আগাম কোন ধারনা দেয়া ছাড়াই হঠাত করেই ২৯ মে তারিখে বাংলাদেশে বন্ধ করে দেয়া হলো ফেসবুক। দেশের বাহিরে থেকে যতদূর জেনেছি বিটি আর সি এই বন্ধের কারন খুব স্পষ্ট ভাবে কিছুই বলেনি। তারা কোনসময় বলছে প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধীদলের প্রধানকে নিয়ে কার্টুন বানানোর মত অপব্যবহার বন্ধ করার জন্যে ফেসবুক সাময়িক বন্ধ করা হয়েছে। আচ্ছা, আমার তাহলে খুব জানতে ইচ্ছে করে প্রতিদিন বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়াতে যে দেশের নেতা-মন্ত্রীদের তো বটেই, এমনকি প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধীদলের নেত্রীকে নিয়ে চেহারার বিকৃতি ঘটিয়ে যেসব কার্টুন ছাপানো হয় সেটা কি কোন অপরাধের মধ্যে পড়েনা? একই ধরনের মুক্তবুদ্ধির চর্চা করতে গিয়ে ফেসবুক কেন সরকারের রোষানলে??
আবার ফেসবুকের বন্ধের কারন হিসেবে কোন কোন জায়গায় দেখলাম সরকারের কিছু লোক পাকিস্তানে সম্প্রতি যে কারনে ফেসবুক/ইউটিউব বন্ধ করা হয়েছে একই কারন দেখিয়েছেন অর্থ্যাত কে বা কারা ফেসবুকে আমাদের নবী করিম (সাঃ) কে নিয়ে কার্টুন প্রতিযোগিতা (নাউজুবিল্লাহ) করবে এইজন্যে ফেসবুক বন্ধ করে দিতে হবে। এবং খুবই আক্ষেপের বিষয় যে বহির্বিশ্বের মিডিয়াগুলোতে এই খবরটির প্রাধান্য পেয়েছে অর্থ্যাত সরকারের যে উদ্দেশ্যই থাক ফেসবুক বন্ধ করে দিয়ে তারা আদত আমাদের দেশকে বহির্বিশ্বে পাকিস্তানের সমমানের রক্ষনশীল এবং মৌলবাদী হিসেবে পরিচিত করে দিল। এবং এর সুত্র ধরে কোন একদিন তালিবান দমনের মত কোন অভিযানে মার্কিন আর্মি এই দেশে আসলে অবাক হবার কিছুই থাকবেনা। ইতিমিধ্যে ভারত তো তাদের দূতাবাসের জন্যে নিজেদের আর্মস ফোর্স দাবী করেই বসেছে।
এখন আসুন আসল পরিস্থিতি বিশ্লেষনে। ধর্মীয় কারনে পাকিস্তানে বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক সংগঠন অনেক দিন ধরেই ফেসবুক বন্ধ করার দাবী করেই আসছিল অথচ আমাদের দেশে ২৯ মে র আগে কোন মিডিয়াতে এমন কোন ধর্মীয় সংগঠনের ততপরতা দেখা যায়নি। তাই আমি মনে করিনা ১৯৭২ সালের সংবিধানের ধারক আওয়ামী সরকার ৫০-১০০ জনের হুজুরের অল্প হুমকি ধামকি তে ফেসবুক বন্ধ করে দিছে। যে আওয়ামী লীগ ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বন্ধ করার জন্যে ততপর, ১৯৭২ র 'ধর্মনিরপেক্ষতা' সংবিধানে যাবার জন্যে উঠেপড়ে লেগেছে তাদের কাছে থেকে এই আচরণ তাদের নৈতিক পরাজয়ের একটি উপযুক্ত প্রমান। প্রসংগত বলা দরকার, যারা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী তাদের বিশ্বাস এত ঠুনকো নয় যে সামান্য কার্টুন দিয়ে তাদের সামনে রাসুল (সাঃ) কে হেয় প্রতিপন্ন করবে বরং যারা এই ধরনের চিন্তা করে তারা আসলে মূর্খ এবং এই মূর্খতাকে যারা মূল্য দেয় তারাও তাদের সহযাত্রী বলেই আমি মনে করি। তাছাড়াও এই ধরনের কর্মকান্ডের বিরুদ্ধ ব্যবস্থা নেয়ার কথা ফেসবুকেই বলা আছে। অনেকের মতে যেতা অফেন্সিভ তা অবশ্যই ফেসবুক কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করবে না এই জন্যে কোনদেশে ফেসবুক বন্ধ করার কোন মানেই হয়না। বরং ফেসবুক থাকলে এই ধরনের অপব্যবহার বা অফেন্সিভ কর্মকান্ডের প্রতিবাদ আরো বেশি জানানো যেত। উদাহরন ধরুন, ইসলামের উপর যেন আঘাত না সে এইজন্যে পাকিস্তান বা বাংলাদেশ ফেসবুক বন্ধ করে দিয়েছে কিন্তু এই দুই দেশের মানুষের অজ্ঞাতে যদি আঘাতটা পড়েই যায় সেইক্ষেত্রে মানসিক দায়তো আরো বেশি যে সুযোগ থাকা স্বত্তেও অনেকে এর প্রতিবাদ করতে পারলো না। তাই আমি মনে করি বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এবং একটা ডিজিটাল মানসিকতার সরকারের কাছে থেকে এইধরনের আচরন একটা কৌতু্কস্পদ ছাড়া কিছুই না।
আসলে মূল কারন হলো ফেসবুকে সরকার বিরোধী প্রচারণা ইদানিং অনেক বেড়ে গেছে। আওয়ামী সরকারের আহবানে সাড়া দিয়ে তাদের বিরোধীরাও যে আজকাল ডিজিটাল ভাবেই তাদের কুকর্ম/অপকর্ম প্রমান সহকারে ফেসবুকে ছেড়ে দিচ্ছে তাতেই তারা বিব্রত এবং ক্ষুব্ধ এবং এনালগ মানসিকতার মন্ত্রী-নেতাদের কাছে তা অবশ্যই গ্রহনযোগ্য হবার কোন কারন নেই। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় সম্প্রতি ঠাকুরগায়ে ছাত্রলীগের অনুষ্ঠানে পানিমন্ত্রী যা বললেন তা মিডিয়াতে আসার পর তিনি তার প্রতিবাদ করলেন কিন্তু ফেসবুকে যখন তার বক্তৃতার ভিডিও এসে গেলো তখন তো তার মিথ্যাবাদী প্রমানিত হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। আবার বরিশাল পলিটেকনিকে ছাত্রলীগের রাম দা র কোপাকুপি যা মনে হয় ফেসবুকের কল্যানে সবাই দেখেছে এবং অবশ্যম্ভাবী সেটা সরকারের ভালো লাগার কথা না, আরো কিছুদিন আগে একটা সংঘর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের সভাপতিকে কে মেরেছে- বিভিন্ন মিডিয়া এবং সরকার দলীয় সংগঠন প্রমান করার চেষ্টা করলো যে এটা ছাত্রদলের আভ্যন্তরীন গন্ডগোল কিন্ত ঘটনার ভিডিও ফেসবুকে যখন প্রচার পেয়ে গেলো তাতে দেখা গেলো লাল জ্যাকেট ওয়ালা এক ছাত্রলীগ কর্মীই আসলে ছাত্রদলের সভাপতিকে আক্রমন করেছে; আবার ধরুন বি ডি আরের সরকারী তদন্ত রিপোর্ট বা সেনা তদন্ত রিপোর্ট যা কখনোই হয়তো পুরো প্রকাশ কোথাও হতো না কারন এতে সরকারের জন্যে অনেক অফেন্সিভ ব্যাপার চলে আসছে কিন্তু ফেসবুকে 'we want justice' নামের গ্রুপটিতে এই রিপোর্ট পুরোই দেখা যায়। আর বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর অনেকেই হয়তো ইতিমধ্যে না চাইলেও বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ‘দশ টাকা সের চাল খাবানোর নির্বাচনী প্রচারনা বেশ কয়েকবার দেখে ফেলেছেন। আজ নাগরিক ব্লগ নামের একটা সাইটে দেখলাম একজন ব্লগার সজীব ওয়াজেদ জয়ের কিছু পুলিশ কেসের পেপার ডকুমেন্ট দিয়ে একটি পোস্ট দিয়েছে; ফেসবুক ওপেন থাকলে আজ এই খবরও হয়তো সরকারের জন্যে আরেক মাথা ব্যাথার কারন হয়ে যেত। আমি শুধু কিছু উদাহরন দিলাম এখানে যা সরকারের জন্যে সত্যিই খুব অফেন্সিভ আর সেটা অনুধাবন করেই ফেসবুকের উপর খড়গহস্তটা এসেছে সেটা বুঝে নেয়া যায়। ধর্মের ব্যাপার শুধু একটা ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এইটুকু বঝে নিতে কষ্ট হয়না যে এই সরকারের 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' স্লোগান 'দশ টাকা কেজি চাল খাওয়ানোর মতই' আরেকটি অসার নির্বাচনী মেনিফেস্টো যা তারা বিভিন্ন সময়ে তাদের মানসিকতা দ্বারা প্রমান করেছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


