somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার চোখে আমেরিকা - San Diego

২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ দুপুর ১২:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমাদের এবারের ভ্রমণ পরিকল্পনা হল San Diego ও তার আশেপাশে ঘুরে আশা। শুক্রবার রাত সাড়ে সাতটা অবধি আফিসে ছিলাম বেড়ানোর পরিকল্পনা করতে ও টিকিট কাটতে। যদিও রাত বলা উচিত নয়। এখানে গরম কালে প্রায় ৮টাতে সূর্য্যাস্ত হয়।
ছকটা হল অনেকটা এরকম, - 26th Aug সকাল ৭টার মধ্যে আমরা পাঁচজন, মানে , রাজর্ষী, রজত, সৌম্য, ইফতিখার ও আমি, ইফতির গাড়িতে সেঁধিয়ে যাব। Torrence থেকে ৯৩মাইল দুরে San Diego-এর Sea World পৌঁছাতে আমাদের মোটামুটি দেড় ঘন্টা লাগবে। এই হিসাবটা মোটামুটি ধ্রুব, কারণ এদেশের freeway-কে ভরসা করা যায়। Sea World খোলা থাকে সকাল ৮টা থেকে রাত ১১টা পর্য্যন্ত। তাই আশাকরা যায় আমরা পুরোটা ঘুরে নিতে পারব।রাতে আমরা খাব Monsoon India Cuisine, downtown San Diego-তে। গোটা California থেকে লোকে এখানে খাঁটি ভারতীয় খাবার খেতে আসে। তারপর বেরিয়ে সোজা আমাদের motel-এ রাত্রিবাস। Mind you, motel-টা ২ তারা! পরের দিন সকালে উঠে Julien. এটা হল রকি পর্বতমালার কোলে একটা ছোট্ট গ্রাম যেটা Gold Rush-এর সময় তৈরী হয়। কিন্তু Gold Rush-এর পর অন্যান্য গ্রামগুলো যেখানে পরিত্যক্ত হয়ে যায়, এই জায়গাটা কোনোভাবে বেঁচে যায়। তার একটা অন্যতম কারণ হল, এই জায়গার লোকেরা চাষ-আবাদের দিকে চলে যায়। এখন এখানে ভাল Apple orchard (সোজা বাংলায় আপেল ক্ষেত), horse ranch (ঘোড়াশাল) ও winery(শুঁড়িখানা) আছে। ফেরার পথে আমরা ছোট্ট করে Carlsbad Factory outlets-এ ঘুরে নেব। এখানে গোটা একটা শপিংমল তৈরি হয়েছে factory outlet দিয়ে। আর তাই সস্তা।
এবার পরিকল্পনা ছেড়ে বেরিয়ে পড়ি। ২৬শে আগস্ট সকালে সবার আগে ঘুম থেকে উঠলাম আমি!! অবিশ্বাস্য লাগছে? লাগবেনা যদি বলি যে উঠলাম সকাল ৮টা নাগাদ। তৈরি হয়ে বেরতে বেরতে ১০টা। তাই পরিকল্পনায় পরিবর্তণ... Google maps থেকে নতুন পথটা লিখে নেওয়া হল। এদেশে রাস্তায় থেমে লোককে জিজ্ঞাসা করা বেশ চাপের। হয় GPS enabled computerised map থাকতে হবে, নতুবা Google maps থেকে পথনির্দেশের printout নিতে হবে। আরো কয়েকটা site আছে, যেমন Mapquest বা Yahoo maps, কিন্তু Google সবচেয়ে ভাল। এই পথনির্দেশ না থাকলে আর কোথাও যেতে হচ্ছে না!
আমরা প্রথমে Carlsbad যাওয়া স্থির করলাম। I-5 south (S) ধরে ঝড়ের গতিতে এগোলাম। বাহন সেই Nissan. চালক সেই ইফতি। রাস্তাটা প্রশান্ত মহাসাগরের ধার দিয়েদিয়ে দক্ষিণমুখো গেছে। দারুণ লাগছিল। পথে US Naval Training Ctr পেরোলাম। মনে হল একটা পারমানবিক কেন্দ্রও পেরোলাম! Carlsbad Shopping mall আমেরিকার মাপকাঠিতে বেশ শস্তা। ২০-২৫ টাকা তে গোলা জুতো পাওয়া যাচ্ছে। আমি IZOD- এর একটা pullover কিনলাম ২০টাকায়। Panda Express(এটা একটা Chinese food chain)-এ দুপুরের খাবার কিনে বেরিয়ে পড়লাম San Diego-এর উদ্দেশ্যে। সৌম্য আমাদের পথপ্রদর্শক বা navigator। এই কাজটা আমরা পালা করে করেছি আর পরে বুঝেছি যে এদেশে বেড়াতে এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কাজ হল পথনির্দেশের printout দেখে চালককে নির্দেশ দেওয়া। হঠাৎ দেখি কখন সমুদ্রের উপর দিয়ে একটা বিরাট উঁচু সেতুর উপর দিয়ে যাচ্ছি। এটার তলা দিয়ে বড় বড় জাহাজ যেতে পারে। আমরা যাচ্ছিলাম Coronado দ্বীপে। এটা San Diego-এর বাইরে প্রশান্ত মহাসাগরের একটা ছোটো দ্বীপ। স্থল থেকে প্রায় ১কিমি মত দুরে। হুল্লাট মস্তির জায়গা। বড়লোকদের yacht-এ ভর্তি। চারদিকেই beach. limusine (এখানে একটা limusine দেখলাম যেটা চারটে ambassador-এর মত লম্বা!), golf course, helth spa ইত্যাদিতে সম্পূর্ণ। ওখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে আমরা রওনা দিলাম Julian-এর দিকে।
ঘড়িতে তখন ৫টা বাজে। রাস্তাটা ব্যাপক। San Diego থেকে প্রায় ৪০মাইল দুরে Rocky পর্বতমালার মাঝখানে।
এই Rocky সম্বন্ধে একটু বলি। এটা আমাদের হিমালয়ের মতই Plate Movement থেকে জন্মাচ্ছে। বয়েস প্রায় এক। তবে উচ্চতায় ধারে কাছে আসে না। আসলে হিমালয়ের দুদিকেই মাটি। তাই বেড়েছে অনেক। কিন্তু এর এক দিকে সমুদ্র হওয়াতে এ খুব একটা বাড়তে পারেনি। উত্তর আমেরিকার পশ্চিম প্রান্তে উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত এই শৈলশ্রেনী। একটা অদ্ভুত জিনিস হল এখানে পাথর বড় কম। পুরোটাই মাটি দিয়ে তৈরি। মাঝে মধ্যে কিছু পাথর আছে তাও পাললিক শিলা (sedimentary rock)। আর এজন্যই এদেশে এত ফসিল পাওয়া যায়। আমাদের দেশের পাহাড়ের মত রূপান্তরিত (metamorphosed) নয়। তাই খুব দুর্বল। প্রচুর গাছে ঢাকা। গাছ বেশি হবার আর একটা কারণ হল এদেশের ঠিক মাঝখান দিয়ে ৬০N অক্ষাংশ গেছে। তাই সূর্য্যের আলো বড় বেশি। তাই গাছও বেশি।
রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে একবার পথ হারালাম! না, ভয়ের কিছু না। এরকম পরে আরো হয়েছে। ইফতিরা পুরোনো পাপী; তাই ওদের হেল-দোল নেই। যদিও আমার প্রথমবার বলে আমি একটু ঘাবড়ে গেছিলাম।
প্রায় মাইল দুয়েক ভুল যাবার পর signboard দেখে বুঝলাম Julian-এর রাস্তা দু-মাইল পিছনে বাঁদিকে বেরিয়ে গেছে। আবার গাড়ি ঘুরিয়ে চলা শুরু। চারদিক সম্পূর্ণ ফাঁকা যতদূর চোখ যায়... কিন্তু রাস্তা একই রকম ঝকঝকে। Julian-এর রাস্তায় পড়ার পর দেখলাম মাঝে মাঝে বিরাট বিরাট ঘেরা জায়গায় গরুর মত ঘোড়া চরছে। সৌম্য বলল এগুলো Horse Ranch -আস্তাবল নয়! আর তা বোঝার সহজ উপায় হল বেড়ার গঠন - সাদা রঙের তিনটা আড়াআড়ি কাঠের বেড়া। একবার দেখলে ভোলা মুসকিল। ঢেউ খেলানো পাহাড়ি প্রান্তরে ঘোড়ার ranch - উফ, পুরো western film থেকে উঠে এসেছে। এই রাস্তাতে প্রায় ১২মাইল পরে আছে Julian। ৫-৬মাইল আসার পর ইফতি ঘোষণা করল গাড়িতে তেল নেই!!! আসার সময় দেখে এসেছি, San Diegor পর কোনো তেলের দোকান নেই প্রায় ২০মাইল রাস্তায়। যদি ফিরতে যাই তাহলে মাঝ পথেই গাড়ি দাঁড়িয়ে যাবে নিশ্চিত। তাই সবাই মিলে ঠিক করলাম Julian-এর দিকেই যাব, যা থাকে কপালে! যদি রাস্তায় তেলের দোকান পাই তো ভাল, নয়তো একবার পৌঁছাতে পারলে ওখানে নিশ্চয় পেয়ে যাব। গাড়ির AC বন্ধ করে দেওয়া হল। কাচ নামিয়ে দেওয়া হল। তাতে পাহাড়ের হিমেল হাওয়া আস্তে লাগল। কিন্তু কিছু করার নেই।
পথে একটা দুরন্ত হ্রদ পড়ল। আসলে রাস্তাটা Cuyamaca State Park-এর মধ্যে পড়ে। এটা আমাদের জাতীয় উদ্যানের ছোট ভাই - অসাধারণ সুন্দর! জায়গায় জায়গায় লেখা আছে DO NOT LITTER FINE $1000। তাতেও নোংরা ভালই আছে। হঠাৎ ইফতি বিকট শব্দে চেঁচিয়ে উঠল, "পেয়েছি!!" আর আমরা কিছু বোঝার আগেই ঝড়ের গতিতে গাড়িটা চালিয়ে এনে হাজির করল একটা তেমাথার মোড়ে একমাত্র তেলের দোকানে। চারদিকে খুব একটা লোকবসতি দেখলাম না। দোকানের মেয়েটি বলল ৭টা নাগাদ দোকান বন্ধ হয়। তখন ঘড়িতে ৬টা ৫৫মিনিট বাজে - আমরাই ওর শেষ খদ্দের ছিলাম! ওকে জিজ্ঞাসা করাতে বলল Julian ওর দোকান থেকেই শুরু। আমরা chips, cake ও সোডা (এখানে cold drinks-কে সোডা বলে) কিনলাম। সূর্য্য তখন ডুবে গেছে কিন্তু আকাশে ভালই আলো। একটু এগোতেই দেখি Julian গ্রাম। সব কাঠের বাড়ি। সামনে আধুনিক গাড়ি দাঁড়িয়ে, নয়ত মনে হত যে এটা কোনো western film-এর সেটে এসে পড়েছি। একটা bar-এ সামনে লেখা ছিল. যে এখানে ভাগ্যাণ্বেষীরা এসে ফুর্তি লুটত।
তবে শহরটা ভীষণই ছোট- লম্ব্বায় বড় জোর ৩০-৪০ টা বাড়ি - ১কিমি ও লম্বা না! যাই হোক আমরা দাঁড়াইনি। আমাদের যে winery যেতে হবে!! সোজা এগিয়ে গেলাম, - তেল ভর্তি; চিন্তা কি? কিছুটা যেতেই বাঁদিকে একটা সরু রাস্তা একটা উপত্যকায় নেমে গেলো যার পাশে লেখা ছিল Menghini Winery. ঐ রাস্তা ধরে বেশ কিছুটা যাবার পর এল চারদিকে আপেল ক্ষেতের মাঝে কাঠের তৈরি winery। অপূর্ব দেখতে! গাড়ি থেকে নেমে দেখি winery-এর পিছনের বাগানে একটা সারাদিন ব্যাপি অনুষ্ঠান শেষ হচ্ছে। শহর থেকে truck ভাড়া নিয়ে সব সাদারা picnic-cum-wine tasting করতে এসেছিল। সঙ্গে live concert-ও ছিল। আমরা যখন পৌঁছলাম তখন ওরা truck ভরে রওনা দিচ্ছিল। আমাদের দেখে বিকট জোরে চিল্লিয়ে উঠল। আমরা হেসে হাত নাড়লাম। Winery-র counter-এ গিয়ে দেখি কেউ কোথ্থাও নেই। সামনেই থরে থরে ভর্তি wine-এর বোতল রাখা আছে। প্রচুর ডাকাডাকি করাতেও কেউ এল না। তখন বাইরের যে হুল্লোড় হচ্ছিল সেখানের যা দু-এক জন লোক বাকি ছিল তাদের জিজ্ঞেস করলাম, কি করে wine taste করব? তারা বলল তাদেরই প্রচুর leftover মানে উচ্ছিষ্ট আছে যদি আমরা চাই আমরা যত খুশি খেতে পারি। তাকিয়ে দেখি left-over বলে যা দেখাল তা আমার গোটা বছরের কোটার থেকে অনেক বেশি!এইখানে একটা কথা বলে রাখা ভাল, এদেশে লোকে উচ্ছিষ্ট (leftover) সযত্নে তুলে রাখে। নিজের বাড়িতে তো বটেই এমনকি রেস্টুরেন্টে গিয়েও যদি বেঁচে যায় পুটুলি করে বাড়ি নিয়ে যায়! আমেরিকানরা যে খাবার নষ্ট করে বলে আমাদের ধারণা ছিল এটা একেবারেই ভুল।
যাই হোক, wine taste করা এযাত্রায় আর হল না! আলো দ্রুত কমে আসছিল... তাই আমরা ফেরার জন্য রওনা দিলাম। ঘড়িতে তখন পৌনে আটটা রাতের অন্ধকারে পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে চলার এক আলাদা মস্তি আছে! দারুণ আনন্দ হল।
ভীষণ খিদে পেয়েছিল। সোজা চলে গেলাম San Diego downtown-এ। দূর্গাপূজার কোলকাতার মত অবস্থা। শনিবার রাতের হুল্লোড় চলছে গোটা এলাকাটা জুড়ে। আমাদের Mansoon India Cuisine-এ খাবার পরিকল্পনা।জায়গাটা খুঁজে পেয়েও গাড়ি রাখার জায়গা আর পাই না। রাস্তার ধারে কোনো জায়গা খালি নেই। ঘুরে ঘুরে হদ্দ হয়ে, শেষকালে একটা shopping mall-এর basement-এ মোটা টাকা দিয়ে park করা হল। রাস্তায় বেরিয়ে দেখি মানুষের ঢল।
রেস্টুরেন্টের সামনে শ্বেত সুন্দরীরা টিপ পরে সবাইকে আপ্যায়ন করছে। ফর্সা গায়ে টিপ বেশ লাগছিল। আমাদের বলল ওদের বার এ অপেক্ষা করতে। টেবিল খালি হলে আমাদের ডেকে নেবে। Bar-এ গিয়ে পানীয়ের দাম দেখেই খাবারের দাম বোঝা গেলো। ভালই খসবে।কিন্তু আর ভাবতে ইচ্ছা করছিল না। ভীষণ ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত ছিলাম সবাই। চুপচাপ তো আর বসে থাকা যায় না; আমি একটা আমের cocktail নিলাম $১২ দিয়ে। একদম সাধারণ খেতে। টেবিল খালি হওয়াতে আমাদের ডেকে নিয়ে গেল। আমাদের ফরমাশ হল, - ৩টে বিরিয়ানি, ৩টে নান, চিকেন টিক্কা মসালা ও lamb curry ১টা করে। বিরিয়ানিটা প্রায় খিচুড়ি করেছিল, কি দেয়নি ওতে! ফুলকপি থেকে লেটুস পাতা সব ছিল। আর তেমনি ঝাল। জঘণ্য একটা জিনিস। তবে বাকি খাবার দারুণ ছিল। পরে বুঝেছি আমেরিকায় ঠিকঠাক বিরিয়ানি পাওয়াটা একটু চাপের। ঐ খাবারই হাপুস হুপুস করে খেলাম। ৫ জনের খরচা হল $১৩০। একটা মজার জিনিস লক্ষ্য করছিলাম, যারা খেতে এসেছে তাদের মধ্যে মহিলা থাকলে, waitress-রা ওদের মত বিন্দি পরিয়ে দিচ্ছে। ওটা রেস্তোঁরার সৌজন্যে!
খেয়ে-দেয়ে রাস্তায় এলাম রাত ১১:৩০ নাগাদ। রাস্তায় দেখি রিক্সা চলছে! অবাক করা ব্যাপার। রিক্সাগুলো একটু অদ্ভুত রকমের দেখতে। অনেক gear লাগানো। সাদা ছোকরা এমনকি বেশ কিছু মেয়েকেও দেখলাম রিক্সা চালাচ্ছে। আসলে ঐ gear-ই রিক্সা চালানোটার কায়িক পরিশ্রমকে অনেকটা কমিয়ে দিয়েছে। আমাদের পাড়ার রহিম মিঞা এরকম রিক্সা পেলে অনেকটা আরাম পেত। বেচারার একটা পা পোলিওর জন্য জন্ম থেকে একটু বেঁকা। তাই নিয়ে রিক্সা চালাতে বেশ কসরৎ করতে হত বুড়োকে। যাইহোক, এই আমেরিকার রিক্সায় চড়ার খুব ইচ্ছে ছিল। কিন্তু সময়াভাবে তা আর হল না। বেশ মজা হত, একটা সাহেব আমার রিক্সা চালক!!
ফেরার সময় সৌম্য navigator ছিল। এমন পথ ভুল করল যে, আমরা আর একটু হলেই মেক্সিকো চলে যাচ্ছিলাম। সবাই মিলে হুলিয়ে খিস্তি করলাম। আসলে I-5 South ধরে San Diego থেকে আর একটু গেলেই মেক্সিকো সীমান্ত। আর মোটেলটা ছিল San Diego থেকে I-5 North ধরে কিছুটা দূরে। সৌম্য উত্তরের বদলে দক্ষিণে যেতে বলেছিল বলেই বিপত্তি। শেষে গাড়ি ঘুরিয়ে আমাদের মোটেলের রাস্তায় এসে পড়লাম। এখানে আবার আর এক সমস্যা। গোটা রাস্তাটা এমাথা থেকে ওমাথা চষে ফেললাম কিন্তু মোটেলটা আর চোখে পড়ে না। বাড়ির নম্বরও উল্টো-পাল্টা। ইফতি বলল, " আমি একটা petrol pump-এ গাড়ি দাঁড় করাচ্ছি তোরা মোটেলে ফোন করে direction নে।" এই বলে ঐ রাস্তার উপরেই যেই একটা petrol pump-এ গাড়ি ঢুকিয়েছে দেখি মোটেলটা ঠিক তার পিছনে। তাই রাস্তা থেকে দেখা যায়নি! ঘরে ঢুকেই সব যে যার মত laptop বার করে নেটে connect করার চেষ্টা করলাম (আমরা সবাই laptop সাথে নিয়ে এসেছিলাম।বলা যায় না, যদি কোনো system problem আসে?) কিন্তু ঘরে নেট নেই। অগত্যা ঠিক করা হল যে, কিছু হলে তখন দেখা যাবে। তখন না হয়, কোনো Starbucks coffee shop খুঁজে নেওয়া যাবে। এই দোকানগুলোর একটা সুবিধা হল এখানে wireless net সর্বদা পাওয়া যায়। একটু তাস খেলে ২টো নাগাদ সবাই AC পুরোদমে চালিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। অবশ্য শোবার আগে আরাম করে এক আমেরিকান বন্ধুর দেওয়া চুরুটে সুখটান দিতে ভুলিনি।
সকালে উঠে একে একে সবাই দ্রুমো (মানে দ্রুততমের থেকেও জলদি;)) তৈরি হয়ে নিলাম। তারপর মোটেলের সৌজন্যমুলক প্রাতরাশ। কিছুই না, একটু কফি আর বাসি donuts! এবার রওনা Sea World-এর উদ্দেশ্যে। ঘড়িতে তখন ১০টা।
Sea World-এ ঢুকে প্রথমেই একটা মানচিত্র নিয়ে নিলাম। দ্রুমো পরিকল্পনা করে নেওয়া হল বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সময়ানুযায়ী। প্রথমেই দেখতে গেলাম ডলফিনের অনুষ্ঠানে। অসাধারণ! নাচে-গানে-অভিনয়ে ভরপুর। গ্যালারীতে দাগ দেওয়া আছে কতটা অবধি জলের ছিটে আসতে পারে। আমরা তার মাঝামাঝি বসেছিলাম তাতেই ভালই ভিজলাম। ডলফিনগুলো এত শয়তান লেজের ঝাপটায় ৮-১০টা সারির যাবতীয় জনতাকে ভিজিয়ে দিয়েছিল। পরের অনুষ্ঠান, শামু নামক একটি খুনে তিমির। এই অনুষ্ঠান হল সৌম্যর সবচে পছন্দের। তাই এই ভ্রমণের পর থেকে ওর নাম হয়ে গেল শামু। এক একটা তিমি টাটা ৪০৭ ট্রাক গুলোর মত বড়। তাতেই এমন লম্ফ-ঝম্প করল ভাবা যায় না! দুরন্ত অনুষ্ঠান। এরা অবিশ্যি আরো বেশি জল ছেটায়। প্রায় কুড়িটা সারি অবধি ভেসে গেল। আমাদের আগের বার শিক্ষা হয়েছিল বলে "Wet Zone"-এর বাইরা ৩১তম সারিতে গিয়ে বসেছিলাম। খুব ভাল লাগল যখন অনুষ্ঠান চলাকালীন ঘোষক বললেন, " দর্শকদের মধ্যে যাঁরা আমেরিকান বা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে আছেন বা যাদের পরিবারের কেউ ওখানে কাজ করেন তারা একটু উঠে দাঁড়াবেন।" বেশ কিছু লোক উঠে দাঁড়াল। তখন ঘোষক আবার বললেন, "এই দুই সেনাবাহিনী আমাদের দেশ ও সারা বিশ্বের শান্তিরক্ষা করছে নিজেদের জীবন দিয়ে। অনুগ্রহ করে আসুন আমরা সবাই এদের অভিনন্দন জানাই।" গোটা গ্যালারি হাততালিতে ফেটে পড়ছিল। আর আমি রাজর্ষীকে জিজ্ঞাসা করছিলাম, "এ জিনিস আমাদের দেশে কেউ করে না কেন?" ও কোন উত্তর দিতে পারেনি।
এবার আমরা খেতে গেলাম MAMA Stella's Pizza parlour-এ। জঘন্য pizza। তেমনি আকাশছোঁয়া দাম। কি আর করা যাবে, একচেটিয়া ব্যবসা!
এরপর গেলাম Pet's Rule-এ। Sea World-এর দাবি, যত রাজ্যের রাস্তার জানোয়ারকে ওরা তুলে এনে খেলা শিখিয়ে এখানে রাখে। এক গুচ্ছ কুকুর, বিড়াল, পায়রা, ম্যাকাও আর একটা শুওরে ভরপুর পরিবার! জন্তু গুলো অসাধারণ সব খেলা দেখাল। এরপর আমরা water ballet composition দেখলাম। তারপর একটা ভুতুড়ে 4D ছায়াছবি দেখলাম। এ জাতীয় ছায়াছবি Universal Studio-তেও দেখেছি। তাই নতুন কিছু ছিল না। খালি এবার 4D-তে জল ছিটিয়েছে বেশি। সুন্দর কাহিনী। এক ঝড়ের রাতে এক দ্বীপের কাছে জাহাজডুবিতে দুই ভাইবোন বেঁচে যায়। তারা ঐ দ্বীপের লাইট হাউসে আশ্রয় নেয়। তাদের বাবা-মা ঐ জাহাজডুবিতে মারা যায়। শিশু দুটি ঐ দ্বীপে মারা যায়। সেই থেকে ঐ লাইট হাউস ভুতুড়ে। শেষ পর্যন্ত অন্য দুটি শিশুর সহযোগিতায় সেই ভুতুড়ে পরিবার আবার মিলিত হয়।
কয়েকটা অসাধারণ aquarium দেখলাম। হাঙর, অন্ধ মাছ, catfish, electric eel, ইত্যাদি। Electric eel-এর কাঁচের গায়ে লেখাছিল - এই মাছ ভয় পেয়ে ১০কিলো ভোল্টের ঝটকা দিতে পারে! যাতে একটা সুস্হ-সবল প্রাপ্তবয়স্ক লোকও মারা যেতে পারে। কি ভয়ঙ্কর!!
একটা ছোট কিন্তু ভয়াবহ rolar coaster-এ চড়লাম। এটা প্রায় ৮০ফুট উপর থেকে সোজা নিচে এসে পড়ে। হাড়-হিম করা জিনিস। এখানেও এক ব্যাপার। পড়ার সময় ছবি তুলেছে, Universal-এর মত।
পরেরটা হল ভোঁদড়ের ভাঁড়ামো। এক কথায় অসাধারণ! ভোঁদড় আর সীল মাছ ছিল। এই প্রাণীগুলির চেহারাই এমন অদ্ভুত আর হাস্যকর যে আর আলাদা করে বেশি কিছু করতে লাগে না। তাই ওদের কান্ড-কারখানা দেখে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যাবে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল যখন ওদের দিয়ে গান করানো হল। সে এক বিকট অবস্থা। শুয়োরের মত ঘোঁত ঘোঁত করে সেকি গান!
খিদে পেয়েছিল, এবার আর কোনো রেস্টুরেন্টে গেলাম না। সোজা রাস্তার ধারে যে popcorn-ওয়ালা ছিল তার কাছ থেকে popcorn কিনে খেলাম। প্রচুর দাম, কিন্তু খাবারটা ভাল ছিল।
সন্ধ্যের দিকে গেলাম সুমেরু সফরে। এটা একটা simulation ride, হেলিকপ্টারের অভিজ্ঞতা দেয়। শ্বেত ভালুক চোখের সামনে মারপিট করলো, খেললো। বেরিয়ে দেখি একটা বিশাল aquarium-এ অনেক White Arctic Whale চরছে। এদের বৈশিষ্ট হল এরা পিছন দিকে সাঁতার কাটতে পারে। বিশ্রী রকমের সাদা জন্তুগুলো! বেরিয়ে একটা একটা স্যুভেনিরের দোকান। এদের এই একটা ব্যবস্থা বেশ শেখার মত। যে কোন আকর্ষণের থেকে বেরবার সময় সেই আকর্ষণের বিষয়ে যাবতীয় পণ্য নিয়ে একটি দোকান থাকবে ঠিক বেরবার মুখে। যাতে দোকানে ঢুকে লোকের কেনার ইচ্ছে জাগে। আমি একটা চুম্বক কিনলাম - মানে শ্বেত ভালুকের ছবির পিছনে চুম্বক লাগানো।
আবার ভোঁদড়ের খেলা। অন্ধকার হয়ে গেছিল বলে আলোর খেলাও ছিল। দূর্ধর্ষ! ৯টার সময় গেলাম শামুর light and sound show দেখতে। Just যা তা! এই দেখে বেরতে বেরতে প্রায় ১০টা বেজে গেল। দিনের শেষ অনুষ্ঠান প্রবেশপথের সামনে নৃত্যানুষ্ঠান। এক কথায় অসাধারণ!!!
বেরলাম যখন ঘড়িতে বাজে রাত ১০-৪৫। এবার গাড়ি নিয়ে ৯৩ মাইল পার করে বাড়ি। ইফতি ঘোষণা করল," আমার ব্যপক ঘুম পাচ্ছে; যদি গাড়ি চালাতে চালাতে ঘুমিয়ে পড়ি তোরা কেউ জাগিয়ে দিস।" শুনে তো আমার হয়ে গেছিল, বলে কি ছেলেটা?!! Freeway-তে ঘুমিয়ে পড়লে free-তে মানুষ থেকে ভূত হওয়া যাবে। Navigator সৌম্য বলল,"সেকিরে! চাপ তো!! আমারও তো ঘুম পাচ্ছে? আমি সাথে সাথে বললাম আমায় navigation-এর কাগজপত্র দে আমি navigate করছি। গাড়ি ছেড়ে দিল। Full blast-এ গান চলছে। ইফতির তিনটে গানের সিডির প্রত্যেকটা এতবার শুনেছি যে গানগুলো মুখস্থ হবার যোগাড়! মাঝে মাঝে আমি বিকট শব্দে চেঁচিয়ে উঠছি, যাতে ইফতি সজাগ থাকতে পারে। তাতে রাজর্ষীর খুব রাগ, কারণ ওর ঘুমের ব্যাঘাত হচ্ছে। আর ইফতি গাড়ি চালাচ্ছে ৯০-১০০ মাইলে। পরে বলেছিল যে জোরে গাড়ি চালিয়েছিল যাতে ঘুম ছুটে যায়। ওর ছুটেছিল তো বটেই, আমারও ঘুম ছুটে গেছিল ভয়ে। গাড়ি উড়ছে। মাঝে মাঝে জানালার কাচ নামিয়ে দিচ্ছি; দমকা ঠান্ডা হাওয়ায় সবাই হিহি করে কেঁপে উঠছে। সবার সেকি গালি! আমার একটাই কথা সজাগ থাকতে হবে, ঘুমালে চলবে না।
নিজের শহরে যখন এলাম তখন ঠিক রাত ১২:১৬ বাজে... কোনো খাবার দোকান খোলা ছিল না। অগত্যা Carl's Junior-এর drive-through থেকে বার্গার কেনা হল। রাজর্ষী ও সৌম্যকে ওদের বাড়িতে নামিয়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফেরা। কাল থেকে আবার অফিস। উফফ....
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ দুপুর ১২:৩৪
৫টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×