ধারাবাহিক উপন্যাস : রঙমহল
= পার্থসারথি
পর্ব-২
***
সুবিমল মিত্র প্রায় তিন যুগ ধরে বাবু বাড়ীতে আছেন। তার আগে পিতা বিশাল মিত্রও এক যুগ কাটিয়েছেন। নিজের অসুস্থতার জন্যে ছেলেকে রেখে গেছেন। পিতার মত পুত্রও বেশ সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করছেন।
বাড়ীর দাস-দাসী থেকে শুরু করে যত কর্মচারী আছে সবার তদারকি করেন সুবিমল বাবু। এবং যাবতীয় হিসেব-নিকেষও তিনি করেন। তিন যুগ ধরে বেশ বিশ্বস্ততার সাথেই দায়িত্ব পালন করছেন। নারায়ণ বাবুর বিশ্বস্ত লোক। বর্তমানে পরিবারের একজন হয়ে গেছেন। অবশ্য এতটুকু পথে আসতে অনেক কাঠ-খড় পোড়াতে হয়েছে সুবিমলকে। সুবিমল বাবু সাত সন্তানের জনক। স্ত্রী মধুবালা বারোমেসে রোগিণী। অভাবে কাটিয়েছেন ঠিকই কিন্তু কোনদিন স্বভাবকে বিনষ্ট হতে দেন নি। কারণ সুবিমল বাবু অর্থের চেয়ে মান-মর্যাদাকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন জীবনভর। আর এ কারণে বর্তমানে বেশ দাপটেই চলেন। ঈশ্বরের কৃপাতে এখন কোনরকম অভাবের ছায়া সংসারে পড়ে না। অবশ্য এ’ সব কিছুর পেছনে নারায়ণ বাবু অবদান। এর পেছনেও রয়েছে এক কঠোর তপস্যার বুনিয়াদ ; সময়টা সম্ভবত বাবু বাড়ীতে আসার তৃতীয় বর্ষের হবে। সুবিমল বাবু তখন মহাবিপদের মাঝখানে হাবুডুবু খাচ্ছেন ; উলাওটায় মারা গেল দু’দুটো তরতাজা ভাই, বাবা ও মা। ঘরে শুধু চারজন সৌমত্ত বোন আর বৃদ্ধা ঠাকুরমা। ভাই দু’জন মারা যাওয়াতে একমাত্র উপার্জনম ব্যক্তি সুবিমল নিজে। তিন বেলার স্থলে দু’বেলা খেয়ে-পরে কোনরকমে দিন কাটাচ্ছেন। আবার এদিকে বোনগুলোও বিয়ের উপযুক্ত। এসব চিন্তায় সুবিমলের দিশেহারা অবস্থা। এদিকে কাজে-কর্মেও কেমন যেন একটু গা-ছাড়া ভাব। প্রধান হিসাব রক নলিনী বাবু একটু দুষ্ট প্রকৃতির। সুবিমল থাকাতে নয়-ছয় করতে পারছেন না। এ সুযোগে টাকা-পয়সা সরিয়ে দোষ চাপিয়ে দেন সুবিমলের ওপর। কিন্তু নারায়ণ বাবু কোনমতেই বিস্বাস করেন না। নলিনী বাবু তা’ বিস্বাস করাবেনই।
নারায়ণ বাবু বিচণ মানুষ। ভাবলেন এর পেছনে নিশ্চয়ই কোন গূঢ় তথ্য আছে। তাই ইচ্ছে করেই একটি থলেতে বেশ পরিমাণ টাকা রেখে এমন জায়গায় রাখলেন যা’তে সহজেই সুবিমলের চোখে পড়ে। এ ঘটনা শুধু তিনি নিজেই জানেন। দ্বিতীয় কোন ব্যক্তিকে জানান নি।
দুপুরের খাওয়া সেরে নারায়ণ বাবু বিশ্রাম নিচ্ছেন। চোখ জোড়া বন্ধ। হাতে হুকার নলটা। থেমে থেমে দম বসাচ্ছেন বেশ তৃপ্তি সহকারে । ে ঁধায়া কুন্ডলী পাকিয়ে ওপরে গিয়ে মিশে যাচ্ছে।
হন্ত-দন্ত হয়ে সুবিমল বাবু হাজির হলেন। ঘন ঘন নি:শ্বাস ছাড়ছেন আর হাফাচ্ছেন। দ্রুত বলার চেষ্টা করেন- কর্তাবাবু , কর্তাবাবু ... !
নারায়ণ বাবু চোখ বন্ধ করা অবস্থায়ই বলেন- কী হয়েছে ?
সুবিমল হাতের থলেটা দেখিয়ে বলেন- কর্তাবাবু দেখেন ... দেখেন ... এটার ভেতর অনেকগুলো টাকা!
নারায়ণ বাবু স্বাভাবিক। কোনরকম বিস্ময় বা আবেগ প্রকাশ না করেই বলেন- কীসের, কোথায় পেলে ?
আমার বিশ্রাম ঘরের খাটের নীচে পেলাম।
নারায়ণ বাবু চুপচাপ। হুকায় লম্বা টান বসালেন। সুবিমল অবাক হয়ে বলেন- কর্তাবাবু একটু তাকিয়ে দেখুন। অনেক টাকা হবে!
নারায়ণ বাবু নিস্পৃহ ভাব নিয়ে বলেন- কত টাকা?
তা আমি গুনি নি।
গুনিস নি কেন?
এগুলো তো আমার নয়। আমি গুণতে যাব কেন?
নারায়ণ বাবু চোখ মেলে তাকালেন। তারপর একটা নির্মল হাসি ছড়িয়ে হাত বাড়িয়ে সুবিমলকে কাছে টেনে নিলেন। এবং আদর করে বললেন- তুই পরীায় পাশ করেছিস। তবে এ ঘটনা আমি আর তুই ছাড়া কেউ যেন না জানে।
সুবিমলের চোখে জল। টপ টপ করে গড়িয়ে পড়ছে। কন্ঠ বাষ্পরুদ্ধ। কোন কথা বের হতে চাচ্ছে না। তবু কষ্টগুলোকে আড়াল করে বলেন- কর্তাবাবু আপনি কি আমাকে কখনও সন্দেহ করেছেন?
না কখনও না। যদি সন্দেহ করতাম তবে তোকে জিজ্ঞাসা করতাম। এটা তোর জন্যে দেয়া আমার পরীা। আশীর্বাদও বলতে পারিস। ভগবান আমাকে যতদিন টিকিয়ে রাখবে তোর কোনরকম বিপদ হবে না। তোর ওপর আমার আশীর্বাদ থাকবে। এখন গিয়ে নলিনীকে আমার কাছে ডেকে নিয়ে আয়।
কর্তাবাবু এখনই আনতে হবে ?
হ্য াঁ, এখনই।
উনি তো গদিতে আছেন।
যেখানেই থাকুক। আমার কাছে নিয়ে আয়।
আচ্ছা কর্তাবাবু এখনই যাচ্ছি। টাকার থলেটা কোথায় রাখব ?- এই বলে থলেটা এগিয়ে ধরে সুবিমল।
এটা তোর।
সুবিমলের দু’চোখ কপালে ওঠতে বাকি- ভীষণ রকম অবাক হল সে।
দেখ সুবিমল, তুই নির্দোষ। তোর ওপর আমি পরীা চালিয়েছি। এই টাকা এখন তোর। এটা নিয়ে নিলে ঈশ্বর আমার ওপর অসন্তুষ্ট হবেন। তাছাড়া তোর এখন টাকা দরকার।
সুবিমল আমতা আমতা করে বলেন- টাকা আমার দরকার ঠিকই। তাই বলে বিনা কারণে এতগুলো টাকা আমি নিতে যাব কেন।
বললাম তো এগুলো তোর। এতে এক হাজার টাকা আছে। সামনে তোর বোনের বিয়ে। ঘর-দোর ঠিক করবি আর বিয়ের খরচ করবি। পারিস তো কিছু জমি কিনিস।
সুবিমল আর কথা বাড়ায় নি। তবে বুদ্ধি খাটিেিয় বলেন- ঠিক আছে কর্তাবাবু। এগুলো আমার বলেই মেনে নিলাম। কিন্তু যখন দরকার হবে তখন চেয়ে নেব। এখন আপনার কাছে থাকুক।- টাকার থলেটা কর্তাবাবুর হাতে তুলে দিল সুবিমল।
ঠিক সেই মুহূর্তে নলিনী বাবু এসে ঊপস্থিত হলেন। নমস্কার জানিয়ে কর্তাবাবর পাশে দ াঁড়ালেন।
নারাযণ বাবু অ াঁড় চোখে তাকিয়ে বলেন- ভালই হলো এসে পড়েছো। তোমাকে ডাকতে পাঠাচ্ছিলাম। নলিনী বাবু হাত জোড় করে বলেন- আজ্ঞে কর্তাবাবু বলেন।
নারায়ণ বাবু একটু রাগত কন্ঠেই বলেন- তোমার জোড় হাত আমার সামনে থেকে সরাও!
নলিনী বাবু ঢোক গিলতে গিলতে জোড় হাত ছাড়া করলেন। তারপর আমতা আমতা করতে লাগলেন।
সুবিমল এ থলে থেকে একশত টাকা বের কর।- এই বলে থলেটা এগিয়ে দিলেন।
সুবিমল গুনে একশত টাকা আলাদা করলেন। এবং তা’ কর্তাবাবুকে জানালেন।
নারায়ণ বাবু বেশ নিরাসক্ত কন্ঠে বলেন- টাকাগুলো নলিনীর হাতে দাও।
নলিনী বাবু প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেন- কিসের টাকা কর্তাবাবু?
তুমি এখন, এই মুহূর্ত থেকে আমার সীমানার বাইরে থাকবে। আর যাবতীয় হিসাব-নিকাস সুবিমলকে বুঝিয়ে দিয়ে যাবে। টাকাটা দিলাম কারণ বাড়ীতে তোমার বউ-বাচ্চা আছে। চার মাসের বেতন আমি তোমাকে দিয়ে দিচ্ছি।
ক াঁদতে ক াঁদতে নলিনী বাবু নারায়ণ বাবুর পা জড়িয়ে ধরলেন। কর্তাবাবু আমাকে মাফ করে দেন। আমি আর কোনদিন এরকম করব না। আমাকে মাফ করে দেন! নইলে বউ-বাচ্চা নিয়ে না খেয়ে মরতে হবে।
দেখ নলিনী আমি বেশি কথা পছন্দ করি না। তাছাড়া অনর্থক কাউকে কিছু বলি না। যা বলছি তা কর। পা ছাড় বলছি।
সুবিমল সুবোধ বালকের মত চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগলেন্।কারণ আগা-গোড়া কিছুই বুঝতে পারছেন না।
সুবিমল নলিনীকে এখান থেকে নিয়ে যা’ তো।- কর্তাবাবু চেয়ারে হেলান দিয়ে হুকা টানতে মনোযোগী হলেন।
সেই থেকেই নলিনী বিদায়। আর সুবিমলের দায়িত্ব আরও বেড়ে গেল। এখন পর্যন্ত তা’ বহাল আছে।
বাবু বাড়ীতে সুবিমলের মতামত বেশ গুরুত্বের সাথেই নেয়া হয়। কারণ তিনি পরিবারের একজন শুভাকাঙ্খী। স্বয়ং বড়কর্তাও উনার কথাকে গুরুত্ব দেন। এর রেশ ধরেই সুবিমল বাবু নারায়ণ বাবুর চার সন্তান ; প্রিয়নাথ সরকার, শম্ভুনাথ সরকার, সুনয়না ও প্রহলাদকে নিয়ে বৈঠক ঘরে বসেছেন। সবাই চুপচাপ। প্রিয়নাথ বর্তমানে চৌদ্দ বৎসরে পা রেখেছেন। বাড়ীর বড় ছেলে। প্রিয়নাথ ও শম্ভুনাথের বয়সের তফাৎ প াঁচ। আর বাকীরা পিঠোপিঠি।
প্রিয়নাথ বেশ চিন্তিত হয়েই জানতে চায়- কাকা বাবু কোন বিপদ-টিপদ হয় নি তো?
সুবিমল বাবু সান্ত্বনার সুরে বলেন-না, ওসব কিছু না। আমি তোমাদের ডেকেছি অন্য কারণে। -- এই বলে সুবিমল বাবু একটু আমতা আমতা করছিলেন।
কাকা বাবু আপনি নিশ্চিন্তে বলতে পারেন- প্রিয়নাথ অভয় দিয়ে বলে।
কীভাবে শুরু করবেন বুঝতে পারছেন না সুবিমল বাবু। খুব ভেবে চিন্তে শুরু করলেন- ইদানিং তোমরা নিশ্চয়ই তোমাদের বাবাকে খেয়াল করেছ ?
সবাই প্রশ্নবোধক দৃষ্টি নিয়ে তাকায়।
গিন্নীমা চলে যাবার পর থেকেই কর্তাবাবু যেন কেমন মিইয়ে যাচ্ছেন। সেদিকে কি তোমরা খেয়াল করেছ ?- কিছু শুনতে চেয়ে সুবিমল বাবু প্রিয়নাথের দিকে তাকান।
সবার মন একটু বিষন্ন হয়।
শোন তোমরা, এভাবে চলতে থাকলে কিন্তু কর্তাবাবুকে টিকিয়ে রাখতে পারবেন না। ঊনি কিন্তু বেশিদিন ব াঁচবেন না।
সুনয়না অস্থির চিত্তে বলে- কাকাবাবু !
শম্ভুনাথও জানতে চায়- কাকাবাবু আমরা কী করতে পারি ?
প্রিয়নাথ বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে বলে- কাকাবাবু ঠিকই বলেছেন। আমি প্রয়ই দেখি বাবা গভীর রাতে একাকী পায়চারী করেন। প্রায় প্রতি রাতেই এ ঘটনা হচ্ছে।
সুবিমল বাবু বেশ আশ্বস্ত হন। সবার দিকে এক পলক তাকান। তারপর বলেন- তাই আমি একটা বিষয় নিয়ে ভাবছি।
সবাই সুবিমলের দিকে কিছু শোনার জন্যে উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে আছে।
তোমাদের জন্য একজন নতুন মা নিয়ে আসি কি বল ?- এই বলে সুবিমল বাবু বেশ আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছেন।কিন্তু সবার মুখমন্ডলে বিষন্নতার ছাপ সুস্পষ্ট।
তবে ত্রিনাথ বেশ হাসি-খুশি ভাব নিয়ে বলে- আমাদের জন্যে মা নিয়ে আসবে ? খুব মজা হবে! অনেকদিন ধরে মাকে দেখি না। মাকে দেখতে খুব ইচ্ছে করে।
প্রিয়নাথ হালকা ধমক দিয়ে বলে- চুপ কর। যা বুঝিস না তা নিয়ে কথা বলিস না!
ত্রিনাথ চুপ হয়ে যায়। ওর বুঝবার বয়স হয় নি। তবে এটুকু বুঝে ওর মা নেই। মাকে দেখতে ওর মনটা ব্যাকুল হয়ে আ্েযছ। তাই ‘মা’ শব্দটি শোনামাত্রই মনটা উতলা হয়ে ওঠে।
তোমরা শোন ; প্রত্যেক মানুষের কিন্তু সঙ্গী দরকার। তা হতে পারে আত্মীয় , হতে পারে বন্ধু অথবা অন্য কেঊ। সঙ্গী ছাড়া মানুষ অর্থহীন জীবন কাটায়। এই ধর তোমরা যে খেলা কর নিশ্চয়ই কারও না কারও কাছে সঙ্গ পাও। তোমাদের মা তেমনি তোমাদের বাবার জীবন সঙ্গী ছিলেন। উনি এখন একাকী জীবন কাটান। সারাদিন হয়ত কাজের ভেতর ডুবে থাকেন। কিন্তু যখন রাত নেমে আসে তখন তিনি ভীষণ রকম একাকীত্ব বোধ করেন। এই একাকীত্ব কিন্তু খুবই খারাপ। এমনকি মানুষ তার স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলে। আমি ইদানিং ল্য করছি কর্তাবাবু বেশ উদাসীন জীবন-যাপন করছেন।
প্রিয়নাথ অনিচ্ছা সত্বেও বলে- তাহলে আপনি কী করতে বলেন কাকাবাবু ?
তোমাদের জন্য নতুন মা আনা খুবই জরুরী কিন্তু কর্তাবাবু শুধু তোমাদের কথা ভাবেন। এ মুহূর্তে তিনি বিয়ে করতে রাজী নন।
সবাই চুপচাপ।
সুবিমল বাবু তাড়া দিয়ে বলেন- তোমরা যদি রাজী থাক তবে আমি খে াঁজ-খবর নিয়ে তোমাদের জন্য একজন ভাল মা নিয়ে আসব।
প্রিয়নাথ শম্ভুনাথের দিকে তাকিয়ে বলে- আপনি যদি ভাল মনে করেন তবে...
এর মধ্যে সুনয়না বলে- আমার কোন আপত্তি নেই।
সুবিমল বাবু ত্রিনাথকে জিজ্ঞাসা করেন- ত্রিনাথ তুমি কী বল?
আমারও কোন আপত্তি নেই। মার জন্য আমার মন খুব খারাপ রাগে। বলতে বলতে সবাই অঝোরে
কে ঁদে ফেলে। শুধু প্রিয়নাথ নিজেকে সামলে রাখে কোনমতে।
যুগবালা পাখির ছানার মত সব সন্তানকে আগলে রাখতেন। সযতেœ আগলে রাখতেন পুরো সংসারটাকে। দাস-দাসী থেকে শুরু করে সব কর্মচারীর হ াঁড়ির খবর পর্যন্ত যুগবালার নখদর্পনে থাকত। কোথায়, কখন, কী করতে হবে সবই খে াঁজ রাখতেন। শুধু নিজের বেলায় ছিলেন ঊদাসীন। বিয়ের পনের বৎসর সংসার-ধর্ম করেছেন নারায়ণ বাবুর সাথে। কিন্তু কোনদিন নারায়ণ বাবুর অযতœ হয় নি। বাড়ীর আঙিনার প্রতিটি বৃ পর্যন্ত তার হাতের ছে াঁয়া পেয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় আশ্চর্যের বিষয় গিন্নীমা মারা যাবার পরদিন বাড়ীর পোষা কুকুরটাও মারা গেল। কুকুরটা সারা রাত বাড়ীর চারদিক হৈচৈ করে ঘুরে বেড়াত। গিন্নীমার মৃত্যু শোক সইতে পারে নি গৃহপালিত কুকুরটাও।
***
বৈঠক ঘরে বসে সুবিমল বাবু টুকটাক হিসেব নিচ্ছেন। শেষে ধান বিক্রির টাকার হিসেব শেষ করলেন। জলমহালের পুরো টাকা এখনও ক্যাশ বাক্সে জমা পড়ে নি। এখনও প্রায় অর্ধেক টাকা পাওনা : সব হিসেব মিলিয়ে নিলেন।
কর্তাবাবুর ডাক আসতেই হিসেবের খাতাগুলো গুছিয়ে সিন্ধুকে রেখে চলে এলেন।
কর্তাবাবু নিজের পোষাক ঠিক করতে করতে বললেন- সুবিমল সব ঠিক আছে তো ?
আজ্ঞে কর্তাবাবু সব ঠিক আছে।
তবে আর দেরি না করে, তাড়াতাড়ি রওনা হই, কি বল ?
চলেন কর্তাবাবু যত তাড়াতাড়ি রওনা হব ততই মঙ্গল। তাছাড়া আষাঢ় মাইস্যা দিনের কোন বিশ্বাস নাই।
এক হাতে ধুতির কোচর টেনে ধরে নারায়ণ বাবু ঘরের বাইরে পা বাড়ালেন। পেছন পেছন সুবিমল বাবু। বজরাতে পা রেখে কর্তাবাবু আকাশের দিকে তাকালেন। আষাঢ়ের আকাশ মেঘ থাকবেই। তবে খুব বেশি নয়। বেশ পরিষ্কার আকাশই বলা চলে। দিনের বেলায় বৃষ্টির সম্ভাবনা কম। তারপর সুবিমলের দিকে তাকিয়ে বলেন- বজরা ছাড়তে বল।
সুবিমল বাবু সব মাঝিদের উদ্দেশে বলেন- বজরা ভাসাও। জোরে দ াঁড় টানবে। কারণ রওনা হতেই বেশ দেরি করে ফেললাম। তোমরা চেষ্টা করবে সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় যেন তাড়াইল পে ৗঁছতে পারি।
শুকনো মৌসুমে মাইলের পর মাইল শুধু তে আর তে। হাওর-বাওড় , বিল-ঝিল , নদ-নদী : যেদিকেই তাকানো যায় গ্রামগুলো বেশ ঝাপসা দেখা যায়। ইটনা থেকে ঊত্তরে বা পশ্চিমে তাকালে কোন গ্রাম সহজে চোখে পড়ে না। যা দেখা যায় তা বেশ অস্পষ্ট। আর বর্ষাকালে চারদিকে শুধু পানি আর পানি। যেন নতুন সমুদ্র। রাতের ঢেউ যখন আছড়ে পড়ে তখন মনে হয় সমুদ্রের গর্জন। একটু জোরে বাতাস বইলে বিশাল বিশাল ঢেউ পাড়ে এসে আছড়ে পড়ে। এখন আষাঢ় মাস বিশাল জলরাশির বুক চিরে পশ্চিমে চলেছে নারায়ণ বাবুর বজরা।
নারায়ণ বাবু বজরার বাইরে চেয়ার পেতে বসেছেন। পাশেই সুবিমল বাবু। সুবিমল বাবু আপন মনে পান চিবুচ্ছেন আর বিশাল জলরাশির বুকে চোখ মেলে দিয়েছেন। দূর থেকে জলরাশির বুক ধুয়ে ভাটিয়ালী সুরের মিষ্টি গান ভেসে আসছে। সম্ভবত নারায়ণ বাবু এ মুহূর্তে ওই গানটি উপভোগ করছেন। আর আপন মনে হুকার নলে ঠে াঁট লাগাচ্ছেন।প্রথমে নীরবতা ভাঙেন সুবিমল বাবু- কর্তাবাবু এবার তাড়াইল বেশিদিন থাকা যাবে না।
কর্তাবাবু ফিরে তাকান প্রশ্নবোধক দৃষ্টি নিয়ে।
সুবিমল বাবু- কর্তাবাবু , জলমহালের বেশ টাকা এখনও বাকী পড়ে আছে। তাড়াআড়ি এসে আবার ওই টাকার জন্যে দৌড়াতে হবে। তাড়াইলের কাজ যেভাবেই হোক এক সপ্তাহের মধ্যেই সারতে হবে।
নারায়ণ বাবুর সংপ্তি উত্তর- ঠিক আছে।
সুবিমল বাবু এবার প্রসঙ্গ পাল্টাতে চেষ্টা করেন। এবং বেশ জোর দিয়েই বলতে চেষ্টা করেন- কর্তাবাবু , আমার একটা কথা আপনাকে রাখতে হবে।
কর্তাবাবু হাত বাড়িয়ে থামিয়ে দেন এবং বলেন- আমার বন্দুকটা নিয়ে আয়তো তাড়াতাড়ি।
সুবিমল বাব ুহকচকিয়ে যান। কিন্তু পরণেই কর্তাবাবুর উৎফুল্ল দৃষ্টি পরখ করে চেয়ে দেখেন বড় ধরনের একটা সাদা বক। অদূরেই বড় বড় কচুরিপানার উপর বসে আছে। সুবিমল বাবু নিজে গিয়ে বন্দুকটা নিয়ে আসেন।
দেখ তো গুলি ভরা আছে কি-না।
সুবিমল বাবু পরখ করে বলেন- কর্তাবাবু সবকিছু ঠিক আছে।
বন্দুকটা নিয়ে নারায়ণ বাবু বকটাকে নিশানা করেন। অব্যর্থ নিশানা। বকটা অনেকটা পথ আহত অবস্থায় উড়ে গিয়ে ধপাস করে পানিতে পড়ে গেল।
দু’জন মাঝি ছোট নৌকা নিয়ে গিয়ে বকটা তুলে নিয়ে এল। সুবিমল বাবু অর্ডার দিলেন- বকের মাংসটা একটু ঝাল করে রান্না করার জন্য। মাঝি দু’জন বকটা নিয়ে চলে গেল ভেতরে।
কর্তাবাবু এতণে সুবিমলের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বললেন- সুবিমল তুই কী করে বুঝলি আমার মনের কথাটা ?
সুবিমল মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলেন- এতদিন কর্তার সাথে আছি ... । তাছাড়া এত বড় বক সচরাচর পাওয়া যায় না।
নারায়ণ বাবু বেশ খুশী হন। এবং বলেন- সুবিমল একজনকে ডেকে বল তো হুকাটা নতুন করে সাজিয়ে নিয়ে আসতে।
কর্তাবাবুর কথা শুনতে পেয়ে একজন মাঝি এগিয়ে সে কলকের মাথাটা খুলে নিয়ে গেল। আবার নতুন করে সাজিয়ে নিয়ে এল।
হুকায় একটা লম্বা টান বসিয়ে নারায়ণ বাবু বলেন- কী যেন বলতে চাচ্ছিলে সুবিমল ?
সুবিমল বাবু বেশ নি:সংকোচে বলে ফেলেন- একটা ভাল পাত্রীর সন্ধান আছে , আপনি আপত্তি করবেন না।
নারায়ণ বাবু একেবারে চুপচাপ হয়ে গেলেন। নিষ্পলক তাকিয়ে আছেন। দৃষ্টিতে নেই রাগ , নেই সুখ। শুধু অবসন্ন কষ্টগুলো লুটোপুটি খাচ্ছে।সুবিমল বেশ ভালই বুঝতে পারছেন। আবার বলতে শুরু করেন- আপনি এ একাকীত্ব থেকে নিজেকে কাটিয়ে ওঠতে পারছেন না কর্তাবাবু। একাকীত্ব মানুষের মাঝে কোনদিন ভাল কিছু বয়ে আনতে পারে না। সঙ্গী ছাড়া মানুষ ব াঁচতে পারে না। সুখ-দু:খ ভাগ করার অংশীদারের দরকার। আপনি বর্তমানে যে সময়টুকু পার করছেন তাতে কেউ সুস্থ থাকতে পারে না।
কিন্তু সুবিমল ... কর্তাবাবু কথা শেষ করতে পারেন নি। সুবিমল বাবু বলেন- কোন কিন্তু নয় কর্তাবাবু। খুব ভাল একটা মেয়ের সন্ধান পেয়েছি। সবদিক দিয়ে আপনার ভাল লাগবে।
আমি বিয়ে করলে আমার চার-চারটা সন্তান অসহায় হয়ে পড়বে। কারণ বিমাতার সংসারে কেউ কোনদিন শান্তি পায় নি। আমি চাই না আমার মাতৃহারা সন্তানগুলো নতুন করে কোন কষ্টে পড়–ক।
কর্তাবাবু এসব নিয়ে কোনরকম চিন্তা করবেন না। আপনি যদি ঠিক থাকেন তবে কোন অসুবিধা হবে না।
তা মানলাম। কিন্তু আমার সন্তানেরা এ বিষয়টা কেমন ভাবে নেয় ...।
এসব নিয়ে আপনি কোন চিন্তা করবেন না। আমি সব ব্যবস্থা করেই তবে আপনাকে বলছি।
কর্তাবাবু সুবিমলের দিকে তাকিয়ে থাকেন কিছু শোনার প্রত্যাশায় ।
সুবিমল বাবু বিস্তারিত বলেন এবং নারায়ণ বাবুকে আশ^স্থ করেন।
বাবুর্চি এসে খবর দিয়ে গেল, দুপুরের খাবার তৈরি।
নারায়ণ বাবু আনমনা। অনির্দিষ্ট দৃষ্টিতে জলরাশির বুকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছেন। সুবিমল বাবু চেয়ার ছেড়ে ওঠে বলেন- কর্তাবাবু চলুন। দুপুরের খাবার তৈরি হয়ে গেছে।
হ্য াঁ , চল , ুধাও লেগেছে বেশ।
মাঝিদের উদ্দ্যেশে সুবিমল বাবু বলেন- নৌকা থামিয়ে সবাই খাবার পর্ব সেরে নাও।
মাঝিরা নৌকা চালনা বন্ধ করে খু ঁটি গাড়ল। তারপর শক্ত করে নৌকা ব াঁধল। চারদিকে বিশাল জলরাশি। আশেপাশে কোন গ্রাম স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না শুধু পশ্চিম দিকে একটা গ্রাম ঝাপসা দেখা যাচ্ছে।
নারায়ণ বাবু ও সুবিমল বাবু কাছাকাছি হয়ে বসলেন্। আর বাবুর্চি ও মাঝিরা এক কাতারে। খাওয়ার দৃশ্য দেখে মনে হবে পিকনিক হচ্ছে। এটা নারায়ণ বাবুর একটা অভ্যাস ; সবাই নিয়ে একসঙ্গে নিয়ে খেতে বসা।
খাওয়া পর্ব সেরে মিনিট পনের বিশ্রাম শেষে নৌকা ছাড়ল। বেলা প্রায় তিনটা। এখনও অনেক পথ বাকী। মাঝিরা জোরে দ াঁড় টানতে শুরু করল। সুবিমল বাবু পানের খিলিটা মুখে পুরে প্রধান মাঝিকে বললেন- কান্লা গ্রামে নৌকা ভিড়াবে।
মাঝি শুধু হ্য াঁ সূচক মাথা ঝাকালেন। তারপর মনের সুখে ভাটিয়ালী সুরে ডুবে গেলেন। বেশ মিষ্টি সুরেলা কন্ঠ। কর্তাবাবু খুব মনোযোগ দিয়ে গান শুনছেন। আর নানান স্মৃতির আঙিনায় ভেসে বেড়াচ্ছেন। ভাবছেন ; ওরা অভাব-অনটনে থেকেও কত সুখী। কেউ সুখী না হলে এমন মধুর সুরে গান ধরতে পারবে ? আড় চোখে কর্তাবাবু মাঝিকে দেখছেন। যেন স্বর্গহতে এ মিষ্টি সুর ভেসে আসছে। মাঝি গান থামিয়ে দিক নির্ণয়ে মনোযোগী হলেন। কর্তাবাবুর ভাবের জগতে যতি পড়ল।
কান্লা গ্রামে যখন বজরা ভিড়ানো হল তখন বেলা প্রায় সারে চারটা। নারায়ণ বাবু সুবিমল বাবুকে জিজ্ঞ্যেস করেন- এখানে বজরা থামালে কেন ?
একটু কাজ আছে কর্তাবাবু। আপনি বসে বসে হুকা টানতে থাকুন। আমি যাব আর আসব।
গ্রামের লোকজন ছোটখাটো নৌকা দেখে অভ্যস্ত। এত সুন্দর এবং বড় নৌকা দেখে নি। তাই অনেক লোকের ভীড় জমে গেল। বাচ্চা-কাচ্চারা রীতিমত দে ৗঁড়াদৌড়ি শুরু করে দিল। কিছু দুষ্ট প্রকৃতির বাচ্চা-ছেলেরা বজরায় ওঠার জন্য চেষ্টা করছে। শেষ পর্যন্ত মাঝিরা বজরা পাড় থেকে একটু দূরে নিয়ে গেল।
প্রায় মিনিট বিশেক পর সুবিমল বাবু ফিরে এলেন। সঙ্গে একজন মাঝ-বয়সী লোক। সুবিমল বাবু নদীর পাড়ে এসে মাঝিদের ডাক দিলেন ছোট নৌকাটা নিয়ে যেতে। একজন মাঝি গিয়ে নিয়ে এল সুবিমল বাবু ও মাঝ-বয়সী লোকটাকে। কাছে এসে কর্তাবাবুর সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তারপর চেয়ার টেনে পাশাপাশি বসলেন। পরিচয় পর্ব শেষে টুকটাক আলাপ-চারিতার পর সুবিমল বাবু প্রসঙ্গ টেনে বললেন- কর্তাবাবু ইনি হলেন পাত্রীর বড় ভাই। ঊনি চাচ্ছেন বিশেষ করে ঊনার পিতা চাচ্ছেন আপনি যেন ঊনাদের বাড়ীতে একটু পদধূলি দেন।
নারায়ণ বাবু সুত্ণী দৃষ্টিতে নতুন আগত লোকটির দিকে তাকালেন। বেশ-ভূষাতে ততটা ঝিলিক না থাকলেও চেহারাতে বেশ একটা ধারালো ভাব আছে। কথাও বলছেন বেশ গুছিয়ে। আদব-কায়দাও বেশ জানেন। তবুও কোথায় যেন একটু ছন্দপতনের সুর।
সুবিমল বাবু নীরবতা ভেঙে বলেন- কর্তাবাবু এত কী ভাবছেন ?
নতুন আগত লোকটির নাম আমরা জেনে নিই ; মনোরঞ্জন সরকার।
নারায়ণ বাবু - না, মানে আমি তো মানসিক ভাবে প্রস্তুত ছিলাম না। তাই ... ।
সুবিমল বাবু- কর্তাবাবু , আমি আগেই খবর পাঠিয়েছিলাম। উনারা জানতেন আপনি আসছেন।
নারায়ণ বাবু হালকা বিরক্ত হয়েই বলেন- তুমি আমাকে কিছুই বল নি !
সুবিমল বাবু- কর্তাবাবু , বলি বলি করেও বলা হয়ে ওঠে নি । তাছাড়া ...।
নারায়ণ বাবু এবার মনোরঞ্জন বাবুর দিকে তাকালেন। ভদ্রলোক লজ্জায় একেবারে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। এবং বেশ মার্জিত ভাবেই বললেন- থাক , উনি যেহেতু মানসিকভাবে প্রস্তুত নন। তাছাড়া এভাবে নিয়ে উনাকে অপ্রস্তুত করতে চাই না।
কথা শেষ করতে না দিয়েই নারায়ণ বাবু বললেন- ঠিক আছে, ঠিক আছে, চলুন। সরি , আমি আসলে ওভাবে চিন্তা করিনি।
পাত্রী দেখে ফিরে আসতে প্রায় এক ঘন্টা সময় লেগে গেল।বিদায় নিয়ে বজরা ভাসিয়ে তাড়াইলের উদ্দ্যেশে রওনা হতে পোনে ছয়টা বাজল।
হুকা টানতে টানতে নারায়ণ বাবু জানতে চান- সুবিমল , কাজটা কি ঠিক করলাম ?
কর্তাবাবু কোনরকম চিন্তা করবেন না। আমি সব খে াঁজ-খবর নিয়ে তবে আপনাকে নিয়ে এসেছি। এক সময় মনোরঞ্জন বাবুরা অবস্থা সম্পন্ন গৃহস্থ ছিলেন। কিন্তু প্রতি বছর ডাকাতদের অত্যাচারে কোনভাবেই ওঠে দ াঁড়াতে পারেন নি। তাছাড়া উনারা নিরীহ গোছের লোক। উনার বাবা সজ্জন ব্যক্তি। গ্রামের বিশিষ্ট ভদ্রলোক। বর্তমানে আর্থিক সচ্ছলতা না থাকলেও পারিবারিক সুনামটুকু ধরে রেখেছেন।
তা’ উনাদের চরনে-বলনে বেশ বুঝতে পেরেছি। কিন্তু তৎণাৎ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি তা’ কি ঠিক করেছি ?
তাছাড়া উপায় ছিল না। মনোরঞ্জন বাবুর পিতা খুবই অসুস্থ। উনিও চাচ্ছিলেন যথাসম্ভব মেয়ের বিয়েটা সেরে ফেলতে। আপনার সিদ্ধান্তে উনারা বেশ খুশি। ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস এটা আপনার জন্য মঙ্গল হবে। মেয়ে শুধু রূপেই অতুলনীয় তা’ কিন্তু ন॥ খুটে খুটে খবর নিয়েছি মেয়ে গুণেও অতুলনীয়া। সচরাচর এমন মেয়ে খু ঁজে পাওয়া দুষ্কর।
প্রথম দেখাতেই নারায়ণ বাবু নিজেকে হারিয়ে ফেলেন। অপরূপা সুন্দরী। টানাটানা চোখ। পাতলা গোলাপী ঠে াঁট জোড়ার অপরূপ মিলন। উন্নত নাসিকা। ওষ্ঠ তলে যেন শরত-মেঘের বিচরণ। ঘন কালো দীঘল চুল রাশি। নাসিকাগ্রে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে যেন মুক্তোমালা জড়ানো। শরীরের গড়ন বেশ আকর্ষণীয়া। যুগবালার সাথে চেহারার সাদৃশ্য নেই। কিন্তু যখন হাতের চেটোয় নাসিকাগ্রের ঘাম মুছতে গেল তখন মুখমন্ডলের ওপরের যে অংশটুকু দেখতে পেলেন সেখানে যুগবালাকে খে াঁজে পেলেন নারায়ণ বাবু। অকস্মাৎ বেশ বেসামাল হয়ে পড়লেন তিনি। যেন হৃত প্রিয়তমাকে মুহূর্তেই ফিরে পেলেন। প্রাণচাঞ্চল্যের আতিশয্যে উৎফুল্ল হয়ে ওঠলেন। তারপর সুবিমলকে ডেকে কানে কানে বলে দিলেন- যত শীঘ্রই পার বিয়ের ব্যবস্থা কর।
নিজের গলায় পরা চেইনটা খুলে দিয়ে কণেকে আশীর্বাদ করলেন। পণ ধার্য করলেন এক হাজার টাকা। কণেকে আশীর্বাদ স্বরূপ একান্ন টাকা দিয়ে এসেছেন। অবশ্য আশীর্বাদ শেষে মমতাময়ীকে নারায়ণ বাবু নিজে জিজ্ঞ্যেস করেছেন- আমি বিপতœীক জানেন তো ?
মমতাময় ‘ হ্য াঁ’ সূচক মাথা নাড়ে।
আপনি এ বিয়েতে সজ্ঞানে রাজী আছেন ?
মমতাময়ী কোন কথা বলল না। নীরবতা সম্মতির লণ ধরে নিলেন নারায়ণ বাবু। খুব ইচ্ছে হচ্ছিল চেহারাটা এক পলক দেখার জন্য। ভগবান সদয় হলেন ; লাজুক হাসির রক্তাভ মুখমন্ডল দেখে বেশ প্রীত হলেন নারায়ণ বাবু।
তাড়াইল বাজারের ঘাটে যখন বজরা ভীড়ে তখন বেশ অন্ধকার হয়ে গেছে। উৎফুল্ল চিত্তেই নারায়ণ বাবু পা বাড়ালেন বাজারের দিকে।
চলবে...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


