somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার চোখে আমেরিকা - পদার্পণ

২১ শে নভেম্বর, ২০০৭ বিকাল ৩:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রবিবার দুপুরে এসেছি। আর সোমবার সকালে কর্মস্থল। এখানে যান-বাহনের অবস্থা একটু বেয়াড়া। বড়লোকের রাজ্য ক্যালিফোর্ণিয়া। সবার বাড়িতে একাধিক গাড়ি। গাড়ি মানে চারচাকা। দু'চাকা এদেশে বিলাসিতা। Hurley-Davidson-এর দেশ বলে কথা!
আমাদের বাড়িতেও দুটি গাড়ি। একটি শেখের, অন্যটি ধীরুর। তাতেই এই বাড়ির সবাই ভাগ-যোগ করে কাজে যায়। আমি প্রথম দিন কাজে গেলাম শেখের গাড়িতে। ওর গাড়িও দুই দরজার Nissan 200SX Coup কালো রঙের ঝকঝকে দেখতে। ছেলেটা চালায় বেশ ভাল। যদিও এই দেশে স্বয়ংক্রিয় gear হওয়ায় গাড়ি চালানোটা অনেকটাই সহজ। পৌঁছে দেখি অফিস বাড়ির থেকে parking lot-এর জন্য বেশি যায়গা। বিচিত্র দেশ সত্যি! শুনলাম এটা নাকি নিয়ম যে, কোন সংস্থার parking lot-এ তার কর্মচারীদের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রাখতে হয়। হবেওবা, আমাদের দেশে তো সম্ভব নয়!
প্রথমেই যেতে হল reception-এ। সেখান থেকে visitor sticker বুকে সেঁটে ভিতরে ঢোকা। lift-এ করে সোজা তিনতলা। একটা ভাল জিনিস দেখলাম। এদেশে ground floor বলে কিছু নেই। একতলা মানে first floor, দুইতলা মানে second floor এই রকম। বেশ ভাল। আমাদের মত। শেখ আমাকে মণির খোপের সামনে ছেড়ে দিয়ে এগিয়ে গেল। মণি প্রাথমিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর আমার জন্য নির্দিষ্ট খোপে আমায় পৌঁছে দিল। দেখি সুন্দর ব্যবস্থা। আগে থেকেই আমার খোপ সাজানো আছে। computer-এর সামনে সুন্দর একটি welcome note আর তারসাথে আর একটি কাগজে বিভিন্ন নির্দেষাবলী, কি করে আমার computer এর বিভিন্ন জিনিস configure করতে হবে এই সব। হুট করে মনে পড়ে গেল আমার নিজের সংস্থার দপ্তরে আমার বসার জায়গা টুকু পেতে পুরো ১৫দিন লেগেছিল; computer ইত্যাদি তো দুরের কথা। তবে সত্যি কথাটা বুঝেছিলাম আরও পরে। আমার এই welcome note ইত্যাদিটা ব্যতিক্রমী ছিল। এখানেও আমেরিকা আমাদের মতই।
এরপর এক এক করে আমার team-এর সবার সাথে আলাপ হল। Cathy, Jim, Kim এমনকি অমল নামের এক "দেশি"! হ্যাঁ, বোকা বোকা শোনালেও, এদেশে ভারতীয় উপমহাদেশের লোকেদের "দেশি" বলে। একটা ব্যাপার দেখলাম, এখানে লোকে একটু বেশি আবেগ প্রকাশ করে - মাঝে মাঝে এই আবেগের আতিশয্য একটু কৃত্রিম লাগে। তবে পরে বুঝেছি এটাই এদেশের রীতি। প্রথম দিনই অফিসে তিন-তিনটি cultural shock খেলাম। প্রথম দুটো ঝটকা break-room-এ। আমার দেশের অফিসে এই ঘরগুলোতে কফি মেশিন আর জলের কল থাকে; এখানে সঙ্গে একটি microwave, একটিcoke vending machine ও তার সাথে একটি গাম্বাট freeze-ও আছে। কৌতুহল বশতঃ ওটি খুলে দেখি নানা রকম খাবারে ঠাসা! ব্যাপক আনন্দ হল। ভাবলাম হবেও বা, বড়লোকের দেশ বলে কথা! হয়ত, কর্মচারীদের জন্য সংস্থার তরফ থেকে এই ব্যবস্থা। একটা লোভনীয় choco bar দেখে মনে হল তুলে নেই। শেষ মুহূর্তে মনে হল প্রথম দিনই কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা না করে এতটা বাড়াবাড়ি ঠিক নয়। তাই জল খেতে গেলাম। dispenser-টার গায়ে গরম বা ঠান্ডা জলের বোতাম আছে। দেশের জ্ঞানের ভরসায় ঠান্ডা জলের বোতামের নিচে জলের গেলাস ধরে যেইনা বোতাম টেপা দেখি বাঁ-দিকের একটা জায়গা থেকে ছড়-ছড় করে জল পড়তে শুরু করল। তাড়াহুড়ো করে সব কাগজে মুছে পরিস্কার করলাম। জল খেয়ে নিজের আসনে ফিরে গেলাম। মুক্তিকে জিজ্ঞাসা করাতে বলল, ঐ freeze-টা রাখা আছে যাতে করে সবাই নিজের নিজের খাবার এনে ওতে জমা করে রেখে ইচ্ছে মত খেতে পারে। এবার বুঝলাম কি ভুল করতে যাচ্ছিলাম! আমি আক্ষরিক অর্থেই কোনো লোকের খাবার চুরি করে খেতে চলেছিলাম!! জোর বাঁচা বেঁচে গেছি! পরিস্থিতিটা ভেবেই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেছিল। ধরাযাক, আমি অম্লান বদনে ঐ choco bar-টা বার করে খাচ্ছি আর তার মালিক এসে হাজির...উফ কি চাপ!
তৃতীয় ঝটকাটা একটু বেলার দিকে খেলাম। আমাদের খোপ গুলির মাঝ দিয়ে bathroom, থুড়ি restroom যাচ্ছিলাম। স্বভাব বশতঃ বাঁ দিক দিয়ে। খেয়াল করিনি উল্টো দিক দিয়ে একজন মহিলা তাঁর ডান ধার দিয়ে অর্থাৎ আমার ধার দিয়েই আসছিলেন। আমি খেয়াল করিনি তার ওপর এদেশের হিসাবে অবজ্ঞা করে, মানে সামনা সামনি হওয়ায় হাসা বা hi-hello না করে এগিয়ে যাওয়ায় দেখি মহিলা বেশ ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। তাড়াতাড়ি আমার ডান দিকে সরে গিয়ে ওনাকে পথ ছেড়ে দিলাম। অপ্রস্তুতের একশেষ!
যাই হোক lunch-এর সময় বেশ চাপে পড়ে গেলাম। এখানে তো আর ফুটপাথের খাবারের দোকান নেই, অফিসের canteen-ই সম্বল। এখন সমস্যা হল, প্রথম দিন, তাই একা যেতে কেমন যেন বাধো-বাধো লাগছিল। প্রথমে আমার roommate শিবুর কাছে গেলাম। কিন্তু, ও অন্য কারোর সাথে বাইরে কোথাও খেতে যাবে। সুতরাং, অন্যত্র দেখতে হবে। দেখি কৌস্তভের খোপ পাশেই। গেলাম ওর কাছে। ও ফাঁকা ছিল। বলল, "canteen-এ খাবি কি রে? বাইরে চল!" আমায় ইতস্ততঃ করতে দেখে বলল, "ভয় নেই; আমার গাড়িতে যাব। আর খরচা প্রায় একই।" বেরিয়ে পড়লাম দুজনে। "কি খেতে চাস? চিনে, জাপানি, তন্দুরী, আমেরিকান?" বললাম, "তন্দুরী ছাড়া যা খুশি।" কৌস্তভ হেসে বলল, "প্রথমদিনই বেশি সাহসি হবার দরকার নেই। চল মায়ের হাতের মাংস-ভাত খাওয়াব। গেলাম অগত্যা এক মালয়ী রেস্টুরেন্টে। সুন্দর ব্যবস্থা। আনা হল Curry Chichen। সঙ্গে একবাটি ভাত বিনামূল্যে। গাঁতিয়ে খেলাম। সত্যি মায়ের হাতের রান্না। শুধু নারকেল তেলে রান্নাটা করেছে। তবে নারকেলের গন্ধ তত প্রখর নয়।
অফিসে ফিরে এসে মুক্তির কাছ থেকে কাজ বুঝে নেবার পালা শুরু।
সন্ধ্যেবেলা শেখের সাথেই বাড়ি ফিরলাম। একে একে ৫ জনই এল। দেখি ধীরু রান্না নিয়ে পড়ল। বাকিরা সবাই যে যার মত আছে। কেউ টিভি দেখছে, তো কেউ অফিসের laptop নিয়ে কাজে মগ্ন। কেউ বা নিছকই internet surf করছে। আমি এর ওর তার সাথে আলাপ জমানোর চেষ্টা করছিলাম। রাজু ও একটু চাপে আছে দেখলাম। অফিসের laptop আর ফোন নিয়ে দেশের অফিসের সাথে প্রচুর আলোচনায় ব্যস্ত। জানলাম আমাদের প্রত্যেকের এক এক দিন রান্নার ভার। ৫ জন ৫দিন; সপ্তাহান্তের দুদিন যে যার মত করে খেয়ে নাও। সুন্দর ব্যবস্থা!
আমার রান্না করার দিন হল বৃহস্পতিবার।
এবার সমস্যা হল কোনোদিন রান্না সে ভাবে করিনি - মানে করতে হয়নি। একা নিজের জন্য হলে তাও নাহয় একটা কথা ছিল। এখানে তো আরো ৪জনে খাবে। চিন্তায় পড়ে গেলাম। তবে আশার কথা এই যে সবাই আমাকে অনেক ভরসা দিল। সাবধানের মার নেই। ডিম হল চিরকালীন। তাই ঠিক করলাম ডিমের ঝোল-ভাত করব। খারাপ নামল না। রাজু তো জিজ্ঞাসাই করল, "তুমি কি আগে রান্না করতে?"
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই অক্টোবর, ২০০৯ রাত ৮:৩০
৮টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:১৭


সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ক্রাউড ফান্ডিং-এর সুযোগ তৈরি করে সরকারী লাভজনক প্রজেক্টে জনগণের বিনিয়োগ নিন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:৩১

বাংলাদেশের বর্তমান সরকার বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত, তা বুঝা যাচ্ছে। নাহলে, খোদ প্রধানমন্ত্রী দেশে বিনিয়োগ নিয়ে আসতে জনগণকে অনুরোধ করতেন না। আমার মন হয়, দেশের মানুষের কাছেই অনেক সম্পদ আছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপির আবালীপনা।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮

বিএনপি ৫০ হাজার নাচের শিক্ষক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। যার পেছনে ১০ বছরে ব্যায় হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে ফুল প্যাকেজ ৩০ টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

×