মতিঝিলের ফুটপাথে তরি-তরকারি, চাউল-ডাউল, পোষাক-পরিচ্ছদ থেকে শুরু করে সকল প্রকার ফলফলাদি কিনতে পাওয়া যায়। ফুটপাথের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অনেকেই নৈতিক মানসম্পন্ন আবার এর ব্যতিক্রমও আছে। অফিস থেকে বের হয়ে রসনা তৃপ্তির নিমিত্তে লিচু কিনতে গেলাম। পাশাপাশি লিচুর চারটি ঝুড়ি। সব মিলিয়ে ছয় থেকে সাত জন ব্যবসায়ী। দর-দাম ঠিক হওয়ার পর বললাম, ভাই লিচু গুণে দিতে হবে। প্রায় সমস্বরে দু'জন বলে উঠলেন, এখানে আগে যে কয়জন চোর বাটপার লিচু বিক্রি করতো তারা আর নেই। পুঁজি হারিয়ে এখন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে। আমরা ধান্দার ব্যবসা করি না। ঠকালে কি পাপ হয় তা আমাদের জানা আছে। তাদের কথায় মনে হলো, ঈমানের আলো প্রথম আলোর যা কিছু ভালোর (?) মতই তাদেরকে আলোকিত করছে, তাই তাদের প্রতি এক প্রকার ভক্তি জন্মালো। বললাম, ঠিক আছে দেন। পলিথিনের ব্যাগে দেয়ার সময় ওদের প্রধানগোছের একজন বলল, ঐ দে, স্যারকে আরো দশটা লিচু দিয়ে দে!
মধু মাসের মধুর গরমে সিদ্ধ হতে হতে বাসায় এসে পায়ের চিহ্ন ফেলার সাথে সাথে বিদু্যত দিল ওড়াল! মন পড়ে আছে লিচুর ব্যাগে। তাই বিদু্যতের ওড়ালে মেজাজ বিগড়ে উঠেনি, নইলে গায়ে ফুসকা পড়া গরমে ডিজিটালের চৌদ্দগোষ্টি শ্রাদ্ধ শুরু হয়ে যেতো! একটা লিচুর দাম তিন টাকা! গিনি্নকে বললাম, মোম জালিয়ে মনের হরষে লিচুগুলি গনে তার পর রসনা পরিতৃপ্ত করো। একটু পরে গিনি্ন কাছে এসে চড়া মেজাজে বললো, তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে ন! বললাম, কেন? এক মেয়ে দুই ছেলে হলো কেমনে? গিনি্ন বললো, রাখো তোমার মশকরা। একশ লিচুতে আটটি কম! গনে আনলে কি প্রেসটিজ পাঙ্কচার হয়ে যেতো? ফাও দশটি লিচুর কথা গিনি্নকে আর বললাম না। মনে মনে ভাবলাম, হায় আল্লাহ ঈমানদার লোকেরা এ কাম করলো কেমনে?
উপরের ঘটনাটি গতবারের। এবার খিলগাঁও রেলগেটে একজন ঈমানদার লিচু বিক্রেতা চ্যালেঞ্জ করে আওয়াজ দিচ্ছেন, একটি লিচু কম হলে দশটি জরিমানা! ক্রয় বিক্রয় চুক্তি সম্পাদনের পর আমি দাম পরিশোধ করতেই পলিথিনের ব্যাগে একশ লিচু ঢুকিয়ে গিট্টু দিয়ে দেয়। বললাম, ভাই গিট্টু খুলেন আর আমার দুই চোখের সামনে একটা একটা করে গণনা করেন। ফিস ফিস করে বললাম, বিবি সাহেবার গতবারের ভেংচির কথা মনে পড়লে এবারও পিলে চমকে উঠে! মন না চাইলেও আমার দৃঢ়তায় লিচু গনতে শুরু করলো বেচারা লিচু বিক্রেতা, একশ লিচুতে ছয়টি কম! তার হাবভাবে মনে হলো, লজ্জা আমারই! গনতে বললাম কেন?
পাশের আম বিক্রেতা অনেক রিকুয়েষ্ট করে বললো, স্যার, ভাল হিম সাগর আছে। নিয়ে যান। সহজে কারো রিকুয়েষ্ট ফেলতে পারি না। আর আমের রিকুয়েষ্ট তো প্রশ্নই উঠে না! আম দেখলেই মুখের পানি গঙ্গার জলের মতো কলকলিয়ে উঠে! বললাম ভাই, আমে তো মিকস্ড থাকে, তাই সবার কাছ থেকে আম কিনি না। মার্কেটিংয়ের ধরণ দেখে মনে হলো লোকটা আগে হয়তো বা ফুটপাথে ঔষধ বিক্রি করতো! তার অনন্য অসাধারণ মার্কেটিংয়ে গলে গেলাম। বাসায় গিয়ে আবার যথারীতি বিবি সাহেবার ভেংচি খেলাম। মাত্র দুই কেজি আমে বেশ কয়েকটি অন্য জাতের আম পাওয়া গেল! উচ্চ মাত্রার টক!
অফিসে যাতায়াতের রাস্তায় হওয়ায় পরের দিন জনাব আম বিক্রেতাকে বললাম, ভাই কালকের আমে তো বেশ কিছু বঙ্গোপ সাগর পাওয়া গেছে, নূনা পানির মতই মুখে দেয়া যায় নি! হা করে থাকিয়ে আছে। বুঝতে পারে নি। একটু ঝাঁঝালো কন্ঠে বললাম, আরে মিয়া আপনার এক নাম্বার হিম সাগরে অন্য জাতের আম ছিল। টকের জন্য মুখেই দেয়া যায় নি। লোকটির চেহারা দেখে মনে হলো তার সাথে আমার সতীন সম্পর্ক! চড়া গলায় বলে উঠে, ঐ মিয়া আম কি আমার গাছের নাকি? আম তো আড়ৎদারের কাছ থেকে কিন্যা আনছি। ষষ্ট ইন্দ্রিয় আমাকে সতর্ক করে দিল, 'এখানে ইজ্জত নিরাপদ নয়'। তাই কথা না বাড়িয়ে মাথা নিচু করে চলে এলাম। সবাইকে মধু মাসে একটু সতর্কতার সাথে রসনার রসদ ক্রয়ের পরামর্শ রইল।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


