আমার প্রিয় পোস্ট

পর্যটক

ফাহমিদুলের আত্মপরিচয় অনুসন্ধান: পুনর্পাঠ

১৬ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ ভোর ৫:৩০

শেয়ারঃ
0 0 0

ফাহমিদুল হক গত কয়েকদিন ধরে একটা বড় ব্লগ লিখছিলেন পর্বে ভাগ করে। এরপর সবমিলিয়ে অখণ্ডে তা আবার পোষ্টে দেন। Click This Link
ওটা এমনিতেই বড় পোষ্ট বলে আমার মন্তব্য এখানে আলাদা পোষ্ট আকারে দিচ্ছি। আশা করি ফাহমিদুল রাগ করবেন না বা আগ্রহের কমতি হবে না।
ফাহমিদুল যথেষ্ট খাটা খাটনি করেছেন বোঝা যায়। যথেষ্ট সাহসও দেখিয়েছেন। ফাহমিদুলের শ্রম ও অধ্যাবসায়ের প্রশংসা করে শুরু করছি। আমি এখানে কিছু পয়েন্ট আকারে আমার কথা তুলব।

১. আপনি লেখাটা শুরুর আগে "অসাম্প্রদায়িক" (অসাম্প্রদায়িক বলতে আপনি যা বুঝেন বা বুঝিয়েছেন তাই) উপাদান আপনাকে খুঁজে দেখতে হবে ও হাইলাইট করতে হবে - এরকম একটা ভাব আগাম অনুমান করে নিয়ে লেখা শুরু করেছেন যা আপনার লেখার প্রবাহকে সবসময় শাসন করে গেছে - সাধারণভাবে বললে এটাই আপনার লেখার একটা বড় দূর্বলতা।
২. লোকধর্ম বলে আমাদের এক নতুন একটা বৈশিষ্ট চিহ্নিত করে বাঙালি ও মুসলমানের পাশে জায়গা করে দিয়েছেন - ভালো। প্রস্তাব রেখেছেন, "আমার বিবেচনায় লোকধর্মকে আমাদের মূল আইডেন্টিটি হিসেবে শনাক্ত করা প্রয়োজন, অন্তঃত বিবাদমান বাঙালিত্ব ও মুসলমানিত্বের প্রকাশ্য দ্বন্দ্বের কারণে"।
এই আলোচনাটা ব্লগে বলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের মুরুব্বিরা (বাংলাদেশীটা গোনায় ধরলাম না) বোধহয় টের পায়নি,- আপনি এমন একটা কথা বলেছেন। দেখা যাক, বাঙালি জাতিয়তাবাদীরা আপনাকে কেমন আদর আপ্যায়ন করে, দেখার অপেক্ষায় রইলাম।
৩। তারচেয়েও সম্ভবত আরও একটা কারণে আপনার লেখাটা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, কারণ তাজ্জব ব্যাপার হলো আপনার বাঙালির ইতিহাস ১৯৫২ সাল বা বড় জোড় ১৯৪৮ সালের উর্দুকে না বলা থেকে শুরু হয়নি।
৪. আপনি বলেছেন, "যদিও ১৯৭১ সালে কোনো কমিউনিস্ট বিপ্লব হয়নি...... তবে কমিউনিজম প্রভাবিত সেকুলারিজম এবং আধুনিকতা এক পর্যায়ে আল্ট্রা সেকুলারিজমে রূপ পেয়েছে, এবং ইসলামবিরোধিতা অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে বাঙালিত্বে অনুপ্রবেশ করেছে। মুক্তিযুদ্ধে ইসলামপন্থী দলগুলোর বিরোধিতা এই বিষয়টিকে সুনিশ্চিত করেছে। এই আল্ট্রা সেকুলারিজম ও মডার্নিজম বাঙালিত্বের দিক থেকে লোকধর্মকে উপেক্ষা করতে উৎসাহিত করেছে -- কারণ তা গ্রাম্য, কারণ তা অনাধুনিক। বাউল গান আধুনিক শিক্ষিতের কাছে অডিও ইন্ডাস্ট্রিবাহিত পল্লীগীতিমাত্র। লুঙিপরিহিত জটাধারী বাউল তার দৃষ্টিতে নিম্নবর্গের প্রতিনিধিমাত্র। মাজার হলো তার কাছে ভণ্ডগুরু ও গাঁজাখোর শিষ্যের আবাসমাত্র। অথচ দেখা যাবে নিম্নবর্গের বাউলের বা মাজারকেন্দ্রিক মুর্শিদের তত্ত্বকথা বোঝার বুদ্ধি আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালির ঘটে নেই বললেই চলে"। - একথা যদি মানেন তাহলে আপনার সাথে বাঙালি জাতীয়তাবাদের, চোখে পড়ার মত পার্থক্য হলো, আপনি সেকুলারিষ্টই থাকতে চান "আল্ট্রা সেকুলারিজম ও মডার্নিজম বাঙালিত্বের দিক" যেতে চান না। আর এটাকেই আপনি সমস্যা বা বিপদ হিসাবে দেখছেন। আপনাকে ঠিক বুঝলাম কী না জানি না। ভুল হলে বলবেন।
আসলে এদুটোর পার্থক্য কী? বুঝি নাই। আপনি সম্ভবত আরও কিছু বলতেন। আবার একটু বলবেন?
আপনার আর একটা অবজারভেশন বেশ আগ্রহ উদ্দীপক। বলেছেন, "ইসলামবিরোধিতা অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে বাঙালিত্বে অনুপ্রবেশ করেছে"। সম্ভবত আপনি একটু ভিন্নভাবে দেখার চেষ্টা করছেন। দেখা যাক এতে আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াই।
৫. তবু প্রথম প্যার‌্যাতেই বলছেন, লোকধর্ম হলো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চর্চিত গৌণধর্মসমূহ"। একেবারে গৌণ বানিয়ে দিলেন। মুখ্য গৌণের নির্ধারক কে? কী দিয়ে নির্ধারণ করব মুখ্য গৌণ? আমরা কী শহুরে ক্ষমতা কর্তৃত্ত্বের দাবড়ানি দেখিয়ে কথা বলছি না?
৬. "বাঙালিত্বে বিশ্বাসী যে সে তার মুসলমানিত্ব খারিজ করতে পারলে যেন বাঁচে" - এটা বোধহয় কম করে বললেন। এটা এখন, ইসলাম বা মুসলমান পরিচয় ত্যাগ করার উদাত্ত আহ্বান জানানোতে গিয়ে ঠেকেছে । এই সা. ই. ব্লগে এর কত ছড়াছড়ি। কোন মানুষকে সে যে ধর্মেরই হোক তাকে ধর্ম ত্যাগ করতে বলা কী ধরণের নিষ্ঠুর, অমানবিক বর্ণবাদী তো বটেই -সেই হুশ বিবেচনাও হারিয়ে বসে আছে এই দায়িত্ত্বজ্ঞানহীন
'মানুষেরা'। আমরা কারও চিন্তাভাবনাকে সমালোচনা তুলোধোনা করতে পারি, ধর্মের ভালোমন্দ নিয়ে তর্ক করতে পারি, এমনকি কূটতর্কও করতে পারি - কিন্তু একটা মানুষের ধর্মটাই খারাপ, ওর অন্য কোন ধর্মগ্রহণ করা উচিত - এই সীমাছাড়ানি কথাটার ভয়াবহতা যার উপলব্দিতেও আসছে না এমনই অমানবিক এক সমাজ তৈরি করছি আমরা! কারণ আমাদের মাথায় ধর্মহীন এক কাল্পনিক সমাজ বিরাজ করে। বাংলাদেশ তো দূরে থাক, দুনিয়ার কোথাও কোন সমাজে এটা বিরাজ না করলেও ওটাই আমাদের চাই, অসম্ভব হলেও ওটাই আমাদের আবদার। কারণ ধর্ম কী - এটাই তাদের জানা নাই। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও আধুনিকতার আড়ালে বসে এরা নিজেদের জন্য যথেচ্ছাচারের বন্দোবস্ত চায় আর এক ধর্মহীন সমাজের কল্পনায় বিভোর থাকে, এই অসম্ভব কল্পনাই সমাজকে এক নৈরাজ্য দাঙ্গার দিকে ঠেলে দিচ্ছে ক্রমশ। এমনিতেই বাঙালি জাতীয়তাবাদী আধুনিক মুসলমান তাঁর মুসলমানিত্ত্ব নিয়ে একটা হীনমন্যতায় ভুগে। এরা যতই ধর্মহীন এক কল্পনার সমাজে ভাসতে থাকে, কাউকেই তাঁর সঙ্কটের কথা বুঝাতে পারে না কিন্তু কষ্ট পায় - আর এতে ওদিকে ততই মোল্লা মৌলবি ধর্মের উপর একচেটিয়া লাভ করে। আমরা সব ওদের হাতে ছেড়ে বসে আছি। সেও বুশের সাথে ক্রসেড লড়ছে ভেবে মনের কষ্ট মিটায়, ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা তড়তড়িয়ে জায়গা করে নেয়। এক অদ্ভুত চক্রের মধ্যে আমরা সবাই আটকা পরে আছি।
৭. আপনি দাবি করছেন, "বাউল তত্ত্বে আত্মা ও পরমাত্মা একই, আত্মা পরমাত্মারই অংশ; তাই আত্মাকে জানাই হলো পরমাত্মাকে জানা। দেহের মাধ্যমেই আত্মাকে জানা বাউলদের আধ্যাত্মিক সাধনার অংশ। 'খাঁচা'র ভেতর 'অচিন পাখি'র আসা যাওয়ার অনুসন্ধানের কারণ হলো এই"। অথবা, "সুফিবাদ প্রভাবিত বাউলতত্ত্ব", "মারফতের অবস্থান থেকে তার প্রশ্ন শরীয়তপন্থা নিয়ে" - একথাগুলো আসলে তথ্যসূত্রে যাদের নাম দেখছি তাদের বয়ান। "আত্মা ও পরমাত্মা" সুফিদের এই ধারণার সাথে লালনের
"অপর" "অধরা" "পড়শি" "অচিন পাখী" ইত্যাদি ধারণার কোন সম্পর্ক নাই। আর সবচেয়ে বড় কথা সুফিবাদ কখনই ধর্মতাত্ত্বিক চৌহদ্দি পেরিয়ে নিজেকে ব্যাখ্যা করে নাই বা দাঁড় করায় নাই। বিপরীতে লালন সবসময়ই ধর্মতাত্ত্বিকতার বাইরে, ধর্মের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত সমস্ত চিন্তার পর্যালোচনা বা ক্রিটিক করে তার আগানো। বাংলায় প্রথম ধর্মের পর্যালোচক। লোকধর্মে সিনক্রেটিক (syncretic) বা সমন্বয়বাদীতা থাকতে পারে। কিন্তু লালন ধর্মের syncretic বা সমন্বয় দূরে থাক, সব চিন্তা বা ধর্মের পর্যালোচনাই তাঁর পথ।
আপনি ঠিকই ধরেছেন বাংলার সমাজগুলো তান্ত্রিকতা, সুফিবাদ ও বৈষ্ণববাদ ইত্যাদি অনেক কিছু পার হয়েছে। লালনের সাধক ধারার মধ্যে বৌদ্ধ তন্ত্র (শাক্ত ধারা নয়), ভক্তি ধারা বা নদীয়ার ধারার (বৃন্দাবনের বৈষ্ণববাদ নয়) প্রভাব থাকলেও আবার, এদের সবার তিনি ক্রিটিক। লালনের ষ্টাইলটা হলো, ধর্মের বা চিন্তাধারাগুলোর যে গল্প বা চরিত্র বা ঘটনাকে বর্ণনা করে আশ্রিত বা দাঁড়িয়ে ছিল লালন সেই গল্প, চরিত্র বা ঘটনাকেই তার কথা পারার উপায় হিসাবে নিয়েছেন ঠিকই। এরপর হয় পুরান ব্যাখ্যা বা বয়ানের মধ্যে এমন এক প্রশ্ন করে বসছেন যেটা নিজেই এর উত্তর, নয়ত নিজে সরাসরি নতুন ব্যাখ্যায় একে তাঁর গানে হাজির করেছেন। নদীয়ার বৈষ্ণবদের একই গোষ্ঠগান লালন সাধকদের ভোরবেলার গান; কিন্তু প্রশ্ন উত্থাপন ও ব্যাখ্যার কারণে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। লালনের নবীতত্ত্বের গান ইসলামের বেষ্ট ক্রিটিক।
আমাদের শহর, এর উপনিবেশিক বিকাশ ইত্যাদি নানান কারণে ঐ ট্রাডিশন থেকে শহরের আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে আমাদের লোকজ চিন্তা চর্চার ধারা থেকে উৎপাটিত হয়ে গেছি। ফলে এখন শহরের লোক অনেক পড়ালেখা করেছে অতএব সে বেশি জানে, লোকজ চিন্তাগুলোকে তাঁর দুনিয়ার চৌহদ্দিতে দেখা সীমাবদ্ধ ধারণা দিয়ে যা সে ব্যাখ্যা দিবে, যে মান অবস্হান নির্দেশ করে দিবে, লেখায় লিখিত অক্ষরে তাই ওটাই এর মানে বলে মানা হবে। ছোটলোকদের একটা নিচু চিন্তার লোকগীতির বেশি ওর মর্যাদা লাভ ঘটবে না, ঘটেনি।
আপনি কী খেয়াল করেছেন লালনের সম্পর্কে বলতে গেলেই কেন আমরা লালন সম্পর্কে আমাদের বিদ্যজনেরা কে কী বলেছেন তার উদ্ধৃতি দেই, ওখানেই লালনকে খুজতে যাই? আপনার তথ্যসূত্র তালিকা দেখুন, কলকাতার বাবুরা, ঐ সময়ের পত্রিকা, রবীন্দ্রনাথ, ডঃ আহমদ শরীফ বা সর্বশেষ আবুল হাসান চৌধুরি পর্যন্ত সবাই ওখানে আছে। লালন সম্পর্কে জানতে বা জানাতে গেলে সরাসরি লালনকে অর্থাৎ তাঁর গান থেকে উদ্ধৃতি টানা ও ঐ গানকে ব্যাখ্যা করে দেখানই কী অথেনটিক পথ নয়? লালন পড়ে কে কী বুঝেছেন - এটা তো সেকেন্ডারি সোর্স ও তাঁর ব্যাখ্যা। কেন আমরা সেকেন্ডারি সোর্সে সহজ, স্বস্তিবোধ করি? ভেবে দেখবেন।
৮. বলেছেন, "আজ যে মুসলমান একসময় বৌদ্ধ ছিল, পরে সে হিন্দু হয়েছে এবং আরও পরে মুসলমান হয়েছে" - তাই কী? আগে বৌদ্ধ পরে হিন্দু হয়েছে - আপনি কী তাই বলতে চেয়েছেন?

আরও অনেক কিছু বলার ছিল। পরে চেষ্টা করব হয়ত। কিন্তু আপাতত এখন শেষ করতে হচ্ছে। আমি আন্তরিকভাবে আপনার উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। ভালো থাকবেন।

 

লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): IdentityBangla & LalonIdentityBangla & Lalon ;
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ ভোর ৫:৩০ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ১৬ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ দুপুর ২:৩৭
ঘোর-কলিযুগ বলেছেন: পড়ে রাখলাম। বেশ কয়টা পয়েন্ট আছে কথা বলার মত। পরে সময় করে আলাপ করার ইরাদা রাখি। আপনার পুনর্পাঠের উদ্দ্যোগে সাধুবাদ। আশাকরি @ফাহমিদ ও অপরাপর ব্লগাদের অংশগ্রহণে আলাপ জমবে।

আমি বরং ''আত্মপরিচয়'' বিষয়টা বাংলাদেশের ইতিহাস ও জাতীয়তাবাদের বয়ানে কিভাবে, কি প্রয়োজন ও উপাদানে তৈরি হয় তাকেই পয়লা বুঝতে ইচ্ছুক। কেন আমাদেরকে দেখাতে হয় যে ''আত্মপরিচয়'' নির্ধারণের সমস্যায় জর্জরিত হওয়ার মধ্যেই বাংলাদেশের জন্মের উদ্দেশ্য ও রাজনীতির ব্যার্থতা নির্ধারিত হয়ে যাচ্ছে। ''আত্মপরিচয়''র মিমাংসার সমস্যাই অসাম্প্রদায়িকতা মায় ইসলাম ''মুক্ত'' হওয়া না হওয়ার সম্ভাবনা হাজির করে।

ফলে গোড়ার কথা হলো বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম বা এই জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক লড়াই-সংগ্রামের ধারাবাহিকতার কেন্দ্রীয় বিষয় কেন 'আত্মপরিচয়' কেন্দ্রিক বয়ানের মাধ্যমে আবর্তিত হয় তাকেই আগে শিকড় শুদ্ধ বোঝা দরকার।
১৭ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ রাত ৩:০৩

লেখক বলেছেন: ১. আত্মপরিচয় মানেই জাতীয়তাবাদ - এটা অনেকে ধরে নেয়। পরিচয় দাঁড় করালেই সেটা জাতীয়তাবাদ হয়ে যাবে এমন স্বতঃসিদ্ধ কোন কারণ নাই।
২. পরিচয় দাঁড় করানোর কারণটা অনুভূত হয় হাজির হয়ে যায় জনগোষ্ঠিকে একতাবদ্ধ করার তাগিদ থেকে। বাংলায় দাড়িয়ে বাংলায় ভেবে দুনিয়াকে একত্রিত করার মত পরিচয়ও দাঁড় করানোর মত কথা বলা যায় হয়ত, তবে এর আশু বাস্তবায়নটা একটা রাষ্ট্রের মধ্যেই ভাবতে হবে। এই স্ববিরোধীতা এর অনুসঙ্গ।
৩. ফাহমিদুলের কথাটা ততটুকুই ইতিবাচক যতটুকু সে বাঙালি জাতীয়তাবাদী পরিচয়টাকে প্রশ্ন করতে পারছে বা সঙ্কটটা উপলব্ধি ও স্বীকার করতে পারছে।
৪. আবার শেষ বিচারে ফাহমিদুলের প্রশ্নটা ফাঁপা, খামোখা। কারণ ঘুমানোর সময় খামোখা কোলবালিশের মত "অসাম্প্রদায়িকতা" তাঁর লাগবেই বলে তাঁর একটা গোঁ আছে। ফলে এই চিন্তার ভবিষ্যৎ নাই, পন্ডশ্রম।

২. ১৬ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৪:২৩
েপচাইললা বলেছেন: @ ঘোর কলিযুগ : আত্মপরিচয় নির্ধারণের যে সাম্প্রতিক ট্রেন্ড তাতে এই বিষয়টা সম্ভবত শুধুমাত্র রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পেক্ষপটকেই তুলে ধরবে, সামগ্রিক প্রেক্ষিতকে নয়। সামগ্রিক প্রেক্ষিত বলতে আমি আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ও নৃ-তাত্ত্বিক প্রেক্ষিতের কথা বলছি।

আপনাদের আলোচনায় যোগ দেয়ার আশা রইল। যদিও নিশ্চুপ থাকব বেশিরভাগ সময়, জানাশোনার পরিধি কম বলে।

ব্লগে ঢোকাটা আজ সার্থক মনে হল। টিনেজারদের হালকা সেক্সুয়াল সুড়সুড়ি, হাসিঠাট্টা আর রাজনৈতিক কচকচানির বাইরেও নির্মল জ্ঞানচর্চা হয় সেখানে ঢুকতে ইচ্ছে করছে।
ধন্যবাদ।

আর ভূ-পর্যটকের সমালোচনার ভাষা এবং স্টাইল সিম্পলি অসাধারণ। যাই এখন ফাহমিদ স্যারের লেখাটা পড়ে আসি। কিন্তু সমস্যায় পড়ে যাব কারণ সমালোচনা আগে পড়ে ফেলায় সেগুলো মনে হতে থাকবে বারেবার।
১৭ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ রাত ৩:১৮

লেখক বলেছেন: ফাহমিদুলের লেখাটা পড়ে আবার ফিরবেন আশা করি।
মন্তব্য লিখবেন।

৩. ১৬ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:১৭
ফাহমিদুল হক বলেছেন: আপনাকে ধন্যবাদ এই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করার জন্য।
আপনার পয়েন্টগুলো ধরে আমি কিছু আলোচনা করতে পারি:

১. আমি অসাম্প্রদায়িকতা বলতে এমন একটা কাঙ্ক্ষিত সমাজের কথা বোঝাতে চেয়েছি যেখানে সম্প্রদায় থাকবে কিন্তু, উগ্র সাম্প্রদায়িকতা থাকবে না। সেটা হয়তো ধর্মহীন কোনো সমাজও নয়। লোকধর্মের দার্শনিকতায় সেটার অস্তিত্ব আছে। তবে আপনি যদি বলেন আমি অসাম্প্রদায়িক উপাদান খুঁজতে নেমেছি এবং তা স্বীকার করি তবে ফাঁদে পড়া হবে, এবং মূল আলোচনা অন্যদিকে ঘুরে যেতে পারে। আমি ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গে বিদ্যমান আত্মপরিচয়গত আশ্রয় খুঁজতে চেয়েছি যার মাধ্যমে একটি সহনশীল, মুক্তিমুখীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।

২. আপনি ঠিকই ধরেছেন। সেহিসেবে মুরুব্বিরা চুপচাপই ছিলেন, পোস্টপ্রদানকালে। কিন্তু আমি তো এটাও বলেছি যে লোকধর্মকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব হয়তো বাঙালিত্বের অনুসারীদেরই।

৩. আপনি তাজ্জব হচ্ছেন দেখে আমি তাজ্জব হচ্ছি। কারণ একটি জাতির আত্মপরিচয় বিশ্লেষণে কয়েক দশকে আটকে থাকা মানে খণ্ডিত ইতিহাসকে জানা।

৪. আল্ট্রা সেকুলারের সঙ্গে সেকুলারের পার্থক্য তো আছেই, 'আল্ট্রা' শব্দটায়। তবে বিষয়টা পুরোটা তাই নয়। আমি বলছি যে লোকধর্মকে মূল আত্মপরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেমন একসময় ছিল। লোকধর্মে ধর্ম আছে, কিন্তু একটি নির্দিষ্ট ধর্মের প্রাধান্য নেই। একটি উদারবাদী সিনক্রেটিক ধারা সেটা। সেহিসেবে সেখানেও সেকুলারিজম আছে, তবে মডার্নিজমবাহিত সেকুলারিজম নয় তা। আর আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাসও এই আলোচনায় গৌন হয়ে যায়, কারণ আমি বিদ্যমান আত্মপরিচয়ের ধারাসমূহের মধ্যে অপেক্ষাকৃত মানবমুখীন ধারাটার ওকালতি করতে চাচ্ছি, বৃহত্তর মাত্রায়।

৫. ইসলাম বা হিন্দুধর্মের তুলনায় লোকধর্ম গৌনধর্ম -- এর মানে এই না যে এর শক্তিমত্তা বা দার্শনিকতা গৌন। এর অনুসারীদের সংখ্যাগত দিক থেকে আমি গৌন বলেছি।

৬. এই চক্রের মীমাংসা হতো পারে লোকধর্ম।

৭. সুফিবাদ ধর্মের চৌহদ্দি পেরোতে পারেনি, কিন্তু বাউলমতে সুফিবাদের প্রভাব তো অস্বীকার করা যায়না। সুফিদের ফানাফিল্লাহ-র ধারণা বাউলমতে প্রভাব ফেলেছে। আত্মা-পরমাত্মার ধারণাটিও বাউলমতে আছে। তবে অবিকৃতভাবে আসেনি তাতো বলাইবাহুল্য।

একটা জিনিস বলা দরকার, এই আলোচনায় লালনের গূঢ়তত্ত্ব জানা উপযোগী হলেও আবশ্যিক নয়। তবে বাউলদর্শনের মূল বিষয়গুলো সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকার দরকার। আমি প্র্যাকটিশনার বাউল না, নবিশ একাডেমিশিয়ান মাত্র। লালনের গান নয় সেকেন্ডারি সোর্স থেকেই আমার লোকধর্মপাঠ। আমার ক্ষুদ্র মেধার যোগে তাকে আত্মপরিচয়ের আলোচনায় তুলে আনার চেষ্টা করেছি। বঙ্গীয় সমাজ-ইতিহাসে লালনের অবস্থান ও তাৎপর্য কী, তা এই আলোচনায় আমি তুলে ধরতে চেয়েছি।

৮. আমি আলোচনায় বলেছি যে আর্যরা বিলম্বে বঙ্গে প্রভাব রাখতে শুরু করে। আর্যরা আসার পূর্বে অনার্য অনির্দিষ্ট ধর্মসমূহের পরে বৌদ্ধধর্মই বঙ্গে পালিত হতো, পালরা তো বৌদ্ধই ছিল। পরে সেনরা পালদের তাড়িয়ে দিলে প্রথমবারের মতো বঙ্গে ব্রাহ্মণ্যবাদ সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। বৌদ্ধদের যারা পালাতে পারেনি, তারা হিন্দুত্ববাদের ছায়ায় একরকম আত্মগোপন বা আত্মপরিচয় বদলে ফেলে। এই হিন্দু-পরিচয়ধারী-বৌদ্ধরাই বেশি পরিমাণে মুসলমান হয়েছে। সেই হিসেবে প্রথমে বৌদ্ধ, পরে হিন্দু এবং শেষে মুসলমান -- এইতো পরিচয়বদলের ক্রনোলজি।
১৭ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ ভোর ৫:৩৪

লেখক বলেছেন: ক. ইতিহাস পাঠ করতে গেলে নির্লিপ্ততা লাগে মানবেন আশা করি। কিছু আশা করে মন "কাঙ্ক্ষিত" রেখে ইতিহাস পাঠ হবে না, একজামিন করা যাবে না। চিন্তাকে স্বাধীন না রাখতে পারলে কোন চিন্তাই অসম্ভব। সবকিছুকেই এমনকি, নিজেকেও প্রশ্নের বিষয় করতে তৈরি থাকতে হবে। তবেই চিন্তার সর্বগম্যতা নিশ্চিত হবে।
আপনার কাঙ্ক্ষিত সমাজ "অসাম্প্রদায়িক" হতে হবে ফলে এটাকে প্রশ্ন করা যাবে না বলে চিন্তার বাইরে রাখছেন, কেন?
"অসাম্প্রদায়িকতা" ভাবনাটা আপনার কাছে এতটাই প্রশ্নাতীত যে ঐ চশমা ছাড়া বাংলার পেছনের ইতিহাসকে দেখতেও আপনি রাজি নন। কোন চিন্তা যখন আগাম সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় যে নিজেরই কিছু কিছু চিন্তাকে সে প্রশ্ন করবে না - এর মানে হোল ঐ চিন্তা স্বাধীন সৎ হবার, চিন্তা হবার মৌলিক শর্ত লঙ্ঘন করছে।
কোন সমাজ বা রাষ্ট্র ঠিকঠাক যদি সম্প্রদায় বা একটা কমিউনিটি গঠন করতে পারে তবে তা আবার সাম্প্রদায়িক হয়ে যাবার ভয় কেন? ভয় যদি থাকে তবে বুঝতে হবে ওটা কমিউনিটি হয় নাই। ইনসাফ বা ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে একটা কমিউনিটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্হা কায়েম গঠন করতে পারে যদি তাহলে ঐ রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পরিচয় দেবার পর আবার "অসাম্প্রদায়িক" বলার দরকার পড়ছে কেন? যদি পড়ে তাহলে বুঝতে হবে ওটা ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয় নাই, ঘাপলা আছে; যে ঘাপলা আবার "অসাম্প্রদায়িক" তকমা এঁটে দূর করা যাবে না। কারণ ধর্ম, বর্ণ, গোত্র বা সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবাইকে নাগরিক হিসাবে দেখতে রাষ্ট্রের কোথাও কোন কারণে অপারগতা আছে। যে অপারগতাটা আসলে রাষ্ট্রের নয়, চিন্তার, আমাদের।
ভারতীয় জাতীয়তাবাদের একটা আদিপাপ আছে। যা ঢাকতে ভারতীয় রাষ্ট্র নিজেকে গণতান্ত্রিক বলে শান্তি পায়নি, আবার "অসাম্প্রদায়িক" বলতে হয়েছে। কিন্তু সঙ্কট চাপা পরেনি তাতে। আর আমরা ওটা পর্যালোচনা ছাড়াই কপি করেছি, ফলে সঙ্কটে পড়ে ভুগছি। তবু বেহুশে এখনও "অসাম্প্রদায়িকতা" কপচিয়ে যাচ্ছি। এমনকি লোকধর্ম খুঁজতে নেমেও আপনি "অসাম্প্রদায়িকতা" বগলে নিয়ে হাটছেন। আমাদের ইতিহাসে দাঙ্গার অভিজ্ঞতার প্রতিক্রিয়া ও মূল্যায়নে যেমন ধর্মহীন কাল্পনিক সমাজের স্বপ্ন দেখে কেউ কেউ তেমনি আর একদল আছে যারা "অসাম্প্রদায়িকতা" কাল্পনিক সমাজের স্বপ্নে বিভোর। আমাদের "অসাম্প্রদায়িকতা"র অভিজ্ঞতা কম দিনের, ভারতের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাটাও আমাদের "অসাম্প্রদায়িক" ধারা পরখ করে দেখেনি? বর্তমান কংগ্রেস-প্রগতিশীলের (?) জোট সরকার (বিজেপি না) সরকারি সামরিক কর্মসূচী নিয়েছে - এক কমিউনিটির হাত থেকে অপর কমিউনিটিকে রক্ষা করার নামে অস্ত্র সরবরাহ করে সশস্ত্র করেছে। এভাবে সঙ্কট মোকাবোলা হবে বিশ্বাসও করতে বলছে। একোন "অসাম্প্রদায়িকতার" কমিউনিটি? ভারতের সাধারণ হিন্দু নাগরিকের ইসলাম ও মুসলমান বিদ্বেষ - এপর্যন্ত দেখা ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে চরমে, একইভাবে বিপরীত কমিউনিটিটা সম্পর্কে একই কথা বলা বাহুল্য। এতে বুঝা যাচ্ছে, সমাজ-গাঠনিক বন্ধনে কমিউনিটির কোন নূন্যতম বৈশিষ্ট আর অবশিষ্ট নাই। "অসাম্প্রদায়িক" রাজনীতির এই পরিণতির কোন মূল্যায়ন না করে কী আমরা আবার বগলে "অসাম্প্রদায়িকতা"র ইট নিয়ে লোকধর্ম খুজতে যেতে পারি? ফাহমিদুল - এই প্রশ্ন মোকাবিলা করেই আপনাকে আগাতে হবে। আবার দেখুন, আপনার লোকধর্ম খুজতে নামাটা "অসাম্প্রদায়িক" ভাবনার সঙ্কটটাকেই প্রকাশ করে। তবে আপনি ফাহমিদুল ধন্যবাদ পাবার যোগ্য অতটুকুই যতটুকু আপনি সঙ্কটটা প্রকাশ করতে পারছেন, আঁচ করতে পারছেন। কিন্তু বগলে "অসাম্প্রদায়িক" ইট থাকার কারণে
"অসাম্প্রদায়িক লোকধর্ম" - এই সোনার পাথরের বাটিই কেবল আপনার হাতে উঠবে, যার জন্য আপনি আকাঙ্খী। কিন্তু ধর্ম কী? কী করলে ধর্ম থেকে মুক্তি মিলবে, নাকি এটা অন্তর্লীন অঙ্গীভূত করে ফেলার কোন বন্দোবস্ত আছে, ধর্মকে পর্যালোচনা মোকাবিলার পথ কী -এটা কখনই আপনার জানা হবে না। ধর্ম আপনার পিছু ছাড়বে না।


বাকি প্রসঙ্গ নিয়ে পরে আসছি।

৪. ১৬ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:২১
ফাহমিদুল হক বলেছেন: ঘোর-কলিযুগ, আত্মপরিচয়ের আলোচনা সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ। আর এটা যদি একরকম 'অ-মীমাংসিত' থাকে, নানা ঘটনাপ্রবাহে এই আলোচনায় ফিরে ফিরে আসতে হয়। যেমন আমার পোস্টের শিরোনাম ছিল 'বাউলের মূর্তি সরানোয় মুসলমানি সাফল্য'।
২১ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:১৫

লেখক বলেছেন: 'বাউলের মূর্তি সরানোয় মুসলমানি সাফল্য' - প্রসঙ্গে আমার কিছু বলা হয়নি। এক্ষেত্রে ফ্যাক্টস হলো, এটা কোন ইসলামি রাজনৈতিক সংগঠনের কাজ নয়। যাদের কাজ তারা বর্তমান ক্ষমতাশীনদের হাতে খেলার পুতুল। "বাউল" ভাস্কর্যের বেলায় আমিনী ঘটনার ঘটনে নয়, প্রতিক্রিয়ার আঁচ থেকে থেকে কিছু ক্রেডিট নিতে চেয়েছিল তবুও ঐ একই পুতুল হয়ে। বলাকা ভাঙ্গার বেলায় সে ক্রেডিটও চাইতে আসেনি।

মুর্তি ভাঙ্গা যখন আকর ক্ষমতার কাজে নাচের পুতুলের মত ব্যবহার শুরু হয়েছে - এটাই ভয়াবহ ইঙ্গিত। সমাজে ইসলাম নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু এটাকে যারা হিংস্র রক্তারক্তির ক্ষমতার কাজে ব্যবহার করছে এরা বির্তকের উভয় পক্ষের কেউ না। এদের তৎপরতার মুখোশ খুলে দেওয়া, কঠোর হাতে দমন করা দরকার। ওরা এই কাজটা করেছে আমরা উভয় পক্ষ যেন পরস্পরের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাই, মারমুখি হ্ই, দাঙ্গা মারমুখি সমাধানের দিকে ঝুকে পরি - এই উস্কানি দেবার জন্য।
আমরা যদি উভয়ে এই উস্কানি উপেক্ষা করতে পারি, একমত হতে পারি যে, আমাদের অমীমাংসিত বিতর্ক আছে আমরা আরও বিতর্ক করব, কিন্তু কোনভাবেই এর সমাধান দাঙ্গা মারামারি করে চাই না। একে কেন্দ্র করে সমাজ দ্বিধা বিভক্ত করতে চাই না।

ফলে একে "মূর্তি সরানোয় মুসলমানি সাফল্য' - বলে দেখা বা দেখানো হবে ওদের উস্কানিতে পা দেওয়া। এর মধ্যে "মুসলমানি সাফল্য' কিছু তো নাইই বরং দেশের স্বার্থ বিরোধী বাইরের স্বার্থ আছে।

৫. ১৭ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৫:৩৪
ভূপর্যটক বলেছেন: ক. "বাউল" প্রসঙ্গে:
বাউল নাম পরিচয় কলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিবৃত্তির দেওয়া, অথবা বলা যায় বীরভূম কেন্দ্রিক "বাউল" রা শহরের দেয়া যে নামে স্বস্তি বোধ করে সেই নাম। এর সঙ্গে লালনকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়ার ছেউরিয়া বা আখড়ার তৎপরতার কোন সম্পর্ক নাই। কলকাতার পড়ালেখা জানা বাবুভদ্রজনেরা যেমন বাইরে থেকে দেখে "বাউল" বলে একটা নাম দিয়েছে তাদের লেখায়, ওটা পড়ে আমাদের এই বাংলার শহরের শিক্ষিতজনেরা লালনকে, একইভাবে দূর থেকে "অশিক্ষিতদের" কাজকারবারকে বাউল বলে নামের ট্যাগ ঝুলিয়ে দিয়েছে। তার মানে দাঁড়াল, বাংলাদেশের শিক্ষিতদের জ্ঞানের সূত্র কলকাতার শিক্ষিতরা। নিজের একবারই বাড়ির কাছের কুষ্টিয়ার ছেউরিয়া বা খোদ লালন নয়। ছেউরিয়ায় বছরে দুইদুইবার মেলা আজকাল শিক্ষিতদের আনাগোনায় ভরপুর হয়। ওখানে সমাগমের কেন্দ্রে থাকে লালন ঘরের (school) অনুসারীরা, তাঁরা তাদের সাধুসঙ্গ আয়োজনে নিজের মত ব্যস্ত থাকে। একে কেন্দ্র করে একটা বলয় পাওয়া যায় যারা এই সাধুসঙ্গ ফকিরদের কাজকর্ম বুঝে হয়ত কিন্তু পেটের দায় বড় দায়, সেখানে হার মেনে তারা একটা ভেক ধরে। যে ধরণের ভেক শহরের শিক্ষিত মানুষেরা দেখতে পছন্দ করে, বাউল বলে ডাকে। পেটের দায়ের কাছে হার মেনে এরা শহরের মানুষ যা চায় যেভাবে চায় ওরা তাই করে। এদের সাধারণত চেনা যাবে গেরুয়া বসন, বা ছালকাপড়ের দৃষ্টি আকর্ষণী বসন দেখে। যারা লালন ঘরের (school) অনুসারী তাদের বসন সাদা, গেরুয়া দূরে থাক অন্য কোন রংয়ে তাদের পাওয়া যাবে না। এরপর এই দ্বিতীয় বলয়ের বাইরে পাওয়া যায় সরকারি অনুষ্ঠান আয়োজন কেন্দ্রিক আমজনতা, শহুরে দঙ্গল। তো যে কথা বলছিলাম, আমরা কুষ্টিয়া গিয়েছি অনেকেই - কেউ জানতে চাইনি লালন ঘরের (school) অনুসারীরা নিজেদের কী পরিচয় দেয়। বাউল না অন্য কিছু? আমরা আমাদের শিক্ষিত জ্ঞানের উপর এতই আস্হা যে আমাদের কোন জিজ্ঞাসা নাই। আমরা জানিই না পশ্চিমবঙ্গের বাউল বলে যা আছে এর সাথে লালনের ধারার কোন সম্পর্ক নাই। লালন বাউল নন, উনি ফকির লালন। লালন ঘরের (school) অনুসারীরা নিজেদের ফকির বলে পরিচিতি দেয়। গেরুয়া নয়, সাদা তাদের পোষাকের রং। এদের অন্তরের ভাবনার বৈশিষ্ঠ তো আছেই, এসব বাইরের বিষয়ও আমরা ঠিকমত খবর নেইনি, বেখেয়াল।
অতএব, প্রথমত আপনার "বাউলমত", "বাউল দর্শন" "প্র্যাকটিশনার বাউল" - বাউল শব্দের এই ব্যবহার বিভ্রান্তিকর, মিসলিডিং নিঃসন্দেহে। দ্বিতীয়ত, "লালনের গূঢ়তত্ত্ব" বলে যেভাবে গোপন, আধ্যাত্মিক বা রহস্যের এক ধারণা ছড়ানোর চেষ্টা করছেন - এটা মারাত্মক অবিচার। আমাদের অজ্ঞতার ঢাকার জন্য একাজ খুবই গর্হিত হবে।
আপনি নিজে "লালনের গান নয় সেকেন্ডারি সোর্স থেকেই আমার লোকধর্মপাঠ" বলে জানিয়ে ভাল করেছেন। আমি আশা করব, সেকেন্ডারি সোর্স অর্থাৎ পরের মুখে ঝাল খেয়ে আসলেই ওটা ঝাল কিনা তাঁর কতটুকু জানা যাবে - এটা আপনি বুঝেন ও বুঝবেন। এছাড়া, সেকেন্ডারি সোর্সের বরাতে কারও চিন্তা সম্পর্কে পাঠককে ধারণা দেওয়ার জন্য লেখা রচনার মূল্য কতখানি - শিক্ষক বা একাডেমিক মানুষ হিসাবে আপনি এটাকে কীভাবে দেখবেন! এটা অপরাধ নয় কী? আপনার বিবেচনার উপর ছেড়ে দিলাম। আপনি কেমন তার ধারণা যদি আপনার রচনা পাশে ফেলে রেখে অন্যের আপনার সম্পর্কে কী ভাবনা সে লেখার (সেগুলো আবার আপনার কোন রচনার ভিত্তিতে কোন রেফারেন্স দিয়ে লেখা নয় - এমন হয়) বরাতে দাঁড় করাই - তাহলে আপনি কেমন অনুভব করবেন - ভেবে দেখুন। লালনের গান তো দূস্প্রাপ্য নয়, গানের অডিও বা লিরিক তো আপনার দেয়া তথ্যসূত্র বইগুলোতেই আছে। ফলে সেগুলো পাঠে লালনের বা তাঁর গানের বরাতে লোকধর্ম বা লালন সম্পর্কে আপনার দাবিগুলো প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবেন - আমরা এমন আশা করলে কী খুব বেশি হবে!

খ. আপনি আবার দাবি করছেন, "সুফিবাদ ধর্মের চৌহদ্দি পেরোতে পারেনি, কিন্তু বাউলমতে সুফিবাদের প্রভাব তো অস্বীকার করা যায়না। সুফিদের ফানাফিল্লাহ-র ধারণা বাউলমতে প্রভাব ফেলেছে। আত্মা-পরমাত্মার ধারণাটিও বাউলমতে আছে। তবে অবিকৃতভাবে আসেনি তাতো বলাইবাহুল্য"।
লালনের কোন গানে শব্দে বা ভাবে অথবা আপনার ভাষায় "অবিকৃত বা বিকৃতভাবে" - সুফিদের ফানাফিল্লাহ, আত্মা-পরমাত্মার ধারণা আছে - একথা সত্যি নয়।
আপনি কোন গানে এটা যদি দেখে থাকেন সেটা জানিয়ে আপনার কথা প্রতিষ্ঠা করার আগে পর্যন্ত আপনার দাবি আপাতত তুলে রাখলাম।

গ. "উদারবাদী সিনক্রেটিক" বা ধর্ম সমন্বয়ের ধারা আপনি খুঁজে ফিরছেন। লালন ধর্ম সমন্বয়ের ধারার লোক নন। বরং সব ধর্মের ধর্মতাত্ত্বিক বয়ানকে তুলোধুনা করে মানুষের চিন্তা, ভাবকে মুক্ত করাই হলো লালনের ধর্মের পর্যালোচনার পথ। ক্ষীণদৃষ্টির কারণে কেউ কেউ একে আপতিকতায় ধর্ম সমন্বয় ভাবেছে। এনিয়ে আপনি পছন্দ করলে Click This Link আরজুর এই ব্লগটা দেখতে পারেন। ওখানে আমার কিছু কথা বলার সুযোগ হয়েছিল।

ঘ. আপনার জবাবের ৮ নম্বর পয়েন্ট: "সেই হিসেবে প্রথমে বৌদ্ধ, পরে হিন্দু এবং শেষে মুসলমান -- এইতো পরিচয়বদলের ক্রনোলজি"।

এনিয়ে পরে আরও বিস্তারিতে বলব। আপাতত ভাবতে থাকুন, বৌদ্ধ বা অন্য কোন ধর্ম থেকে হিন্দু ধর্মে ফিরে আসার কোন ব্যবস্হা কী হিন্দু ধর্মে আছে?

আপাতত এখানেই। পরে আবার আসব। আপনার শুভ কামনায়।



৬. ১৭ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ রাত ১১:১২
ঘোর-কলিযুগ বলেছেন: ''আমি ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গে বিদ্যমান আত্মপরিচয়গত আশ্রয় খুঁজতে চেয়েছি যার মাধ্যমে একটি সহনশীল, মুক্তিমুখীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।''--- আমি নিজে @ ফাহমিদের কথার সারসংক্ষেপ করার চাইতে এই উপরি উদ্ধৃত অংশটায় নজর ফেলতে বলব। তিনি কি চান বা কি প্রয়োজনে এই পরিচয়গত ব্যাখ্যা বা বয়ান দাঁড় করিয়েছেন তার হদিস এতে মিলে।

প্রথমে আমরা আসি ''আত্মপরিচয়গত আশ্রয়'' খোঁজার প্রসঙ্গে।

আমাদের শহুরে মধ্যবিত্তের সমস্যাটা তৈরি হয় বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরে। ঐতহাসিক ধরাবাহিকতার মধ্যে এই আবির্ভাবের তাৎপর্য এবং নিজেকে 'জাতি' হিসেবে নতুন করে দাবির মাধ্যমে জাতিরাষ্ট্রের ধারণার সাথে একটা আবশ্যিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার দরকারে। এটাকে একটা ঐতিহাসিক অনিবার্যতার সফল পরিসমাপ্তি বা অরো স্পষ্ট করে বললে জাতির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য এবং স্বাতন্ত্র দ্বারা নির্ধারিত গতিপথের চুড়ান্ত অভিপ্রকাশ বলে প্রমানের জায়গা থেকে ব্যাখ্যা অরম্ভ করা।( নজির: মুনতাসির মামুনের 'বাংলাদেশ, বাঙ্গালি মানস....." বইটা দ্রষ্টব্য। এটা নিয়ে পরে কখনো একটা পোস্ট দেওয়ার ইরাদা রাখি) বলা ভালো প্রায় সব সাংস্কৃতিক জাতিয়তাবাদই এটা করে ও ধরে নেয়। নিজেকে জাতি হিসেবে সংগঠিত (টেলিওলজিক্যাল অবজেক্টিভ) করার উপাদানের অনুসন্ধান ও বিকাশ দেখানোই হলো এই ধরণের আলোচনার কেন্দ্রীয় বিবেচ্য। এবং অবধারিতভাবে একটা পর্যায়ে সেই উপাদান রাজনৈতিক উপাদান হয়ে উঠবে এবং শত্রু-মিত্র বিভাজনের সংঘবদ্ধতায় চুড়ান্ত সংঘাতের জন্ম দিয়ে ''আত্মপরিচয়''র লড়াই হিসেবে হাজির হবে। এক্ষেত্রে এই বিশেষ ধারার বয়ানের প্রধান মাল-মশলার যোগান দিতে তুলে ধরা হয় নৃতাত্ত্বিক কুলজি আর ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে সংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিশেষত যাকে আমরা ''হাজার বছরের'', ''আবহমান কালের সংস্কৃতি'' বলে শুনতে অভ্যস্ত। এই বয়ান দাঁড় করানোর জন্য আবার প্রধান আশ্রয় হলো ভাষা। বাংলা ভাষার জন্ম ও বিবর্তনের হাতে হাত রেখে কিভাবে বাঙ্গালী জাতি ক্রমে সংগঠিত ও জাতিত্বের চেতনায় উজ্জীবিত হয়েছে সেই নিরবিচ্ছিন্ন ধারাবর্ণনা। ভাষার মাধ্যমে জাতিত্বের এই নির্ধারক সংহতি ও সংঘবদ্ধতার যে প্রাকৃতিক ভিত্তি ধরে নেওয়া হয়েছে এবং প্রায় সমার্থক গন্য করে বয়ান খাড়া করা হয়ে থাকে সে বিষয়ের বিস্তারে এখানে প্রবেশের ফুরসত নেব না। তো মোটা দাগে আদি ও অকৃত্রিম সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বলে যা কিছু শনাক্ত করা হয় স্বভাবতই তার সবই মেলে নৃতাত্ত্বিক খোঁজাখুজি আর মধ্যযুগের ভান্ড়ারে। তো এখান থেকে গজাতে থাকে শ্বাশত ঐতিহ্য নামক চিজটার ডালপালা। এখানেই খাড়া করা হয় আসল প্রেমাইসটা; কি তার অংশ আর কি তার অংশ নয় বা যেভাবে বলা হয় '' বাইরে থেকে আসা'' তা ঠিক করার মানদন্ড। এতকথা বললাম এই বিশেষ দিকটার প্রতি নজর ফেরানোর জন্য, এর চরিত্রের এই গুঢ় মর্মার্থের ভেতর বাসা বাঁধা সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ধরবার তাগিদে। মজার ব্যাপার হোল এই সাম্প্রদায়িকতাকেই বলা হয় সেক্যুলার ধারা!!

তো ধর্ম হিসেবে ইসলাম বা ইসলামের বিশ্বাস, চর্চার অনুসঙ্গ ও মূল্যবোধের সাথে এখানকার জনগোষ্ঠী যারা মুসলমান হয়েছে (ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে) তারা কি ধরণের সম্পর্ক রাখবে বা অন্য কথায় কতটুকু রাখতে পারে তাকে নির্দিষ্ট করে দেওয়ার তর্ক আকারেই আত্মপরিচয়ের সাংস্কৃতিক বয়ান তৈরি করার মূল লক্ষ্যে পরিচালিত । ভারতীয় বা বাঙ্গালী জাতিয়তাদের কোন বয়ানেই ইসলামকে উপমহাদেশের ইতিহাসের অংশ হিসেবে স্বীকার করে তার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য গঠনে এর ভূমিকার পর্যেলোচনা করা হয় না। বরং মুসলমানরা ইসলামের সাথে সম্পর্কের সমাপনুপাতিক মাত্রায় ভারতীয় বা বাঙ্গালীত্ব থেকে খারিজ হতে থাকে। পুরো ব্যাপারটাই খাড়া করা হয় ধর্ম বনাম সংস্কৃতির বিশুদ্ধ বিভাজনে। মুসলমানদের ক্ষেত্রে ধর্ম বা ইসলামের ইতিহাসের কোন কিছু গ্রহণ মানেই যেন সেই 'অকৃত্রিম সংস্কৃতি' থেকে বিচ্যুতি, ভারতীয়ত্বের বাইরে চলে যাওয়া।

তো বিদ্যমান এই ''ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে''র প্রশ্নহীন খরিদ্দার হয়ে এখানকার তথাকথিত সেক্যুলার ধারা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আর্বিভাবের পর পূর্ব বাংলার যে কৃষক সম্প্রদায় (মুসলমান+তফসিলী হিন্দু সম্প্রদায়), আলাদা হয়ে একটি রাজনৈতিক জনগোষ্টী হওয়ার সংগ্রাম করেছিল তাকে কিভাবে মুল্যায়ন করবে সেটা মুসাবিদা করে নেয়। কৃষক-প্রজার (তফসিলী সম্পদায়ের বর্ণাশ্রম প্রথার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ধারাবাহিকতা) জমিদার-মহাজনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াইটাই এদের কাছে হয়ে পড়ে সাম্প্রদায়িক আত্মপরিচয়ে ঝুকে পড়া পশ্চাদপদতার কালপর্ব। সাম্প্রদায়িকতায় খাবি খাওয়া। ঠিক এখান থেকেই ন্যয্যতা উৎপাদন করা হয় বাহারি 'অসাম্প্রদায়িকতা' বা সেক্যুলার আত্মপরিচয়ের রাজনীতির।

তো এই অসাম্প্রদায়িকতা আর সেক্যুলার সংস্কৃতির মামলায় পরে ফিরতি বার কথা বলব। আসছি...
৭. ১৮ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৪:০৭
ফাহমিদুল হক বলেছেন: @ভূপর্যটক, আপনি আপনার ফাঁদ দিয়ে মোটামুটি আমাকে আটকে ফেলেছেন। এইবার আমি তবে বেরুনোর চেষ্টা কর।

১. আমার পোস্ট পড়ে আপনি কী কী ভাবে নিশ্চিত হলেন যে আমি বগলে 'অসাম্প্রদায়িকতা' নিয়ে হাঁটছি? গড় উপসংহারের পরিবর্তে আমি এক্ষেত্রে পোস্টের উদ্ধৃতি বা কাঠামোগতভাবে কীরকম অসাম্প্রদায়িকতাপ্রত্যাশী তা একটু বোঝান।
২. স-সাম্প্রদায়িকতার আত্মপরিচয়গত কোন রূপরেখা আপনি বিকল্প হিসেবে উত্থাপন করতে চান? অর্থাৎ আপনার বগলে অসাম্প্রদায়িকতার পরিবর্তে কী ফর্মুলা লুক্কায়িত রয়েছে, তা বের করে দেখান।
৩. অন্যের কাজ, রেফারেন্স, তত্ত্বের, ফাইন্ডিংসের ভিত্তিতেই পরবর্তী গবেষকরা কাজ করেন, একাডেমিয়াতে এটাই রীতি। সেকেন্ডারি সোর্স সেহিসেবে অপরিহার্য একাডেমিক কাজের ক্ষেত্রে। সাধারণ চলতি 'লেখকরা' এবং মাস্টারপিসই কেবল অন্যের কাজের ধার ধারেনা। আমিও অন্যের কাজের ধার ধারি না মাঝে মাঝে, ইচ্ছেমতো মাধুরী মিশাই, যখন একটা গল্প লিখি কিংবা পত্রিকা-ব্লগের জন্য ছোট নিবন্ধ/কলাম লিখি। পদ্ধতিগতভাবে আমার ঐ পোস্টটি যদি বলেন ঐকারণে ত্রুটিযুক্ত তবে মানা কষ্টকর।
তবে স্বীকার করি লালনের গান প্রাইমারি টেক্সট হিসেবে ব্যবহার করে তার তত্ত্বোদ্ধার অবশ্যই উন্নত পদ্ধতি। কিন্তু বিষয় হলো লালনের গানের তত্ত্বোদ্ধার লক্ষ্য ছিল না ঐ পোস্টে। আর সত্য হলো ঐ যোগ্যতাও আমার নাই। যদি কোনো দিন মাওলা সেই হেকমত দেন তবে সেবিষয়েও অভাজনের আলাপ শুনবেন।
৪. বাউল (ফকির) তত্ত্ব নিয়ে আপনার বিস্তৃত আলোচনা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমার পোস্টকে ঘিরে যে-আলোচনা তাতে এটা একরকম অপ্রাসঙ্গিক। বাউল/ফকির বিষয়ক আলোচনা আমি ঐখানে করি নাই, আত্মপরিচয়ের আলোচনায় বাউলদের কথা এসেছে বৃহত্তর 'লোকধর্ম' ক্যাটাগরিতে। বাউলমত ছাড়াও আরও অনেক মত বঙ্গে প্রচলিত রয়েছে।

১৯ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ রাত ৮:৫৪

লেখক বলেছেন: আমি ঠিক ফাঁদ পেতে আপনাকে ধরতে চেয়েছি তা নয়। আমি চেষ্টা করেছি আপনার যুক্তির স্ববিরোধীতাগুলো ধরিয়ে দিতে, এটাকেই আপনার ফাঁদপাতা মনে হচ্ছে। সে হিসাবে আপনারই যুক্তিতে বিছানো আপনার এই ফাঁদ।
আপনার নিজের বিছানো ফাঁদ থেকে আপনি এখনও বের দিয়ে পারেননি। যাক সেকথা আমরা পাঠক সবাই যার যার মত নিশ্চয় বুঝেছি ঘটনাটা কী! ওটা ওখানেই থাক।

আমি এখনও মনে করি চিন্তার গলদের গোড়াটা হলো, আপনি নিজেকে প্রশ্ন করতে চান না, এই সাম্প্রদায়িকতা মানে কী। এটাকে আপনি given বলে ধরে নিয়েছেন বা আগাম দেয়া আছে ভাবছেন ফলে কোন প্রশ্ন করতে চাইছেন না। কাকে আপনি অসাম্প্রদায়িক বলে বুঝছেন -এটাই সেই চিন্তার ফাঁদ, আপনি এখানে আটকে আছেন। এথেকে ছুটকারা মিললে সামনে পথ পেতে পারেন।
আপনি বুঝছেন আপনার সেকুলারিজমটা "আল্ট্রা বা মডার্নিজমবাহিত সেকুলারিজম" হয়ে যাওয়াতেই সমস্যা ঘটছে। আমি আপনার কথা আপনার মত করে বুঝেছি কিন্তু গ্রহণ করতে পারিনি। কারণ, আমি খোদ সেকুলারিজম যেটা "আল্ট্রা বা মডার্নিজমবাহিত" সেকুলারিজমের স্প্রিং বোর্ড ঐ সেকুলারিজমকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছি। সমস্যার গোড়া ওটাই।

অসাম্প্রদায়িক: লক্ষ্য করবেন শব্দটা না-বাচক, প্রতিক্রিয়ামূলক। কী সে চায় না তা হয়ত বুঝা যায় কিন্তু কী চায় তা ওর মধ্যে প্রকাশিত নাই। সাম্প্রদায়িক ভয়াবহ দাঙ্গাগুলো দেখার ও তার ফল ভোগ করার খারাপ অভিজ্ঞতা আমাদের আছে। সেই খারাপ অভিজ্ঞতার প্রতিক্রিয়ার দাগ শব্দটায় লেগে আছে। সেটা আর কখনই আমরা দেখতে চাইতে পারি না। কিন্তু কি করলে আমাদেরকে আর এটা দেখতে হবে না সেটা না জানলে আমাদের মুক্তি নাই। সেটা নিশ্চিত ভাবে জানাটাই আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্ত্বপূর্ণ। সাম্প্রদায়িকতা বলে আমরা যেটাকে দেখছি সেটা রোগের লক্ষণ, রোগ নয়। ফলে অসাম্প্রদায়িকতা বা সেকুলারিজম - ওটা রোগের লক্ষণ দেখে ঠাহর করা একটা ভুল ওষুধ না, বরং কোন ওষুধই না। রোগের সাথেও যার কোন সম্পর্ক নাই। বরং রোগ সম্পর্কে এই ধারণা রোগকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। তুলছেও।
এটা আবার অনেকটা চিন্তার বাজারে কী খুজে ফিরছি তা জানি না কেবল দোকানদারদের কাছে জিজ্ঞাসা ওমুক জিনিষটা চাইনা ওটা আছে!

সেজন্য আপনার অসাম্প্রদায়িক লোকধর্ম খুঁজার প্রকল্পটা শেষ পর্যন্ত অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্রের মত সাম্প্রদায়িকই হবে। কারণ না-অসাম্প্রদায়িক বলেতো কিছু পাওয়া যাবে না।

আসলে আপনার চিন্তার একটা আগাম ভিত্তি হলো, ধর্মই সাম্প্রদায়িকতার উৎস বা কারণ।এজন্য অসাম্প্রদায়িকতার হারিকেন না জ্বালিয়ে আপনি কিছু খুঁজে দেখতে রাজি না।
আপনার চিন্তার এই আগাম ভিত্তিটাকে দৃঢভাবে নাকচ হয়ে যাবে পরিচয় বা আত্মপরিচয় জিনিষটার হদিস নিলে।

১৯৪৭ সালের দেশবিভাগের দিকে ঠিক মত তাকালে দেখতে পাবেন ধর্মকে আশ্রয় করে যে পরিচয় দাঁড় হয়েছিল ওটা একটা খোলস মাত্র। ১৯৭১ এও ভাষাকে আশ্রয় করে যে পরিচয় দাঁড় হয়েছিল ওটাও একটা খোলস মাত্র। জনগোষ্ঠি তাঁর আত্মবিকাশের পথে বাধাগুলো অতিক্রম করে মুক্তির লক্ষ্যে কী পরিচয়ে আত্মপ্রকাশের পথ বেছে নিবে এর কোন আগাম ফর্মুলা নাই। অনেক কিছুর উপর তা নির্ভর করে, তবু দুএকটা এখানে বলব। এগুলো হল যেমন, কী ধরণের বাধা, কী ধরণের পরিচয় দাঁড় করানোর সুযোগ উপস্হিত পরিস্হিতিতে হাজির আছে, কোন পরিচয়টা নিলে সবচেয়ে ব্যপক সংখ্যক মানুষের কাছে এটা তারও স্বার্থ বলে উপস্হাপনের সুযোগ আছে, কোন পরিচয়ে জয়লাভ বা সাফল্যের সম্ভাবনা বেশি, অন্য আর কোন শ্রেণী বা স্বার্থের সাথে এ্যালায়েন্স করে বা না করে তাঁর জেতার সম্ভাবনা আছে, উপস্হিত রাজনৈতিক চিন্তাচর্চার মাত্রা ইত্যাদি।
এবার সুনির্দিষ্ট করে কিছু কথা বলি। পূর্ববঙ্গে প্রজা সমিতি বা কৃষক-প্রজা পার্টি নামটা প্রমাণ করে আমরা ধর্মকে পরিচয় হিসাবে নিয়েই জন গোষ্ঠির মুক্তির পথে উঠে দাঁড়াতে হবে এমন আগেই কোন গোঁ আমাদের ছিল না। সারা পূর্ববঙ্গও যদি এই পরিচয়কে কেন্দ্র করে প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতা গড়ার স্বপ্ন দেখত তো ওটা কেবল দিবাস্বপ্ন হতো। কারণ সর্বভারতীয় পর্যায়ে ক্ষমতাসীন বৃটিশের কথা ভাবলে তুলনায় বিরুদ্ধে একা এটা কোন চ্যালেজ্ঞই নয়। কেবল ভারতের অন্যান্য রাজ্যে ভুগোলের আন্দোলনে প্রকাশিত অন্যান্য জনগোষ্ঠির স্বার্থগুলোর সাথে এ্যালায়েন্স গড়ে একটা পাল্টা ক্ষমতাই হতে পারে সারা বৃটিশ ভারতের একটা অলটারনেট চ্যালেজ্ঞ ক্ষমতা। এক্ষেত্রে কংগ্রেস ভারতীয় জাতীয়তাবাদ বলে ভূগোলভিত্তিক জাতিগত যে পরিচয় দাঁড় করিয়েছিল এই পরিচয়ের ভিতরে পূর্ববঙ্গ তার জনগোষ্ঠির স্বার্থের প্রতিনিধিত্ত্ব দেখতে পায়নি। (কেন হয়নি সে আলোচনা এখানে এখন যাচ্ছি না।) ফলে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ তার পরিচয় হতে পারনি। কৃষকের সবচেয়ে কাছের মিত্র যে কলকাতা কেন্দ্রিক পূর্ববঙ্গের মধ্যবিত্ত সে ইতিমধ্যে মুসলিম লীগ ধর্মকে পরিচয় করে ফেলেছে। কলকাতার বাঙালি হিন্দু মধ্যবিত্ত তাঁর স্বার্থের প্রতিদ্বন্দ্বী। কংগ্রেসের ভিতরে যারা নিজ জনগোষ্ঠির স্বার্থ দেখেনি এমন সারা বৃটিশ-ভারতের অন্যান্য রাজ্যের অনেকের সাথে ধর্মকে পরিচয় মেনে বঙ্গের মুসলিম লীগও নিজেকে তুলে ধরেছিল। এভাবে ধর্মের পরিচয়কে ভিত্তি করে তাদের স্বার্থ পূরণ সহজ হবে ও কংগ্রেসের বাইরে প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতা ব্যাপকতা পাবে - এটাই ছিল (পরবর্তীকালের) পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের দুই আলাদা জনগোষ্ঠি এক বাইরের এ্যালায়েন্স।
আমার বলার মূল বিষয়টা হলো কী পরিচয় নিয়ে জনগোষ্ঠি আত্মপ্রকাশ করবে এটা গৌণ বা সেকেন্ডারি। এর নির্ধারক বিষয় হলো জনগোষ্ঠির স্বার্থ কি পরিচয়ে প্রকাশ করলে এটা এমন ব্যাপকতা পাবে যাতে সে দৃশ্যমান প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতা হয়ে হাজির হয়।
১৮৭০-১৯৪৭ এই কালপর্বে পরিচয় নির্ধারণের দীর্ঘ ভাঙ্গাগড়ার এ্যালায়েন্সের দিক বিচারে অক্ষম থাকলে, ১৯৪৭ সালের সম্প্রদায়গত দাঙ্গা দেখে এই সিদ্ধান্তে আসা সবচেয়ে সহজ যে, ধর্মই সাম্প্রদায়িকতার উৎস বা কারণ। ধর্মই আমাদের সব দুঃখের কারণ।

আমরা সম্ভবত খেয়াল করিনি, সব পরিচয় নির্মাণই এক একটা সম্প্রদায়গত পরিচয়, বাকি সব সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অলক্ষ্যে যুদ্ধ ঘোষণা। সাম্প্রদায়িকতা বিনির্মাণ। পরিচয় নির্মাণই মানেই সম্প্রদায় বা সাম্প্রদায়িকতা বিনির্মাণ। ইতিহাস তো পরিচয় ভাঙ্গাগড়া নির্মাণ মানে সাম্প্রদায়িকতা বিনির্মাণের ইতিহাস।
আবার সাম্প্রদায়িকতা বিনির্মাণ বা পরিচয় নির্মাণেরও সীমাবদ্ধতা বা ত্রুটি আরও সাম্প্রদায়িকতা বিনির্মাণ বা পরিচয় নির্মাণের কারণ হতে পারে। এটা পরিচয় নির্মাণের আর এক প্রত্যক্ষ সমস্যা ও বৈশিষ্টও বটে। ভারতীয় জাতীয়তাবাদ পরিচয়টা যেভাবে দাঁড় হয়েছে এর নির্মাণ ত্রুটি বা সীমাবদ্ধতা কী মুসলিম ধর্মভিত্তিক একটা নতুন পরিচয় নির্মাণের পূর্বশর্ত বা কারণ নয়? বাঙালি জাতীয়তাবাদ পরিচয়টা যেভাবে দাঁড় হয়েছে এর নির্মাণ ত্রুটিই কী আমাদের আজকের বাংলাদেশকে দুটি বড় বিপদজনক ভাগে ভাগ করে রাখেনি। (১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ করা সঠিক মানে এই নয় যে একে আজকের "অসাম্প্রদায়িক" বাঙালি জাতীয়তাবাদ বলে সরাসরি ইসলাম বা ধর্ম বিরোধী পরিচয় সংহত করার চেষ্টা দেখছি এটা সঠিক। এদুটো এক জিনিষ নয়।) এর সঙ্কটই আপনাকে লোকধর্ম খুজতে বাধ্য করেছে। বাংলাদেশের নতুন কোন সম্ভাবনার পথে এটাই বাধা হয়ে দাড়িয়েছে। এটা হলো যাদেরকে এই একই পরিচয়ে সে প্রতিনিধিত্ত্ব করবে বলে ভেবেছিল, দাবি করেছিল বা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তার ব্যর্থতা অদূরদর্শীতা থেকে সে আরও ভাঙন আরও নতুন সাম্প্রদায়িকতা বিনির্মাণ বা পরিচয় নির্মাণের শর্ত তৈরি করা।

এধরণের নতুন নতুন সাম্প্রদায়িকতা বিনির্মাণ বা পরিচয় নির্মাণের ঘটনা ইতিহাসে ঘটতে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্তটা একটা পরিচয় যা সবাইকে প্রতিনিধিত্ত্ব করতে পারে এমন সবল চিন্তা, শুধু চিন্তায় নয় কাজেও সক্ষম এমন কিছু হাজির হয়; একটাই পরিচয় মানুষের উম্মা বা মানুষের কমিউনিটি বা সম্প্রদায় বলে হাজির হয়। আবার মজার কথা হলো ওটা আর তখন আজকের বিচারে কোন সাম্প্রদায়িকতা বিনির্মাণ বা পরিচয় নির্মাণ নয়। কারণ বিপরীত বা ভিন্ন কোন পরিচয় বা সম্প্রদায় বলে তখন আর কিছু থাকছে না।

এতক্ষণ বস্তুগত স্বার্থ, প্রতিনিধিত্ত্ব দিক থেকে পরিচয় সম্প্রদায়গত বা সাম্প্রদায়িকতার আবির্ভাবের প্রসঙ্গে কথা বলে গিয়েছি। দুনিয়াতে ধর্ম থেকে যাবার কারণে পরিচয়, সম্প্রদায়গত বা সাম্প্রদায়িকতার আবির্ভাব ঘটছে - এটা প্রথমত আমাদের চিন্তার অক্ষমতা, মুরোদের সমস্যা। একই সাথে জনগোষ্ঠি স্বার্থ, প্রতিনিধিত্ত্ব না থাকার (unheeded) সমস্যা। এটাই এর বস্তুগত ভিত্তি। এই অবস্হাকে বিভেদকে কাজে লাগিয়ে সুবিধা নিয়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠির স্বার্থ, প্রতিনিধিত্ত্বকে পায়ে দলে উপেক্ষা ও দাবিয়ে রাখার পক্ষের ব্যাখ্যা। পশ্চিমের স্বার্থ উদ্ধারের ব্যাখ্যা।

দুনিয়াতে ধর্ম বলে কিছু যদি নাও থাকতো তবু সম্প্রদায়গত পরিচয় বিভেদ আপনি দেখতে পেতেন। ধর্ম বাদে অন্য আর সবকিছু (গোত্র, রক্ত, গায়ের রং, ভূগোল ইত্যাদি) ভিত্তিক পরিচয়ে জনগোষ্ঠিগুলো তার স্বার্থ, প্রতিনিধিত্ত্বকে দৃশ্যমান করতে কাজে লাগাবে। নতুন সম্প্রদায় নাম দিবে, সে অর্থে সাম্প্রদায়িক হবে।

আমার উপরের এই কথা প্রেক্ষিতে এখন বিচার করুন "অসাম্প্রদায়িক" বলে আপনি কী খুঁজছেন।

৮. ১৯ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ রাত ২:৪৫
হামোম প্রমোদ বলেছেন: আপনাদের এই একাডেমিক আলোচনার একজন সাধারণ পাঠক হিসাবে একটু নন একাডেমিক তর্ক শুরু করি। ব্যাক্তি অহং বোধ এখানে প্রাধান্য না দিলে বাধিত হবো।
তবে এখানে এ ও বলে রাখি, ব্লগের পোষ্ট বা মন্তব্য পড়ে আলোচনায় অংশগ্রহণ খানিকটা আগ্রহ খানিকটা অনুসন্ধিৎসু মনের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। বিদ্বেষ কিংবা খামোখা তর্ক এখানে অপ্রাসঙ্গিক। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে কোন পোষ্ট শুরু করার পর বিদ্বেষ এবং বিষয়কে ছাড়িয়ে তর্কে বেশ জোড় দিতে দেখা যায় অনেক সময়, তখন আমরা পাঠকরা একটু কনফিউজড হই।
ব্যাক্তি কিংবা তর্কে জেতা - এটাকে অধিক গুরুত্ব না দিয়ে বিষয়টাকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করলে আমাদের পাঠকদের জন্য বুঝতে সুবিধা হয়।

১৯ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ ভোর ৪:৫০

লেখক বলেছেন: আপনি কার আচরণ বা কোন বক্তব্যকে "ব্যাক্তি অহং বোধ" এর প্রাধান্য বলছেন তা উল্লেখ করলে আরও একটু ভাল হতো, বুঝতে সহজ হতো।
আপনার সাথে একমত, এগুলো এড়িয়ে চলা উচিত, ভাল আলোচনার জন্য।
তবে এনিয়ে আবার কথা শুরু হয়ে যাক এটাও চাচ্ছি না।
আশা করি আমরা সবাই দায়িত্ত্ববান, সেরকম কোন সমস্যা আমি দেখিনি। তবে আপনার যেহেতু মনে হয়েছে আমি বিশ্বাস করি সবাই সতর্ক থাকব।

৯. ২০ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ সকাল ৮:০৫
ফাহমিদুল হক বলেছেন: আপনি আগের সুদীর্ঘ আলোচনার শেষে বলেছেন "দুনিয়াতে ধর্ম যদি নাও থাকতো, তবু সম্প্রদায়গত বিভাজন দেখতে পেতেন।"

এভাবে আমিও কি ভাবিনি, আমার আলোচনায়? সংক্ষেপে আবার বলি, আমি তিনটি আত্মপরিচয়গত ধারা তুলে ধরেছি -- বাঙালিত্ব , মুসলমানিত্ব ও লোকধর্ম। আমি বলতে চেয়েছি বাঙালিত্ব ও মুসলমানিত্বের সমস্যা কোথায়, দ্বন্দ্বের কারণ। আপনি বুঝেছেন এই সমস্যা কাটাতে আমি লোকধর্মকে সাজেস্ট করেছি এবং ওপরের আলোচনাসমূহে এটা বলতে চেয়েছেন লোকধর্মকে ঠিকমতো না বুঝেই হয়তো এই ধৃস্টতা দেখাচ্ছি।

তবে মূল সমস্যা হলো আমি অসাম্প্রদায়িকতা, এমনকি লোকধর্মের ভেতরেও খুঁজছি। অর্থাৎ অসাম্প্রদায়িকতা আমার চাই-ই চাই।

ঠিকাছে। কিন্তু আপনি কি আমার পোস্টের সবগুলো দিক মাথায় রাখছেন না? আমি কিন্তু আলোচনায় বলেছি সুলতানি আমলে মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধদের সমাজ সত্ত্বেও যে উদার ও সহনশীল পরিবেশ ছিল, সেটাকে ফিরিয়ে আনতে হবে। সেটা তো একটা 'সাম্প্রদায়িক' শাসনই ছিল। সাম্প্রদায়িকতার ধারণাই, রাজনৈতিক পরিসরে, নাজেল হয়েছে ব্রিটিশ আমলে। আর ব্রিটিশবিরোধী হওয়া সত্ত্বেও ওয়াহাবী ও ফরায়েজীর মতো ইসলামী সংস্কার আন্দোলন চিরতরে বঙ্গের ইসলামকে আরবমুখিন করে তুলেছে (যদিও বঙ্গীয় [ইরানী] সুফিপ্রভাবিত ধারা একেবারে নির্মূল হয়নি)।

এখন হালের বাংলাদেশের যে-বিদ্যমান ইসলাম, তাতে রাজত্ব করছে পলিটিকাল ইসলাম। বিএনপির মতো, জাপার মতো 'গণতান্ত্রিক' দলও একে পরিপুষ্ট করেছে, নানা সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে। এই ইসলাম তো সুলতানী আমলের ইসলাম নয়। ওদিকে বাঙালিত্ব ইসলামকে পুরোপুরি খারিজ করলে বাঁচে, তারা সুফি ইসলামকেও বুঝতে চায়না। তাদের কাছে, পলিটিকাল, স্কলাস্টিক ও পপুলার -- সব ইসলাম এক। আপনি যদি আমাকে বিদ্যমান (ইসলামী/মুসলমানী) সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে মডিফিকেশনের মাধ্যমে আগাতে বলেন, আমি রাজি না। আমি সুলতানী আমলের 'সাম্প্রদায়িকতা' চাই। এজন্য আমি বিদ্যমান আত্মপরিচয়গত ধারার মধ্যে লোকধর্মকে সামনে আনতে চাই। সুলতানী আমলের উদার সাম্প্রদায়িকতার পেছনেও এইসব লোকধর্মের অবদান ছিল।

এখন আমি যে ব্রিটিশ আমল থেকে উত্থিত সাম্প্রদায়িকতা চাইনা, এইটা আমার লেখার ফোকর বলে আপনি আবিষ্কার করেছেন আর বারবার সেখানেই মাথা গলাতে চাচ্ছেন।

আশা করি এবার কিছুটা পরিস্কার করতে পেরেছি।
২১ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ দুপুর ২:৩৯

লেখক বলেছেন: ফাহমিদুল, কিছুটা পরিস্কার হয়েছে আবার কিছুটা আরও অপরিস্কার হয়ে গেছে। আমার শেষ মন্তব্যে সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে আমি যা বলেছি "পরিচয় নির্মাণই মানেই সম্প্রদায় বা সাম্প্রদায়িকতা বিনির্মাণ" - তা একবার মনে হয় গ্রহণ করাতে পেরেছ। যেমন, আপনি স্পষ্ট করেই বলছেন, "আমি সুলতানী আমলের 'সাম্প্রদায়িকতা' চাই"। আবার বলছেন, "তবে মূল সমস্যা হলো আমি অসাম্প্রদায়িকতা, এমনকি লোকধর্মের ভেতরেও খুঁজছি। অর্থাৎ অসাম্প্রদায়িকতা আমার চাই-ই চাই"। এটা কী খেদোক্তি না স্বগোক্তি আমার কাছে পরিস্কার নয়। আবার একটু সরাসরি বাক্যে পরিস্কার করবেন। আমার একটা পর্যবেক্ষণ হলো, এবারের জবাবটায় আপনার বাক্যগঠন খুব অগোছাল, তাড়াহুড়োতে ভর্তি। আমার পরামর্শ থাকবে আমরা যে বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি তা গভীর চিন্তাভাবনার প্রশ্ন ফলে পাল্টা জবাব লিখতে দেরি হোক তবুও একটু সময় দিয়ে গুছিয়ে জবাব লিখতে। আমি মনে করি ফাহমিদুল এটা কেবল আপনার আর আমার বিতর্ক আলোচনা না, অনেক পাঠক কোন মন্তব্য না করেও এখানে নজর রাখছে। আগামিতেও অনেকে এটার পাঠক হবে। ফলে বিষয়টা গম্ভীর বলে একটু বেশি সময় দিতে অনুরোধ রাখছি। তবে আমিও সবসময় উপযুক্ত সময় ব্যয় করতে পেরেছি এমন দাবি করছি না।

আর লোকধর্ম প্রসঙ্গ আমার মনে হয় আমরা যথেষ্ট আলোচনা শেষ করেছি। আমার দিক থেকে লোকধর্ম প্রসঙ্গ শেষ। লক্ষ্য করেছেন বোধহয় গত জবাব থেকে আমি এনিয়ে কিছু বলছি না।

"আমি সুলতানী আমলের 'সাম্প্রদায়িকতা' চাই" -আপনার এই স্পষ্ট উচ্চারণের মধ্য দিয়ে ধরে নিচ্ছি আপনি আমার কথা - "আমরা সম্ভবত খেয়াল করিনি, সব পরিচয় নির্মাণই এক একটা সম্প্রদায়গত পরিচয়, বাকি সব সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অলক্ষ্যে যুদ্ধ ঘোষণা। সাম্প্রদায়িকতা বিনির্মাণ। ইতিহাস তো পরিচয় ভাঙ্গাগড়া নির্মাণ মানে সাম্প্রদায়িকতা বিনির্মাণের ইতিহাস" - মেনে নিয়েছেন।
তবে এই কথাটার দুটো দিক (অর্থ নয়) আছে। ১. ভূখন্ড বনাম ভুখন্ডের বাইরে: একটা নির্দিষ্ট ভূখন্ডের ভিতরে সফলভাবে সম্প্রদায়গত পরিচয় নির্মাণ করে ভুখন্ডের বাইরের সবার সাথে পরোক্ষে সম্প্রদায়গত (ইতিবাচক!) বিভেদ দেয়াল তুলে দেয়া অর্থে। ২. ভূখন্ডের ভিতরে: ভূখন্ডের ভিতরে জনগোষ্ঠির সবার বস্তুগত স্বার্থ, প্রতিনিধিত্ত্ব নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা থেকে সৃষ্ট ত্রুটিপূর্ণ পরিচয় নির্মাণ যা থেকে এর উৎপত্তি।
প্রথমটার অসফলতা থেকে দ্বিতীয়টার উৎপত্তি। যেমন, ভারতীয় জাতীয়তাবাদ নামে পরিচয় দাঁড় করাতে গিয়ে এর ব্যর্থতা ত্রুটিপূর্ণ পরিচয় নির্মাণের সমস্যা শেষ পর্যন্ত দুটো পরিচয় নির্মাণের ধারা তৈরি করে ফেলে। জনগোষ্ঠি যে অংশের এতে তাদের বস্তুগত স্বার্থ, উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ত্ব হয়নি ফলে সমস্যা মনে করেছিল তাঁরা নতুন পরিচয়ের তাগিদ বোধ করে। ধর্মকে ভিত্তি করে এটা করা সুবিধাজনক মনে করে এটাই মুসলিম লীগ বলে আবির্ভূত হয়। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগে দুই পরিচয় কায়েম করার মধ্য দিয়ে এটা শেষ হয়। এরপর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতাকে যদি ব্যাখ্যা করি দেখব, এখানে জাতীয়তাবাদ ভিত্তিক পরিচয় নির্মাণ সুবিধাজনক মনে করে এই জনগোষ্ঠি তাঁর বস্তুগত স্বার্থ, উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ত্ব সমস্যা মিটাতে আগিয়ে গিয়েছে। এই বাঙালি জাতীয়তাবাদী পরিচয় নিয়ে পাকিস্তান থেকে আলাদা হবার পর্যায়ে বড় কোন আভ্যন্তরীণ সমস্যায় পড়েনি। সমস্যায় পড়তে শুরু করে বা দূর্বলতা স্পষ্ট হতে শুরু করে বাঙালি জাতীয়তাবাদ এই পরিচয়কে ব্যাখ্যা বা মানে দিতে গিয়ে। ইসলাম প্রশ্নে আজকে এটা সমাজকে স্পষ্ট প্রায় সমান দুইভাগে বিভক্ত করে ফেলেছে। বলা যায় এটা সমাজের গাঁথুনি বুননি পর্যায়ে ভেঙ্গে সঙ্কটাপন্ন। ১৯৭১ সালের আগে পরিচয় বিনির্মাণের প্রথম পর্যায়ে ইসলাম বা ধর্ম, যেটা তার ১৯৪৭ সালের সময় আগের বারের পরিচয় ছিল, এটাকে যতটা সফলতার মোকাবোলা করেছে, ১৯৭১ সালের পর, সেই পরিপক্কতা দেখাতে ততটাই যেন ব্যর্থ হয়েছে। আগে পাকিস্তানী কালোদাগের রাষ্ট্র যতবার তাকে ধর্মবিরোধী বলে আঘাত করে তার জনগোষ্ঠির বস্তুগত স্বার্থ, উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ত্ব সমস্যাকে অন্যায্য বা খেলো প্রমাণ করতে গেছে ততবার সে একে মোকাবিলা করে প্রমাণ করে গেছে তার সমস্যা ধর্ম নয়, জনগোষ্ঠির বস্তুগত স্বার্থ ও প্রতিনিধিত্ত্বের সমস্যা। লক্ষ্য করবেন, তখন সরাসরি এটা বলে নাই (বলাটাও বেআক্কেলীও) আমি জাতি বা জাতীয়তাবাদী হতে চাই - এটাই সমস্যা। কারণ আসল সমস্যার গোড়া জনগোষ্ঠির বস্তুগত স্বার্থ ও প্রতিনিধিত্ত্বের সমস্যা যার সমাধানে লক্ষ্যে জনগোষ্ঠিকে সংগঠিত করতে অপ্রত্যক্ষে সে একটা নতুন পরিচয় খুঁজছে। পরিচয়টা যে বাইরের বিষয়, খোলস জনগোষ্ঠির বস্তুগত স্বার্থ ও প্রতিনিধিত্ত্বের সমস্যার উপরে যা চাদরের মত পর্দা করে আছে - এই বোধ স্পষ্ট থেকেছে তাতে। তবে অবশ্যই পরিচয়ের বিনির্মাণের একটা সাংস্কৃতিক দিক কাজ থাকে। যে কাজটা ১৯৭১ সালের পর পোক্ত সুনির্দিষ্ট করতে গিয়ে সীমাহীন দুঃস্ততায় ব্যর্থ হয়েছে। পাকিস্তানী কালোদাগের রাষ্ট্র ১৯৭১ সালের আগে তাকে ধর্মবিরোধী বলে যে অভিযোগ করত, ১৯৭১ সালের পর স্বাধীন বাংলাদেশে ওটাকেই মুকুট বলে মাথায় পড়ে নিল। পাকিস্তান বা জামাতে ইসলামীর অভিযোগ স্বীকার করে নিল। বাঙালি জাতীয়তাবাদের মানে বা বৈশিষ্ট হয়ে গেল ইসলাম বিরোধীতা। এটাকেই আপনি সঠিক ভাষায় আইডেনটিফাই করেছেন, "ইসলামবিরোধিতা অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে বাঙালিত্বে অনুপ্রবেশ করেছে"। এর মানে আজ এমন হয়ে গেছে যেন, ১৯৭১ সালে আমরা পাকিস্তানী কালোদাগের রাষ্ট্র বা আমাদের জন্য অপ্রতিনিধিত্ত্বশীল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়, ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলাম। ওটাই আমাদের দাবি ছিল।

লক্ষ্য করেছেন নিশ্চয় আমি সবসময় "জনগোষ্ঠির বস্তুগত স্বার্থ ও প্রতিনিধিত্ত্বের সমস্যা" আর এর হাল করার প্রয়োজনে নেয়া যে কোন একটা পরিচয় (ধর্ম, জাতি, ভূগোল ইত্যাদির ভিত্তিতে) যা এর খোলস - এদুটোর ফারাক ও সম্পর্ক সমসময় আলাদা করে মনে করিয়ে দেবার চেষ্টা করে গেছি। পরিচয় ধারণ করাটা বাইরের দিক মূল সমস্যা নয়।

আমাদের অনেকের মাথায় একটা ধারণা গেঁথে বসে গেছে যেন কোন একটা পরিচয় গ্রহণ করা মানেই তা জাতিভিত্তিক জাতীয়তাবাদ পরিচয় হতেই হবে বা হবেই অথবা সম্ভাব্য নানান রকমের পরিচয়গুলোর মধ্যে জাতীয়তাবাদ পরিচয়টাই শ্রেষ্ঠ, সঠিক, উপযুক্ত এবং একমাত্র। উপরে অনেকবার বলেছি, এরকম ধারণার কোন ভিত্তি নাই। দ্বিতীয়ত, আগেই বলেছি জনগোষ্ঠি কোনটাকে পরিচয় বলে নিবে এটা ইচ্ছামত বেছে নেবার বিষয় নয়। উপস্হিত পরিস্হিতিতে যেটার তুলনামূলক সুবিধা বেশি সেটাই নিজগুণে জায়গা পেয়ে যায়। অতএব, জনগোষ্ঠির স্বার্থ মানেই জাতি হয়ে নিয়ে জাতির স্বার্থ নয়। আশা করি এভাবে আমরা বুঝব না।

তাহলে জনগোষ্ঠির স্বার্থ প্রতিনিধিত্ত্ব এই মূল বিষয়টা নিশ্চিত করতে নেয়া পরিচয় কী ভৌগলিক বা রাষ্ট্রের সীমানা ছাড়িয়ে অর্থ হয় এমন কিছু দাঁড় করানো সম্ভব? কারণ, জাতিরাষ্ট্র মানে তো আবার শেষ বিচার জাত্যাভিমানি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। এর উত্তর হলো, হ্যাঁ সম্ভব। তবে এর পূর্বশর্ত হলো, ১. যে কোন পরিচয় ধারণ মানেই আবার একটা সাম্প্রদায়িক ফেকড়া তৈরি পথে যাত্রা - এই সীমাবদ্ধতা বোধ চিন্তা যদি সমাজের চেতনায় পরিস্কার থাকে। ২. মানুষ কী, তাঁর ধর্ম কী - এসবের মানে দার্শনিক রাজনৈতিকভাবে সমাজে আধিপত্যশীল চিন্তা হিসাবে যদি প্রতিষ্ঠিত থাকে। ৩. কেবল তার জনগোষ্ঠি নয়, তার বাইরের জনগোষ্ঠিকেও সংগঠিত করার প্রয়োজন তাগিদ বা দায় সে বোধ করে কী না। ৪. তার নির্মিত পরিচয় এমনভাবে উপস্হাপন করা যেন অন্য আরও জনগোষ্ঠিও যেন এখানে সামিল হতে স্বচ্ছন্দবোধ করে এভাবে খোলা রাখা। কারণ শেষ বিচারে মানুষের উম্মা বা কমিউনিটি গড়ার কর্তব্য তার আছে।

এককথায় এসব কিছুই নির্ভর করছে জনগোষ্ঠি নিজেকে কিভাবে দেখে এর দার্শনিক রাজনৈতিক বিষয়ে তার সামাজিক প্রস্তুতি কতটা, ধর্মের পর্যালোচনা মোকাবোলার কাজে সে কতটা অগ্রগামি, ইত্যাদি।


আগামি দিনের বাংলাদেশে আমরা কী পরিচয় নিব তা নির্ধারিত হবে এসব প্রস্তুতির উপর।
এসব প্রস্তুতিতে, নিজেকে তৈরি কাজকে ফেলে রেখে দোকানের শেল্ফ থেকে একটা তৈরি জিনিষ বেছে তুলে বা কিনে আনার মত বিষয় নয় এটা।

আপনি আমাকে যেমন বলছেন,
"আপনি যদি আমাকে বিদ্যমান (ইসলামী/মুসলমানী) সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে মডিফিকেশনের মাধ্যমে আগাতে বলেন, আমি রাজি না। আমি সুলতানী আমলের 'সাম্প্রদায়িকতা' চাই"।

এটা সেরকম কোন ফরমায়েসী ব্যাপার না। ফলে আমার আপনাকে " (ইসলামী/মুসলমানী) সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে মডিফিকেশনের" মত কোন মডিফিকেশনের প্রস্তাব করার কিছু নাই। আমি মডিফিকেশনের লোক না। সবধরণের পরিচয়ের মূল ধরে নাড়া দেয়া আমার কাজ। সব পরিচয়ের বিভেদের দেয়ালের উর্ধে উঠা আমার সন্ধানের বিষয়। ধর্মের পর্যালোচনা মোকাবিলা দিয়ে যে কাজ শুরু হতে পারে। আমরা তো এখনও ধর্ম কী তাই ঠিক মত জানি না।

শেষ কথা: বাঙালি জাতীয়তাবাদ "ইসলামকে পুরোপুরি খারিজ করে বাঁচতে" গিয়ে এখন নিজের সব সম্ভাবনা হারিয়েছে। বাংলাদেশকেও সঙ্কটগ্রস্হ করেছে। আপনি ঠিকই বলেছেন, "সুফি ইসলাম", পলিটিকাল, স্কলাস্টিক ও পপুলার -- সব ইসলামই তা কাছে এক।
এখন বাঙালি জাতীয়তাবাদ যে জায়গায় পৌছে গিয়েছে তাতে অনেক কিছুই সে আশ্রয় করে জীবনের শেষ দিনগুলো টিকে থাকার প্রাণপণ চেষ্ঠা করবে। কিন্তু কোন ইসলাম সে বেছে নিবে সে সুযোগ আর তার নাই।
"আমি সুলতানী আমলের 'সাম্প্রদায়িকতা' চাই" - বলে যে আকুতি জানাতে আপনাকে দেখছি এভাবে "বাঙালি জাতীয়তাবাদ" কে আপনি রিভাইভ করতে পারবেন না। যদি আসলেই কিছু চান তাহলে মূলে যেতে হবে, ধর্মের মূলে। প্রশ্ন ও উত্তর দিতে সক্ষমতা সঞ্চয় করুন - ধর্ম কী? এই হরিনাম নেয়া খাবলা খাবলা করে হবে না। হরিনাম নেয়া খাবলা খাবলা করে হয়ও না। গভীর ধ্যান লাগবে, নইলে কেবল সময় নষ্ট হবে।


আমার লেখায় কোন অনিচ্ছায় উষ্মা প্রকাশিত হয়ে পড়লে ওটা উপেক্ষা করবেন। আর একবার পড়ে তারপর পোষ্ট করার মত অবস্হায় আমি এমুহুর্তে নাই।
ভালো থাকবেন।

১০. ২০ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ রাত ৯:১৬
ঘোর-কলিযুগ বলেছেন: @ ভূপর্যটক আপনি দেখি আমার কথা কওয়ার রাস্তা প্রায় বন্ধ কইরা দিছেন। সাম্প্রদায়িকতা আর আত্মপরিচয় নিয়া আমামার যা কওনের ভাব উঠছিল তা এই যাত্রায় মুলতবি রাখলাম। কারণ মোটাদাগে উপসংহার হিসেবে পলিটিক্যাল জায়গাটা আপনার মন্তব্যে চইলা আসছে। কথা কইতে না পারলেও অখুশি হই নাই।

কিন্তু @ ফাহমিদের আলোচনা থেকে এবার যা জানা গেল তাতে উনি 'সাম্প্রদায়িক' পরিচয়কে সমস্যা গণ্য করেন বা সে জায়গা থেকে উত্তরণে সচেষ্ট তা আর বলছেন না। বরং একটি 'সহনশীল' জাতীয়তাবাদি আত্মপরিচয়ের মধ্যে নিজেকে তিনি স্থিতু করতে চান। যার নজির সুলতানি আমল। এটা আমি বুঝেছি।

এই অবস্থানে তিনি অবিচল আস্থা রাখলে আমরা আলোচনায় এখানকার অনুমান ও ইতিহাস বোঝাপড়ায় তাঁর রাজনৈতিক প্রকল্প নিয়ে সামনে অগ্রসর হতে পারি।
২১ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৫:২৩

লেখক বলেছেন: আপনার কথা কওয়া বন্ধ হওয়াতে ভালই হইছে মনে হয়। এখন কথা গড়াইয়া গড়াগড়ি যাইব না, এক জায়গায় থাকব। কথা দামি জিনিষ এইভাবে গড়াগড়ানি দেওয়াইতে নাই।

১১. ২১ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ সকাল ৭:৩৮
আওয়াজ বা উচ্চারণ বলেছেন:



ভূপর্যটক কে সাধুবাদ ।

আগামীদিনে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জনগোষ্ঠী হিসেবে আমরা বিশ্বদরবারে কি রূপ নিয়ে দাড়াঁব
এবং তার জন্য বর্তমান রাষ্ট্রের চৌহদ্দিতে আমরা যারা বসবাস করছি;
তারা যেন স্বাস্থ্যকর রূপে বেড়ে উঠতে পারি,
তার জন্য যে সব রাজনৈতিক প্রশ্নের অমীমাংসার কারণে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেব আমরা ভাগ হয়ে আছি । তার মীমাংসা জরুরি ।

উপরে ভূপর্যটক-ফাহমিদুল-কলিযুগের আলোচনার মধ্যে যে সব বিষয় বা প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে সেই সব বিষয় বা প্রশ্নের মীমাংসা আমরা জনগোষ্ঠী আকারে কিভাবে করছি বা করতে চাই বা আগামী দিনে করব তার উপর নির্ভর করবে
বিশ্বদরবারে আমাদের ভূমিকা কি হবে ?

ফাহমিদ,ভূপর্যটক এবং কলিযুগের মধ্যে মৌলিক বিষয়ে ধারণাগত ফাঁক বা ফারাক রয়েছে । যে কারণে ভূপর্যটক এবং ফাহমিদকে একই জিনিস ঘোরিয়ে বারবার বলতে হচ্ছে । কখনও উষ্মার সুরে ।

উভয় পক্ষের প্রতি সম্মানরেখে বলছি --
প্রথমত ফারাক হচ্ছে ফাহমিদুল ধর্ম বলতে বুঝেন বাংলার সুবিদাবাদী প্রতিক্রিয়াশীল মোল্লা-মৌলবিদের বুঝ; সাথে মধ্যবিত্ত(বাঙ্গালীজাতীয়তাবাদী) + (বুশের) শান্তির-উদারতার-সহনশীলতার ধর্ম ।
ফাহমিদূলের চাওয়া----- মোল্লা-মৌলবিদের বুঝ; সাথে মধ্যবিত্ত(বাঙ্গালীজাতীয়তাবাদী) বুঝ থাকুক কিংবা থাকতে পারে ; সমস্যা নাই । কিন্তু এদের উপর রাজ্যত্ব করবে (বুশের) শান্তির-উদারতার-সহনশীলতার ধর্ম ।
দেখুন ফাহমিদুল বলছে ----'আমি সুলতানী আমলের 'সাম্প্রদায়িকতা' চাই।' --------

------ 'তবে মূল সমস্যা হলো আমি অসাম্প্রদায়িকতা, এমনকি লোকধর্মের ভেতরেও খুঁজছি। অর্থাৎ অসাম্প্রদায়িকতা আমার চাই-ই চাই। '----

আবার কেন ফাহমিদুল অসাম্প্রদায়িকতা চান ? অসাম্পদায়িকতা দিয়ে ফাহমিদুল কি মীমাংসা বা মোকাবেলা করতে চান ?

ফাহমিদুল সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে কিংবা বোমায় অকালে নিহত হওয়ার ভয়ে বুঝতে পারছে প্রতিক্রিয়াশীল মোল্লা-মৌলবিদের বুঝ; সাথে মধ্যবিত্ত(বাঙ্গালীজাতীয়তাবাদী) + (বুশের) শান্তির-উদারতার-সহনশীলতার ধর্ম দিয়ে সমাধান হচ্ছে না ।

'পলিটিকাল ইসলাম' নামের কিছু একটা

পৃথিবীতে লড়াইয়ে নাইমা গেছে । যারে বুঝবার জ্ঞানগত প্রস্তুতি ফাহমিদুলের নিজের কিংবা তার তথাকথিত একাডেমীর কিংবা ঐতিহাসিক ভাবে তার শ্রেণীর নাই।

ফলে বুশের চিন্তা ফাহমিদুলের চিন্তা কিংবা বুশের শত্রু ফাহমিদুলের শত্রু হিসেবে দাঁড়ায় যাচ্ছে বা গেছে ।

অন্যদিকে সাম্রজ্যবাদের বিরুদ্ধে ময়দানে এই সময়ের লড়াকু শক্তি জিহাদী ইসলাম নামের ডাকে লড়ছে ।

ফলে দিশাহীন ফাহমিদ কিংবা তার শ্রেণী । তারা নানান হাতিয়ার খোঁজে । ফাহমিদুলের মত দিশাহীন মধ্যবিত্ত ফিরে যেতে চায় নানান প্রতিকুলতায় লড়াকু চিন্তা নিয়ে বেচে থাকা নিজের ভূমিতে চর্চিত দার্শনিক ঐতিহ্যের কাছে । উপনিবেশিক দাসত্ব-মনন চর্চার ধারায় বেড়ে উঠার ফলে তার নিজের দার্শনিক ঐতিহ্যকে চিন্তে না পেরে ডাকছে লৌকিকধর্ম নামে ।

ফাহমিদুলের সমস্যা শিকড়হীন শহুরে মধ্যবিত্তের সমস্যা ।
ফলে ফাহমিদুল খোঁজে তথাকতিথ শহুরে মধ্যবিত্ত কল্পনার লৌকিকধর্ম (যাকে তার শ্রেণী কুসংস্কার মনে এককালে প্রত্যাখান করেছে )।

অন্ধকারে যেমন সব বিড়াল কালো মনে হয় তেমনি ফাহমিদুল কিংবা তিনি যাদের বরাতে লালনের চিন্তার দোহাই পেড়েছেনে তাদের কাছে লালনকে অন্ধকারে সব বিড়ালকে কালো বিড়ালের মতই মনে হয় বা হয়েছে । লালান = লৌকিক ধর্ম হয়ে যাচ্ছে ।

ফলে উপনিবেশিক শহুরে মধ্যবিত্ত প্যাটানের চিন্তা কাঠামোর কল্পনায় অভ্যাস্ত ফাহমিদূল পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী সেক্যুলার বা অসাম্প্রদায়িকতা তার চাই- ই - চাই বলে গো ধরে ।

যে লালন তার মতকরে ডিভাইন অর্থে পরকালিনতার বিরোদ্ধে চিন্তা এবং কর্ম করে গেছেন অসামপ্রদায়িকতার জগতদিয়ে । সেখানে যখন
ফাহমিদুল গংরা তথাকথিত লৌকিধর্ম খোঁজতে যায় । আমাদের খেয়াল করা উচিত তার তাদের ধান্দা ভিন্ন ।

ফলে ভূপর্যটক কিংবা কলিযুগ আপনারা যাই আলোচনা করেন আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি খানিক অপাত্রে কথা বলছেন কি ? কারণ যার সমস্যা ভিন্ন কিংবা বুঝ অসম্পুর্ণ তার কর্ণ তার মত করে সব শুনবে ।



ফাহমিদুল গং(শ্রেণী) যতদ্রুত উপনিবেশিক সাম্প্রদায়িক মননকে পিছনে ফেলে শিকড়কে বর্তমান আর্ন্তজাতিক রাজনীতির শত্রু-মিত্র বিভাজনের বাস্তবতার প্রেক্ষিতকে মাথায় রেখে বুঝতে যাবে ততই আমরা পরস্পরের ভাব-ভাষা সহজে বুঝতে পারব ।

পুঁজিতন্ত্র নামের আইয়ামে জাহেলিয়াত মত পারলৌকিকতার ধংস হয়ে শুরু হউক ইহকালিন র্ধমের যাত্রা ।


বুশের 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অন্তত' যুদ্ধের মর্ম যত দার্শনিক ভাবে বুঝব তত বুঝব এইকালে লড়াইয়ের ভাব-ভাষা ।


ফাহমিদূল- ভুপর্যটক এবং কলিযুগের কাছে কৃতজ্ঞ উপরের গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ গুলোর অবতারনার জন্য । সবাই কে বর্ণহীন সালাম ।


















২১ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ রাত ১০:২৬

লেখক বলেছেন: লেখক বলেছেন: "ফাহমিদের বুঝ = খানিক মৌলবির বুঝ+খানিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী বুঝ+ (বেশ) খানিকটা বুশের বুঝ....."

মৌলবির বুঝ কেন বলছেন? (বেশ) খানিকটা বুশের বুঝ কেন বলছেন? -- এগুলো ব্যাখ্যা না করলে বললে আপনি হয়তো ঠিক বুঝছেন কিন্তু তাতে ফাহমিদের দাবি জেনুইন। "বুশসংক্রান্ত যাবতীয় বমি উগরে দিলেন, আমার গায়ে" বলে ফাহমিদুলের মনে হবে।

যাই হোক আপাতত আমাদের বিতর্ক মন দিয়ে শুনুন, আপনার ব্যাখ্যা এখানে আসেও পড়তে পারে। তারপর না হয় বইলেন।

১২. ২১ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ সকাল ৮:২৫
ফাহমিদুল হক বলেছেন: আলোচনা চলছিল, মানে চালিয়ে যাবার মতো ছিল, আওয়াজ মশাই এসে সব ভণ্ডুল করে দিলেন।

ফাহমিদের বুঝ = খানিক মৌলবির বুঝ+খানিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী বুঝ+ (বেশ) খানিকটা বুশের বুঝ

এই হলো ফাহমিদের পোস্টসম্পর্কিত আওয়াজের বুঝ?! সাধু সাধু!!

আমার ঘোর সন্দেহ হচ্ছে আপনি আমার দীর্ঘ পোস্টটি আদৌ পড়েননি। এই পোস্টই হলো আপনার একমাত্র পাঠ। একটা টেক্সটের (মূল পোস্টের) কীরকম ভুলপাঠ হতে পারে, তার উদাহরণ উচ্চারণ মশাই রেখে গেলেন আওয়াজসমেত।

তিন আমার প্রত্যাশার সঙ্গে বুশের প্রত্যাশা গোঁজামিল দিয়ে মেলালেন তারপর তারা জানা বুশসংক্রান্ত যাবতীয় বমি উগরে দিলেন, আমার গায়ে।

ভালো ভালো!

দেখি ভূপর্যটক ও কলিযুগ সাহেব এবার কী বলেন।
২১ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ রাত ১০:৩০

লেখক বলেছেন: আশা করি জবাব পেয়েছেন।

১৩. ২১ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ রাত ৯:২০
ঘোর-কলিযুগ বলেছেন: জ্বি স্বীকার করি একটা মুশকিল তৈরি হল @আওয়াজ'র এই মর্মে উচ্চারিত কথাগুলান থেকে। তার কথা ও তার অবস্থানের যৌক্তিকতা আরো বিশদে শোনার জন্য আমি ও ভূপর্যটকের মত আমিও অপেক্ষমান। আশা করি তিনি বলবেন।

@ফাহমিদুল, আমরা তো ব্লগে সবাই সবার ইচ্ছা ও মর্জিমাফিক মন্তব্য বা অভিমত ব্যক্ত করি। প্রত্যেকে তার নিজের জায়গা থেকে বুঝা ও গ্রহণ করাই আমার রীতি। পার্থক্য বা ভিন্নমত থাকলে সরাসরি তা জানান দিতে চাই। আমার অনুরোধ থাকবে আপনি রাগ না করে সামগ্রিকভাবে আলোচনায় সরব থাকুন। বলার ধরণ বা প্রবণতার মধ্যে আপত্তির জায়গাগুলোকে আলাদা করার পাশাপাশি যে প্রশ্নটি চুঁড়ে দিতে চাইছে তাকেও বিচার করে দেখুন না। প্রশ্নগুলো কাজের হতেও তো পারে।
১৪. ২১ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ রাত ১১:৫৪
ফাহমিদুল হক বলেছেন: @ভূপর্যটক ও ঘোর কলিযুগ, দেখেন হামোম প্রমোদ যে অভিযোগ করলেন, যে ব্যক্তি অহংবোধ দ্বারা তাড়িত হয়ে তর্কের নামে কুতর্কে ্প্রবৃত্ত হওয়া, ঐ কাজটা আমি করতে চাইনা, সচেতন থাকার চেষ্টা করি। তবুও কিছুটা হয়তো প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। আওয়াজ মশাই যেভাবে বুশের সঙ্গে মেলালেন আমার অবস্থানকে সেটা মেনে নেয়া কঠিন। পৃথিবীর সবাই বুশবিরোধী কিন্তু তবুও বুশ দুইবার ভোটে জেতে। বুশবিরোধী হওয়াই দরকার, কিন্তু সেই বিরোধিতা যত্রতত্র প্রয়োগ করা মানে খোদ বিরোধিতাকেই দুর্বল করে দেয়া। বুশবিরোধিতা আমিও ব্যক্তিগতভাবে কম করি নাই, আফগান ও ইরাক যুদ্ধবিরোধী বাংলা ভাষায় প্রকাশিত সবচাইতে বৃহৎ প্রকাশনাটির সঙ্গে আমি যুক্ত ছিলাম (মানুষ: সন্ত্রাস মিডিয়া যুদ্ধ সংখ্যা, সমাবেশ, ২০০৩, সেলিম রেজা নিউটন সম্পাদিত)। উল্টাপাল্টা তুলনা প্রতিতুলনা মেনে নেওয়া মুশকিল। আপনারা আওয়াজ মশাইয়ের ব্যাখ্যার জন্য অপেক্ষা করেন, আমার আগ্রহ নাই। আমার মনে হয় উনার যা বলার ইতোমধ্যেই বলে ফেলেছেন।

@ভূপর্যটক, আমার বিগত (৯ নম্বর) মন্তব্যের পর আপনার মন্তব্যের শেষটা ছাড়া পুরোটাই রেটিকাল বা কথামালার সমাহার মনে হয়েছে। আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছেনা, কী বলতে চাইছেন। আমি যত স্পষ্ট করতে চাইছি আমার অবস্থান, আলোচনার ফলাফলের দিকে যেতে চাইছি, আপনারা ততই রেটরিকাল জায়গায় চলে যাচ্ছেন।

আমি বললাম উদার মুক্তিমুখীন একটা আত্মপরিচয় চাই। বাঙালিত্ব ও মুসলমানিত্ব এটা আমাকে দিতে পারেনা, ঐতিহাসিক কারণে। লোকধর্মের মাধ্যমে এটা পেতে পারি।

এই সারাংশে আপনারা একটা সমস্যা খুঁজে পেলেন যে আমি যাই-ই বলি না কেন, আসলে আমি এসবের মধ্য দিয়ে তথাকথিত অসাম্প্রদায়িকতাকে খুঁজে মরছি। আমার মাথায় আসলে বাঙালি জাতীয়তাবাদী ভূতই রয়ে গেছে। আমি বললাম তাহলে পরিস্কার করে বলি যদি আমাকে সুলতানী আমলের 'সাম্প্রদায়িক' সহনশীলতা উপহার দিতে পারেন তাতেই আমি খুশি। এইবার আমরা মনে হয় কাছাকাছি এলাম।

এই পরিপ্রেক্ষিতে বলেন, আত্মপরিচয়ের আলোচনায় এরপরও আমার দিক থেকে কী কী সমস্যা থেকে গেল? আর আপনারাই বা কী কী নতুন যোগ করতে চাচ্ছেন আলোচনায়? আমি কিছু কিছু ব্যপার টের পেয়েছি ইতোমধ্যে, কিন্তু আবার সংক্ষেপে জানতে চাই। পরে আবার প্রয়োজনে বিস্তৃত আলোচনা করা যাবে।

আসলে আমারই ব্যর্থতা হবে, সবকিছু বুঝে উঠতে পারছি না। তাই ফ্রেশ স্টার্টের প্রয়োজন দেখা দিল।

আর ভূপর্যটক যেমন পরামর্শ দিলেন আরও মন দিয়ে সময় নিয়ে পড়ে আবার বোঝার চেষ্টা করবো। তবে মূল পয়েন্টগুলোতে ফিরে আসতে তো দোষ নেই। ম্যাক্রো থেকে আবার মাইক্রোতে যাওয়া যাবে।
২২ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ দুপুর ২:০১

লেখক বলেছেন: আমি নিশ্চিত আমি রেঠরিকাল বা কথামালার সমাহার করি নাই। এটা বুঝা বা বুঝানোর সীমাবদ্ধতা। আবার সংক্ষেপে বলার চেষ্টা করি যা আছে ওখানে,
১. পরিচয় নির্মাণ প্রসঙ্গে আমি যা আগে বলেছি তা আবার গুছিয়ে বলা,
২. জনগোষ্ঠির পরিচয় নির্মাণের চেষ্টা করলে এটার একমাত্র পরিণতি জাতি, জাতীয়তাবাদ বা জাতিরাষ্ট্র হবে- এমন কোন কথা নাই। এটা আপনার লোকধর্ম বা কমিউনিষ্ট যেমন করে এমন অনেক কিছুই হতে পারে।
৩. আগামি দিনের বাংলাদেশের পরিচয় ভিত্তি "সুলতানী আমলের 'সাম্প্রদায়িক' সহনশীলতা" অথবা লোকধর্ম চাই - এমন কথা বলে কেউ প্রথমিকভাবে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু কথাগুলোর আরও কংক্রিট মানে দাঁড় করানোর দরকার। আবার এটা একইসাথে স্টেকহোল্ডাররা কে কী চূড়ান্ত ভূমিকা নেবে তা স্পষ্ট দৃশ্যমান করার কাজও বটে।
৪. উপরের এই কাজগুলো আগানো সুনির্দিষ্টভাবে নির্ভর করছে ধর্ম কী বা ইসলাম আমদের কাছে কী, এককথায় ধর্মের পর্যালোচনা মোকাবিলা করতে আমরা সামাজিক চিন্তা আকারে কতটা পরিপক্ক হয়েছি - এসবের উপর।
৫. এই কাজগুলো গুছানোর আগে পলিটিকাল, স্কলাস্টিক ও পপুলার, সুফি -ইসলাম কোনটার প্রতিই পক্ষপাতিত্ত্ব বা পছন্দ প্রকাশের দরকার নাই। কারণ আমাদের সাথে এদের সবার সম্পর্ক হলো পর্যালোচনামূলক, ক্রিটিকের মোকাবিলার। একাজের ফলাফলে আমাদের আগামির পরিচয়টা ক্রমশ স্পষ্ট হবে, করতে পারব।

কাজটা লম্বা, এর কোন সর্টকাট পথ নাই। তবে কাজটা কি ও কেন এটা বুঝতে পারলে আমরা অবশ্যই সফল হব।

১৫. ২৩ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ রাত ১২:৫৪
ঘোর-কলিযুগ বলেছেন: @ফাহমিদুল আপনার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, এখানে ব্যক্তি অহংবোধের জায়গা আমি কিছু দেখি নাই। আর আমার কথার যে জায়গাটা আপনি রেটরিকাল বলে কটাক্ষ করলেন তাতে আমি একটু দমে গেলাম। সেটা রেটরিকাল বলার জন্য নয় বরং আপনি বুঝাতে চেয়েছেন যে আলোচনা সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে একটা উপসংহারে পৌঁছানোর কোন লক্ষণ আপনি আমার মন্তব্যে পাচ্ছেন না। তাই? কি মুশকিল, আমি তো বরং সংক্ষিপ্ত করার প্রয়াসে মোটাদাগে @ভূপর্যটকের বক্তব্য থেকে জাত উপসংহারটাকে একটা সিদ্ধান্ত বিন্দু হিসেবে রেখে সামনে আগানো যায় কিনা তার চেষ্টা করছিলাম। ইহিতাসের বয়ান সংক্ষিপ্ত করা কি আপনার কাছে এই আলোচনার জন্য বেমানান ঠেকেছে? আমার কোন আপত্তি নাই আপনার যদি দরকার মনে করেন আমি পুনরাবৃত্তির ঝুকি নিয়ে আগের জায়গা থেকে আবার সুতা টানতে পারি। তাতে লাভ কি হবে জানি না।

আপনাদের 'মানুষ' নামক সংকলনটা আমি দেখেছি। সেটার জন্য এ উসিলায় একটা ধন্যবাদও দিতে চাই অনেকগুলো লেখা একজায়গায় জড়ো করে একসাথে পড়ার সুযোগ করে দেবার জন্য। এই রকম আরো একটা সংকলন হয়েছিল: 'মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও রক্তাক্ত আফগান' (নভেম্বর ২০০২ ঢাকা) শিরোনামে। সংকলক ছিলেন মাসুদ মজুমদার। মজার ব্যপার হলো, আমার আমলে থাকা এই দুটা সংকলনেই আমি সাম্প্রতিক আবার চোখ বুলালাম একটা বিশেষ বিষয় বুঝার তাগিদে। সে প্রসঙ্গ এখানে আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক হবে। আপনি যদি কষ্ট করে আমার দেয়া লাস্ট পোস্টটা পড়েন (Click This Link) সেখানে কিছুটা রেশ আছে তা ধরে আমরা আলাপ করতে পারবো। আশা রাখছি সেখানে আপনার সাথে বিস্তর কথার সুযোগ হবে। এখানে শুধু এটুকু্ই বলি যে, বুশ তথা মার্কিন সাম্রাজ্যের জারিকৃত ইরাক ও আফগান যুদ্ধের সূচনা পর্বে অনেকেই 'যুদ্ধ বিরোধিতা' করেছেন। কিন্তু বুঝা দরকার ওসব 'বিরোধিতা'র আদত জায়গাটি কি? উদাহরণ হিসেবে ধরুন বাংলাদেশের প্রথম আলো ( মিডিয়া) এবং আলী রিয়াজ ( প্রবাশি গবেষক, দেশি বুদ্ধিজীবী) এরাও সেসময় যুদ্ধের বিরোধিতা করে লেখালিখি করেছে। আপনার মনে পড়ে নিশ্চয়। কিন্তু ভেবে দেখুন তারা কিন্তু সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের শক্ত সমর্থক। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মূল ভাষ্যকারদের অন্যতম। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নীতিগত সমর্থক ও আদর্শিক সৈনিক হয়ে কিভাবে ইরাক ও আফগানিস্তানের বেলায় পরিচালিত ঠিক সেই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধেরই 'বিরোধিতা' এরা করলো? এটা কেমন বেখাপ্পা লাগে না? তাহলে ব্যাপাটা কি? কেন বাংলাদেশে এত 'বুশ বিরোধিতা'র নমুনা সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের আওতায় বাংলাদেশের জন্য নীতি ও কৌশল হিসেবে যে (যুদ্ধ)পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে তার বাইরে প্রায় কোন দল বা বুদ্ধিজীবীতা যেতে পারে নাই? এসমস্ত বিরোধিতার হেকমত আসলে কি? কোথায় দাঁড়িয়ে কেনই বা তা করা হয়েছিল সেটা শনাক্ত করাই আমার উদ্দেশ্য ছিল। বিশেষত জানুয়ারি ১১তে প্রকাশ্য ও নগ্নভাবে দূতাবাস নিয়ন্ত্রিত ক্যু হয়ে যাবার পরে সমর্থন ও হুমড়ি খেয়ে পড়া দেখে।

আপনার আগ্রহ থাকলে ওই পোস্টে আলাপের কমতি হবে না। এখন কি কিছুটা সাফ করতে পারলাম কেন আমি অপেক্ষা করে @আওয়াজের আরো ব্যাখ্যা শুনতে আগ্রহী। কেন নির্বিবাদি 'যুদ্ধ বিরোধী' এনজিও মার্কা আত্মচিৎকারে ডুবে যাইনা?


১৬. ২৭ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ সকাল ৮:৫৬
ফাহমিদুল হক বলেছেন: @ভূপর্যটক, আপনি বলেছেন, "উপরের এই কাজগুলো আগানো সুনির্দিষ্টভাবে নির্ভর করছে ধর্ম কী বা ইসলাম আমদের কাছে কী, এককথায় ধর্মের পর্যালোচনা মোকাবিলা করতে আমরা সামাজিক চিন্তা আকারে কতটা পরিপক্ক হয়েছি - এসবের উপর।"

এই কথাগুলো আমি আপনার বক্তব্যের সারাংশ হিসেবে পাচ্ছি। এখন কর্তব্য তাহলে এরকম:
১. ধর্ম বা ইসলাম আমাদের কাছে কী তা বোঝা
২. ধর্ম বা ইসলামকে পর্যালোচনা করা এবং এই পর্যালোচনাযুক্ত মোকাবেলার মাধ্যমে আমাদের সামাজিক চিন্তা পরিপক্ক করা।

প্রশ্ন আসতে পারে:
১. ধর্ম বা ইসলামকে বোঝার ক্ষেত্রে আমরা কোথায় রয়েছি? ধর্ম বা ইসলামকে আরও কী কী ভাবে আমাদের বুঝতে হবে?
২. সামাজিক চিন্তা পরিপক্ক করার ক্ষেত্রে ধর্ম পর্যালোচনায় পলিটিক্যাল ইসলাম, সেকুলারিজম, সুফি ইসলাম ও লোকধর্মের ভূমিকা কী হবে?
২৯ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ ভোর ৫:০৯

লেখক বলেছেন: আপনার প্রথম প্রশ্নের প্রথমটা থেকে শুরু করছি। উত্তর কী হতে পারে তা সাধারণভাবে আমার পোষ্টগুলোর প্রসঙ্গ নির্বাচন যদি অনুসরণ করেন তাহলে বুঝতে পারবেন। সুনির্দিষ্টভাবে "ধর্ম কী" পোষ্টে তত্ত্বের দিকটাই পরিস্কার করার চেষ্টা করেছি। আপনিও যখন সঠিক ভাষায় আইডেনটিফাই করে বললেন, "ইসলামবিরোধিতা অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে বাঙালিত্বে অনুপ্রবেশ করেছে" - সত্যি বলতে কী আমি ভরসা পেয়েছি ও অনুপ্রাণিত হয়েছি। আমি আপনার সব লেখাই পড়ে আপনাকে বুঝার চেষ্টা করি। এ্যকটিভিজম নিয়ে লেখাটাও দেখেছি। আপনার জীবন সংগ্রাম, কষ্ট বুঝার চেষ্টা করেছি। তবে আপনার চলতি পোষ্টটাই প্রথম আমাকে আকৃষ্ট করতে পেরেছে।

বাংলাদেশে ধর্ম নিয়ে কোন আলোচনা করা প্রায় অসম্ভব। আপনি একাডেমিক আলোচনা করতে চাইলেও পারেন না। আপনাকে
"রাজাকার" বলে গালি দিয়ে চুপ করিয়ে দিবে। দেবার সে বন্দোবস্ত পাকা করা আছে। এই আচরণ ব্যাখ্যা করলে দেখবেন এর ভিতরে আছে, চরম দলবাজি মনোভাব, ভোট কমে যাবার ভয়, তথাকথিত প্রগতিশীলতা, আধুনিকতা, শস্তা নারীবাদিতা, আর যথেচ্ছাচার করার স্বাধীনতা। এক ধরণের পাথর সময়ের ভিতর দিয়ে আমরা পার হচ্ছি। কোন প্রসঙ্গে একটা ক্রিটিক্যাল মন, বিচার করার ক্ষমতা চিন্তাধারা সমাজে গড়ে উঠার বিপক্ষে তাবত ব্যবস্হা যেন পাকা করা আছে। জামাত বলে গায়ে কালি লাগিয়ে দেবার এমন এক স্বৈরাচারী পাহারা বসানো আছে - মানুষের চিন্তাশীল পরিচয় মিটিয়ে দেওয়াই যেন এর লক্ষ্য। আবার এর উল্টা দিকটাও যদি দেখেন সত্যি সত্যি জামাত বিষয়ক সমস্যা তো রাজনীতিতে আছেই। আবার ইসলামি রাজনীতিক দলগুলোকে দেখেন এই রাজাকার প্রচারণার বিপরীতে ইসলামকে জোড়েসোড়ে ধর্মতাত্ত্বিক বয়ানের সীমায় মৌলবিদের রাজত্ত্বের মধ্যে বেধে রাখা আছে। এর মানে হলো আমরা উভয় দিক থেকে বন্দী। এজন্য আমি কথা শুরু করেছিলাম এভাবে, ধর্মকে আমরা ভক্তিভরে পূণ্যসঞ্চয় বা সোয়াব কামাতে পাকপবিত্র হয়ে বসে শুনার বিষয় ভাবতে পারি আবার চিন্তার সাবজেক্ট, ভাব বা দর্শন চর্চার বিষয় হিসাবে নিতে পারি। অর্থাৎ যারা ধর্মকে ভক্তিভরে নেবে এদের সাথে বিরোধের কিছু নাই। এরা পূণ্যসঞ্চয় বা মানসিক শান্তি লাভ করতে পারলে করুক। কিন্তু সমাজে চিন্তার বিকাশের জন্য চিন্তার সপ্রাণতার জন্য ধর্মকে দর্শনের বিষয় নিতে হবে, বিচারে বসতে হবে। বিচার করার ক্ষমতা ও যোগ্যতা লাগবে। কেন? ধর্ম কেন? ধর্ম থেকে কেন? কারণ, ধর্ম (ধর্মতত্ত্ব নয়) পর্যালোচনা, মোকাবিলা পর্ব শেষ না করতে পারলে চিন্তার স্বাধীন বিকাশ, ভিত্তি দর্শন বা ভাবচর্চা আগাবে না।

পশ্চিম তার সময়ে, তার সমাজে ভুগোলে বসে তার ধর্মের পর্যালোচনার কাজটা করেই আগিয়েছে। এরই ফল হলো, মানুষের সাম্য, গণতন্ত্র, মানবতাবাদ, সেকুলারিজম, এমনকি জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার সনদ পর্যন্ত সবই। এই ভিত্তিভূমির উপর দাড়িয়ে পুঁজিতন্ত্রও বিকশিত। এটাই পৃথিবীর এক সভ্য জগতের একছত্র চিন্তা বলে প্রতিষ্ঠিত। আমাদের মূলধারাও আধুনিক বলে একে কপি করে বরণ করে নিতে প্রস্তুত। যেটা কেউই তলিয়ে দেখেনি বা দেখতে আগ্রহী নয় তা হলো পশ্চিমের ধর্মের পর্যালোচনার দাবিটা আসলে একপেশে। তার দাবিটা ধর্মের বলা হলেও আসলে তা সাধারণভাবে সব ধর্মের নয়, কেবল খ্রীচানিটির। কেন কেবল খ্রীচানিটি? না ওটাই তার সামনে ছিল বলে নয়, তার বিচারে অন্য ধর্মগুলো (ইসলাম, বৌদ্ধসহ বাকি যা কিছু) বিচারে গোনায় ধরার মত যোগ্যই নয়। পৃথিবীর সভ্য চিন্তার দাবিদারের এভাবেই তার দাবি বাকি সমস্ত সমাজ সভ্যতা ভূগোলের উপরে শাসন করে যেতে পারলেও দিনকে দিন যতই সে চ্যালেজ্ঞ হচ্ছে ততই তার দাবির অসারত্ত্ব প্রকাশ হয়ে পড়ছে। এটা হয়ত সংঘাতময় হিসাবে প্রকাশিত নাও হতে পারত। কিন্তু পুঁজিতন্ত্রের দখলি বিস্তারের কাজকে র‌্যাশনালাইজ করতে যতই সে সভ্যতার দাবিতে, অন্যকে সভ্য করার মহান কর্তব্যের কাজ হিসাবে নিজের নিষ্ঠুর নির্মমতার পক্ষে ন্যায্যতা হিসাবে পেশ করছে ততই তার সভ্য ভাবনার সঙ্কট উদোম হয়ে যাচ্ছে। বুশের মধ্যপ্রাচ্য বা ইরাক আফগানিস্তানে হামলার পক্ষে ন্যায্যতা কোথা থেকে টানছে লক্ষ্য করুন। আল কায়েদা ফেনোমেননকে পশ্চিমের সাধারণ মানুষের মনোভাব আর প্রাচ্যের সাধারণ মানুষের মনোভাব - পারসেপশনে যে মহাসমুদ্র গ্যাপ, ওটা লক্ষ্য করুন। কেউ কাউকে তার পারসেপশন, মনের ভাষা বুঝাতে পারছে না।
এই পরিস্হিতিকে কেউ ভাবছে এটা হলো এই লড়াইটা হলো খ্রীচানিটির বিরুদ্ধে ইসলামের জাগরণ, কারণ আল কায়েদা বা আপনার ভাষায় "পলিটিক্যাল ইসলাম" ধর্মযুদ্ধ মনে করেই লড়ছে। পশ্চিমের সভ্য চিন্তার সঙ্কট সীমাবদ্ধতাটা পুঁজিতন্ত্রের হাতে পরে দ্রুত উদোম হচ্ছে অন্যদিকে পুঁজিতন্ত্রের কারণে পুঁজিতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধটা ধর্মযুদ্ধ বা ইসলামের জাগরণ মনে করে এই খোলসে হাজির হচ্ছে। আবার বেকুব ইভানজেলিক বুশও এটাকে ধর্মযুদ্ধ বা খ্রীচান ক্রসেডই মনে করছে।
দুনিয়া জুড়ে চিন্তার এই উথালপাতাল অবস্হায় আমরাও তো বাইরে থাকব না। প্রভাবিত হব এটাই স্বাভাবিক। আমরা দুটো চিন্তাতেই প্রভাবিত হয়ে ভাগ হয়ে যাচ্ছি। ঘটনা কী তা না বুঝতে পেরে আমরা সেকুলারিষ্ট আর ইসলামিষ্টে ভাগ হয়ে যাচ্ছি।

তাহলে পশ্চিমের ধর্মের পর্যালোচনা করার দাবি মূলত খ্রীচানিটি পর্যালোচনা করে বেড়ে উঠা আব ইসলামসহ বাকি সবাইকে পশ্চাদপদ অযোগ্য বলে তার পর্যালোচনার দায় এড়ানো, উপেক্ষা আর অসভ্য বলে একধরণের বর্ণবাদিতার চর্চা। বিনাবিচারে বেমালুম একে আধুনিক বলে গ্রহণ করে সমাজের ভাগাভাগিতে আমরা একটা পক্ষ্ নিয়ে ফেলেছি। অথচ দরকার দুটোর কোনটাই না, দুটোই ধর্মযুদ্ধের দুই পক্ষ মাত্র।

তাহলে আমরা কোথায় দাড়াব, কোথা থেকে শুরু করতে হবে?

আবার সেই পুরনো অসমাপ্ত কাজ। ধর্মের পর্যালোচনা, তবে ১. কেবল ইসলামের পর্যালোচনা নয়, ২. পশ্চিমের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে, ৩. কোনভাবে ভুল করে মনে করা যাবে না পশ্চিমের প্রতিদ্ধন্দ্বী কিছু একটা আমরা করতে যাচ্ছি, ৪. পশ্চিমের চিন্তার অবদানগুলো সাথে রাখতে হবে, ওর সীমাবদ্ধতা থেকে শুরু করতে হবে, ৫. পশ্চিম মানেই অগ্রসর অথবা উল্টাটা সব খ্রেচানের কারবার এভাবে বিনাবিচার পর্যালোচনায় গ্রহণ বা ত্যাগ করা যাবে না, ৬. পশ্চিমের চেয়েও অগ্রসর, যা পশ্চিমকেও কাভার করে জয় করে - এমন কোন ধারণার উপর না দাঁড়াতে পারলে এই উদ্যোগের কোন ভবিষ্যৎ নাই। এটাও একটা একপেশে বর্ণবাদী কিছু একটা হয়ে দূর্গতি লাভ করবে। ইত্যাদি।

লন্বা লিষ্ট দেখে ঘাবড়ে গেছেন বোধহয়। কিন্তু কাজটা লম্বা হলেও শুরু করতে হবে। আর আশু কাজ হলো সমাজের ভাগকে আরও প্রকট করে তুলে এই বিভাজন ঠেকানোর কাজটার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে। এই বিরোধটা সমাজ ধারণ না করতে না পারলে ১৯৪৭ এর দাঙ্গার দাগ আজও যেমন আমরা মুছে ফেলতে পারিনি প্রতিমূহুর্তে আমাদের ক্ষতবিক্ষত করে, এরচেয়েও ভয়াবহ সঙ্কটের মুখোমুখি হব আমরা।
আমি কেন ধর্মের পর্যালোচনা থেকে শুরু করতে তাগিদ জানাচ্ছি এর একটা সংক্ষিপ্ত জবাব দেবার চেষ্টা করলাম। পরবর্তীতে আপনার প্রতিক্রিয়ায় ঠিক হবে আর কী আমার বলার আছে বা ঘাটতি থাকলো।

পলিটিক্যাল ইসলাম, সেকুলারিজম, সুফি ইসলাম ও লোকধর্মের ভূমিকা কী হবে - এগুলো াগেই ঠিক করার বিষয় না। এছাড়া এরমধ্যে পছন্দসই কোন একটাকে ঝেড়ে মুঝে আবার খাড়া করার বুদ্ধি আমরা করছি না। ধর্মের ধর্মতাত্ত্বিক বয়ান ঝেড়ে ফেলতে পারলে এটা নিজেই একটা নতুন নামে হাজির হবে। ওখানে ধর্ম, চিন্তা আর রাজনীতি এটাকে আলাদা করে চেনা যাবে না। "আধুনিক" ধারণাটার কথাই ভাবুন। আমাদের কাজের ফলাফলটাও আগামি দিন "আধুনিক" জাতীয় কিছু একটা ডাকনাম দিবে নিশ্চয়। আপাতত নিশ্চিত এতটুকুই যে এটার নাম "আধুনিক" হবে না। নাম হিসাবে ওটা হয়ত আপনার প্রস্তাবে হবে "লোকধর্ম"!

আপাতত এখানেই শেষ করতে হচ্ছে, তাড়াহুড়োতে লেখা বাক্যের অস্পষ্টতা থাকতে পারে, মাফ করে দিয়েন।

২৯ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ ভোর ৫:১৬

লেখক বলেছেন: পলিটিক্যাল ইসলাম বিষয়ে একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছি। নীচের পোষ্টে পি মুন্সী মন্তব্যে শেষের দিকে পলিটিক্যাল ইসলাম প্রসঙ্গে ভাবনাটা আমার ভাল লেগেছে আপনি পড়ে দেখতে পারেন,
Click This Link

১৭. ১৩ ই জুন, ২০০৯ বিকাল ৪:২৪
ফিরোজ জামান চৌধুরী বলেছেন: খুবই উপভোগ্য বিতর্ক। (অনেক দিন পর পড়লাম)
ধন্যবাদ ফাহমিদ ভাই।
০৩ রা জুলাই, ২০০৯ ভোর ৪:৪৫

লেখক বলেছেন: বিতর্ক উপভোগ করেন। বিতর্ক উপভোগ্যই হওয়া উচিত।
তবে অবস্হান নেয়ার উদ্দেশ্যে উপভোগ করা উচিত।

ফাহমিদকে আমিই বেশি ধন্যবাদ জানাই। কারণ ওর উসিলাতেই আমার কথগুলো বলবার সুযোগ নিতে পেরেছি। নইলে হয়ত মনের কথা মনেই যেত রয়ে। তবে স্পষ্ট জানতে পারি নাই আপনার ফাহমিদকে ধন্যবাদ দেবার অর্থ ফাহমিদের পক্ষ নেয়া কী না।

অনেক দেরিতে হলেও এসেছেন, পড়েছেন। আপনাকে ধন্যবাদ জানাই।

 

মোট সময় লেগেছে ১.০৭৭২ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

    কোন বিভাগ নেই