বেড়াতে এসেও শান্তি নেই। মায়ের হুকুমে একগাদা বই ঠিকই সাথে করে নিয়ে আসতে হয়েছে। আমি এবার নবম শ্রেণীতে উঠলাম। ক্লাস এখনও শুরুই হয়নি। আম্মুর কথা হলো আমাকে আগেই অনেক পড়া করে নিতে হবে যেন বন্ধুদের থেকে এগিয়ে থাকতে পারি।
ফজর নামাজ শেষে মৌলভী সাহেব এলেন। আমার মামতো ভাই তারিক এবং রিফাতকে তিনি কুরআন পড়া শেখান। এখানে এসে আমিও ওদের সাথে কুরআন পড়তে বসি। আমার কুরআন পড়া শুদ্ধ হয় বলে মৌলভী সাহেব আমাকে খুব আদর করেন।
মৌলভী সাহেব চলে গেলে আমাদের সবাইকে বই নিয়ে বসতে হলো। তারিক বড় মামার ছেলে আর রিফাত মেঝ মামার ছেলে। ওরা দুজন সমবয়সি এবং আমার চেয়ে প্রায় দুবছরের ছোট। তারিক এবং রিফাত এবার ক্লাস সেভেনে উঠল। ভোর বেলা টিচার আসেননা। এসময় ওরা হোম ওয়ার্ক করে। টিচার আসেন সন্ধ্যায়।
তারিক দশমিকের অংক করছে। আমি ওকে অংক করতে সাহায্য করছি। এসময় ছোট মামা অর্থাত মন্টু মামা বই হাতে চোখ ডলতে ডলতে উপস্থিত হলেন। মামার চোখ ডলার কারন হলো তিনটি। প্রথম কারন হলো-মামা ফজরের নামাজে ওঠেননি। যার কারনে নানুভাই তাকে আচছা মতো ঝেড়েছেন। দ্বিতীয় কারন হলো-আম্মুর কাছে গিয়েছেন গণিত শিখতে, আম্মু তাকে পাঠিয়েছেন আমার কাছে। এটা মামার জন্য প্রেস্টিস মেটার। মেট্রিক ফোর্ত ইয়ারের একজন ছাত্রকে নাকি গণিত শিখতে হবে হবু নবম শ্রেণীর এক পুচকে ছোকরার কাছে! মামার কান্না পাচেছ। তোমাদেরকে বলে রাখা ভালো যে, মন্টু মামা তিন বার মেট্রিক ফেল করে এবার চতুর্থবারের জন্য প্র¯তুতি নিচেছন। এজন্য তার একাডেমিক স্ট্যাটাস হলো মেট্রিক ফোর্থ ইয়ার। আর আমি যেহেতু এখনো নবম শ্রেণীর ক্লাস শুরুই করিনি, তাই মামার কাছে আমি হবু নবম শ্রেণীর ছাত্র। থাক সে কথা। মামার চোখ ডলার তৃতীয় কারন হলো-এখনও তার তার চোখে ঘুম লেগে আছে।
মামা চুপচাপ টেবিলে এসে বসল।
‘ কেমন আছো মামা?’ আমি বললাম।
মামা জবাব দিলো না। অংক বই খুলল মামা।‘ আমাকে এই অংক গুলো বুঝিয়ে দে।’ মামা বলল।
মামার কথা শুনে তারিক রিফাত মুখ টিপে হাসতে শুরু করল। মন্টু মামা চোখ বড় করে ওদের দিকে তাকালো। এখনই হয়তো চড় থাপ্পর মেরে বসবে। পরিস্থিতি নিয়šত্রনের বাইরে যাচেছ দেখে আমি তরিঘরি করে বললাম, ‘কি অংক মামা?’
মামা পাতা উল্টে গড় অংক বের করলেন।
আমি বললাম,‘ তুমি কোনটা পারনা?’
‘একটাও পারিনা। সবগুলো বুঝিয়ে দে।’ অনেকটা নির্দেশের শুরে বলনেল মামা।
বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চই বুঝতে পারছো-মন্টু মামা কেন মেট্রিক ফোর্থ ইয়ারে পড়ে।
আমি মামাকে গড় বোঝানো শুরু করলাম। মন্টু মামা একজন মনযোগী ছাত্রের মত বুঝে নেবার চেষ্টা করছে।
শেষে মন্টু মামা মšতব্য করল,‘ আরে এটাতো একদম সোজা একটা অংক, আসলে জানিস , আমি কখনো বই খুলেও দেখিনি। নইলে এসব কোন ব্যাপার ছিল?’
আমিও মামার কথায় সম্মতি দিলাম।
‘ মন্টু বাজারে যা।’ মা ও ঘর থেকে বললেন। মন্টু মামা বই পত্র গুছালো। বলল,‘ আমার সাথে বাজারে যাবি?’
‘ না মামা তুমি একাই যাও।’ আমি বললাম।
মামা চলে গেল। বেলা এগারোটার দিকে মামা ফিরে এলো আশ্চর্য ব্যাপার। মামার জামা কাপর ভিজে জবুথবু অবস্থা। আমি উৎসাহিত হয়ে মামার কাছে গেলাম।‘ কি ব্যাপার মামা? ভিজলে কিভাবে?’
মামা আমার কথার কোন জবাব না দিয়ে ঠাস করে একটা থাপ্পর বসিয়ে দিল আমার গালে। আমিতো হতবম্ভ। আমি আবার কি করলাম? আমার চোখ দিয়ে জল বেড়িয়ে এল।
আম্মু বললেন ,‘ কিরে মন্টু ভিজলি কেন? জারীরকে মেরেচিস?’
জারীর আমাকে ভূল অংক শিখিয়েছে, তাই ওকে মেরেছি।’ বলল মন্টু মামা।
‘ মানে?’ আম্মু আমার দিকে তাকালেন।
মন্টু মামার কথা শুনে আমিতো আকাশ থেকে পরলাম।
‘ ভিজলি কিভাবে সেটা আগে বল।’ মন্টু মামাকে আবার প্রশ্ন করল আম্মু।মন্টু মামা আম্মুকে সব ব্যাখ্যা করে শোনালো। বাড়ির সবাইতো শুনে হেসে লুটোপুটি খাবার অবস্থা। বন্ধুরা মন্টু মামা একটা মজার ঘটনা ঘটিয়ে এসেছে। তোমাদেরকে সেটা বলছি ,শোন।
নানু বাড়ি থেকে বাজারে যাবার দুটি পথ আছে। একটা হল গ্রীষ্মকালীন পথ। আরেকটা হল শীতকালীন পথ। শীতকালীন পথে শুধু শীতকাল ছাড়া বছরের বাকী সময়ে পানি থাকে । এই পথটা খুব সংক্ষিপ্ত। সবসময় পানি থাকে বলে বাধ্য হয়েই মানুষ ঘুরপথে বাজারে যায়। যেটাকে সবাই গ্রীষ্মকালীন পথ বলে।
এসময়ে সংক্ষিপ্ত পথটাতে পানি কিছুটা কমতে থাকে। পানি কমলে লোকজন কাপড় গুটিয়ে খাল পার হয়।
মন্টু মামা স্বভাবতই অলস প্রকৃতির। বাজারে যেতে তাই সংক্ষিপ্ত পথটাই তার পছন্দ। সময় বাচানোর জন্য মামা পানির পরিমাপ জানতে গেল। এক লোকের কাছে মামা জিজ্ঞেস করল যে, খালের পানি কত?
লোকটা জবাব দিল ,‘পানিতো একেক জায়গায় একেক রকম। কেথাও হাটু পানি, কোথাও কোমর পানি আবার কোথাও টাখনুও ঠিকমতো ডুববে না।’
মমা একটু চিন্তা করে নিল। গড়ের হিসেবেতো কাপড় ভেজার কথা নয়। যে ভাবা সেই কাজ। গণিতের প্র্যাক্টিক্যাল প্রয়োগের সুযোগ পেয়ে মামা ভিশন খুশী। মন্টু মামা চোখ কান বন্ধ করে হন হন করে পানিতে নেমে গেল। যা হবার তাই হলো। ভিজে একাকার হয়ে গেল মামা। আর গড় অংকের ধারনা যেহেতু মামা আমার কাছ থেকে পেয়েছে, সেহেতু তার সব রাগ এসে পড়ল আমার উপর। আর আমার এই অপরাধে(!) আমার ভাগ্যে একটা থাপ্পর যোগ হয়ে গেল।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




