মেয়েরা কেন চলে যায়?
২৪ শে জানুয়ারি, ২০০৮ সকাল ১০:১৭
গত নভেম্বরে মাহবুবা আখতার ভালবাসা: মেয়েরা কেমন চায় আর ছেলেরা যেমন হয় এই শিরোনামে কিছু কথা লিখেছিলেন, যা ব্যাপক হিট করেছিল। সরল গদ্যে বলা তাঁর কথাগুলোর সাথে আমি কম বেশী একমত।
কিন্তু খুব কাছ থেকে দেখা ছেলে এবং মেয়ের মধ্যকার সম্পর্কের কিছু ঘটনা আমাকে এই লেখায় প্ররোচিত করেছে। একে কোন গবেষণা পত্রের কেস স্টাডি ভেবে ভুল না করাই শ্রেয়।
এক
জিসান সমাজ কল্যানে পড়তো। বাংলা সিনেমার নায়কের মত নয়, সত্যি সত্যিই জিসান ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হওয়ার লাইনে ছিল শেষ পর্যন্ত সেকেন্ড হলেও। একসময় হলে আমার রুমমেট ছিল জিসান। ওরই ইয়ারমেট, ফোর্থ হওয়া ফারাহ ছিল ওর গার্লফ্রেন্ড। দুজনের সাথেই আমার বন্ধুত্ব। মগ বাজারে আমার পার্ট টাইম চাকুরী থেকে রোকেয়া হলের সামনে দিয়ে হলে ফেরার সময় চোখে পড়লে রিকশা থামিয়ে আমিও বসে পড়তাম ওদের সাথে। ওদের আনন্দময় খুনসুটি দেখে মাঝে মাঝে আমারও মনে হতো, এমন একটা মায়াবতী পাশে থাকলে খারাপ হতোনা।
অনার্সের রেজাল্টের পর এমনিতেই জিসান একটু বিমর্ষ। কিছুদিন বিরতির পর হঠাৎ একদিন জিসানকে দেখে রবিন্দ্রনাথের সেই ওলাওঠা ব্যামোর কথা মনে হল। আমি পুরো আঁতকে উঠলাম, একি দশা হয়েছে জিসানের? বললোনা কিছুই। জিসানের রুমমেট রাজুকে ধরলাম, ব্যাপারটা কি?
জানলাম, ফারাহ বিয়ে করে ফেলেছে এক ডাক্তারকে। আমাদের সমাজে মেয়েদের নিরাপত্তাবোধের যে অভাব, তাতে এরকম হতেই পারে, কিন্তু আমি অবাক হয়েছি আরেকটি তথ্যে, বিয়ের আগে নাকি ফারাহ বানী দিয়ে গেছে- জিসানের যা একদিন হবে, তাতো আমি এখনই পাচ্ছি.... আমার সাথে ফারাহ’র আর যোগাযোগ হয়নি, আমি তার কাছ থেকে শুনতে পারিনি, সে সত্যিই এই কথা বলে গেছে কিনা, তবু চলে গেছে এটাই সত্যি।
কিছুদিন আগে জিসানের সাথে দেখা, সেই চুপ চাপ মেধাবী ভাল ছেলে জিসান বিরতিহীন কথা বলছে মোবাইল ফোনে। ও প্রতিজ্ঞা করেছে এক এক করে একশ মেয়ের মনে কষ্ট দেবে।
দুই
আলমের সাথে নিপুর সম্পর্কের প্রথম দিকে আলম কিছু ঘুমের বড়ি নিয়ে একদিন মুকুলের রুমে এসেছিল। নিপু ওকে রিফ্যুজ করেছে, ও নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারছেনা। মুকুল ওকে টোয়েন্টি ফোর আওয়ারের ফ্রি কন্সালটেন্সী দিয়ে দিয়ে ফিরিয়ে আনে। পরে আলমের সাথে নিপুর সম্পর্কটা হয়েছিল। এবং সেটা এমনই যে, আমাদের বন্ধুদের কোন প্রোগ্রামেই ওরা থাকতোনা, ওদের নিজস্ব সময় নষ্ট হবে বলে।
আলমের পারিবারিক যে অবস্থান, তাতে প্রেম করে বিয়ে পর্যন্ত পৌঁছুনোর চিন্তা করাটা একধরণের ভ্রান্তি বিলাস। তবুও কমিটমেন্ট আর ইচ্ছাশক্তির বলে আলম সেসব জয় করেছিল। আলম এগিয়ে যাচ্ছিল নিশ্চিত লক্ষ্যে। ২৬ তম বিসিএস-এ প্রথমবারেই আলম ভাইভা দিয়ে এসেছিল আমাদের মধ্যে সবার আগে।
মাস্টার্স পরিক্ষা যেদিন শেষ হল, তার পরদিন রাত দুটোর দিকে আলম আবার ঘুমের ওষুধ নিয়ে মুকুলের রুমে হাজির, চোখ লাল।
নিপু আজ সন্ধ্যায় পটুয়াখালী চলে যাবার আগে বলে গেছে, সে আর আলমের সাথে যোগাযোগ রাখতে চায়না।
তিন
জারিফ আর মুনা ল'য়ে পড়তো। ইন্টারে পড়াবস্থায়ই জারিফ তার জেলায় ছাত্রলীগের সেক্রেটারী ছিল, জনকণ্ঠ এবং আরো দুটো পত্রিকার জেলা সংবাদদাতা ছিল। সেই জারিফ ফার্স্ট ইয়ারেই মুনাকে দেখে এমন গাড্ডার মধ্যে পড়লো, কোথায় গেল জারিফের সাংবাদিকতা আর কোথায় গেল সেই সংগ্রামী জারিফ!
আমাদের সময়ে, মানে ৯৮ থেকে ২০০৪ এ অনার্স দেওয়া পর্যন্ত মৈত্রী হল এলাকায় জারিফ মুনার প্রেম কিংবদন্তীর পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল।
জারিফের দৈন্দন্দিন রুটিন ছিল, সকালে হল থেকে বেরিয়ে মৈত্রী হল থেকে মুনাকে নিয়ে এনেক্স বিল্ডিংএ ক্লাশে যাওয়া, তারপর ক্লাশ থেকে বের হয়ে টিএসসিতে দুপুরের খাবার খাওয়া এবং বিকেলে মৈত্রী হলের সামনে চলে যাওয়া, সবশেষে দশটায় হলগেট বন্ধ হলে মুনার দেওয়া টিফিন বক্স হাতে হলে ফিরে আসা। এই সময়কালে ওদের একাকী কেউ দেখেছে কিনা বল মুশকিল।
অনার্সের পরপরই জারিফ একা হয়ে গেল। আগে মুনা থাকায় জারিফ কোনদিন অন্য কোন বন্ধুর প্রয়োজন মনে করেনি বা অন্যরাও বন্ধুত্ব করতে আগ্রহী হয়নি। পুরো হলে আমার সাথেই জারিফের যা যোগাযোগ, আমার চার রুম পরেই থাকতো ও।
কোন এক অদ্ভুত কারনে জারিফ আমাকে পছন্দ করতো। মুনা যেদিন স্পেশাল কোন মেনু দিত, জারিফ আমাকে ডেকে নিয়ে খাওয়াতো, আমাকে বলতো ওদের নিজেদের কথাগুলো। সেই সুত্রে জারিফ যখন একা হয়ে গেল, তার সময়গুলো আমার রুমেই ব্যয় হতে লাগলো বেশী। আমি জানলাম, এক তরুণ শিক্ষকের সাথে মুনা ইউকে চলে গেছে।.....
তারপব জারিফ জীবন সংগ্রামে নেমে গেছে, এবং সফল হয়েছে। জারিফ এখন এইচ এস বি সির বড় কর্মকর্তা। গতকাল ওর অফিসের পাশ দিয়ে একটা কাজে যাওয়ার সময় ঢু মারলাম। সেই আরিফ আর নেই। প্রেমিক জারিফ শরীর থেকে ছাত্রত্বর গন্ধ ঝেড়ে ফেলে পুরোপুরি পেশাদার। বিয়ে করে সুখে আছে, প্রাণ প্রাচুর্যে ভরপুর, গাড়ি কিনবে শিঘ্রই, ফ্ল্যাট বুকিং দিয়েছে। আমাকে বলে, বিয়ে করে ফেল.... ধুর মিয়া.... সব ঠিক হয়ে যাবে......
আমি বললাম, জারিফ মুনার কথা মনে পড়ে..............?
এক নিমিষেই জারিফের মুখের হাসি নিভে গেল।
আর ভাল্লাগছেনা, লিখলে শুধু বাড়তেই থাকবে তালিকা, শেষ হবেনা। আমি যেটা বলতে চেয়েছিলাম, আমার এই বন্ধুদের মধ্যে কি ভবিষ্যৎ ছিলনা কোন? সবাই তো এখন ভালো ক্যারিয়ার নিয়েই আছে, তাহলে মেয়েগুলো কেন এভাবে কষ্ট দিয়ে ভেঙ্ েচুরে দেয় ছেলেদেরকে?
নোটসঃ
সংগত কারনেই নামগুলো বদলে দেয়া, তবে সব ঘটনাই সত্যি।
এই আমি মীরা বলেছেন:
দুঃখজনক। যা কখনও সম্ভব না, জেনে শুনে সেটাতে যাওয়ার মানে হয় না। পুরানো ডায়ালোগ ছাড়ি: সব ছেলেরা যেমন এক না, সব মেয়েরাও নিশ্চয় এক হতে পারে না।
পদ্ম পুকুর বলেছেন:
সত্যি কথা, আমি একদিক দেখেছি ঘটনার। অন্যদিকটা দেখার সুযোগ ছিলনা আর।তবে এর বিপরীত উচ্চারণও আমার জানা আছে, সেটা আরেকদিন বলব। লুবনার কমিটমেন্ট দেখে আমি আভিভূত।
ভাল থাকবেন সবাই।
বিবর্তনবাদী বলেছেন:
আর কয়েক মাস পর চার নম্বর ঘটনাটা আমিই লিখে দেব।
কম্পোজিশান বলেছেন:
লুবনার অপেক্ষায় আমি...তবে এই চলে যাওয়ার সাথে আমাদের সামাজিক ব্যবস্থাটাই অনেকাংশে দায়ী।
জ্বিনের বাদশা বলেছেন:
আপনার লেখার হাত ভাল ... চালিয়ে যান
মাহবুবা আখতার বলেছেন:
প্রথমে লেখার ভাষা ভাল লেগেছে বলে + দিয়েছি জানিয়ে রাখি।তারপরের কথা হল সেই পুরনো কথা- সব মানুষ এক হয় না।
আপনি ছেলে, ছেলেদের সাথে মিশেছেন বেশি, তাদের জেনেছেন বেশি।
আমি মেয়ে, আমি মেয়েদের দেখেছি বেশি এবং জেনেওছি বেশি।
আমার খুব ক্লোজ কয়েকজনকে আমি আমার চোখের সামনে প্রতারিত হতে দেখেছি। এই প্রতারণাগুলো কিন্তু কিছু পুরুষই করেছে।
আবার এমন মেয়েকেও দেখেছি যারা ছেলে ঘুরাতে ভালবাসে।
আমার চোখে কিন্তু প্রতারক ছেলেই বেশি পড়েছে (হয়ত এজন্য যে আমি মেয়েদের বেশি দেখেছি, ছেলেদের কম।)
আপনার অভিজ্ঞতার উপরে তেমন কিছু বলার নাই।
কেবল একটা কথা বলি, যে ছেলেটা ১০০টা মেয়েকে প্রতারিত করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার বিষয়টা এভাবে ভেবে দেখুন- এই ছেলেটা একটা মেয়ের কাছে ঠকে ১০০টা মেয়েকে ঠকাচ্ছে। ছেলেটা কি ভালো? কিংবা মানসিকভাবে সুস্থ্য?
আমার মনে হয় না।
যাই হোক, আমি আমার পরিচিত এক মেয়েকে দেখেছি যে ঠিক এই রকম একটা ছেলের সাথে সম্পর্ক গড়ে কষ্ট পেয়েছে। আমি কিন্তু মেয়েটার কষ্ট জানি। যে ছেলেটা শুধু কষ্ট দেয়ার জন্যই তার কাছে এসেছে, তাকেও তো সে ভালবেসেছিল!
ব্যাপারটা এমন, একটা মূদ্রার দু'টো পিঠ। আমরা সবাই একটা করে পিঠ দেখতে পাই সাধারণত।
আবারও, আপনার লেখার প্রশংসা করছি- লেখা ভালো হয়েছে।
অহনা বলেছেন:
আসলে কে কেমন এসব বিচার না করাই ভালো। আসুন আমরা সবাই আগে নিজেকে চিনি। আমরা সবাই কমবেশি স্বার্থপর, লোভী, এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী। যে কারণে ভালোবাসা আসে ভালাবাসা পালিয়ে যায়। ধন্যবাদ চমৎকার লেখার জন্য।
পদ্ম পুকুর বলেছেন:
আপনাদের কথাগুলোর সাথে আমি একমত। আমার ইচ্ছে ছিল ওই তিনটা ঘটনার সাথে আরো যে ঘটনাগুলো আমি দেখেছি, সেগুলো লিখব। সাথে সাথে আমার দুজন মেয়ে বন্ধুকে ফেলে যে ছেলে দুটি চলে গেছে, তাদের কথাও বলব, কিন্তু লিখতে লিখতে কেমন যেন হতাশা এসে যাচ্ছিল। তাই আর লিখতে ভাল্লাগলোনা।
তূর্য্য বলেছেন:
( অহনা বলেছেন: আসলে কে কেমন এসব বিচার না করাই ভালো। আসুন আমরা সবাই আগে নিজেকে চিনি। আমরা সবাই কমবেশি স্বার্থপর, লোভী, এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী। যে কারণে ভালোবাসা আসে ভালাবাসা পালিয়ে যায়। ধন্যবাদ চমৎকার লেখার জন্য।)একমত।
লেখাটা ভালো লেগেছে +
শয়তান বলেছেন:
কেমনাছেন ভাই ?
ধূমকেতু বলেছেন:
আমার নিজের দেখাও কম নয়! একটা মেয়েকে চিনতাম যে খুবই ভাল ছাত্রী, ক্যারিয়ার ওরিয়েন্টেড মেয়ে, সে ভালবাসার খাতিরে তার নিজের স্বপ্ন, বাবা-মার স্বপ্ন বিষর্যন দিতে পারবেনা। ছেলেটার কথাছিল, এসবতো বিয়ের পরেও হতে পারে, তার কথা হলো, বিয়ের পরে ভালবাসা বলে আর তেমন কিছু থাকেনা, আর শুধু ভালবাসা দিয়ে জীবন চলেনা, তাই---



















আপনার ভাষার গতিময়তা দেখে ভাল লাগলো....