somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রসংগ- হিন্দু ধর্ম

১২ ই আগস্ট, ২০০৭ রাত ৩:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

‘হিন্দু ধর্ম’ নামে যেটা এখন প্রচলিত সেটার নাম আসলে ‘সনাতন ধর্ম’ বা ‘সনাতন আচার অনুষ্ঠান’ যেটা মূলত আর্যরা তাদের সাথে নিয়ে এসেছিল। লক্ষ্য করলে দেখবেন, গ্রীকদের অনেক দেব-দেবীর সাথে হিন্দু ধর্মের দেব-দেবীর মিল রয়েছে। গ্রীকদের প্রধান দেবতা ‘জিউস’ আর আর ‘ব্রক্ষা’র ভূমিকাও মূলত এক। আজ থেকে তিন-চার হাজার বছর আগে ভূ-মধ্যসাগরীয় এলাকার লোকজনের স্রষ্টা সম্পর্কে এরকম দেব-দেবী কেন্দ্রিক ধারণাই ছিল, আর্যদের মাধ্যমে যেটা উপমহাদেশে প্রবেশ করে।

‘হিন্দু’ শব্দটা এসেছে Indus বা সিন্ধু নদ থেকে- অর্থাৎ সিন্ধু নদ অববাহিকার লোকজন যে ধর্ম পালন করে তা বোঝাতেই ‘হিন্দু ধর্ম’ শব্দের উৎপত্তি। ভারতবর্ষ একটি বিশাল ভূ-খন্ড। আজ থেকে তিন-চার হাজার বছর আগে যে আচার-অনুষ্ঠান উপমহাদেশে এসেছিল কালের বিবর্তনে, বিভিন্ন মুনি-ঋষি এবং সেই সাথে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের প্রভাবে তা এক এক এলাকায় এক এক রকম রূপ লাভ করেছে। বাঙ্গালী হিন্দুর প্রধান উৎসব দূর্গা পূজা কিন্তু উত্তর ভারতে বা অন্যান্য জায়গায় পালন করা হয় না। সেখানে প্রধান উৎসব হল গণেশ পূজা। কিন্তু জিনিষটা একই- হিন্দু ধর্ম। অপরদিকে ব্রাক্ষ্য ধর্ম একেশ্বরবাদী এবং নিরাকার স্রষ্টায় বিশ্বাসী হলেও ব্রাক্ষ্যরা নিজেদের সংস্কারপন্থী হিন্দু ধর্মাবলম্বী মনে করে। এখানে পার্থক্যটা গড়ে উঠেছে মূলত ধর্মগ্রন্থকে কেন্দ্র করে যেটার উৎস উপনিষদ। এখানে ইসলামের সাথেও হিন্দু ধর্মের যোগসূত্র রয়েছে। বাংলাদেশের কবি গোলাম মোস্তফা উপনিষদ নিয়ে রীতিমতো গবেষণা করেছেন এবং তিনি দেখিয়েছেন উপনিষদে ‘আল্লাপনিষদ’ নামে একটি অংশ রয়েছে যেখানে সরাসরি আল্লাহর কথা বলা হয়েছে। বইটা এখনো পাওয়া যায়, নাম ভুলে গেছি- দেশে থাকতে অনেক আগে পড়েছিলাম। আপনারাও পড়ে নিতে পারেন।

মাহিরাহির পোস্টে কেউ একজন মন্তব্য করেছিলেন, যে ওরা নিরাকার স্রস্টাকেই বিভিন্ন রুপে উপাসনা করে। কথাটা ঠিকই। কারণটাও আরেকজন বলে দিয়েছেন নিরাকারের চাইতে সাকার রূপেই স্রষ্টাকে বেশী অনুভব করা যায়। কিন্তু এভাবেই আসলে পৌত্তলিকতার উৎপত্তি। মানুষ কিন্তু কখনোই এত বেকুব ছিল না যে নিজ হাতে মাটির তৈরী পুতুলের প্রাণ আছে বলে বিশ্বাস করত। বরং স্রষ্টার বিভিন্ন রুপ মনের মাধুরী মিশিয়ে কল্পনা করতে গিয়েই মূর্তিপূজার জন্ম হয়েছে। কিন্তু যেখানে স্রষ্টা নিজেই বলছেন (বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের মাধ্যমে) তিনি নিরাকার, সেখানে তাকে একটা কল্পিত রূপে উপাসনা করা, স্রষ্টাকেই অপমানিত করা, নয় কি?

যাই হোক সাকাররুপে নিরাকার স্রষ্টার উপাসনা হলেও, হিন্দু ধর্মে প্রধান যে সব দেব-দেবী এবং তাদের ভূমিকা রয়েছে তা নিম্নরূপ-

প্রচলিত ধর্মানুসারে তিনজন প্রধান দেবতা পৃথিবীকে শাসন করেন। এরা হলেন, ব্রক্ষা (creator), বিষ্ণু (preserver), শিব (destroyer)। তিন দেবতারই সঙ্গিনী বা দেবী রয়েছে। ব্রক্ষার সঙ্গিনী হলেন স্বরসতী (বিদ্যার দেবী), বিষ্ণুর সঙ্গিনী লক্ষী (বাণিজ্য দেবী) এবং শিবের সঙ্গিনী পার্বতী যাকে কালী বা দূর্গা নামেও পূজা করা হয়।

হিন্দু ধর্মে জাতিভেদ র‌যেছে এবং হিন্দু ধর্মানুযায়ী সব মানুষ সমান নয় (All men are not equal). এবং এটি একটি জাত ধর্ম অর্থাৎ আপনি জন্মের সময় যে অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেন আপনার বর্ন পরিচয়ও তাই হবে অর্থাৎ ব্রাক্ষণের পুত্রই ব্রাক্ষণ হবে, শুদ্রের পূত্র কখনো ব্রাক্ষণ হবে না। সে জন্য অন্য ধর্মাবলম্বীরাও কখনো আগে হিন্দু হতে পারত না। বর্তমানে এ প্রথা সংস্কার করা হয়েছে, যদিও কনভার্টদেরকে নিম্ন বর্ণের হিন্দু হিসেবেই দেখা হয়। এ বিষয়ে একটা মজার ঘটনা মনে পড়ে গেল। বেশ আগের কথা, তবে আধুনিক সময়েরই। তখনো হিন্দু ধর্মে কনভার্ট নিষিদ্ধ ছিল। হিন্দু ধর্মের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা এক ঋষির কাছে ধর্ণা দিলেন, যে হিন্দু ধর্মে লোক সংখ্যা কমে আসছে, অন্য ধর্মাবলম্বীদের কনভার্টের সুযোগ দেয়া হোক। ঋষি প্রথমে রাজী ছিলেন না, অনেক গাই-গুই করে রাজি হলেন, কিন্তু ফতোয়া দিলেন, কনভার্টদের গোবর-জল খাইয়ে শুদ্ধ করতে হবে। আমার খুব জানার ইচ্ছা যারা কনভার্ট হন, তাদের আসলেই গোবর-জল খাওয়ানো হয় কি না।

জাতের প্রসঙ্গে বলছিলাম, এটার একটা স্তরবিন্যাস বা hierarchy আছে। এটা মূলত কর্মভিত্তিক। প্রথম বা উচু স্তরে আছে ব্রাক্ষনরা। এরা হচ্ছে পুরোহিত। পূজা-অর্চনা করে যেহেতু স্রষ্টার প্রত্যক্ষ সেবা করে, এদের অবস্থান তাই সবচেয়ে উচুতে। দ্বিতীয় স্তরে আছে- ক্ষত্রিয়-রা। এরা মূলত যোদ্ধা। প্রাচীণকালে এদের কাজ ছিল যুদ্ধ করে ব্রাক্ষণদের রক্ষা করা, যাতে পূজা-অর্চনায় কোন বিঘ্ন না হয়। এরপর ছিল বৈশ্য, শূদ্র- এরা কর্মজীবি মনে হয় তাঁতী, জেলে এই সব। এদের কাজ হল ব্রাক্ষন ও ক্ষত্রিয়দের সেবা করা- তার মাধ্যমেই এদের পূণ্য লাভ হত। এছাড়া পরবর্তীতে চাকুরীজিবী এক শ্রেণীর উদ্ভব হয়- এরা হল কায়স্থ। এর বাইরে আছে গোত্রহীন (casteless) নিম্নবর্ণের হিন্দু যাদের বলা হয় অস্পৃশ্য (untouchables)। মুসলমান বা বিধর্মীদেরকেও হিন্দু ধর্মে এ চোখে দেখা হয়। নিশ্চয়ই আগের যুগের গল্পে পড়েছেন, মুসলমানের বাসায় বর্ণ হিন্দু পা দিত না বা ছোঁয়া লাগাত না। যুগে যুগে বর্ন হিন্দুরা নিম্নবর্ণের হিন্দুদের উপর অত্যাচার করেছে এবং এখনো করছে (কিছুদিন আগেও বর্ণ হিন্দুদের অত্যাচারে, অনেক নিম্ন বর্ণের হিন্দু বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছে)। মহাত্মা গান্ধী ভালবেসে অস্পৃশ্যদের ডাকতেন, ‘হরিজন’- অর্থাৎ 'যারা হরি বা স্রষ্টার লোক' এবং তিনিই প্রথম অস্পৃশ্যদের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করেন এবং আজীবন করে গেছেন।

আধুনিক ও উচচ-শিক্ষিত হিন্দুরা যদিও এখন এসব জাত-পাত মানেন না, কিন্তু মধ্যবিত্ত ও মধ্য-শিক্ষিত সমাজে এর প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। ’৪৭ এর দেশভাগের পর মূলত বর্নহিন্দুরাই ওপারে পাড়ি জমিয়েছিলেন। যারা এপারে রয়ে গিয়েছিলেন তারা ছিলেন মূলত নিম্ন বর্ণের হিন্দু। পশ্চিমবংগের হিন্দুরা শুনেছি এ জন্য বাংলাদেশী হিন্দুদের খাটো চোখে দেখেন। তবে বাংলাদেশী নিম্ন বর্ণের হিন্দুরাই বাংলাদেশের স্বাধীনতায় আখেরে লাভবান হয়েছেন। মুসলিম অধ্যুষিত সমাজে জাত-পাতের বালাই না থাকায় সামাজিক অবস্থানে তারা উপরে চলে আসতে পেরেছেন। পক্ষান্তরে, পশ্চিমবঙ্গে শুনেছি চাটুয্যে-বাড়ুয্যে-দের প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। এ বিষয়ে ব্লগের পশ্চিমবঙ্গের বন্ধুরাই ভালো বলতে পারবেন। তবে এখানে উল্লেখ্য, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ায় কিন্তু বাংলাদেশের মুসলমানদেরও লাভ হয়েছে। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে ফারসী-উর্দুর প্রভাবাধীন যে আশরাফ-আতরাফ দ্বন্দ্ব মুসলমানদের মধ্যে গড়ে উঠেছিল তা পাকিস্তান আমলেও জিইয়ে ছিল। কিন্ত বাংলা ভাষা ও বাঙ্গালীকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ায় এদেশে সেই দ্বন্দ্ব হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেছে। কাজেই, আসুন হিন্দু-মুসলিম সবাই মিলে আমরা বাংলাদেশকে গড়ে তুলি।

শেষ করছি, হিন্দু ধর্মের পুনর্জন্ম মতবাদ দিয়ে। সাধারণ বিশ্বাস হল, মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হয় তার কর্ম (deeds) দ্বারা, যেটাকে পশ্চিমে এখন ঢং করে karma বলা হয়। মানুষের দেহ ভস্ম হলেও আত্মার মৃত্যু হয় না। যে আত্মা এ জন্মে ভাল কাজ করে, পরের জন্মে সে আরো ভাল জীবন লাভ করে। যে আত্মা এ জন্মে পাপ করে, পাপের শাস্তিস্বরুপ পরের জন্মে নিম্ন শ্রেণীর জীবন লাভ করে এবং একের পর এক খারাপ জীবন নিয়ে সে জন্মাতেই থাকে। এটাকেই বলে জন্ম-চক্র (circle of rebirth). ভাল আত্মাগুলো এক সময় এই চক্র থেকে মুক্তিপায় যাকে বলে ‘মোক্ষলাভ’ এবং এটাই একজন ধার্মিক হিন্দুর জীবনের মূল উদ্দেশ্য। ‘মোক্ষ’ শব্দের অর্থ হল freedom.

(আমি পৃথিবীর সব ধর্মের প্রতিই শ্রদ্ধাশীল। কাজেই উদ্দেশ্যমূলকভাবে কোন ধর্মকে হেয় করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। যদি কেউ তা মনে করেন, তবে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত)
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে অক্টোবর, ২০০৭ বিকাল ৪:২৬
৩৮টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকাল

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:৫১



আজকাল আমার মনে হয় -
আমাকে কেউ পছন্দ করে না,
কারো কাছে গেলে, সে বিরক্ত হয়।
পোশাক অগোছালো, এলোমেলো চুল,
চোখের দৃষ্টি কেমন ঘোলাটে!
বীরত্ব দেখানোর কিছু নেই।
চতুর পুরুষ স্ত্রীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে ৯টি বছরঃ একজন লিলিপুটিয়ান থেকে সত্যিকার ব্লগার হয়ে উঠার গল্প

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২৮

আজ আমার ৩য় বইয়ের জন্য চুক্তি করতে প্রকাশক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। প্রকাশনা সংস্থা 'উত্তরণ'-এর মাসুদ ভাইয়ের বাংলাবাজারের অফিসে ঘণ্টাখানেক ছিলাম। তাঁর সাথে কথা বলতে বলতেই আমার মনে একটি বোধোদয় আসে! আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×