আমার প্রিয় পোস্ট
- ইন্ডিয়ান মিউজিশিয়ানদের জোচ্চুরি
(আসুন কিছু হিন্দি গানের অর্জিনাল ভার্সন শুনি) - আলআমিন মিরাজ
- স্মৃতি ১৯৭১ (শেষ পর্ব) - সুরঞ্জনা
- ফিরে দেখা ২০১০ : বছরজুড়ে সামহোয়্যারইন ব্লগে যা কিছু আলোচিত-সমালোচিত... - ফিউশন ফাইভ
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সব বই ডাউনলোড করুন - মো: হারুন-অর-রশিদ
- সামহোয়্যারইন ব্লগ : সপ্তাহের নির্বাচিত পোস্ট (১৬ আগস্ট - ২২ আগস্ট) - ফিউশন ফাইভ
- এবার প্রেসের কাজে বাংলা লিখুন ইউনিকোডেই একদম সরাসরি ফটোশপ (মেহেদী ভাইয়ের নতুন পোস্ট) - টেকি মামুন
- পলিটিক্স কে পলিটিক্স ছাড়া কোনো সুশীল তরীকায় মোকাবেলা করা যায় না! - কৌশিক
- যেকোন Webpage থেকে বিজ্ঞাপন অপসারন করুন, বিজ্ঞাপনহীন ওয়েবের জগতে আপনাকে স্বাগতম! (রিপোস্ট)
- নাফিস ইফতেখার
- কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমগ্র রচনাবলী অনলাইনে - বংশী নদীর পাড়ে
- ১৯৭২ সালে প্রণীত বাংলাদেশের সংবিধান - অরূপ
- গুগলের বই ডাউনলোড - মানিক হাসান
- কিভাবে আপনার উইন্ডোজের গতি বাড়াবেন? - কমপিউটার জগৎ
- যে কারনে পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে ব্যর্থ হলাম (মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ও নির্যাতিত সকল সূর্য-সন্তানদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা সহ) - মিরাজ
- চলমান পুঁজিবাদী সংকট থেকে উত্তরণ ( - দিনমজুর
- হাইব্রীড বীজ নিয়ে আশঙ্কা সত্যি হলো এবার 'সত্যিরা' ভয়াবহ আতঙ্ক ছড়াচ্ছে ! - মনজুরুল হক
- জিএম শস্যের ভালো মন্দ - দিনমজুর
রাষ্ট্র ভাবনা: একাত্তরে চীন কেন আমাদের সমর্থন করতে পারে নাই (দ্বিতীয় ও শেষ অংশ)
২৮ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:২১
ব্লক প্রসঙ্গের বাকি অংশ:
রাশিয়ার উদ্যোগে কনফেডারেশন রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন বানানোর একটা ছোট লাভক্ষতির খতিয়ান নিয়ে এবার শুরু করব। এতে দেখা যাবে, বাস্তবে অন্য দেশগুলোর নগদ লাভ হয়েছে এই যে, এরা পিছিয়ে পড়া এক প্রাক-পুঁজিতান্ত্রিক জঠর জ্বালা থেকে বের হতে পেরেছে। কিন্তু এতটুকুই অর্জিত হতেই বিনিময়ে রাশিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হিমশিম খেতে হয়েছে। আর নিজের রাষ্ট্র গড়া, রাষ্ট্রকে সার্বভৌম করার কাজ ফেলে রেখে এসব দেশ আজ কতটুকু আগাতে পারবে বা পারছে সে প্রশ্ন প্রকট হতে শুরু হয়েছে। বিক্রি হওয়াই যার নির্ধারিত ভাগ্য বলে স্বীকার করে শুরু হয়েছে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার পর তা নতুন ক্রেতা আমেরিকার কাছে কোন নীতি-অবস্হানহীনভাবে নিজের যার যা আছে তাকেই বেচেই সম্ভবত ও একমাত্র সে আবার বেচে থাকতে চেষ্টা করবে। তাতে, আমেরিকার ইরাক হামলার পর তার শখের পাহারাদার বহুজাতিক বাহিনীতে পাহারাদারের চাকরীই সই। ইউরোপে গিয়ে খোলামেলা ঘুরে নিজের জনশক্তি কাজকর্ম করে খেতে পারতে পারে চিন্তা করেছে, কাজেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ, ন্যাটোর মেম্বারশীপ সোনার হরিণ - এগুলো পেতে তাকে ন্যাংটা হয়ে যেতে হলেও সে রাজি। সম্প্রতি জর্জিয়া - আমেরিকার সাথে গাঁটছাড়া বাধা গেছে- এই সাহসে রাশিয়ার সাথে বলপ্রয়োগে সমাধান পথে গিয়ে নাকানি চুবানি খেয়ে এখন আমছালা দুটোই যাবার অবস্হা। চেকশ্লোভিয়া, যুগশ্লোভিয়ার ভেঙ্গে পড়া, টুকরো টুকরো দেশ হয়ে যাওয়া, সার্ব, ক্রেট, বসনিয়া, কসোভোর যুদ্ধ -প্রমাণ করে রাষ্ট্র গঠনের কাজটা জন্মের সময় এতই দুর্বল গাছাড়াভাবে করা যে এখন কিছু করেই নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হওয়া যাচ্ছে না, চারিদিকে একটা নীতিহীন অবস্হানের মধ্যে কোন মতে টিকে থাকার সংগ্রাম করতেই সব শেষ। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, ব্লক বাস্তবে ভেঙ্গে গিয়েছে ঠিকই কিন্তু ব্লক ধারণাটা এমন একটা ভাবনা দাড় করাবার ভান করেছে যেন সার্বভৌম রাষ্টের ক্লাসিক ধারণা ছাড়িয়ে সে এখন একটা বিকল্প। অথচ, রাষ্ট্র ধারণার ইতিহাসে জায়গা করতে চেয়ে শেষে হয়ে দাড়িয়েছে একটা ব্যর্থ, অক্ষম প্রচেষ্টা। সোভিয়েত ইউনিয়ন গড়ে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ত্ব এই ক্লাসিক প্রশ্নটার কোন বিকল্প ধারণা গড়তে পারেনি বরং রাষ্ট্র কেন দরকার, কেন সে টিকে থাকে সেই মাথা খারাপ করা প্রশ্নের মধ্যেই আবার চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে।
প্রতিটি পড়শি বা অন্য রাষ্ট্র নতুন রাষ্ট্রের ভরপুর সম্ভাবনাময় শত্রু - এই গুরুত্ত্বপূর্ণ প্রস্তাবকে পাশ কাটিয়ে কোন ধারণা দেখা যাচ্ছে এখনও তৈরি হতে পারেনি। ব্লকের ধারণা বিষয়টাকে বরং ঘোলাটে করে একে কেবল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ধারণার খাপে ভরে বিতর্কটাকেই পথভ্রষ্ট করেছে। ব্লক ধারণার ভিতরে - রাষ্ট্র মানেই অন্য আর সব রাষ্ট্রের সাথে শত্রুতা সম্পর্ক - রাষ্ট্রের সংজ্ঞার এই মৌলিক ও ক্লাসিক ধারণাকে অস্বীকার করা হয়েছে। মনে করা হয়েছে এই মৌলিক স্বার্থের দিকটা যার জন্য ওটা রাষ্ট্র, ওর অস্তিত্ত্বের সমার্থক - তাকে ভুলে গিয়ে, চেপে রাখা সম্ভব। এখানে ধরে নেয়া আছে, কোন জনগোষ্ঠি নতুন রাষ্ট্র হিসাবে আবির্ভূত হবার পর যেনবা চাইলেই অন্য রাষ্ট্রের সাথে "বন্ধুরাষ্ট্র" (সত্যি সত্যি মানে করে ডিপলোমেটিক ভাষায় নয়) হতে পারে। সময় ও ইস্যুভিত্তিক বিশেষ পরিস্হিতিতে উভয়ের লাভ (win win) অর্থে না, স্হায়ীভাবে ভাবে একটা রাষ্ট্রের জোট (alliance) করা সম্ভব। আরও লক্ষণীয়, সোভিয়েত ইউনিয়ন রাষ্ট্রের আলাদা সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা বজায় রেখে কোন হাল্কাপাতলা রাষ্ট্রের জোট নয়। জোটের উদাহরণ হিসাবে যেমন, আরব লীগ, ইসলামি ঐক্য সংস্হা (OIC), আফ্রিকান ইউনিয়ন বা এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নও নয়। পাঠক একদিকে এদেরকে রাখুন অপরদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন কল্পনা করুন। সোভিয়েত ইউনিয়নকে মনে করা হয়েছে রাষ্ট্রের ফেডারেশন। এটাই সেই কাঁচের পাথরের বাটি জাতীয় সমস্যা। এমনকি যারা সোভিয়েত ইউনিয়নের কেউ না, যেমন, চেকোশ্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি বা রুমানিয়া কথাই যদি ধরি, এদেরকে আলাদা রাষ্ট্র বলে স্বীকার করে নেয়া হয়েছিল, অথচ সোভিয়েত ইউনিয়নের "বন্ধু" রাষ্ট্র বলেও নাকি মানা হতো - এদের উপর ট্যাঙ্ক চালানোর ঘটনাকে আমরা "বন্ধু" রাষ্ট্র বা রাষ্ট্র ধারণা কত প্রকট সমস্যা সঙ্কুল ছিল বুঝতে পারি। এই ধরনের চিন্তার ভিতর আরও মারাত্মক বিষয় ধরে নেয়া আছে। মনে করা হয়েছিল জন্ম নেয়া নতুন কোন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে নিজে ভাবার দরকার নাই। যেমন আমেরিকা বা রাশিয়ার বৈদেশিক নীতির বাস্তবায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়াই নতুন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ত্ব ও নিরাপত্তার গ্যারান্টি পাবার উপায়।
রাষ্ট্র সম্পর্কে এসব ভাবনা থেকেই দুনিয়া জুড়ে চালু কমিউনিষ্ট আন্দোলনের আরও একটা গুরুত্ত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট হলো, এরা যে রাষ্ট্রের বদল ঘটাবার জন্য আন্দোলন করছে একে ভাঙ্গা বা বদলাবার জন্য যতটা মরিয়া কর্তব্যজ্ঞান করে ঠিক ততটাই রাষ্ট্র গঠন বা constitute করার যে একটা দিক আছে সেটা বুঝতে পারে না। বড় জোড় একটা ক্ষমতা দখল টাইপের কিছু একটা বুঝে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আকার দেবার জন্য কমিউনিষ্টের কাজটা কী সে কিছু বুঝে উঠতে পারে না। ঐতিহাসিকভাবে দেখলে রাষ্ট্র ক্ষমতা ও রাষ্ট্র কাঠামো (categorical division of power and apparatus) লেনিনের হাতে বিকশিত এই ধারণাটাই এদের মধ্য না থাকার কারণে এই চিন্তাটা চর্চার মধ্যেও অনুপস্হিত। এসব কিছুর সম্মিলিত ফলাফল হলো সে যে কোন দেশের কমিউনিষ্ট পার্টি হোক বা ক্ষমতাসীন কমিউনিষ্ট পার্টি হোক - সবার গন্তব্য ছিল "দুনিয়ার মজদুর এক হও" বলে শ্লোগানের আড়ালে সবাই নিজ নিজ দেশে সোভিয়েত বৈদেশিক নীতির একএকজন সফল সুচারু বাস্তবায়ক। । অথচ এরা বিপ্লবী আবেগে ঠেলায় যে তিতা-সত্যটা ভুলে গিয়েছিল তা হলো, শেষ বিচারে রাশিয়া একটা আলাদা রাষ্ট্র ফলে এর অস্তিত্ত্বের সমার্থক এর একটা আলাদা স্বার্থ এই রাষ্ট্র জন্মানোর সাথ সাথে সহজাত তৈরি হয়ে গেছে। এই স্বার্থটা যেটা এর পররাষ্ট্র নীতির ভিতরে প্রতিফলিত সেটা সবসময় অন্য কোন কমিউনিষ্ট বা নন-কমিউনিষ্ট রাষ্ট্র, নতুন কিংবা পুরানো রাষ্ট্রের স্বার্থের সাথে কখনও মিলবে কখনও মিলবে না - এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। কোন নতুন কিংবা পুরানো রাষ্ট্রের স্বার্থের ভিতরে রাশিয়া কখনও কিছু তার জন্যও ভাল অথবা সবটাই তার জন্য ভাল মনে করতে পারে, তবুও এর মানে এই না যে রাশিয়া তার জন্য সবসময় পক্ষের বা "বন্ধুরাষ্ট্র" এভাবে বিবেচনা করতে হবে। এমনকি অন্য সময়ে একই বা ভিন্ন ইস্যুতে হয়তো দেখা যাবে ঘটনা পুরা উল্টা।
চীনের অভিজ্ঞতা:
দুনিয়াকে কাপিয়ে দেয়া দ্বিতীয় যে কমিউনিষ্ট বিপ্লব তা ঘটেছিল চীনে। ওরাই প্রথম বুঝেছিল, "দুনিয়ার মজদুর এক হও" স্লোগানের আর সোভিয়েত বৈদেশিক নীতিতে প্রতিফলিত রাষ্ট্রের স্বার্থ এদুয়ের মধ্যে একটা বিরোধ আছে। কথাটা আমি যতটা গুছিয়ে বললাম চীনা কমিউনিষ্ট পার্টি ঠিক এভাবেই বুঝেছিল এটা আমার দাবি নয়। চীনা কমিউনিষ্ট পার্টির সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে "সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ" বলে মূল্যায়ন ও অভিযোগটাতে যদি কোন সারবস্তু থাকে তবে ওটাকে এই আলোকে দেখা যেতে পারে। তবে দুঃখজনকভাবে বলতে হচ্ছে, চীনারাও কথাটা বলছে রাশিয়ার সাথে সম্পর্কের একটা বাস্তব অভিজ্ঞতার উপরে দাড়িয়ে, রাষ্ট্র ভাবনায় চিন্তার, তত্ত্বের সমস্যা হিসাবে নয়; এটাকে তত্ত্বীয়ভাবে রাষ্ট্র ভাবনার কমিউনিষ্ট আন্দোলনের সমস্যা বলে বুঝেছে - এরকম কোন বুঝের উপর দাড়িয়ে বলা কথা হিসাবে আমরা দেখছি না। এজন্য অভিযোগ উপস্হাপনটাও গোলমেলে। রাশিয়ান বিপ্লব কীসে পরিণত হয়ে গেছে সেই রাষ্ট্র চরিত্র (একটা উদ্ভট শব্দ, আসলে বলতে চেয়েছে বৈশিষ্ট) উল্লেখ করে দিয়ে বলার চেষ্টা। এভাবে বৈশিষ্ট তুলে কথা বলাটা মানে ঘটনার লক্ষণ দেখে ঘটনা বর্ণনার (রোগ না রোগের লক্ষণ) চেষ্টা। ফলে এর সমাধান পেতে তা আমাদের যথেষ্ট কাজে আসেনি, তবে কাদা ছুড়াছুড়িতে খুব কাজে লেগেছে। আমাদের দরকার ছিল চিন্তার কোন সমস্যার কারণে এটা হয়েছে সেটাসহ খুজে দেখা। তাহলে এর সমাধানটা কী হতে পারে, নিজেরাও একই দোষ দোষী কীনা - এসব বিপর্যয় এড়ানো যেত হয়ত।
চীনের বেলায় সবচেয়ে যেটা গুরুত্ত্বপূর্ণ, নিজেও সেই একই ব্লক ধারণা কান্ধে নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের মত তবে ভিন্ন নিজের ব্লক খুলে বসা। সোভিয়েত ব্লক ধারণা বিরোধীতা করে চীনও আলোচ্য প্রস্তাবকেই সমর্থন করেছে। এজন্য সোভিয়েত বিরোধীতার কিছুদিন পরে এক পর্যায়ে আলবেনিয়াকেও চীনের বিরুদ্ধে একই চীনা সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের অভিযোগ করতে দেখেছি।
ব্যাপার হলো সারকথায় আমি যা বলতে চাচ্ছি - চীনারা যদি বুঝতে সক্ষম ও একমত হত, রাষ্ট্র মানেই অন্য রাষ্ট্র তার সম্ভাবনাময় শত্রু - এই প্রস্তাব সত্যি ফলে, রাষ্ট্র মাত্রই ওর একটা একান্ত স্বার্থ আছে থাকবে। কিন্তু তাসত্ত্বেও ইতিহাসের কোন বিশেষ পরিপ্রেক্ষিতে অন্য রাষ্ট্রের সাথে দরকারি সাময়িক সমঝোতাগুলো করার সুযোগ নেয়া যায়। যেখানে সমঝোতা করতে পারছে না তা আকাঙ্খি রাষ্ট্রকে খোলাখুলি জানাতে পারে। আমি বলতে চাচ্ছি, রাষ্ট্র হিসাবে সব রাষ্ট্রের একান্ত স্বার্থ আছে, যতক্ষণ সে রাষ্ট্র ততক্ষণ তার এই স্বার্থ আছে, অস্তিত্ত্ব ও স্বার্থ সমার্থক। একমাত্র রাষ্ট্রের অস্তিত্ত্ব না থাকলে তার কোন স্বার্থ নাই। তবে সেক্ষেত্রে মানে হবে ঐ জনগোষ্ঠি নিজেদেরকে কোন রাষ্ট্রের মধ্যে গঠন (constitute) করা পর্যন্ত পৌছাতে সক্ষম হয় নাই। একথা যদি বুঝি ও মানি তবে নিজের স্বার্থে কথা বলছি একথা জানান দিয়ে কথা বলাই তো ভালো।
সে খোলাখুলি পথে না গিয়ে "দুনিয়ার মজদুর এক হও" স্লোগানের আড়ালে (যেহেতু একথার প্রয়োজন সব বিপ্লবী মানে যদিও এর ব্যবহারিক রূপ বিষয়ে তত্ত্বীয় সমস্যার হাল হয়নি) অন্য রাষ্ট্রকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করা, ব্লক বানানো; এমনকি আবার নন-কমিউনিষ্টদের মতনই পরিস্হিতি তৈরি করে অথবা তৈরি পরিস্হিতির সুযোগে সে ফাঁদে ফেলে বা বড়ভাইয়ের গায়ের জোড় দেখিয়ে নিজ রাষ্ট্রের স্বার্থ উদ্ধার করা -এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য, সবচেয়ে অমার্জনীয়।
চীনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অভিযোগ:
ঘটনার সত্যতা হলো, গণপ্রজাতন্ত্রী চীন রাষ্ট্র ১৯৭১ সালে বাংলাদেশকে সমর্থন করে নাই। কেন? এই প্রশ্নটাকে মাথায় রেখে রাষ্ট্র ভাবনা ইতিহাসের ভিতর দিয়ে যেভাবে গড়িয়ে চলেছে তাকে ধরার চেষ্টা করতে গিয়ে এখানে পৌছেছি। এখন এর সহজ উত্তর দেয়া একেবারে সহজ।
চীনের জনগোষ্ঠির রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ওর পররাষ্ট্র নীতিতে যা সবচেয়ে ভালোভাবে প্রতিফলিত, ওটা আমাদের জনগোষ্ঠির রাষ্ট্র আকাঙ্খার স্বার্থের সাথে ম্যাচ করে নাই। দ্বিতীয়ত, আমরা ব্যবহৃত হয়ে গেছি।
১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময়ে বিশেষ করে যুদ্ধের পরে পরে, নকশাল আন্দোলন রাষ্ট্রকে সশস্ত্র মোকাবিলা করতে গিয়েছিল। এর বিরুদ্ধে প্রচারের দরকারে আওয়ামী লীগ-ভারতীয়-সোভিয়েত একটা ভাবাদর্শগত বিচার, পাল্টা বক্তব্য ছিল - আমি পাঠককে এথেকে আরও গভীরে নিয়ে যেতে চাই। এই প্রচারমূলক বক্তব্যের ভিতরে সত্যতা আছে। আমি পাঠককে আরও গভীরে নিতে চাই এজন্য যে আজ এই প্রচারের শুধু সত্যতা বিস্তারে জন্য জানা আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়। বরং গভীর পর্যালোচনার ভিতর দিয়ে আমাদের রাষ্ট্র ভাবনা বিষয়কে যদি আরও স্বচ্ছ করতে পারি, আজকের প্রেক্ষিতে আমাদের লাভালাভি সেখানে। আমি এজন্য এখানে নকশাল আন্দোলনের কোন পর্যালোচনাও করতে যাব না, প্রাসঙ্গিকও নয় বলে। । ফলে দুই কুকুরের কামড়াকামড়ি জাতীয় প্রসঙ্গ পাশে রেখে আরও দূরে যেতে পাঠককে আহ্বান রাখব।
চীনা রাষ্ট্রের দিক থেকে দাঁড়িয়ে দেখলে, আমরা দেখব ১৯৬৯ সাল থেকেই চীনা রাষ্ট্র একটা তার গুরুত্ত্বপূর্ণ স্বার্থের ব্যাপারে চেষ্টা করে যাচ্ছে। বিষয়টা হলো, মুখ্যত জাতিসংঘের সদস্যপদ, তবে আরও অনেক কিছু। আগেই জানিয়েছি অক্টোবর ১৯৭১ সালের আগে চীন জাতিসংঘের সাধারণ সদস্যও নয়। এটা শুধু সাধারণ সদস্যপদের মামলা নয়, নিরাপত্তা পরিষদের ভেটোধারী স্হায়ী সদস্যপদেরও বিষয়। আরও স্পষ্ট করে বললে এটা একইসঙ্গে তাইওয়ানকে বহিস্কার করার মামলা। তাই জটিল, দীর্ঘদিন থেকে চীন সদস্যপদের জন্য আবেদন করে বসে থাকলেও প্রতিবার সাধারণ সভার আগেই আমেরিকান ভেটোতে তা নাকচ হয়ে গেছে। আমি যদিও জাতিসংঘের সদস্যপদ বিষয়কে ধরে কথা শুরু করেছি তবু চীনের ঐ সময়কে বুঝতে এটা অবশ্যই যথেষ্ট নয়। তারপরেও ইস্যুগুলোর সবিস্তারে না গিয়ে সংক্ষেপে শিরোনামে বলছি। ১৯৫৮ সাল থেকে শুরু হওয়া সাংস্কৃতিক বিপ্লব ভাটায় এসে এক ধরণের থিতাচ্ছে, এর খতিয়ান টানা শুরু হয়েছে, ২. চীন-রাশিয়ার সীমান্ত এলাকায় পরস্পরের উপর স্হানীয় সীমায় তবে সশস্ত্র সংঘাত দেখা দিয়েছে। এতে চেক, হাঙ্গেরির উপর রাশিয়ান সামরিক অভিযানের কথা স্মরণ করে চীন ভালরকম ভীত হয়ে পড়েছে। ৩. বিপ্লবের ২০ বিছর পরও আশানূরূপ অর্থনৈতিক অপর্যাপ্ত অবিকাশ মোকাবিলার পথ কী তা নিয়ে পার্টিতে বিরোধ দেখা দিয়েছে। এখানে একটা কথা মনে রাখা দরকার, ব্লক ধারণার আর একটা অনুসঙ্গ হিসাবে আলাদা দ্বীপের মত "সমাজতান্ত্রিক" দুনিয়া বিকশিত হচ্ছিল, বাইরে থেকে বিনিয়োগ নেয়া জায়েজ কী না - এসব চিন্তা তখনও না তত্ত্বে না ব্যবহারিক বাস্তবতা হিসাবে কমিউনিষ্ট চিন্তায় ফয়সালা হয় নাই। এটা আজও তত্ত্বে সমাধান না হলেও, ব্যবহারিক সুবিধা বিবেচনাতে আন্তর্জাতিক পূঁজিতান্ত্রিক সম্পর্কের দুনিয়ায় অংশ নিতে সবাই এগিয়ে যাচ্ছে। লেনিনের সাম্রাজ্যবাদের লগ্নি পূঁজি তত্ত্বের পর এর আর কোন আপটুডেট নাই। বিশষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক পূঁজির সঙ্কট মিটাতে ১৯৪৪ সালে থেকে শুরু করে যেসব নতুন ফাইন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠান (IMF, WB, WTO) গড়ে উঠতে শুরু করেছে এই লক্ষণের মানে কী তা নিয়ে কোন তত্ত্বীয় মূল্যায়ন না করে, কেবল ব্যবহারিক সুবিধা বিবেচনাতেই এগুলোর সাথে সম্পর্ক পাতানোর মাপকাঠি হয়ে আছে। ফলে "বিড়াল ইদুর মারে কী না" - এগুলোই সেই মাপকাঠি। মূলকথা হলো তত্ত্বীয়ভাবে সমাধান না জানলেও, ব্যবহারিক যুক্তিতে পশ্চিমের দুয়ার খোলার একটা ভাবনা সক্রিয়ভাব চীনের বিবেচনায় ছিল। এই পটভূমিতে আমরা চীনকে নিয়ে কথা বলতে বসেছি।
এবার মূলকথায় ফিরে আসি। এসব নিয়ে আমেরিকার সাথে ডায়লগ ওপেন করার তাগিদ উভয় দেশ অনুভব করলেও কোন ডিপলোমেটিক সম্পর্ক না থাকায় পাকিস্তানের মাধ্যমে অপ্রত্যক্ষ আলোচনা চলছিল। এরই একটা ফলাফলে ঐ সময়েই পেকে উঠে। পাকিস্তানের সাথে এই উভয় দেশের ভালো ঘনিষ্ট সম্পর্ক তাই, পাকিস্তান একটা ব্রিজ হিসাবে চীন-আমেরিকার সম্পর্কে একটা পরিণতি আনার ক্ষেত্রে গুরুত্ত্বপূর্ণ নির্ধারক ভূমিকা পেয়ে যায়।
এবার আয়ুব খান বা পরবর্তিকালে ইয়াহিয়া খানের দিক থেকে দেখলে এটাই পাকিস্তানের এই মেডিয়েটরের ভূমিকা নেবার গুরুত্ত্ব তার সামনে একটা ইউনিক সুযোগ হিসাবে হাজির হয়। পাকিস্তান তার নিজের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উথাল-পাথাল মানে আমাদের দিক থেকে দেখলে গণঅভ্যূত্থান, আগামি রাষ্ট্রের জন্য প্রাকপ্রস্তুতি পোয়াতি ব্যাথার কালপর্ব -এসব সমস্যা মোকাবিলায় পাকিস্তান চীনের সহায়তা চেয়ে বসে। মনে রাখতে হবে পাকিস্তানের ভুমিকাটা চীন-আমেরিকার আসন্ন ডিনারে starter meal এর মতো। এই শর্তগুলোকে কাজ লাগিয়ে বাংলাদেশের (পূর্ব পাকিস্তান) চীনপন্থি কমিউনিষ্ট পার্টির উপর চীনের প্রভাব আয়ুব খান ও পরবর্তিকালে ইয়াহিয়া খান পুরোপুরি নিজের স্বার্থে ব্যবহারে পাকিস্তান সফল হয়। ১৯৬৯ এর গণঅভুত্থান যাতে সমাজের ছাত্র ও শহুরে জনগোষ্ঠির বাইরে বিশেষত শ্রমিকদের সংগঠিত করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ও প্রভাব ছিল মোহাম্মদ তোয়াহার। ফলে গণঅভ্যুত্থান সফল করা পর্যন্ত বড় নির্ধারক ভুমিকা নিলেও এই সফলতার পরপরই বাংলাদেশের (পূর্ব পাকিস্তান) রাজনীতিতে নির্ধারক ঘটনাটা ঘটে। ভাসানী ইয়াহিয়ার সাথে লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডারের (LFO) গোলটেবিল আলোচনা বর্জনের ডাক দেয়। এই প্রজন্মের পাঠকের কাছে বোধগম্য করার জন্য একটু বিস্তারে যাবে। পাকিস্তান আমলে কমিউনিষ্ট নামে পার্টি করা নিষিদ্ধ ছিল বলে ভাসানীর নেতৃত্ত্বে ন্যাশনাল আওয়ামি পার্টির (ন্যাপ) নামে ভাসানীকে সামনে রেখে চীনাপন্থী কমিউনিষ্ট ধারাগুলো (হক, তোয়াহা, আলাউদ্দিন ইত্যাদি) রাজনৈতিক তৎপরতা চালাত। গণঅভুত্থানকে সফল পরিণতি দিতে আওয়ামী লীগ সকল দলের সাথে মিলে ন্যাপ হিসাবে এরা সবাই ভুমিকা রেখেছে। আয়ুব খানকে হার মেনে ক্ষমতা হস্তান্তরে রাজি হয়েছে। এখন আলোচনার একটা পর্যায় শুরু হচ্ছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পদ্ধতিতে কী হবে তার ফর্মুলা কী হবে তার নিগোশিয়েশন। এই ফর্মুলা, নিগোশিয়েশনের আইনী নাম লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার (LFO)। দীর্ঘ সামরিক শাসনের পরবর্তীতে, সবাই মানে এমন গঠনতন্ত্র (constitution) বলে কিছু অবশিষ্ট নাই। ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা কেবল আইনী দিক থেকে দেখলে, আমাদের বাচ্চার-বুঝ হলো একটা নির্বাচন (মাথায় কাজ করে একটা সংসদ নির্বাচন) দিয়ে দিলেই তো হয়। কিন্তু ঘটনা হলো, সংসদ খাড়া করা বা নির্বাচন চাওয়া মানেই ধরে নেয়া হয়ে যায় কোন একটা গঠনতন্ত্র (constitution) আগে থাকতে আছে, রাষ্ট্র গঠন (constitute) হয়ে আছে। তার অধীনে একটা নির্বাচন চাছ্ছি। অথচ সবাই মানতে রাজি আছে বাস্তবে এমন কোন গঠনতন্ত্র (constitution) বলে কোন কিছু অবশিষ্ট নাই। একথার ভাবগত অর্থ হলো, আসলে জনগোষ্ঠি তখনও রাষ্ট্রে নিজেকে সংগঠিত (constitute) আত্মপ্রকাশ করে নাই। তবে হওয়ার পথে লড়াই সংগ্রামরত। ফলে আইনী দিক থেকে (LFO) হলো সেই বিবদমান পক্ষের চুক্তিপত্র এবং দাঁড় করানো একটা প্রি-আইনী একমতের ভিত্তি যার উপর দাড়িয়ে জনগোষ্ঠি নিজেকে রাষ্ট্রে সংগঠিত (constitute) করবে, গঠনতন্ত্র (constitution) রচনা করবে। আবার ঐ গঠনতন্ত্র (constitution) কারা প্রণয়ন ও কাদের কোন সভার অনুমোদনে তা গৃহীত বলে বিবেচিত হবে - সেই গঠনতন্ত্র (constitution) সভার সদস্য নির্বাচন ছিল ১৯৭০ এর নির্বাচনের লক্ষ্য। ওখানে জগাখিচুরি অবশ্যই ছিল, যেমন গঠনতন্ত্র (constitution) সভার সদস্য নির্বাচন মানে যেন তারাই আবার সংসদ সদস্য - এমন ধারণা ওখানে ছড়িয়ে রাখা ছিল। যেখানে গঠনতন্ত্রই (constitution) নাই সেখানে কোন গঠনতন্ত্রের (constitution) অধীনে সংসদ নির্বাচন আহ্বানের আয়োজন হবে? আগে গঠনতন্ত্রের সভার সদস্য নির্বাচন, না আগে গঠনতন্ত্রের একটা হাওয়াই অস্তিত্ত্ব ধরে নিয়ে তার অধীনে সংসদ নির্বাচন -এসব জগাখিচুরি ওখানে ছিল। যা হোক সেই (LFO) সংক্রান্ত গোলটেবিল আলোচনা বর্জনের ডাক দিয়েছিলেন ভাসানী ন্যাপ। কেন?
বাংলাদেশের (পূর্ব পাকিস্তান) চীনাপন্থি কমিউনিষ্ট পার্টির উপর চীনের প্রভাব যেটা আয়ুব খান ও পরবর্তিকালে ইয়াহিয়া খান নিজের স্বার্থে হাসিল করতে পেরেছিলেন - এটা সেই প্রভাবের ফসল, তবে অবশ্যই সবটা কারণ নয়। সোজা বাংলায় চীনা রাষ্ট্রে স্বার্থের কাছে আমাদের জনগোষ্ঠির রাষ্ট্রে নিজেকে সংগঠিত (constitute) করার আকাঙ্খাটা বিক্রি হয়ে গেছিল। এখন আমার এই ব্যাখ্যাকে আরও সবল করার জন্য আরও কিছু তথ্যে যাব।
আমরা যখন ২৫ মার্চের ভয়াল রাত্রি পার হচ্ছি, ইয়াহিয়ার এই নৃশংস হত্যাকান্ড কাজের নিন্দা করতে মনোযোগ দেবার মত অবস্হায় চীনা রাষ্ট্র নাই। বরং পাকিস্তান ইয়াহিয়া শাসকের প্রতি মৌন বা অপ্রতক্ষ্য সমর্থন আছে - এতে চীনা স্বার্থের তীব্রতা কতটা মারাত্মক ছিল তা আমরা বুঝতে পারি। ১৯৭১ সালের জুলাই, ছিল একটা গুরুত্ত্বপূর্ণ সময়। প্রেসিডেন্ট নিক্সনের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা হেনরি এ কিসিজ্ঞার পাকিস্তান সরকারের আমন্ত্রণে সফরে এসেছেন, পাকিস্তানের পাবলিক ঘোষণায় আমরা এটা জেনেছিলাম। পাঠক বোধহয় উৎফুল্ল হচ্ছেন, কিসিজ্ঞার ইয়াহিয়াকে কী বুদ্ধি দিয়েছিলেন থ্রীলার পত্রিকা কলামে আমরা যেমন দেখি তেমন কিছু একটা বলব। সরি হতাশ করলাম, পাঠক আমি থ্রীলার লেখক নই। আমি কেবল কিছু তথ্যের আশ্রয় নিব, উভয়ের কী কথা হয়েছিল - কল্পনায় রাঙ্গিয়ে এমন কোন গল্প ফাঁদব না। পাকিস্তান সফরে এসে ৯-১১ জুলাই এই দুই দিন কিসিজ্ঞারের অনুষ্ঠানসূচি কী কেউ জানে না। কিসিজ্ঞার জনসমক্ষ থেকে গায়েব ছিলেন। অনেক পরে জানা গেল গোপন সফরে তিনি চীন গিয়েছিলেন। এই সফর চীন ও আমেরিকার জন্য খুবই দরকারি একটা সাক্ষ্যাত ছিল। প্রথমত এটা ছিল বিগত প্রায় দুবছর ধরে চলে আসা নিগোশিয়েশনের একটা প্রথম পরিণতি টানা, ফসলগুলো ঘরে তোলা, নতুন আরও লাভের পথের দিশ ঠিক করা। এর ব্যবহারিক কাজ হিসাবে এসেছিল আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নিক্সনের জন্য চীন সফরের আয়োজন করা। চৌ-এন-লাইয়ের সাথে বসে কিসিজ্ঞারের প্রেসিডেন্টের ভিজিটের বিস্তারিত আলোচনার ধাপ সেরে নেওয়া। চীনাদের দিক থেকে আলোচনা আগানোর প্রথম ধাপ ছিল পরস্পরের স্বীকৃতি বিনিময় আদায় করে নেয়া। মানে, জাতিসংঘে তাইওয়ানকে সরিয়ে চীনকে স্হায়ীসদস্য পদে মেনে নেওয়া। কিসিজ্ঞারের সফরে আলোচনার ফলাফলে ইতিবাচক সাড়া হিসাবে আমরা দেখেছিলাম দুদিন পরেই। ১৪ জুলাই প্রেসিডেন্ট নিক্সন কিসিজ্ঞারের সাথে চীনা নেতা আলোচনার প্রতি তাঁর ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করতে ঘোষণা করলেন, চীনা পণ্য ও পণ্যের চলাচলের ব্যাপারে আমেরিকা তার শর্তের তালিকা আরও ছোট ও শিথিল করবে। এরপরের দিন ১৫ জুলাই ারও চমক। প্রেসিডেন্ট নিক্সন হঠাৎ করে প্রেসের সামনে ঘোষণা দিলেন পরের বছর অর্থাৎ ১৯৭২ সালের মে মাসে তিনি চীন সফরে যেতে চান। নিক্সনের ঘোষণার তিন সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যে তাঁর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা উইলিয়াম পি রজারর্স ঘোষনা দেলেন, আমেরিকা জাতিসংঘের পরবর্তী সাধারণ সভায় চীনের বসা ও নিরাপত্তা পরিষদে সদস্যপদ তাইপেই (তাইওয়ানের রাজধানী) থেকে পিকিং কে দেওয়ার ব্যাপারটা সমর্থন করবে।
আমরা তাহলে স্পষ্ট দেখলাম, চীনা রাষ্ট্র নিজের প্রকট স্বার্থে এমন বুঁদ হয়ে গেছিল, যেটাকে বলে হুঁশ হারানো অবস্হা যাতে সে নিজের বেষ্ট বন্ধুর নিষ্ঠুরতা আচরণ লক্ষ্য করতে পারছিল না। বরং পাকিস্তানের অবস্হানই সমর্থন জুগিয়ে বসেছিল। অবশ্য ওখানে আঞ্চলিক যুদ্ধকৌশলগত স্বার্থও ছিল।
এবার একটু বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে আবার ফিরব। বলেছিলাম (LFO) সংক্রান্ত গোলটেবিল আলোচনা বর্জনের ডাক দিয়েছিলেন ভাসানী। এতে (LFO) ব্যর্থ হয়ে যায়নি। কারণ বর্জনের ডাক দিলেও ভাসানী ন্যাপের ছাতার তলে কাজ করা কোন কমিউনিষ্ট ধারা বিকল্প কোন দৃশ্যমান রাজনৈতিক পদক্ষেপ কর্মসূচি নেয়নি। আসলে দল সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঠিকই কিন্তু কেন নিয়েছে, কে নিয়েছে - তা মাঠের সাথে জনগোষ্ঠির উপস্হিত মেজাজের সাথে যে সামজ্ঞস্য নাই - তা কর্মী নেতা সবাই বুঝতে পারছিলেন। কিন্তু কিছু করার নাই, দলের এক গায়েবি সিদ্ধান্তের জ্বালে সবাই আটকা। সোজা কথায় আসলে, একটা নৈতিক বিপর্যয়ের ঝড় বয়ে গিয়েছিল সবার উপর দিয়ে। ফলে এথেকে বের হতে সবাই যেন মনে মনে অপ্রত্যক্ষে চাইছিল গণআকাঙ্খাটার যেন মৃত্যু না হয়, শেখ মুজিবের মাধ্যমে হলেও যেন এটা একটা পরিণতি পায়। শেখ মুজিব যখন ইয়াহিয়ার সাথে (LFO) সংক্রান্ত প্রথম দিনের গোলটেবিল আলোচনায় যোগ দিতে যাচ্ছেন, একদম আক্ষরিক অর্থে কথাটা সত্য,তাঁর যাবার পথে তিনি ভাসানীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। আলোচনায় সফলতা বরকত পাবার জন্য "হুজুরের দোয়া" নিতে। এই ঘটনাটা খুবই প্রতীকি। জনগোষ্ঠি হিসাবে আমাদের রাজনৈতিকতার মাত্রা, এর ধরণ, আমরা কীভাবে ভাবতাম, ঐ ভাবনার সীমাবদ্ধতার ভিতরে কী সমাধান বের করেছিলাম - এসব কিছু যেন প্রতীকায়িত হয়েছে ঐ ঘটনায়। এলাইনটা লিখতে বসে যে আবেগ অনুভব করছি তাহলো এই ভেবে যে, "দুনিয়ার মজদুর এক হও" শ্লোগান ত্যাগ করা যে ঠিক নয় এটা বুঝতে পেরেছিলাম। এটা যেমন সত্য ঠিক তেমনি, আমাদের জনগোষ্ঠির রাষ্ট্রে নিজেকে সংগঠিত (constitute) ও আত্মপ্রকাশের যে আকাঙ্খাটা অনুভব করছি - ওটাও তো সত্য। তাহলে চিন্তার এই জট থেকে বের হবার পথ কী? শেখ মুজিবকে মওলানা ভাসানীর দোয়া করছেন, আগিয়ে যেতে ইঙ্গিত করছেন। এটাই সেই আগানির পথ। কখনও কখনও মানুষের চিন্তার ফাঁদ বাস্তবতার চেয়ে বড় মনে হয়ে সামনে খাড়া হয়ে যায়। তবু শেখ মুজিবের ভিতর দিয়ে আগানির পথ ভেসে উঠুক এই দোয়া তিনি করার সুযোগ নিতে পেরেছিলেন। এটা ভাবছি আর ভাবছি, শিহরিত হয়ে উঠছি।
লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): রাষ্ট্র ভাবনা, চীন ;
বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...
পারভেজ রবিন বলেছেন:
প্রিয়তে, পরে পড়ব, বড় লেখা।
লেখক বলেছেন: পড়ে পরে কিছু বলবেন সেই আশায় থাকলাম।
ধন্যবাদ।
সাদাসিধা বলেছেন:
পরে পড়ব
লেখক বলেছেন: তবু পড়েন।
কম্পোজিশান বলেছেন:
এত্ত বড় একটা পোস্ট দিলেন এই সময়ে?আপনার লেখাতেতো আর চোখ বুলিয়ে গেলেই হয় না, রীতিমত পেন্সিল দাগিয়ে পড়তে হয়।...
সেই সময়টুকু দিবেন না?
লেখক বলেছেন: আসলেই সময় নির্বাচন বোধহয় ঠিক যুৎসই হয়নি। এটা নিয়ে ভাবছিলাম একবার। কিন্তু কিছু করার ছিল না। বিগত ছয় মাসের ও বেশি ধরে প্রসঙ্গটা লটকে ছিল। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এবছর শেষ করবই।
যাই হোক, "পেন্সিল দাগিয়ে পড়েন" জেনে ভাল লাগলে। আপাতত সময় নিয়ে চিন্তা করেন না। একমাস পরে মন্তব্য করলেও তড়িৎ জবাব দিব।
আহসান হাবিব শিমুল বলেছেন:
হুমমমম.....।দুপর্বই পড়লাম।ভালো বিশ্লেষন।
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ। ভাল থাকবেন।
দুটো পোস্টই পড়লাম
বহুদিন থেকে মাথায় ঘোরা কিছু বিষয় আর ইনফরমেশন যেন একটা সংকলিত রূপ পেলো
০২
৭১ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এবং কাছাকাছি সময়ে পৃথিবীতে আরো অনেকগুলো জায়গায় স্বাধীনতা/স্বাধীকার আন্দোলন/যুদ্ধ হচ্ছিল
আমার মতে শুধু চীনা স্বীকৃতি নয়
ওইসব দেশের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আমেরিকা-রাশিয়া-চীন-ভারতে এক ধরনের ব্লক/মেরু প্রক্রিয়াও চলিছিল যার অনেকগুলো প্রভাবই এসে পড়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ-যুদ্ধপূর্ব ও যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে
সেইসব বিষয়ে কি কিছু বলবেন?
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ মাহবুব লীলেন আপনার আগ্রহ দেখে ভাল লাগল।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ-যুদ্ধপূর্ব ও যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে - আর কী কী প্রভাব পড়েছিল তাও এর সাথে সংযুক্ত করতে পারলে আমারও ভাল লাগত। কিন্তু আমি নিজেই নিজের কাছে বন্দী।
এলেখাটা ফোকাস রাষ্ট্র ভাবনা: ইতিহাসের হাতে হাত রেখে চলতে চলতে রাষ্ট্র ধারণাটা ক্লাসিক কিছু বৈশিষ্ট অর্জন করেছে। কমিউনিষ্ট বিপ্লবের পরে আরও একে আরও নতুন কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে সেগুলো সে কী মোকাবিলা করে আরও নতুন কিছু সংযোজন করতে পেরেছে নাকি ক্লাসিক ধারণাগুলোই পেরোতে পারেনি, মুখ থুবড়ে পড়েছে - এটা ছিল আমার একজামিনের বিষয়।
রাষ্ট্র ভাবনার সূত্রে আমি চীন রাশিয়ার কাছে গেছি কেস স্টাডি করতে। এতে অপ্রত্যক্ষে কমিউনিষ্ট রাজনীতির কিছু মূল্যায়ন এসে পড়েছে। চীনকে শিরোনামে আনার পিছনে কারণ হলো, এতে পাঠক আগ্রহী জান। এছাড়া আলোচনাটা বাংলাদেশের পাঠকের কাছে প্রাসঙ্গিক না করতে পারলে এটা একটা একাডেমিক নিরস কিছুতে পর্যবসিত হতো। সেটা এড়াতে চেয়েছি। চীনের প্রসঙ্গে আমাদের আগ্রহ এমাথা-ওমাথা। একমাথায় আওয়ামি-সিপিবি তো আর এক মাথায় চীনা কমিউনিষ্টরা। আমি আমাদের সবার মনের কিছু প্রশ্নের উত্তর দেবার সুযোগে নিতে চেষ্টা করেছি। এতে আরও প্রশ্নের উত্তর খুজার তাগিদ তৈরি হবে জানি। সামর্থ অনুযায়ী এর চেষ্টা অব্যহত রাখব, তবে পাঠকের সাড়া দেবার উপরেও অনেক কিছু নির্ভর করে।
এখানে যেমন অপ্রত্যক্ষে স্বাধীনতা পূর্ব চীন, চীনপন্থি কমিউনিষ্টদের ভুমিকার একটা আলোচনা চলে এসেছে তেমনি ওটার ধারাবাহিকতা মেনে যুদ্ধোত্তর কালের ভূমিকা নিয়ে প্রত্যক্ষভাবে এর পরে কিছু বলার চেষ্টা করব। আপনার প্রতিক্রিয়ায় এই উৎসাহটা অনুভব করছি।
আমার এই লেখাটার একটা বড় সীমাবদ্ধতা হলো, বিপ্লবের পর রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখার সমস্যা, অন্য রাষ্ট্রকে ব্যবহার করা - এসব প্রশ্ন সঙ্কট যেন কেবল কমিউনিষ্টদের সমস্যা - এমন একটা একপেশে ধারণা দিয়ে ফেলেছি। কথাটা সত্যি বলে মনে না করলেও অনিচ্ছাকৃত একটা ধারণা দিয়ে ফেলেছি। এটা কাটাতে অকমিউনিষ্ট বিপ্লবের একটা উদাহরণ (ইরানী বিপ্লবের) পাশাপাশি রেখে ভবিষ্যতে আলোচনা তুলার ইচ্ছা আছে।
ঘোর-কলিযুগ বলেছেন:
হুমম...
লেখক বলেছেন: হুমমমমমম.....।
সুমন রহমান বলেছেন:
চীন কেন মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে সমর্থন করে নাই সে বিষয়ে পি মুন্সী যা লিখেছেন তা মোটামুটিভাবে বাংলাদেশে এসম্পর্কিত বিদ্যমান সাধারণ মতটিরই প্রতিফলন। নতুনত্ব এসেছে তথ্যের প্রজেকশনে। ফলে গ্লোবাল পারস্পেক্টিভ থেকে জিনিসটা ধরা যায়। তাঁর ব্যবহৃত প্রায়-সব উপাত্তই মোটামুটি নির্ভরযোগ্য এবং প্রমাণযোগ্য সূত্র থেকে নেয়া, আমার এমন মনে হয়েছে। শুধু নিম্নোক্ত বক্তব্যের ব্যাপারে আমি সূত্র নিশ্চিত হতে চাই। এদেশীয় চীনপন্থী কমিউনিষ্ট পার্টিপ্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন:"আসলে দল সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঠিকই কিন্তু কেন নিয়েছে, কে নিয়েছে - তা মাঠের সাথে জনগোষ্ঠির উপস্হিত মেজাজের সাথে যে সামজ্ঞস্য নাই - তা কর্মী নেতা সবাই বুঝতে পারছিলেন। কিন্তু কিছু করার নাই, দলের এক গায়েবি সিদ্ধান্তের জ্বালে সবাই আটকা। সোজা কথায় আসলে, একটা নৈতিক বিপর্যয়ের ঝড় বয়ে গিয়েছিল সবার উপর দিয়ে। ফলে এথেকে বের হতে সবাই যেন মনে মনে অপ্রত্যক্ষে চাইছিল গণআকাঙ্খাটার যেন মৃত্যু না হয়, শেখ মুজিবের মাধ্যমে হলেও যেন এটা একটা পরিণতি পায়।"
- মুক্তিযুদ্ধ বা অসহযোগ নিয়ে এদেশীয় চীনা কমিউনিস্ট পার্টির এ হেন নৈতিক পীড়ন যে ঘটেছিল, এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য এবং প্রমাণযোগ্য তথ্যসূত্র কি?
লেখক বলেছেন: আসলে, তথ্যসূত্র প্রমাণ পিছনে রেখে, ওর বরাতে আপনার উদ্ধৃত বাক্য অংশ তৈরি করি নাই। এই ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ উপস্হাপন করেছি ঐ সময়ের বাস্তবতাকে অবজেকটিভলি গ্রেফতার করে আর, এক ধরণের পরিপার্শ্বিক প্রমাণ (circumferencial evidence) এর উপর ভিত্তি করে। তথ্যসূত্র জোগাড় করে আরও সরাসরি বলতে পারলে আমার ভালো লাগত। প্রত্যক্ষ্ তথ্যসূত্র মানে কমিউনিষ্ট পার্টি বা ভাসানী ন্যাপের সিদ্ধান্তের কোন কপি জোগাড় এখন কঠিন হলেও চেষ্টা করছি। আশা করি পেয়ে যাব। তার আগে আপাতত, এই বাক্যগুলো দিয়ে অবজেকটিভলি আমরা ইতোমধ্যে যেভাবে দেখতে পেয়েছি এদিক থেকে বলতে হয়েছে। পাঠককেও এদিক থেকে নজর করতে অনুরোধ করব। পরিপার্শ্বিক প্রমাণ বলতে যা বুঝিয়েছি যেমন, উনসত্তরের গণআন্দোলন একটা প্রথম পরিণতি লাভ করছিল গণঅভ্যুত্থানে, এবং ফ্যাক্টস হলো সবাই জানি, এটা একটা জয়েন্ট আন্দোলন ছিল, একক কোন পার্টি বা ছাত্র সংগঠন তা সংগঠিত করেনি বা হয়নি। গণঅভ্যুত্থানে পরাজয় মেনে আয়ুব খান ক্ষমতা হস্তান্তরে প্রকাশ্য ঘোষণায় রাজি হয়েছিলেন। এরপর মোডালিটি বা কিভাবে কোন পদ্ধতিতে (এটাই পরে LFO নামে হাজির হয়েছিল, পপুলারলি যা গোলটেবিল বৈঠক নামে পরিচিত) ক্ষমতা হস্তান্তর হবে তাই নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি। এইবার আমরা দেখছিলাম একটা রাজনৈতিক ধারা - অর্থাৎ শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে চলমান মামলা, পুরো অভিযোগ প্রত্যাহার করে তাঁকে মুক্তি দেয়া হচ্ছে। শেখ মুজিব গোলটেবিল আলোচনায় যোগদানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অপরদিকে ভাসানীর নেতৃত্বে অপর রাজনৈতিক ধারা এই সিদ্ধান্তের সম্পূর্ণ বিপরীত গোলটেবিল আলোচনা সম্পূর্ণ বর্জনের ডাক দিচ্ছেন। এখন এই ঘটনার সবচেয়ে ইনটারেষ্টিং অংশ হলো যে, রাজনৈতিক ধারা দুটো একসাথে মিলে গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত করেছে ঠিকই কিন্তু পরবর্তী করণীয় প্রশ্নে তাদের সিদ্ধান্ত পরস্পরের সম্পূর্ণ বিপরীত। আবার এই বৈপরীত্য সত্ত্বেও পরস্পরের প্রতি তাঁদের মনোভাব ভাব-ভালোবাসার। অথচ স্বাভাবিক ছিল প্রকাশ্যে এবং কঠোর বিরোধীতা, হয়তো রাস্তায় বিপরীত শো ডাউন, মারামারির। কিন্তু আমরা দেখেছিলাম একেবারে এ্যমিকেবল - গোলটেবিল আলোচনায় অংশগ্রহণে যাবার পথে প্রকাশ্যে শেখ মুজিব ভাসানীর সাথে দেখা করে তারপর যাচ্ছেন। আর ভাসানীও তাঁকে জনগণের পক্ষ থেকে যেন মুরুব্বী হিসাবে আমাদের সমাজ সংস্কৃতি মানার ঢঙয়ে শেখ মুজিবের সফলতা কামনায় প্রাণভরে দোয়া করছেন। কেন? কেন এই ইউনিক ঘটনা আমরা দেখেছি?
ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় সেসময়ের কমিউনিষ্ট নেতা কর্মী এখনও যারা বেঁচে আছেন, তাঁরা বলছেন, "শ্রেণী সংগ্রাম সংগঠিত করে পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপ" নেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল চীনাপন্থি কমিউনিষ্ট পার্টিগুলো। পার্টি 'গুলো' বলছি এজন্য যে প্রকাশ্যে ভাসানী ন্যাপের অধীনে গোপন কমিউনিষ্ট পার্টিগুলো ইতোমধ্যে উপধারায় বিভক্ত হতে শুরু করেছিল। তো তাই যদি হয় তাহলে ভাসানী ন্যাপের শুধু গোলটেবিল বর্জনের ডাক তো কোন কর্মসূচী হতে পারে না, "শ্রেণী সংগ্রাম সংগঠিত করে" গণঅভ্যুত্থানে না থেমে আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে নেয়া সক্রিয় কর্মসূচীতে মাঠে তৎপর থাকতে আমরা দেখতাম। কিন্তু আমরা তো আমরা তা দেখিনি!
১৯৮৪-৮৫ সালের দিকের কথা, আমার সুযোগ হয়েছিল মোহাম্মদ তোয়াহার একটা সাক্ষাৎকার নেবার। ওখানে আলাপচারিতায় ১৯৭১ এর আগেপরের অনেক ঘটনায় তাঁর ভাষ্য জানতে পেরেছিলাম। যদিও ঐ সাক্ষাৎকারের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন; অনেকেই হয়ত জানেন না, তোয়াহা ও তাজউদ্দিন ছাত্র অবস্হায় অবিভক্ত ভারতের কলকাতায় সহপাঠী ও গভীর বন্ধু ছিলেন, একসাথে মুসলিম লীগ করতেন, কমিউনিষ্ট প্রভাবাধীন অংশের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ১৯৪৭ এর দেশভাগের পর তাজউদ্দিন শেখ মুজিবের সাথে আওয়ামী মুসলিম লীগে চলে আসেন আর, তোয়াহা সক্রিয়ভাবে কমিউনিষ্ট পার্টির সাথে জড়িয়ে পড়েন। তাসত্ত্বেও তাদের ব্যক্তিগত বন্ধুত্ত্ব অটুট থাকে। ১৯৭১ সালের আগে ও পরেও, ১৯৭২ সাল পর্যন্ত বহু রাজনৈতিক গুরুত্ত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া তাজউদ্দিন ও শেখ মুজিব রাজনৈতিক ভিন্নতা সত্ত্বেও তোয়াহা সাথে শেয়ার করছেন বলে তোয়াহা আমাকে জানিয়েছিলেন। অথচ এগুলোর কোনটাই বর্জনের ডাকের সাথে, "শ্রেণী সংগ্রাম সংগঠিত করে পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপ" নেবার সিদ্ধান্তের সাথে সামজ্ঞস্যপূর্ণ নয়।
এই অবস্হাটার বর্ণনা করতেই আমি নিজের ভাষা ব্যবহার করে পরিস্হিতি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি মাত্র। ভাসানী ন্যাপ বা কমিউনিষ্ট পার্টিগুলো তাদের গৃহীত সিদ্ধান্তের বিপরীত আচরণ পদক্ষেপ দিয়ে প্রকান্তরে প্রমাণ করছে তাদের সিদ্ধান্ত ভুল। কিন্তু কেউই কাগুজে সিদ্ধান্ত বদলাবার বা একে ভুল বলার বা শুধরে নেবার কোন উদ্যোগ দেখানো - অতদূর যেতে পারেনি। প্রত্যেকে এমন আচরণ করেছে যেন সিদ্ধান্তটা সে নেয়নি, অন্য কেউ, কে সে - এএক গায়েবি অবস্হা বিরাজ করেছিল তখন। এই দিকটাই আমি তুলে ধরতে চেয়েছি, আপাতত।
এই বিষয়ে আমার বলবার আরও অনেক কিছুই বাকি রয়ে গেছে। কিছু ডকুমেন্টের পাবার চেষ্টা ও অপেক্ষায় আছি। গোলটেবিল বা নির্বাচন বর্জনের ডাক দিয়ে যেমন একবার চীন রাষ্ট্রের স্বার্থে আমরা বলি হয়েছি ঠিক তেমনি ১৯৭২ সালে স্বাধীনতার পর আর একবার চীন রাষ্ট্রের স্বার্থে আমরা বলি হয়েছিলাম - সেকথা আর এক সময় বলব।
একটা ভিন্ন প্রসঙ্গ: আপনি বলেছেন, আমার এই লেখাটা "বাংলাদেশে এসম্পর্কিত বিদ্যমান সাধারণ মতটিরই প্রতিফলন। নতুনত্ব এসেছে তথ্যের প্রজেকশনে"। আমার মনে হচ্ছে, এতে লেখাটা আপনার কাছে এর যথাযথ গুরুত্ত্ব পায়নি। যে কোন কারণেই হোক আমি আপনার মত সিরিয়াস পাঠকদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছি। আমার বলবার প্রসঙ্গ কিন্তু চীন নয়, রাষ্ট্র নিয়ে তত্ত্ব ও ভাবনা - রাষ্ট্র ভাবনা আমার বিষয়। প্রশ্নটা পপুলার ঢংয়ে পাঠক-আকর্ষণীয় করতে চীনের প্রসঙ্গ শিরোনামে উল্লেখ করেছি। আপনার প্রতিক্রিয়া থেকে মনে হচ্ছে সেদিকে সিরিয়াস পাঠকদের নজর নিতে আমি ব্যর্থ হতে যাচ্ছি। সে যাই হোক, আমি আপনাকে অনুরোধ করব একটা রাষ্ট্র ভাবনা সংক্রান্ত কিছু পড়ছেন, চীন প্রসঙ্গ নয় - এই বিবেচনা করে আর একবার লেখাটা পড়ে দেখবেন। আমাকে জানিয়ে বাধিত করবেন।
সুমন রহমান বলেছেন:
না না... "বিদ্যমান সাধারণ মত" বলে আমি এই লেখাটির ওজনকে খাটো করতে চাই নি। আমার বলার বিষয় হল.... এমনকি সাধারণের মাঝে এতদসম্পর্কিত যে কাহিনীটা কনস্পিরেসি থিওরি আকারে বিদ্যমান (থিওরি, কিন্তু প্রমাণ-উপাত্তহীন) তাকে আপনি আপনার মুন্সীয়ানাসহ যথেষ্ট কনভিন্সিং কায়দায় হাজির করেছেন। এটা আমার কাছে সদর্থক বলেই একথা লিখেছিলাম, বলার ধরনে হয়ত অন্যরকম মানে দাঁড়িয়ে গেছে।রাষ্ট্রভাবনার জায়গা থেকে এমন করে দেখার মধ্যে নভেল্টি আছে। আমার তাই ধারণা, যদিও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে আমার অজ্ঞতা সীমাহীন।
তবে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে চীনপন্থী কমিউনিস্টদের ভূমিকা এবং এতদসংক্রান্ত প্রচলিত মতটিকে আপনি যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তা নিঃসন্দেহে অভিনব। এই জায়গাটি আরো পোক্ত হতে পারে যদি আমরা সেসময়ের চীনা কমিউনিস্টদের নৈতিক পীড়ন বা একাত্মতা/ভিন্নতাবোধের জায়গাগুলোকে তথ্যউপাত্তসহ সনাক্ত করতে সক্ষম হই। এই প্রণোদনা থেকেই মন্তব্যটি করেছিলাম। আপনি এ সম্পর্কিত প্রমাণাদির সন্ধানে আছেন শুনে খু্বই ভালো লাগল। একটা উপন্যাসের বিষয় হতে পারে কিন্তু!
লেখক বলেছেন: রাষ্ট্রবিজ্ঞানর উপর এত ভরসা করেন না। নিজেই মানুষ ও তাঁর সমাজ বুঝতে চেষ্টা করুন - কোন অজ্ঞতাই থাকবে না।
লেখক বলেছেন: আপনার মন্তব্য দেখে, ভাবাতে পেরে আমারও ভালো লেগেছে।
ভুডুল বলেছেন:
অসাধারণ বিশ্লেষন
লেখক বলেছেন: ভাল। ধন্যবাদ।
সামিউর বলেছেন:
হুম পড়লাম পুরাটা।
লেখক বলেছেন: খুব ভাল কথা। খুশি হলাম। এখন কাজে লাগান।
লেখক বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ নাজনীন১।
আপনি কষ্ট করে এত পুরানো লেখা খুজে বের করে পড়েছেন। ভাল লাগল।
আপনি খেয়াল করলে দেখবেন এখানে আমার বেশির ভাগ পোষ্টেরই বিষয় রাষ্ট্র -পরোক্ষে বা প্রত্যক্ষে - কখনও শিরোনামে টা আছে কখনও নাই, ইচ্ছা করেই রাখিনি।
সত্যি কথা বলতে কী এই লেখাটা প্রথম লিখেছিলাম ক্লাসিক অর্থে "রাষ্ট্রচিন্তা" বা "রাষ্ট্রতত্ত্ব" প্রসঙ্গে। কিন্তু কোথাও পোষ্ট করি নাই, কেবল আমার এক বন্ধুর অন্য কাজে সহায়তা করার জন্য ইংরাজীতে লিখেছিলাম। পরে ওটাকে আবার বাংলায় লেখার সময় সামহয়ারে প্রথম পোষ্ট করার কথা মাথায় আসে। কিন্তু লিখতে লিখতে টের পেলাম সামহয়ারের বাংলা পাঠকরা হয়ত তত্ত্বের ভার বলে পছন্দ করবে না। তখন উপস্হাপনের স্টাইল বদলে চীনের প্রসঙ্গটা প্রথমেই নিয়ে আসলাম। কারণ পাঠক এভাবেই প্রসঙ্গে প্রবেশ করতে পছন্দ করবে, লিজের অভিজ্ঞতার সাথে মিলাতে পারবে। আবার, পরে কখন ভারী প্রসঙ্গে এসে পড়েছে টের পাবে না। এজন্য শিরোনামটা আকৃষ্ট করার মত সুযোগও পেলাম। পরে ইংরাজিটাও পোষ্ট করেছি, এখন এখানে পাবেন, http://pmunshe.wordpress.com/
সেই একই কারণে, বেশির ভাগ পোষ্টই রাষ্ট্র প্রসঙ্গে হলেও পাঠককে প্রসঙ্গে প্রবেশে আকৃষ্ট করতে রাষ্ট্র প্রসঙ্গকে পিছনে রেখেছি সামনে বা শিরোনামে আনিনি।
এখন আমার মনে প্রশ্ন যখন এসেছে এর নিশ্চয় একটা মানে আছে। কী ভেবে, আপনার এই কথা মাথায় আসলো তা এখন ভেবে, সেই এক্সপেক্টেশনটা যদি আমার সাথে শেয়ার করতে পারেন তবে আমি সেদিকটা বা প্রসঙ্গ খেয়াল রেখে পরবর্তী কোন পোষ্টে তা আনবে। ভালো থাকবেন।
ত্রিভুজ বলেছেন:
একাত্তরে আমেরিকা কেন আমাদের সমর্থন করতে পারে নাই' শিরোনামে একটা সিরিজ করতে পারেন...একাত্তরে বাঙালীর একটা অংশ কেন পাকিস্তানকে সমর্থন করেছিলো এটা নিয়েও লিখতে পারেন...
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ ত্রিভুজ।
দেখি কী করতে পারি।
এ ব্যাপারে কি এখন আগানো যায়?
বা,
৫ নং-এ মাহবুব লীনেনের কমেন্টের জবাবে, ......এখানে যেমন অপ্রত্যক্ষে স্বাধীনতা পূর্ব চীন, চীনপন্থি কমিউনিষ্টদের ভুমিকার একটা আলোচনা চলে এসেছে তেমনি ওটার ধারাবাহিকতা মেনে যুদ্ধোত্তর কালের ভূমিকা নিয়ে প্রত্যক্ষভাবে এর পরে কিছু বলার চেষ্টা করব। আপনার প্রতিক্রিয়ায় এই উৎসাহটা অনুভব করছি।.........
এ ব্যাপারে আগানো।
আর গণঅভ্যুত্থানের পরে রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটা ক্রসিং টের পাওয়া যাচ্ছে, ভাসানী পিছিয়ে আসলেন বা থেমে গেলেন, শেখ মুজিব এগিয়ে গেলেন (নাকি ভাসানী, শেখ মুজিব দুইজনেই প্যারালাল ছিলেন? কার বেশি জনসমর্থন ছিল বা প্রভাব ছিল?), পরবর্তীতে ভাসানী নির্বাচন থেকেও সরে গেলেন (যদিও সেটা নাকি ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী ত্রাণকাজে অংশগ্রহণের জন্য ছিল), পাকিস্তানের শাসকদের উপর চীনের প্রভাব ছিল, আবার ভাসানী চীনাপন্থী ছিলেন বা তিনিও ব্যবহৃত হয়েছেন, পরবর্তীতে তার তো তাহলে স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকাই থাকবার কথা, নাকি এখানেও কোন ফাঁক আছে, ভাসানী কি প্রতারিত হয়েছিলেন? নাকি চীনাপন্থী কমিউনিস্টরা স্বাধীনতা পেতে চায়নি, নাকি রাশিয়া জড়িয়েছিল বলে চীনাপন্থীরা অভিমান করলো, নাকি তাদের স্বাধীনতা পাবার উদ্দেশ্য ভিন্নরকম ছিল? (আপনি উপরে যেমন বললেন শ্রেণীসংগ্রামভিত্তিক আন্দোলন......)
এ ব্যাপারে ......
আবার আপনি ইরানী বিপ্লবের কথাও আলোচনা করতে চেয়েছিলেন.........
আপনার এ পোস্টে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রতত্ত্বই আলোচনা হিসেবে এসেছে। সেটা বুঝেছি। তবে আমার কাছে তত্ত্ব যেমন ভাল লাগে, প্রায়োগিক ব্যাপারটাতেও সমানভাবে আগ্রহী, ফলাফল দেখতে আরো বেশি কৌতুহলী। উপরে যে অনুরোধগুলো করলাম তাতে হয়তো আপনার এ পোস্টের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে, তবুও আপনি আপনার মতো করেই লিখেন, কোন সমস্যা নেই।
লেখক বলেছেন: আপনি সত্যিই আমার লেখার মনোযোগী পাঠক।
জবাব দিতে দেরি হলো, সরি। নেটে আসতে পারি নাই, ব্যক্তিগত ঝামেলায়।
আপনার পরামর্শগুলো মনে রাখব। কী করতে পারি চিন্তা করব।
দাসত্ব বলেছেন:
আমার এই পোস্টটিতে কি একটু আসবেন ?মডুরা আমার এই পোস্ট পাবলিশ করে নাই ।
Click This Link
সামহোয়্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...















