বাঙলায়ন : রহমান হেনরী
--------------------
জগতের প্রান্তসীমায়
--------------------
দুনিয়াটাকে মুক্ত করে দিলাম আর কারারুদ্ধ করলাম সাত আসমানকে। আলোর প্রতি বিশ্বস্ত থাকবো বলে লাফিয়ে নামলাম, দুনিয়াকে দ্ব্যর্থক, মনোমুগ্ধকর, পরিবর্তনীয় আর বিপজ্জনক করে তুলবো বলে; প্রচল- পদক্ষেপণের বাইরে নতুন এক পদযাত্রা ঘোষণা করবো বলে।
দেবতাদের টাটকা রক্তের দাগ এখনও লেগে আছে আমার জামা-কাপড়ে। একটা শঙ্খচিলের তীব্র আর্তনাদ প্রতিধ্বনি তুলে যাচ্ছে আমার কেতাবের পৃষ্ঠাগুলো জুড়ে। সমস্ত কবিতা বাক্সবন্দী করে এবার শুধু চলে যেতে দাও আমাকে।
----------------------------
নিউ ইয়র্কের সৎকার-গাথা
----------------------------
একটা নাশপাতি কিংবা স্তনের প্রতিবিম্বে আঁকো
দুনিয়াটার ছবি।
ওইসব ফল আর মৃত্যু, এ-দুয়ের মাঝখানে
ফুটে ওঠে, নির্মাণ শৈলীর দারূন এক চালাকি:
নিউ ইয়র্ক-
এর নাম দাও চারপেয়ে নগরী;
যখন নিমজ্জিত মানুষের আর্তনাদ
দূর থেকে ভেসে আসছে কানে, ঠিক সেই সময়ে,
খুনি-শিং বাগিয়ে সে-ও তেড়ে যাচ্ছে, ওদিকেই।
নিউ ইয়র্ক এক নারী-মানুষ
ইতিহাস বলছে, যার একহাতে,
ধরা আছে, স্বাধীনতা নামের ঝাণ্ডা
আর অন্য হাতে, সে-ই, টুঁটি চিপে ধরছে গোটা দুনিয়ার।
যখন ক্ষুধার্ত তুমি
শুধু বজ্রই তার দাঁতভাঙ্গা জবাব
যখন শৃঙ্খলিত তুমি
আকুল প্রতীক্ষায় থাকো ধ্বংস-যজ্ঞের।
আসুক এবার আমাদের পালা
জেগে উঠছে আমাদের কেতাবগুলো
আর এগুলো শুধুই ছাপার হরফ নয়
ভবিষ্যৎবাণী, ফলছে আর ফলছে।
স্বাধীনতার স্মারক মূর্তিগুলো ধূলিসাৎ হয়ে যাক
তাদের নির্জীব দেহগুলো ফুঁড়ে বেরিয়ে আসুক অগণিত নখ
প্রস্ফুটিত পুষ্পের প্রকারে।
একটা পুবালি-বাতাস, তার বলিষ্ঠ ডানায়
উপড়ে ফেলছে, ওইসব তাঁবু আর গগণচুম্বী দালানগুলি।
-------------
নতুন নিয়ম
------------
তোমাদের এ-ভাষায় কথা বলে না, সে।
চেনে না, নিষ্ফলা-পতিত ভূমিগুলোর কন্ঠস্বর-
পাথুরে ঘুমের কর্ণকুহরে আগাম-নিগুমের বয়ানকারী,
অনাগত-সুদূরের অজস্র ভাষায় ভরপুর তার কণ্ঠস্বর।
এখানে, এই ধ্বংসস্তূপতলে সে আসে
অভিনব শব্দাবলীর সুবাতাস বইয়ে দিতে,
সে, তার, ঘঁষামাজাহীন অথচ চকচকে পেতলের পাতের মত
কবিতাবলী, শুনিয়ে যাচ্ছে মর্মাহত বাতাসের কানে কানে।
মাস্তলে মাস্তলে অভাবনীয় স্ফুলিঙ্গ-উদ্ভাসনের মত সেই ভাষা,
অশ্রুতপূর্ব শব্দাবলীর নকীব, সে।
------------------------
সঙ্গীতসমূহের ছদ্মাবরণ
-----------------------
তার আপন ইতিহাসের নামে,
কাদার পাঁকে পুঁতে যাওয়া এক ভূখণ্ডে,
ক্ষুধা যখন গিলে খাচ্ছিলো তাকে
সে তখন, খেয়েছে ফেলেছে তার নিজেরই প্রশস্ত কপাল।
তারপর মরে গেছে।
বছরজুড়ে চক্রাবর্তিত ঋতুরা কিছুতেই খুঁজে পায় না, সেই মৃত্যুর কারণ।
সঙ্গীতসমূহের অন্তহীন ছদ্মাবরণের আড়ালে, মরেছে সে।
নিজস্ব আনুগত্যের একমাত্র বীজ,
নিঃসঙ্গ, সে, বাস করে- জীবনেরই অতলে, সমাহিত।
---------------------
পাপ-পূণ্যের ধারণা
---------------------
উত্তরাধিকার জ্বালিয়ে দিচ্ছি আমি, বলছি,
‘‘অপত্য-অক্ষত এ ভূমি, আমার যৌবনে, এখানে কোনই কবর ছিলো না।’’
ভগবান আর শয়তান উভয়কে ছাপিয়ে উঠে যাচ্ছি উর্ধে
(আমার চলার পথ ভগবান ও শয়তানের পথভুক্ত নয়)
আমি আমার কেতাবের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি,
হেঁটে যাচ্ছি, বজ্রের দীপ্তিময় শোভাযাত্রার ভেতর দিয়ে,
সবুজ বজ্রের দীপ্তিময় শোভাযাত্রার ভেতর দিয়ে
আর যেতে যেতে, চিৎকার করে বলছি:
‘‘আমার পর এখানে থাকবে না আর কোনও বেহেস্ত, স্বর্গচ্যূতিও না,’’
আর মুছে দিচ্ছি পাপ-পূণ্যের যাবতীয় ধারণা।
_______________________________________
[আদোনিস (১৯৩০) :
উচ্চারণভেদে আদুনিস।
সিরিয়ান-লেবানিজ কবি, সাহিত্য-সমালোচক, অনুবাদক ও সম্পাদক; আরব দুনিয়ায়, কবিতা ও সাহিত্য জগতে, এই সময়ে জীবিত কবিগণের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী। প্রকৃত নাম : অলি আহমাদ সা'য়িদ। রাজনৈতিক মতাদর্শের জন্য লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন, জেল খেটেছেন বেশ ক’বছর। ১৯৫৬ সালে জন্মভূমি ছেড়ে লেবাননে বসবাস শুরু করেছেন।
১৫টিরও অধিক গন্থের প্রণেতা আদোনিস, কবিতার জন্য, ইতোমধ্যেই, বর্নসন পুরস্কার(২০০৭) ও গেটে পুরস্কার(২০১১) অর্জন করেছেন; গ্রিফিন কবিতা পুরস্কার(২০১১) এর সম্ভাব্য প্রাপকগণের মূল-তালিকায় আছেন, আছেন সম্ভাব্য নোবেলজয়ের তালিকাতেও।]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



