থেকে ডান দিকে রাস্তাটা গেছে সাতপাই । সাতপাই ছিলো আমার সময়ে নেত্রকোনা শহরের বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্র । বিশাল আকারের দুটো জেনারেটর চালানো হতো । যেতে যেতে আবার-এইতো তেরীবাজার-----আমার কথা শুনে শুনে রুন্টু একসময় একটু নাটকীয় ভাবে বলল--হে অগ্রজ আপনার বাল্যকাল আর এই অধমের তরুণ বয়স এই শহরেই কেটেছে একথা সত্য এবং এটাও সত্য যে শহরটাকে আপনার চেয়ে এই অধম একটু বেশীই চেনে । তাছাড়া শুনেছি আপনি খাঁটি ভাইট্যা । আর এই অধম শহর থেকে পা'য়ে হাঁটা দূরত্বেই থাকত । তাছাড়া আপনি ৬৪তে ছেড়ে গেছেন আর এই অধম গেছে ৭১এ । সুতরাং আপনার চেয়ে এই অধমের স্মৃতি অনেক সতেজ ।
রুন্টুর এই ডায়লগের মধ্যেই দেখলাম নিভে গেল আলো । খোলা গলায় এবার আমরা একটু হেসে নিলাম । দেখলাম আলো নিভে গেলেও অন্ধকার ততটা নয় । চাঁদের আলো ঝরছে । আর দেখলাম এই আলোতে একটা বাস্তব শহর কীভবে তার বস্তু খোলস ছেড়ে লকলকিয়ে জেগে উঠে । আমাদের রিকসার গতি তাতে এতটুকু কমেনি । চড়াইউৎরাইময় ভাঙাচোরা রাস্তা আর নেই । সবকিছুই কেমন মসৃণ হয়ে গেছে । ডানায় চাঁদের আলো মেখে রিকসাটা যেন ভেসে ভেসেই যাচ্ছে । কোথায় যাচ্ছে---গন্তব্য কোথায়---কেউ আর কিছু বলছেনা । এইতো নাম ভুলে যাওয়া সিনেমা হলটা না? মাইকে গান বাজছে না?---মধুমালতী ডাকে আয়--ফুল ফাগুনে ---এখান থেকে পুকুর পার ধরে আর একটু এগোলে বাঁদিকে মনতোষদের বাড়ী আর ডান দিকে আমার পিসির বাড়ী । ডানা কাত করে রিকসাটা আবার ঘুরে গেল কেন? দেখতাম পিসিমারা কেমন আছে--তাদের বাড়ীতে থেকে যে পোলাটা দত্ত হাই স্কুলে পড়তো সে আছে কিনা । সে কি এখনও খালি পা'য়েই ইস্কুলে যায়? আরে এইটাইতো সেই দত্ত হাই স্কুল--মৌলবী স্যারের বেত কে না খেয়েছে । যে খেত সেদিন তার ছুটি হয়ে যেত । কারণ অনেকেরই তাতে হাফ প্যান্ট ভিজে যেত । এখানে এসেই রিকসাটা একচক্কর মেরে চলে এলো হাসপাতালে । এই কি সেই হাসপাতাল যেখানে সেই সাহসী পোলাটা একা একা সকালে খালি পেটে আসতো ইনজেকশান নিতে ? কুকুরের কামড়ের ইনজেকশান ? নাভির গোড়ায় নিতে হতো সেই ইনজেকশান । কত বড় বড় ছেলেরা ইনজেকশানের সুঁই দেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠতো । পোলাডা কাঁদতো না । গ্রামের বাড়ী গিয়ে যখন এই সাহসের কথা পোলাটা তার মা'কে বলতো তখন তার মা বলতো ছেরাইনের ভয়ডর কম থাহন বালা।
হঠাৎ মনে হলো রিকসাটা থেমে আছে । রুন্টু বলছে--ও রাজাদা কী হলো --নামো--এসে গেছি । দেখি একটা বাড়ীর সামনে দাঁড়িয়ে রিকসাটা । আমরা রাত্রিবাসের জন্য রুন্টুর আত্মীয়ের আতিথ্য নিলাম । প্রাথমিক আপ্যায়নের পর এবার আমরা সিগারেট খাওয়ার জন্য উস্খুস্ করছি । এক ফাঁকে বরিয়েও পড়লাম । রুন্টুকে বললাম চল আমার কাকা যে ফার্মাসী দোকানে কাজ করতো তার খোঁজ করি । গিয়ে দেখি দোকান বন্ধ । আমাদের সবকিছুই এমন হয়, এটা আমরা ধরে নিয়েছি । মন খারাপ বা ভালো কোনোটাই নয় এমন একটা ভাব নিয়ে দু'জনে জ্যোৎস্নালোকিত নেত্রকোনা শহরে যখন আনমনে হাঁটছি তখন বোধ হয় রাত আট'টা ন'টা হবে । হঠাৎ সামনে একজন মানুষকে দেখে আমার মনে হলো এতো 'বিকাশ' । দত্ত হাই স্কুলের আমার সহপাঠি । নেহাৎ রসিকতা করেই রুন্টুকে বললাম --রুন্টু দেখ সামনের লোকটা, এর নাম বিকাশ, আমার সংগে ইস্কুলে পড়তো । কুড়ি কুড়ি নয় তেইশ বছর পরেও মনে আছে । রুন্টু বলল সত্যি! আমি বললাম সিওর । বুঝতে পারিনি যে এই কথার পর ও ডেকে বসবে । --ও বিকাশ বাবু । বিকাশ বাবু না ? দেখলাম সত্যি মানুষটা সাড়া দিলো --বলল -কে? চাঁদের আলোয় কে কাকে আর চিনতে পারে । যখন ডেকেই ফেলেছে তখন আমিই বাধ্য হলাম এগিয়ে যেতে । বললাম তুমি নিশ্চই বিকাশ --দত্ত হাই স্কুলে পড়তে---। উত্তরে বিকাশ বলল --হ্যাঁ, কিন্তু আপনে--। তখন বিশদ পরিচয়টাই দিতে হলো । আবছা চিনতেও পারলো মনে হয়। ততক্ষণে দু'জন দু'জনের হাত ধরে । এবার বিকাশ আর কিছুতেই ছাড়েনা । বলে--চলো বাসায় চলো, রাইতে আমার ঐখানে খাওয়া দাওয়া কর--অসুবিধে নাই কিছু । তারপর লগে কইরা আগাইয়া দিব । ভয় নাই ।
অনেক কষ্টে বিকাশের হাত থেকে এই কড়ারে ছাড়া পেলাম যে ফেরার পথে তার বাড়ীতে একবেলা । আসলে হঠাৎ এইরকম একটা পরিচয়ের ঘাত সইতে তার তখনও বেশ অসুবিধা হচ্ছিলো । (চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই জুন, ২০০৯ রাত ১০:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


