লুই কানের জন্ম এস্তোনিয়ার এক দরিদ্র ইহুদী পরিবারে ১৯০১ অথবা ১৯০২ সালে, যেটা তিনি নিজেও কখনো জানতে পারেন নি। ভাগ্যের অন্বেষণে তাঁর পরিবার আমেরিকার ফিলাডেলফিয়া শহরে এসে আস্তানা গাড়ে। ছবি আঁকাতে লুই কানের ছিল সহজাত প্রতিভা। ছোটবেলা থেকেই আঁকাআঁকি করে রোজগার করতেন। দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত পরিবারে পেন্সিল কেনার সামর্থ্যও তাঁর ছিল না। কিন্তু তাতে তিনি থেমে থাকেন নি। চারকোল কয়লা আর খড়িমাটি দিয়ে চলত তাঁর আঁকাআঁকির কাজ। অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর অসাধারণ প্রতিভার জোরে ১৯২৪ সালে ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভেনিয়া থেকে লুই কান স্থাপত্যবিদ্যায় ডিগ্রি অর্জন করেন।
ব্যক্তিগত জীবনে লুই কানের ছিল দ্বৈতজীবন। বিবাহিত স্ত্রী এবং সন্তানের পাশাপাশি তার জীবনে আরো দুইজন নারী এবং তাদের গর্ভের সন্তানরা ছিল, যাদের কথা তাঁর মৃত্যুর পরই মূলত প্রকাশ পায়। ছবির কাহিনী আসলে এখান থেকেই শুরু। নাথানিয়েল কান- যিনি এ ছবির নির্মাতা, তার মা আদৌ লুই কানের স্ত্রী ছিলেন না। অজানা এবং প্রায় অদেখা পিতাকে জানার জন্য এ এক সন্তানের যাত্রা। পিতাকে জানতে পিতার রেখে যাওয়া কর্মের সাথে পরিচিত হতে চেয়েছেন নাথানিয়েল কান। তাই তিনি ছুটে বেড়িয়েছেন বাংলাদেশ, ভারত, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের নানা প্রান্তে যেখানে তার পিতার কর্ম কীর্তিকে বহন করে চলেছে। নাথানিয়েল কান ছবিতে তার এই মর্মস্পর্শী যাত্রার চিত্র তুলে ধরেছেন।
বাংলাদেশ ছিল ছবির শেষ অংশে। লুই কানের সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি বাংলাদেশের সংসদ ভবন ও শেরে বাংলা নগর। এ কীর্তি তিনি দেখে যেতে পারেন নি। তাঁর মৃত্যুর ৯ বছর পরে সংসদ ভবনের কাজ শেষ হয়। ১৯৭৪ সালে পেনসিলভেনিয়া স্টেশনে নিসংগ অবস্থায় বিপুল ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে লুই কান মৃত্যুবরণ করেন। ছবিতে জানা যায়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংসদ ভবনের অসম্পূর্ণ নির্মাণ কাজ দেখে পাকিস্তানী সৈন্যরা কোন ঐতিহাসিক ধ্বংসাবশেষ মনে করেছিল। তাই, তারা সেখানে হামলা করে নি। নাথানিয়েল কান বলেছেন, তার পিতা আছেন এ বাংলাদেশের মাটিতেই। যে পিতার সন্ধানে তিনি যাত্রা শুরু করেছিলেন তাকে তিনি সম্পূর্ণরূপে পেয়েছেন এই দেশে এসে। তার এই যাত্রা তাই সার্থক।
ছবিতে বাংলাদেশের খ্যাতিমান স্থপতি শামসুল ওয়ারেস নাথানিয়েল কানকে বলেছেন, লুই কান কোন রাজনৈতিক নেতা নন। তবু তিনি বাংলাদেশকে গণতন্ত্র উপহার দিয়েছেন, গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠান উপহার দিয়ে এ দেশে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু করেছেন। তার এ অবদান অসামান্য। তিনি তার জীবনের সবচেয়ে বড় এবং ব্যয়বহুল প্রজেক্ট পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র দেশে করার সাহস দেখিয়েছেন। বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের মানুষ লুই কান এবং তার কীর্তির জন্য গর্বিত।
লুই কানের কথা বলতে গিয়ে শামসুল ওয়ারেস কেঁদেছেন। ছবি শেষ হওয়ার পর হল ভর্তি অনেকের চোখেই আমি পানি দেখেছি। ছবিতে বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে, সংসদ ভবন, বুড়িগঙ্গা, ঢাকার রাস্তার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে- হল ভর্তি বিদেশীদের মাঝে বসে এসব দৃশ্য দেখে আমার চোখেও পানি এসে পড়েছে। হয়তো আমার কান্নার সাথে ওই বিদেশীদের কান্নার কোন মিল নেই। লুই কান, নাথানিয়েল কানের দুঃখকে ছাপিয়ে আমার দেশকে নিয়ে গর্ব, দেশকে নিয়ে দুঃখ-ই আমাকে কাঁদাল। হায়, এমন কান্না যদি প্রতিদিনই কাঁদতে পারতাম!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

