somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার চোখে আমেরিকা - কর্মক্ষেত্রে সমস্যা

২৫ শে মার্চ, ২০০৮ দুপুর ১:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আস্তে আস্তে আমাদের client-এর আমার ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে চাপ - কাজের এবং অফিস রাজনীতির। আমি আসি মুক্তির জায়গায়। আগে বুঝিনি এটা একটা বিরাট রাজনীতির ফল। আর আমি সেই দাবা খেলার একটা বোড়ে মাত্র। এখানে এসে বুঝলাম আমাদের দেশের অফিস ও আমেরিকার অফিসের বড়কর্তাদের মধ্যে বেশ একটা ক্ষমতার ঠান্ডা লড়াই চলে।
মুক্তি এখানে থাকতে চেয়েছিল - যদ্দিন পারা যায়। তাই সে এখানকার বড়কর্তাদের সাথে বিশেষ সম্পর্ক রাখত। এভাবেই হয়ত চলে যেত; বাদ সাধল দেশের অফিস। হঠাৎ তাদের মনে হল - বাঃ এই ছেলেটা তো অনেক দিন আমেরিকাতে আছে! ব্যাস শুরু হল চাপ দেওয়া। প্রথম সমস্যা হল, দেশে এই কর্মসূচিতে ওর উপযুক্ত পরিবর্ত পাওয়া। শেষ পর্যন্ত আমাকে ধরে আনা হল অন্য কর্মসূচি থেকে।
তাই আমি এসে দেখি মুক্তি তো বটেই উর্ধঃতন কর্মচারীরা পর্যন্ত আমার প্রতি যারপরনাই বিরক্ত। মুক্তি নানা অছিলায় তার কাজ আমায় বুঝিয়ে দেওয়া থেকে এড়িয়ে যেত। ভাল করে কথা বলত না। একদিন বসলাম ওর সাথে। প্রথমে তো কিছুতেই বসবেনা। তারপর কফি খাবার অছিলায় শান্তিনিকেতন নিয়ে গেলাম।
আমাদের অফিস বাড়িটা ইংরাজি "C" আকৃতির। আর ঐ মাঝের ফাঁকা জায়গাটায় একটা সুন্দর বাগান আছে,যত্নে লালিত। আমরা নাম দিয়েছি শান্তিনিকেতন।
কোন ভনিতা না করে সোজা আসল কথায় গেলাম। বললাম, "দেখ তোমাকে এখান থেকে সরানোটা কর্ত্বপক্ষের সিদ্ধান্ত। সেখানে আমি নিমিত্ত মাত্র। আমার আমেরিকা আসার কোনো উদগ্র বাসনা ছিলনা। আমি না এলে অন্য কেউ আসত। কারন যে ভাবেই হোক তোমায় ফেরত পাঠাতই। মানে, আমি আসতে চেয়েছিলাম বলে তোমায় ফেরত পাঠাচ্ছে না। বরং তোমায় ফেরত পাঠাচ্ছে বলেই আমায় আসতে হয়েছে। এখন তোমার রাগের চোটে আমায় ভুগতে হবে তুমি চলে গেলে। এটা তোমার মত একজন অভিজ্ঞ পেশাদারের মানায় না।" কপাল ভাল ছিল এই যুক্তিটা মুক্তির ভাল লেগেছিল। এরপর থেকে সেভাবে আর ঝামেলা করত না। অন্ততঃ কোন কিছু জিজ্ঞাসা করলে উত্তর দিত।
সমস্যা শুরু হল মুক্তি চলে যাবার পর। দুদিক থেকেই চাপ ছিল - আমার সংস্থার উর্দ্ধতন এবং আমার client-এর থেকে। প্রাথমিক চাপটা ছিল client-এর থেকে। আসলে দোষ আমারই। আমি এই application-টা দেখছি ৩-৪মাস। সেখানে মুক্তি দেখছে ৩-৪বছর। আমায় কাজ বুঝিয়ে দিলেও অভিজ্ঞতা কি করে শেখাবে! ওর সব জিনিস মুখস্থ ছিল। আমায় সেখানে দেখতে হচ্ছে। Meeting-এ গিয়ে যেখানে মুক্তি যাবতীয় সমস্যার সমাধান করে আসত; সেখানে আমাকে গিয়ে বলতে হচ্ছে, "সব দেখে জানাবো।" সমস্যা শুধু সেখানে নয়, কাজের ধরণেও আমেরিকানদের সাথে তাল মেলাতে অসুবিধা হচ্ছিল। এখানে দুটো উদাহরণ দিলে পরিষ্কার হবে ব্যাপারটা।
১। একদিন একজন আমাকে mail করে জানাল যে সে একটা কাজ করতে চলেছে যাতে আমার application-জড়িত। আমি উত্তরে জানাতে চাইলাম যে ঠিক আছে আমি খেয়াল রাখব। এই উত্তর দিতে আমি ভাবলাম একটু আমেরিকান হওয়া যাক। লিখলাম, "Roger that." অনেক সিনেমায় এই কথাটা শুনেছি; মানে, ঠিক আছে। তৎক্ষনাৎ Karen নিরিহ ভাবে Sametime-এ লিখল, "Roger that কি জিনিস? কোত্থেকে শিখলে এসব? তোমাদের দেশে কি এই ভাবে লোকে কথা বলে?" দ্রুত ক্ষমা চাইলাম এজাতীয় চলিত কথা ব্যবহারের জন্য। এদেশে এই একটা জিনিস তদ্দিনে জেনে গেছি ভুল করলে ক্ষমা চাইলে এরা মাফ করে দেয়। বরং ওপরচালাকের কোন ক্ষমা নেই। Karenবোঝালো, "দেখ, এই সব প্রথাগত mail অনেক লোকের কাছে যায়। সবাইতো আর সমান হয় না, কারুর খারাপ লাগতেই পারে। সুতরাং সাধারণ ভাষায় mail লেখার চেষ্টা কর।" খুব শিক্ষা হল।
২। প্রথম প্রথম কেউ আমাকে কোন কাজ mail-এ করতে বললে আমি কাজটা শেষ করে তারপর তাকে mail করে জানাতাম। এ ব্যপারটাও যে সমস্যা সৃষ্টি করবে কে জানত! David আমার বিরূদ্ধে Karen-এর কাছে এ ব্যাপারে অভিযোগ করল। Karen একদিন এসে আমাকে ডেকে আলাদা ঘরে নিয়ে গেল। ঝাড়ল না কিন্তু; বরং ভদ্রভাবে বলল, "তোমাকে কেউ কোনো কাজের জন্য mail করলে সাথে সাথে উত্তর দিয়ে বোলো যে তুমি ব্যাপারটা দেখছ। নয়ত ঐ ব্যক্তি যে অন্ধকারে থেকে যাবে! কেউ বলছে না তুমি কাজ করছ না; কিন্তু কেউ বুঝছেও না যে তুমি কাজ করছ, যতক্ষণ না তুমি উত্তর দিচ্ছ।" খুব ভাল লাগল। এই ভাবে কেউ কোনদিন আমাকে কাজের ক্ষেত্রে শেখায়নি।
এবার চাপটা হল এই সমস্যা গুলোর কিছু কিছু আমার সংস্থার এই অফিসে উপস্থিত উর্দ্ধতনদের কাছে চলে গেছিল। ব্যস আর যায় কোথায়! উঠতে বসতে শুনতে থাকলাম, "তুই মনে হচ্ছে আমেরিকায় কাজের জন্য উপযুক্ত নোস। কিছুই পারিস না।" কি ভীষণ পার্থক্য। আমার আমেরিকান ওপরওয়ালা চাইছে আমি যেন সবকিছু শিখে নেই; আর আমার দেশি ওপরওয়ালা চাইছে আমি কেন সবকিছু শিখে নেই!
একদিন সবার সামনে ঘোড়াদা (ওনার গলাটা ঘোড়ার মত লম্বা বলে আমরা আড়ালে ঐ নামে ডাকতাম) এক meeting-এর মাঝে হঠাৎ করে বলল,"তোকে নিয়ে এসে কি ফেঁসে গেছি দেখ। আমাদের তরফ থেকেই মুক্তিকে ফেরৎ পাঠাবার কথা client-কে বলা হয়েছিল। এখন তুই যা শুরু করেছিস তাতে তোকে ফেরৎ পাঠাতে পারলেই ভাল হত, কিন্তু client-কে কি মুখে এত তাড়াতাড়ি বলি বল তো!"
এত খারাপ লেগেছিল কি বলব! ভেবেছিলাম বলি,"আপনার এত মুক্তিকে পছন্দ তো ওকে রেখে দিলেই পারতেন। আমি তো আমেরিকা এখন আসতে চাইনি। প্রায় জোর করেই তো পাঠানো হয়েছে আমাকে।" একটা কথা ভেবেই মুখবুজে রইলাম - আগে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। গোদের ওপর বিষফোঁড় হল আমার application-এ আমি ছাড়া আমার সংস্থা থেকে আমেরিকাতে আর কেউ নেই। একা হাতে সামলাতে হয়, মানে আমি যদি একদিন অসুস্থ হয়ে পড়ি তো সামাল দেবার কেউ নেই। অন্যদিকে কাজের ব্যাপারে কোন সমস্যা থাকলে কারুর সাথে আলোচনা করার উপায় নেই - কেউ জানে না যে!!
সব ঠেকে শেখা ছাড়া উপায় ছিল না। আস্তে আস্তে ছন্দ পেতে থাকলাম। Client-ও একটা দুটো করে প্রসংসাসূচক mail করতে থাকল। আমি সেগুলো জমিয়ে যেতে থাকলাম। ঘোড়াদা আর কোনদিন ওভাবে কথা বললে mail-গুলো মুখের সামনে ধরব। Catherine, David আর Karen-এর সাথে একটা সুন্দর team গড়ে উঠতে থাকল। খাঁটি পরিশ্রমের বিকল্প নেই।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে মার্চ, ২০০৮ সকাল ৮:৩০
১৪টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:১৭


সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ক্রাউড ফান্ডিং-এর সুযোগ তৈরি করে সরকারী লাভজনক প্রজেক্টে জনগণের বিনিয়োগ নিন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:৩১

বাংলাদেশের বর্তমান সরকার বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত, তা বুঝা যাচ্ছে। নাহলে, খোদ প্রধানমন্ত্রী দেশে বিনিয়োগ নিয়ে আসতে জনগণকে অনুরোধ করতেন না। আমার মন হয়, দেশের মানুষের কাছেই অনেক সম্পদ আছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপির আবালীপনা।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮

বিএনপি ৫০ হাজার নাচের শিক্ষক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। যার পেছনে ১০ বছরে ব্যায় হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে ফুল প্যাকেজ ৩০ টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

×