আটাশিতে প্রথম যখন ঢাকা এসেছিলাম, আমি তখন থ্রিতে পড়ি মাত্র।
সোহাগ পরিবহনে সারারাতের জার্নি শেষে ভোরে এসে নেমেছিলাম গাবতলীতে। তারপর আলো ফুটতে ফুটতে আমরা যখন ঢাকাতে প্রবেশ করি, এক দূরন্ত কিশোরের অবাক চোখে তখন আমি দেখছিলাম স্বপ্নের এক শহর, অন্যরকম এক ঢাকাকে।
বেবিট্যাক্সিতে মানিক মিয়া পেরুনোর সময় আমার চোখে রাজ্যের বিস্ময় এঁকে দিয়েছিল ডিভাইডার বিহীন প্রশস্ত এই এভিনিউ। সেই সাত সকালেই পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা ঝাড়– দিয়ে পরিষ্কার করে ফেলেছিল পুরো রাস্তাটি। বাঁ পাশে ছিল নির্বিঘœ প্রবেশাধিকারের বিস্তৃত সবুজ মাঠ। তারও ওপাশে অনিন্দ্য সুন্দর সংসদ ভবন।
সেই আটাশিতে প্রায় তিন মাস ছিলাম ঢাকাতে। ঢাকা তখন আদতেই ‘ঢাকা’ ছিল। ছায়া ঢাকা, গাছে ঢাকা। ছিমছাম, নিরিবিলি আর পরিচ্ছন্ন একটা শহর।
ফার্মগেটের এখন যে পুরোনো ফুটওভারব্রিজ, আমি দেখেছিলাম ওখানে তখন বুনো পায়রার দল বাস করত। ডিম বাচ্চা ফোটাতো। বুনো পায়রার মত এরকম আরো অসংখ্য পাখিরা তখন ধানমন্ডি, শাহবাগ, ইউনিভার্সিটি এলাকা, রমনা, সোহরাওয়ার্দি, মিন্টো রোড, লালমাটিয়া, ইস্কাটন রোড এবং আরো আরো এলাকায় অভয়ারণ্য বানিয়ে নিয়েছিল।
এই পায়রার দলের সর্বশেষ প্রজন্মকে আমি ৯৫ এ স্থায়িভাবে ঢাকায় আসার পরও দেখেছি পিজির দক্ষিণ দিকের ভবনের কার্নিসে কার্নিসে। ছিল যাদুঘরের ব্যলকনিতেও। দল বেঁধে এরা আকাশে উড়ত শ‘য়ে, শ‘য়ে।
ঢাকার আকাশে সেই পাখিরা আর নেই। ছায়াঘেরা ঢাকাও নেই। তার যায়গায় এসেছে লাখ লাখ মানুষ। এই মানুষদের যায়গা করে দিতে আমরা এক এক করে গাছ কেটেছি, জলাশয় ভরাট করেছি, উঁচু উঁচু বিল্ডিং করে পরিবেশকে বিপন্ন করেছি, প্রয়োজনের অতিরিক্ত প্রযুক্তির আমদানি করে দূষণ বাড়িয়েছি। এভাবে শহরটাকে একটু একটু করে ধ্বংস করে দিয়েছি।
এখন ঢাকা আর কোন শহর না, একটা কংকাল।
কবি বুদ্ধদেব বসু ঢাকাকে বলেছিলেন উদ্যানের নগরী। সত্যিকারার্থেই ঢাকাতো উদ্যানের নগরীই ছিল। ১৬১০ সালে সুবেদার ইসলাম খাঁ ঢাকাকে রাজধানী করেই তখনকার ঢাকা নগরীকে প্রসারিত করার লক্ষ্যে ঢাকার উত্তরে রমনাকে ঘিরে নতুন এক উদ্যান নগরী তৈরী করেছিলেন। তারপর ১৮২৫ সালের দিকে ঢাকার বৃটিশ কালেকটর মি. ডৌজ শহরের উন্নয়নের লক্ষ্যে রমনা উদ্যানকে আরো প্রসারিত করার পাশপাশি এই এলাকায় কিছু প্রশাসনিক ভবনও নির্মাণ করেন। ১৯০৮ সালের দিকে এসে রমনাকে ঘিরে পরিকল্পিত একটি বাগান তৈরীর কাজ শুরু হয়। ঢাকার নবাবরা এ সময় দি রয়্যাল গার্ডেন বা শাহবাগ নির্মান করেন। শহর আরো প্রসারিত হতে থাকে।
তারপর সাতচল্লিশের পর এই রমনারই পূর্বদিকে কিছু নয়নাভিরাম ভবন তৈরী হয় সরকারী কাজে ব্যবহারের জন্য। এটা মিন্টো রোড। এভাবেই উদ্যানকে ঘিরেই শরীরে বেড়েছে ঢাকা শহর।
ঢাকাতো উদ্যানের নগরী হবেই। স্বাধীনতার পরেও এই ধারা অব্যহত ছিল। আমাদের ধানমন্ডি, কলাবাগান, তারপর গুলশান, বনানী, বারিধারা এসবগুলোই উদ্যান নগরীইতো ছিল।
বাট দোজ ডেইজ হ্যাভ পাস্ট!!!
পঁচানব্বুইয়ে যখন আবার ঢাকা এলাম, শাহবাগেই এক বাসায় থাকতাম। বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া আমার ভাইয়া তখন আমাকে একটা রেসিং সাইকেল কিনে দিয়ে বলেছিল সাইকেল নিয়ে একদিকে যেতে থাকবা, যখন পরিচিত রাস্তা দেখবা, তখন আবার ফিরে আসবা। এভাবে নিজে নিজেই ঢাকা চেন। আমি তখন মাত্র এসএসসি পরিক্ষা শেষ করেছি।
আজকের ঢাকাবাসীদের হয়ত বিশ্বাসই হবে না যে ঢাকা শহরে অপরিচিত ১৬ বছরের একটা ছেলেকে কেউ এভাবে ব্যস্ত রাস্তায় ছেড়ে দিতে পারে।
কিন্তু আমি এভাবেই ঢাকা চিনেছি। ঢাকার রাস্তা তখন ফাঁকাই থাকত। ট্রাফিক সিগন্যাল পড়লে সাকুল্যে আটটা দশটা গাড়ি হয়ত দাড়াত, তারপর সবুজ বাতি জ্বললেই আবার রাস্তা ফাঁকা।
সেই ফাঁকা রাস্তায় আমি একা একা বাইসাইকেল চালিয়ে চালিয়ে একেক দিন চলে গেছি মতিঝিল, ফার্মগেট ছাড়িয়ে আরো দূরে। মিরপুর, মোহাম্মদপুর তখনও পোড়ো এলাকা।
সেই পরিবেশবান্ধব, সুন্দর উদ্যানের শহর ঢাকাকে আমরা চিঁপে, নিংড়ে সবটুকু নির্যাস বের করে একেবারে ন্যাড়া করে ফেলেছি। আজকের ঢাকা একটা অসুন্দর, অনিরাপদ, অস্বাস্থ্যকর আর অসভ্য লোকেদের শহর।
ঠিকভাবে বসবাসের কোন নিয়ামকই নেই এখানে। যেটুকু বাকি আছে, ওটুকু রেখে আর কি হবে, আসুন সবাই মিলে ঢাকাকে ধ্বংস করে ফেলি।
ছবি পরিচিতি:
১. বর্তমানে দোয়েল চত্ত্বর হিসেবে পরিচিত রমনা গেট (১৯০১)
২. পুরানা পল্টন (১৮৭৫)
আসুন আমরা সবাই মিলে ঢাকা শহরটাকে ধ্বংস করি
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
১৭টি মন্তব্য ৪টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
রাসূলের (সা.) অনুসারি হবেন শুধুমাত্র সাহাবা (রা.), অন্যরা এবং ওলামা ওলামার অনুসারি হবেন

সূরাঃ ৩৫ ফাতির, ২৮ নং আয়াতের অনুবাদ-
২৮। এভাবে রং বেরং- এর মানুষ, জন্তু ও আন’আম রয়েছে। নিশ্চয়ই আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে (ওলামা) আলেমরাই তাঁকে ভয় করে।নিশ্চয়্ই আল্লাহ পরাক্রমশালী ক্ষমাশীল।
সূরা:... ...বাকিটুকু পড়ুন
রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন
দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল
দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

মানুষের জীবন মূলত অসংখ্য ছোট-বড় সিদ্ধান্তের সমষ্টি। প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি মোড়ে আমাদের কোনো না কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন
দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল
আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।