নাস্তিকরা মানবতা এবং মানবাধিকার নিয়ে আলোচনা করে। তারা বলে নাস্তিকতা যদি ধর্ম হয় তবে সে ধর্মের নাম মানবিকতা। এই মানবাধিকার জিনিসটা কোথা থেকে আসল? নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছ থেকে নয় কারণ তারাতো আল্লাহকে বিশ্বাস করেনা। তাহলে কি কোন দেশের সংবিধান থেকে এসেছে? কিন্তু সংবিধান তো মানবাধিকার রক্ষার কথা বলে, প্রণয়ন তো করেনা। আচ্ছা ঠিক আছে তাদের সুবিধার্থে ধরে নিলাম যে মানুষ জন্মসূত্রে মানবাধিকার নিয়ে জন্মলাভ করে। তাহলেওতো প্রশ্ন থেকে যায়। কে ঠিক করে দেয় যে কোনগুলো মানবাধিকার? সরকার বা শাষক? সরকার যদি মানবাধিকার প্রণয়ন করতে পারে তাহলেতো সেটা তুলেও নিতে পারে। এভাবেতো এটাও বলা যায় হিটলার, মুসোলিনি কেউই মানবাধিকার লঙ্ঘন করেনি, কারন যেখানে তারা তা প্রণয়নই করেনি সেখানে তা লঙ্ঘন করার প্রশ্ন উঠে কিভাবে?
তাহলে কিভাবে আসল মানবাধিকার? প্রকৃতপক্ষে মানবাধিকার শব্দটিইতো বিংশ শতাব্দীর আগে তেমন কোথাও ব্যাবহার করা হতনা। এখন নাস্তিকরা বলবেন যে মানবাধিকার ঠিক করে সমাজ বা জনগণ। যেমন, জনগণের বিদ্রোহে ১৬৮৯ সালে প্রতিষ্ঠা পায় ইংলিশ 'বিল অফ রাইটস'। ১৭৮৮ সালের ফরাসী বিপ্লবের পর ফ্রান্সে প্রতিষ্ঠা পায় মানবাধিকার আইন। এভাবেই ১৯৪৮ সালে আমেরিকা ঘোষোনা করে বৈশ্বিক মানবাধিকার এর কথা। তার মানে হচ্ছে মানবাধিকার আসে মানুষের ঠিক-বেঠিক নির্ণয় করার মোড়াল, আদর্শ বা নীতিবোধ থেকে।
আচ্ছা মেনে নিলাম। কিন্তু এসব মানবাধিকারের ব্যাপারেতো ধর্মগ্রন্থগুলো থেকে প্রবল সমর্থন পাওয়া যায়। তাহলে মানবাধিকার সম্পর্কিত ধারণা ধর্মগ্রন্থ থেকে আসেনি সে কথাওতো ঠিকনা। আবার, মানবিক নাস্তিক ধর্ম প্রচলিত ধর্মগুলোর চাইতে শ্রেয় সে কথাই বা কিভাবে বলা যাবে? কারন যেখানে অধিকার এবং বিশেষত সমাধিকারের কথা বলা হচ্ছে সেখানে শুধু মানবের অধিকার নিয়ে কেন পক্ষপাতিত্ব থাকবে, কেন পশু পাখিও মানুষের সমান সমান অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে? মানুষের মত পশুপাখিওতো প্রকৃতিরই সৃষ্টি। আপনারা যদি পশু অধিকার আইনের কথা বলেন সেখানেতো পশুদেরকে মানুষের সমান অধিকার দিতে দেখিনা। তাহলে কি একথা বলা যায় যে বিবর্তনের আশীর্বাদে মানুষ পশু অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হবার কারনে মানুষ বেশী অধিকারের দাবিদার? এ কথা মেনে নিলেতো মানবিকতা ধর্মের মধ্যেই আর সুবিচার খুঁজে পাওয়া যায়না। কারন মানুষ যেমন পশু অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ঠিক তেমনি একজন মানুষ আরেকজন মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, সব মানুষ সমান নয়। মেধা, যোগ্যতা, শক্তি এবং সাহস এর বিচারে মানুষের নিজেদের মাঝে বিস্তর ব্যাবধান বিদ্যমান। তাহলে যোগ্য এবং শক্তিশালী মানুষরাতো আরেকটু বেশি অধিকারের ন্যায্য দাবিদার। মানবিকতার ধর্মতো তাহলে অমানবিক এবং পাশবিক এর মাঝামাঝি কিছু হয়ে গেল। ধর্মগ্রন্থগুলোর অবস্থানতো এব্যাপারে পরিষ্কার, মানুষ সৃষ্টির সেরা এবং বাকি সব সৃষ্টি মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত। নাস্তিকতার ধর্ম এব্যাপারে কি বলে?
শুধুমাত্র মানবাধিকারই কি পারে পৃথিবী থেকে সকল দন্দ্ব, সঙ্ঘাত, দরিদ্রতা, অবিচার মুছে ফেলতে? এ বিষয়ে কথা বলার সময় বিভিন্ন সরকার, রাস্ট্র এবং ব্যাক্তির মতামতে কেন এত পার্থক্য থাকে? কিভাবে সবাই একটা ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারবে?
ধর্ম বিরোধিতা করতে গিয়ে নাস্তিকরা একটা রেফারেন্স স্ট্যান্ডার্ড বা যার সাথে অন্য সাধারণ কিছুর তুলনা করা যায় এমন আদর্শ একটা ব্যবস্থার অনুপস্থিতির কথা বলে। যেমন, আস্তিকরা যখন বলে এই মহাবিশ্ব, তারকারাজী, গ্রহ নক্ষত্র সবকিছু কত সুশৃঙ্খলভাবে অবস্থান করছে যা স্রস্টার অস্তিত্বের প্রমাণ, তখন নাস্তিকরা বলে মহাবিশ্ব যে সুশৃঙ্খল তার রেফারেন্স কি, এই শৃঙ্খলতা হয়তো বিগ ব্যাং এর পর খুবই স্বাভাবিক একটা ঘটনা। তাহলেতো নাস্তিকদের যুক্তি দিয়ে একথাও জিজ্ঞেস যায় যে যেগুলোকে আমরা মানবাধিকার, নীতিবোধ ইত্যাদি বলে চিনি সেগুলোর রেফারেন্স স্ট্যান্ডার্ড কি? মানুষের চিন্তা ভাবনা, ধ্যান ধারণাতো খুবই আপেক্ষিক একটা বিষয়। পারিপার্শ্বিকতার বিভিন্নতাভেদে এসবই পরিবর্তিত হতে পারে। যেমন ১০/২০ বছর আগে সতিত্ব হারাবার চেয়ে বাংলার প্রায় সব মেয়েরা জীবনও দিতে প্রস্তুত ছিল, কিন্তু এখন সে রকম মেয়ের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে, আবার পশ্চিমা দেশগুলোতে সতিত্বের ধারণাই মেয়েদের মাঝে নেই। এসব ব্যাপার বুঝতে হলে এপিজিনেটিক্স বিষয়টি জানতে হবে আর আমি এটির মত জটিল একটি বিষয়ে এখন পাঠককে টানতে চাচ্ছিনা। মূল কথায় ফিরে যাই। একজন সন্যাসী মানবাধিকার ব্যাপারটা যেভাবে দেখে একজন খুনী কিন্তু সেটা সেভাবে দেখেনা। সিজোফ্রেনিয়া নামে একটা মানসিক রোগ আছে যার রোগীরা অসামাজিক হয়ে যায়, উলটা পালটা জিনিস দেখে-শুনে(হেলুসিনেশন) এবং নিজেদের ছাড়া বাকি সবাইকে পাগল মনে করে, যেখানে আমরা বলি ওই রোগীরাই পাগল। এখন পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ যদি সিজোফ্রেনিক হয়ে যেত তাহলে কে নির্ধারণ করত কোন পক্ষ পাগল? এই রোগটা হয় খুব সামান্য একটা কারনে, মস্তিস্কে ডোপামিন নামের এক তরলের কম বা বেশী মাত্রার ক্ষরণে। তাহলে দেখুন কত সামান্য কারনে মানুষের চিন্তা চেতনা পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে সেখানে মানবিকতা, নীতিবোধ এসবযে ভাল তার রেফারেন্স আপনি কোথা থেকে পাবেন? নাস্তিকরা কিন্তু সিজোফ্রেনিকদের মত সংখ্যালঘু, এমন কি হতে পারেনা যে তারা আস্তিকতাকে অনুপযোগী বলে মনে করে অথচ তাদের নিজেদের মতবাদই অনুপযোগী?
মানুষ এবং মহাবিশ্ব সৃষ্টির পেছনে অবশ্যই একজন স্রষ্টা আছেন আর তার সৃষ্টির সুশৃঙ্খলতা প্রমাণ করতে কোন রেফারেন্স লাগেনা। কারন, সামান্য ডোপামিনের ক্ষরণ সামান্য এদিক সেদিক হলে যেমন মানুষ পাগল হয়ে যায় তেমনি গ্রহ নক্ষত্রের সামান্য বিচ্যুতিও মহাবিশ্বে বিপর্যয় নিয়ে আসতে পারে। তাহলে কে ঠিক করে দিল এই সঠিক মাত্রা যা যুগ যুগ ধরে এই সঠিক পর্যায়ে বজায় থাকছে? মানবাধিকারের ধারণা সর্বপ্রথম ধর্মগ্রন্থগুলো থেকেই পাওয়া যায় এবং বিভিন্ন দেশের সংবিধানে মানবাধিকার রক্ষার কথা বলতে গিয়ে স্রষ্টার অস্তিত্বের কথাই বলা হয়েছে। আলোচনা শেষ করছি যুক্ত্রাস্ট্রের ফাউন্ডিং ডকুমেন্টের উদ্ধৃতি দিয়েঃ
We hold these Truths to be self-evident, that all men are created equal, that they are endowed by their Creator with certain unalienable Rights, that among these are Life, Liberty and the Pursuit of Happiness. That to secure these rights, Governments are instituted among men.
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই এপ্রিল, ২০১১ রাত ৯:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


