দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে এমন সময় মোহনগঞ্জ রেলস্টেশনে নামলাম । রেলপথ এখানেই শেষ । মোহনগঞ্জের পর আর রেলপথ নেই । স্টেশনটা আবছা চেনা মনে হতে লাগলো । আগে এত দোকান ভীড় ছিলো না । তা থাক । তবু তো মোহনগঞ্জ । অজ গ্রাম থেকে কালে ভদ্রে এখানে এসেই মনে হতো শহুরে পৃথিবীর শুরু বুঝি এখান থেকেই । ছোট ছোট পা'য়ে শ্রীমন্তপুর থেকে প্রায় মাইল চারেক হেঁটে আসাতে তখন কোনোই ক্লান্তি ছিলো না । তা এখন যতই জনাকীর্ণ হোকনা কেন এটা যে সেই মোহনগঞ্জ তা ভুলি কেমনে । সর্বত্র দারিদ্র অনুন্নয়ন চরে বেড়ালেও মানুষগুলো কি এখনো সেই রকমই আছে --রসিক আর অতিথিবৎসল !
ভাবতে ভাবতে ময়মনসিং থেকে পাওয়া কানু'র দোকানের ঠিকানার খোঁজে বেরোলাম । কানু জগদীশের ছোট ভাই । মোহনগঞ্জে তার ওষুদের দোকান । সবাই চেনে দেখলাম । রিকসা নিয়ে পৌঁছুতে অসুবিধা হলোনা । অনেক সময়ান্তর হলেও আমাকে সে ঠিক চিনতে পারলো। তবে বেশ অবাক হয়ে গেল । তার ধারনা যে আমরা আর কোনোদিনই মনে করে এখানে আসবোনা । ওপারে থেকে কি আর এই পেছনের কথা কেউ মনে রাখে । কানু'র এই বিস্ময়সূচক কথা যত শুনছি ততই আমার ভেতরের এক আবেগ যেন বলতে চাইছে, বলতে চাইছে ভুল, সবটাই মারাত্মক এক ভুলের অর্জন । আর এটা যে একটা দীর্ঘ ইতিহাস, গভীর দুঃখের ইতিহাস-- তা বোঝাই কীভাবে !
দোকানের পেছনেই একটা অংশে তার থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা । একাই থাকে । তার পীড়াপীড়িতে দুপুরের খাওয়াও খেতে হলো । কিন্তু আমার তখন অস্থিরতা কতক্ষণে যাব শ্রীমন্তপুর । কানু আশ্বাস দিলো যে সেও যাবে আমার সংগে । একসময় কাজকর্ম গুছিয়ে দোকান বন্ধ করে দু'জনে পথ ধরলাম শ্রীমন্তপুরের ।
প্রথম কিছুটা পথ রেললাইন বরাবর । অর্থাৎ যেদিক থেকে এলাম সেই দিকে । ট্রেনে কংস নদীর উপর একটা ব্রীজটা পার হয়ে আমরা মোহনগঞ্জে ঢুকেছিলাম । সেই রেলব্রীজটা এখন পার হওয়ার কথা । অবশ্য এখন আর রেলব্রীজ পা'য়ে হেঁটে পার হতে হয়না । পাশেই একটা ফুট ব্রীজ হয়েছে । এটা পার হয়েই আমরা রেললাইন ছেড়ে সোজা দক্ষিণ বরাবর নেমে যাব । নেমে গিয়ে শ্রীমন্তপুর যাওয়ার পথ ধরবো । এই রেল ব্রীজটার কথা আমার অবিকল মনে আছে । বিশেষ যে কারণে মনে আছে তা আমি কোনো মতেই ভুলতে পারবোনা । এর সংগে জড়িয়ে আছে আমার একটা ভয়াবহ স্মৃতি । আজ এটার মুখোমুখি হয়ে ঘটনাটা আবার মনে পড়ে গেল । তখন আমি বেশ ছোট । আমাদের সবচেয়ে ছোট বোনটি তখন মা'র কোলে । আমরা তিনজনা আমার মামার বাড়ী দশাল যাবো বলে বেরিয়েছি । দশাল যেতে হলে তখনকার দিনে আমাদের বাড়ী থেকে মোহনগঞ্জ আসতে হতো এবং ট্রেনে করে যেতে হতো বারহাট্টা এবং সেখান থেকে হাঁটা পথ । আর বারহাট্টা যেতে মাঝে পড়তো শুধু একটিই স্টেশন, নাম অতিথপুর । যাক্ সেবার এটুকু যাওয়ার জন্য আমরা প্রায় চার মাইল পা'য়ে হেঁটে এই রেল ব্রীজ এর কাছে এসে যখন পৌঁছেছি তখন দেখছি ট্রেনের টাইম হয়ে গেছে । ব্রীজের কাছে সিগনাল ডাউন অবস্থায় আছে । অথচ আমাদের এই ব্রীজ পার হয়ে আরো অনেকটাই হাঁটতে হবে ।অবশ্য আগে ট্রেন চলে গেলেও সময় পাওয়া যায় । কারণ মোহনগঞ্জ 'ই হলো শেষ স্টেশন । যাই হউক মা' অত না ভেবে মনে হলো সিদ্ধান্ত নিলো যে ট্রেন আসার আগেই পেরোতে হবে ব্রীজ । সেই মতো আমরা উঠেও গেলাম ব্রীজে । কিন্তু যখন অর্ধেক ব্রীজ পেরিয়েছি মাত্র তখনই শব্দ শুনে দেখলাম পেছনে এসে গেছে ট্রেন । যা কল্পনা করতাম ভয় ভয় খেলার জন্য । তা আজ সত্যি হয়ে গেল ! কিন্তু এখন ! সেই যন্ত্র দানব কি আমাদের রেহাই দেবে ? একটু ধীরে চলবে কি ?
হতে পারে হঠাৎ বিপদে মা'র পা' একটু ফস্কে গেছে । আমি দেখলাম দু'টি স্লিপারের মাঝে মা'র ডান পা । হাঁটু মুড়ে মা, বাঁ কোলে ছোট বোন। পেছনে আগুয়ান ট্রেন । ঠিক এই অবস্থায় আমাকে ভর করে মা' প্রায় অবিশ্বাস্য গতিতে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন । আমাকে বললেন --ভয় নাই--এই তো পার হইয়া গেলাম ।
ঘটনাটির পর আমার যত বয়স বেড়েছে আমি খালি ভেবেছি কি ক'রে মা এই সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে বলছে --ভয় নাই এই তো পার হইয়া গেলাম । আসলে তখনো বাকি বেশ ক'টি স্লিপার । শেষ পর্যন্ত আমরা বেঁচে গেলাম । সর্ব শক্তি দিয়ে মা আমাকে নিয়ে কোনো মতে ব্রীজটা পার হয়ে গেলেন । আর পেছনে তখনি দেখলাম ব্রীজে উঠে গেল আগুয়ান ট্রেন । ভীষণ ধাতব শব্দ তুলে ট্রেনটা চলে গেল আমাদের পাশ দিয়ে । না, মা আর চলতে পারেননি । কাছেই লাইনের পাশেই একটা বড়ই(কুল) গাছের নিচে বোনকে কোল থেকে নামিয়ে বসে পড়লেন । যন্ত্রণা তার সারা মুখে । পা'য়ের কাপড় সরিয়ে দেখলেন যে হাড়ের সংগে স্লিপারের ঘর্ষণে একটা জায়গা নীল হয়ে ফুলে উঠেছে । (চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই জুন, ২০০৯ রাত ১১:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




