somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ফিরে দেখা আঁতুড় ঘর/১৯

১৬ ই জুন, ২০০৯ রাত ১১:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে এমন সময় মোহনগঞ্জ রেলস্টেশনে নামলাম । রেলপথ এখানেই শেষ । মোহনগঞ্জের পর আর রেলপথ নেই । স্টেশনটা আবছা চেনা মনে হতে লাগলো । আগে এত দোকান ভীড় ছিলো না । তা থাক । তবু তো মোহনগঞ্জ । অজ গ্রাম থেকে কালে ভদ্রে এখানে এসেই মনে হতো শহুরে পৃথিবীর শুরু বুঝি এখান থেকেই । ছোট ছোট পা'য়ে শ্রীমন্তপুর থেকে প্রায় মাইল চারেক হেঁটে আসাতে তখন কোনোই ক্লান্তি ছিলো না । তা এখন যতই জনাকীর্ণ হোকনা কেন এটা যে সেই মোহনগঞ্জ তা ভুলি কেমনে । সর্বত্র দারিদ্র অনুন্নয়ন চরে বেড়ালেও মানুষগুলো কি এখনো সেই রকমই আছে --রসিক আর অতিথিবৎসল !

ভাবতে ভাবতে ময়মনসিং থেকে পাওয়া কানু'র দোকানের ঠিকানার খোঁজে বেরোলাম । কানু জগদীশের ছোট ভাই । মোহনগঞ্জে তার ওষুদের দোকান । সবাই চেনে দেখলাম । রিকসা নিয়ে পৌঁছুতে অসুবিধা হলোনা । অনেক সময়ান্তর হলেও আমাকে সে ঠিক চিনতে পারলো। তবে বেশ অবাক হয়ে গেল । তার ধারনা যে আমরা আর কোনোদিনই মনে করে এখানে আসবোনা । ওপারে থেকে কি আর এই পেছনের কথা কেউ মনে রাখে । কানু'র এই বিস্ময়সূচক কথা যত শুনছি ততই আমার ভেতরের এক আবেগ যেন বলতে চাইছে, বলতে চাইছে ভুল, সবটাই মারাত্মক এক ভুলের অর্জন । আর এটা যে একটা দীর্ঘ ইতিহাস, গভীর দুঃখের ইতিহাস-- তা বোঝাই কীভাবে !

দোকানের পেছনেই একটা অংশে তার থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা । একাই থাকে । তার পীড়াপীড়িতে দুপুরের খাওয়াও খেতে হলো । কিন্তু আমার তখন অস্থিরতা কতক্ষণে যাব শ্রীমন্তপুর । কানু আশ্বাস দিলো যে সেও যাবে আমার সংগে । একসময় কাজকর্ম গুছিয়ে দোকান বন্ধ করে দু'জনে পথ ধরলাম শ্রীমন্তপুরের ।

প্রথম কিছুটা পথ রেললাইন বরাবর । অর্থাৎ যেদিক থেকে এলাম সেই দিকে । ট্রেনে কংস নদীর উপর একটা ব্রীজটা পার হয়ে আমরা মোহনগঞ্জে ঢুকেছিলাম । সেই রেলব্রীজটা এখন পার হওয়ার কথা । অবশ্য এখন আর রেলব্রীজ পা'য়ে হেঁটে পার হতে হয়না । পাশেই একটা ফুট ব্রীজ হয়েছে । এটা পার হয়েই আমরা রেললাইন ছেড়ে সোজা দক্ষিণ বরাবর নেমে যাব । নেমে গিয়ে শ্রীমন্তপুর যাওয়ার পথ ধরবো । এই রেল ব্রীজটার কথা আমার অবিকল মনে আছে । বিশেষ যে কারণে মনে আছে তা আমি কোনো মতেই ভুলতে পারবোনা । এর সংগে জড়িয়ে আছে আমার একটা ভয়াবহ স্মৃতি । আজ এটার মুখোমুখি হয়ে ঘটনাটা আবার মনে পড়ে গেল । তখন আমি বেশ ছোট । আমাদের সবচেয়ে ছোট বোনটি তখন মা'র কোলে । আমরা তিনজনা আমার মামার বাড়ী দশাল যাবো বলে বেরিয়েছি । দশাল যেতে হলে তখনকার দিনে আমাদের বাড়ী থেকে মোহনগঞ্জ আসতে হতো এবং ট্রেনে করে যেতে হতো বারহাট্টা এবং সেখান থেকে হাঁটা পথ । আর বারহাট্টা যেতে মাঝে পড়তো শুধু একটিই স্টেশন, নাম অতিথপুর । যাক্‌ সেবার এটুকু যাওয়ার জন্য আমরা প্রায় চার মাইল পা'য়ে হেঁটে এই রেল ব্রীজ এর কাছে এসে যখন পৌঁছেছি তখন দেখছি ট্রেনের টাইম হয়ে গেছে । ব্রীজের কাছে সিগনাল ডাউন অবস্থায় আছে । অথচ আমাদের এই ব্রীজ পার হয়ে আরো অনেকটাই হাঁটতে হবে ।অবশ্য আগে ট্রেন চলে গেলেও সময় পাওয়া যায় । কারণ মোহনগঞ্জ 'ই হলো শেষ স্টেশন । যাই হউক মা' অত না ভেবে মনে হলো সিদ্ধান্ত নিলো যে ট্রেন আসার আগেই পেরোতে হবে ব্রীজ । সেই মতো আমরা উঠেও গেলাম ব্রীজে । কিন্তু যখন অর্ধেক ব্রীজ পেরিয়েছি মাত্র তখনই শব্দ শুনে দেখলাম পেছনে এসে গেছে ট্রেন । যা কল্পনা করতাম ভয় ভয় খেলার জন্য । তা আজ সত্যি হয়ে গেল ! কিন্তু এখন ! সেই যন্ত্র দানব কি আমাদের রেহাই দেবে ? একটু ধীরে চলবে কি ?

হতে পারে হঠাৎ বিপদে মা'র পা' একটু ফস্‌কে গেছে । আমি দেখলাম দু'টি স্লিপারের মাঝে মা'র ডান পা । হাঁটু মুড়ে মা, বাঁ কোলে ছোট বোন। পেছনে আগুয়ান ট্রেন । ঠিক এই অবস্থায় আমাকে ভর করে মা' প্রায় অবিশ্বাস্য গতিতে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন । আমাকে বললেন --ভয় নাই--এই তো পার হইয়া গেলাম ।

ঘটনাটির পর আমার যত বয়স বেড়েছে আমি খালি ভেবেছি কি ক'রে মা এই সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে বলছে --ভয় নাই এই তো পার হইয়া গেলাম । আসলে তখনো বাকি বেশ ক'টি স্লিপার । শেষ পর্যন্ত আমরা বেঁচে গেলাম । সর্ব শক্তি দিয়ে মা আমাকে নিয়ে কোনো মতে ব্রীজটা পার হয়ে গেলেন । আর পেছনে তখনি দেখলাম ব্রীজে উঠে গেল আগুয়ান ট্রেন । ভীষণ ধাতব শব্দ তুলে ট্রেনটা চলে গেল আমাদের পাশ দিয়ে । না, মা আর চলতে পারেননি । কাছেই লাইনের পাশেই একটা বড়ই(কুল) গাছের নিচে বোনকে কোল থেকে নামিয়ে বসে পড়লেন । যন্ত্রণা তার সারা মুখে । পা'য়ের কাপড় সরিয়ে দেখলেন যে হাড়ের সংগে স্লিপারের ঘর্ষণে একটা জায়গা নীল হয়ে ফুলে উঠেছে । (চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই জুন, ২০০৯ রাত ১১:৫৭
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাখি মন

লিখেছেন সামিয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:১০



রাত গভীর হলে পাখিটা বারান্দায় এসে বসে। দূরের আকাশে তখনও কিছু আলো জ্বলজ্বল করে, কিন্তু পৃথিবীর কোলাহল ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসে। সেই নীরবতার মধ্যে বসে পাখিটার মনে হয়, মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৬


শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×