ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কার্যক্রম দেশব্যাপী চলছেই, কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না। সর্বশেষ গত সোমবার রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুু'গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে ৩০ জন আহত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাল্লা দিয়ে চলছে এ সন্ত্রাসী কার্যক্রম। তাদের সন্ত্রাসী কার্যক্রম অধিকাংশই হচ্ছে নিজেদের মধ্যে মারামারি। সেই সঙ্গে চলছে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ধর্ষণ, ভর্তি বাণিজ্য। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ছাত্রলীগ ১৫৮টি সন্ত্রাসী কর্মকা-ে লিপ্ত হয়েছে। এর বেশিরভাগই নিজেদের বিরুদ্ধে। এসব সংঘর্ষের অনেকগুলোতে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে। এসব সংঘর্ষে ৯ জন নিহত হয়। আহত হয়েছে কমপক্ষে ১৯৪৭ জন। ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার হয়েছে ২৬৪ জন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার হয়েছে ৮৭ জন। আটক ও গ্রেফতার হয়েছে ২৪১ জন। মামলা দায়ের হয়েছে ছাত্রলীগের ২১৫ নেতাকর্মীর নামে। বন্ধ ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, রাজশাহী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী মেডিকেল কলেজসহ দেশের ৩৫টি বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সরকার ক্ষমতায় আসার পর ছাত্রলীগের কর্মকা-ে নারাজ হয়ে প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগের সাংগঠনিক অভিভাবকের পদ ত্যাগ এবং বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও থামছে না তাদের সংঘর্ষ।
বিগত একমাসে দেশের ৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের বড় ধরনের সংঘর্ষ হয়। এই সময় এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রলীগের সংঘর্ষে নিহত হয় ১ জন আর আহত হয় কমপক্ষে ১০৬ জন। ছাত্রলীগের বেপরোয়া সন্ত্রাসী কার্যক্রমে ২২ দিন অচল থেকে গত রোববার খুলে দেয়া হয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। অস্থিরতা বিরাজ করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বগুড়া সরকারি আযিযুল হক কলেজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসহ আরও অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশও কার্যকর হয়নি। ছাত্রলীগের বেপরোয়া সন্ত্রাসী কার্যক্রমের ফলে তাদের লাগাম টেনে ধরার আহ্বান জানিয়ে দেশের ৫ জন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ বিবৃতিও দিয়েছেন। কিন্তু ছাত্রলীগের বেপরোয়া সন্ত্রাসী কর্মকা- বন্ধ করার কোন নির্দেশই কার্যকর হচ্ছে না। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সংঘর্ষের সংখ্যা। ছাত্রলীগের সংঘাতময় পরিস্থিতির জন্য কেন্দ্রীয় নেতারা চেইন অফ কমান্ড না থাকা ও আওয়ামী লীগের মধ্যকার ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেটকে দায়ী করেন।
ছাত্রলীগের এ নিয়ন্ত্রণহীনতা ও অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ-সংঘাতের জন্য চেইন অফ কমান্ড না থাকা, কেন্দ্রীয় নেতাদের গ্রুপিং ও মুরুবি্ব সংগঠন আওয়ামী লীগের মধ্যে থাকা গ্রুপিংয়ের জন্য দায়ী বলে ছাত্রলীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা মনে করেন। বর্তমানে ছাত্রলীগে চেইন অফ কমান্ড নেই। দলের কেন্দ্রীয় নেতারা বহুধাবিভক্ত। তৃণমূল থেকে দেশের সব স্তরে কেন্দ্রীয় নেতাদের গ্রুপিং বিরাজ করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কেন্দ্রীয় নেতাদের হাতে ছাত্রলীগ সভাপতি মাহমুদ হাসান রিপন লাঞ্ছিত হওয়ার মাধ্যমেও ছাত্রলীগে চেইন অফ কমান্ড না থাকার বিষয় আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সিন্ডিকেটের ব্যাপারে সহ-সভাপতি ও সম্পাদক পদমর্যাদার কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা 'সংবাদ'কে জানান, ছাত্রলীগের সিন্ডিকেটের মধ্যে রয়েছে সাবেক সভাপতি লিয়াকত শিকদার, সাবেক দপ্তর সম্পাদক ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ও ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের কর্মকর্তা সাইফুজ্জামান শিখরের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট। কেন্দ্রীয় নেতারা দাবি করেন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের লোক সিন্ডিকেটের হাতে থাকায় নেত্রীর (শেখ হাসিনার) কাছে ছাত্রলীগের চেইন অফ কমান্ড না থাকা এবং সংঘর্ষের বিষয় পেঁৗছাচ্ছে না। আর সংঘর্ষের কারণ নেত্রীর কাছে না পেঁৗছানোর কারণে তার নির্দেশও কার্যকর হচ্ছে না বলে দাবি করেন তারা। অন্য একটি সূত্র জানায়, ছাত্রলীগের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ কার্যকর না হওয়ার পেছনে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের কারসাজি রয়েছে। সংসদ সদস্যরা তাদের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের জন্য ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের কাজে লাগান। ছাত্রলীগ কর্মীরা সংসদ সদস্যের শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে। এমপির কথা শোনে না এলাকার এমন বিশেষ লোককে শায়েস্তা করতে তারা (এমপি) ছাত্রলীগের মস্তানদের লেলিয়ে দেন। এভাবে তারা এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখেন। তাই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের কিছু অপকর্মও তাদের (সংসদ সদস্য) হজম করতে হয়। অন্য অর্থে এমপিরা ছাত্রলীগকে ব্যবহার করেন বলে ছাত্রলীগকে কিছু বলতে পারেন না।
যাদের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দেয়ার অভিযোগ করা হয়েছে তাদের একজন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী 'সংবাদ'কে বলেন, 'ছাত্রলীগতো কোন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান নয় যে, এখানে সিন্ডিকেট থাকবে।' তিনি বলেন, 'ছাত্রলীগ, ছাত্রলীগ দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়।' প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ কেন কার্যকর হচ্ছে না এ ব্যাপারে খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, 'স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ বিষয়ে বলতে পারবেন।' ছাত্রলীগের বিরদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ছাত্রলীগের নিজেদের মধ্যে এ সংঘাতময় পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক পদ থেকে পদত্যাগ করেন। দেশের সব প্রান্ত থেকে আসে ছাত্রলীগের লাগাম টেনে ধরার অনুরোধ। তবুও থামেনি ছাত্রলীগের নিজেদের সংঘাত। ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দেন। তবুও লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হয়নি ছাত্রলীগের। ছাত্রলীগের পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারায় সরকারকে আহ্বান জানিয়ে দেশের ৫ জন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম ও প্রফেসর ইমিরেটাস ড. আনিসুজ্জামান ১১ এপ্রিল এক যৌথ বিবৃতি দেন। বিবৃতিতে তারা ছাত্রলীগের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানান। তবুও ছাত্রলীগের বেপরোয়া কার্যক্রম চলছেই। গত ১৫ এপ্রিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার জোবরা গ্রামের বাসিন্দাদের সঙ্গে ছাত্রলীগ কর্মীদের সংঘর্ষের পর ১৬ এপ্রিল ছাত্রলীগ কর্মী আসাদুজ্জামান নিহত হন। তখন থেকে ২২ দিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অচল ছিল। গত ১৪ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদুল্লাহ হল ও একুশে হলে ছাত্রলীগের সংঘর্ষে আহত হয় ২ জন আর মহসিন হল ও সূর্যসেন হল ছাত্রলীগের সংঘর্ষে আহত হয় কমপক্ষে ১০ জন। গত ৪ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসীন হলের ছাত্রলীগ সভাপতি শেখ মুহাম্মদ আলী ও সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন গ্রুপের মধ্যে ভোর থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত দফায় দফায় সংঘর্ষে আহত হয় কমপক্ষে ১৪ জন। ছোড়া হয় ৫ থেকে ৭ রাউন্ড গুলি। ফাটানো হয় দুটি বোমা। ভাঙচুর করা হয় হলের ১৫ থেকে ২০টি কক্ষ। গত ৪ মে ছাত্রলীগের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বরিশাল পলিটেকনিক কলেজে ছাত্রলীগের দু'গ্রুপের দফায় দফায় সশস্ত্র সংঘর্ষে ১৫ জন আহত হয়। যার মধ্যে বেঞ্চে বসিয়ে একজনকে নির্মমভাবে কোপানোর ছবি বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হয়। কলেজ শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি আবদুর রাজ্জাক ও মহানগর ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক তৌহিদুর রহমান ছাবিদের সমর্থকদের মধ্যে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। গত ২০ এপ্রিল মধ্যরাতে জাবিতে দুই হলের ছাত্রলীগ কর্মীদের ৩৫ জন ছাত্রলীগ কর্মী আহত হয়। এর মধ্যে একজনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আ ফ ম কামাল উদ্দিন হলের কয়েকজন ছাত্রের সঙ্গে শহীদ সালাম বরকত হলের ছাত্রদের বাগবিত-ার জের ধরে তারা এ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। এরপর গত ২৯ এপ্রিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দু'গ্রুপের সংঘর্ষে ১৫ জন আহত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট নির্বাচনে বিজয়ীদের ফুল দেয়াকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের শামীম ও সামি-সাফিন গ্রুপের কর্মীদের মাঝে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। গত ২৮ এপ্রিল রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট) ছাত্রলীগের এক পক্ষের হামলায় আরেক পক্ষের ২ জন গুরুতর আহত হয়।
অন্যদিকে ছাত্রলীগের জেলা কমিটি নিয়েও দলে গ্রুপিং বিরাজ করছে। ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটি ৪ বছর অতিক্রম করেছে। জেলা সম্মেলন করে কমপক্ষে ৪০টি জেলা কমিটি শেষে কেন্দ্রীয় কাউন্সিল হওয়ার কথা। সম্মেলন দিয়ে জেলা কমিটি হওয়ার কথা থাকলেও কেন্দ্রীয় নেতাদের গ্রুপিংয়ের কারণে তা সুষ্ঠুভাবে হতে পারছে না। এ পর্যন্ত ১৯টি জেলায় সম্মেলন হয়েছে। কমিটি হয়নি ৬টি জেলায়। সম্মেলনে কমিটি দেয়া হয়েছে ৭টি জেলায় আর অজ্ঞাত স্থান থেকে প্রেস রিলিজ পাঠিয়ে কমিটি দেয়া হয়েছে ৬টি জেলায়। যশোরে কমিটি নিয়ে ঘটে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। যাতে এক ছাত্রলীগ নেতা নিহত হন।
অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রলীগ কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠক হয় না। বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটি ৪ বছর অতিক্রম করলেও কমিটির বৈঠক হয়েছে মাত্র একবার। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থাকলেও তা খোলা হয় না। গত দুই বছরে মাত্র দু'বার কেন্দ্রীয় অফিস খোলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা। ছাত্রলীগের গ্রুপিং নয়, মুরুবি্ব সংগঠন আওয়ামী লীগের কিছু নেতাও সিন্ডিকেট আকারে ছাত্রলীগকে নিয়ন্ত্রণ করেন বলে জানিয়েছেন ছাত্রলীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা। সম্পাদক পর্যায়ের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে 'সংবাদ'কে বলেন, 'আমাদের ছাত্রলীগ এখন শুধু ছাত্রলীগ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না। ছাত্রলীগের সঙ্গে সঙ্গে এর নিয়ন্ত্রণ করেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত শিকদারসহ প্রধানমন্ত্রী অফিসের কিছু কর্মকর্তা।' তবে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন কেন্দ্রীয় নেতাদের এ অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি টেলিফোনে 'সংবাদ'কে বলেন, 'আমাদের মাঝে গ্রুপিং আছে বলে আমি মনে করি না।' তিনি বলেন, 'সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে ঘটনা ঘটছে আমরা সবগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি। বরিশাল পলিটেকনিকের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে।' তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতে সংঘর্ষ না ঘটে সে ব্যাপারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠন প্রশাসনের ভূমিকা থাকা দরকার বলে মনে করেন তিনি। (লেখাটি সমকাল পত্রিকা অবলম্বনে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

