আমার প্রিয় পোস্ট

One of the things I keep learning is that the secret of being happy is doing things for other people.

জানিনা,পেরেক কোথায় বিঁধে আছে/ছোট গল্প

০৮ ই মার্চ, ২০০৮ সকাল ১১:২১

শেয়ারঃ
0 1 0

রুপগন্জ স্টেশনে বসে আমি বাসের অপেক্ষায় আছি।সময় কাটেনা,কাটেনা।।এক পিচ্চি হাঁক দিয়ে দিয়ে চা বিক্রি করছে।পিচ্চির কাছে চা চাইলো-এক সুবেশী যুবক।পিচ্চি চা কাপে ঢালতে না ঢালতেই ,আরেক হকারের কুনুইয়ের ধাক্কা খেয়ে ছলাত করে যুবকের শার্টে পড়লো।যুবক পিচ্চিকে এমন জোরে চড় মারলো-আমার পুরো অন্তরাত্মাই কেঁপে ওঠলো।
আমার পাশে বসা ভদ্রলোক,সব লক্ষ্য করে বললেন-আহারে যুবক-কেন যে মিছেমিছি চড় মারলে। যা হবার তা তো হয়েই গেছে।আসলে তোমার সুলাইমানের গল্পটা জানা দরকার ছিলো।বলেই আমার দিকে ফিরে থাকালেন।আমার ও সময় কাটেনা। আমি বলি ,সুলাইমানের গল্পটা কেমন?

ভদ্রলোক অতি আগ্রহে গল্প শুরু করলেন-
একজন নিরীহ প্রাইমারী ইস্কুলের শিক্ষকের ছেলে সুলাইমান এমন জালিম ছিলো-তারপর আবার সাধু হয়ে গেলো একবারে আজিব ব্যাপার।
সুলাইমান-রিকশা থেকে নেমেই ড্রাইভারকে চড়াতে শুরু করলো একটা টাকা বেশী চাইছিলো বলেই।
বাড়ী,এসে দেখে উনুনে এখনো ভাত।সুলাইমানের মাথা- গরম ভাতের মতো গরম হয় আর সিদ্ধ ভাতের ধোঁয়ার মতো মাথা থেকে ভাঁপ বের হতে থাকে।রাগের মাথায় মারলো কাজের মেয়ে জরিনারে এক চড়।
আকমল মাস্টার রাতে বাসায় এসে যথারীতি ছেলের একই কীর্তি শুনেন।
ভোরে পূবাকাশে আলো ফুটছে।চারদিকে প্রশান্তির বাতাস বইছে,ফুরফুরে হিমেল হাওয়া।আকমল মাস্টার ছেলেকে ঘুম থেকে জাগান।হাত মুখ ধূয়ে বাপ আর ছেলে অল্প কিছু পেটে চালান দিয়ে গ্রামের আল ভরাভর হাঁটতে থাকে গন্জের দিকে।
সুলাইমানের বায়ুচড়া মন বড় বেশি উচাটন।বাপ আজ সকাল বেলায় তারে নিয়ে কোথায় রওয়ানা দিলেন।
দুজনে রহমত ব্যাপারীর ভূষিমালের দোকানে আসে।নানারকম সওদা শেষ করে।তারপর,মাস্টার মশাই, সুলাইমানকে বলেন-ছটাক তিনেক পেরেক কিনে নিতে। পূবাকাশের আগুনের গোলা মাথার উপর ওঠতে না ওঠতেই দুজনে বাড়ি ফিরে আসে।
আকমল মাস্টার ছেলে সুলাইমাকে নিয়ে খেতে বসেন।খাওয়া দাওয়া শেষ করে , ছাতিম গাছটার নীচে গিয়ে বসেন।তারপর তিন ছটাকের পেরেকের থলেটি ছেলের হাতে দেন। শান্ত-ধীরে ছেলের মাথায় হাত রেখে বলেন-যখনই তোমার মেজাজ চড়া হবে -কারো সাথে অভদ্র ব্যবহার করবে তখনই একটি করে পেরেক এই ছাতিম গাছের বুকে বিধঁবে।
তোমার জন্মদাতা বাপ হিসাবে এই অনুরোধটুকু কি বেশী হয়ে যাবে?
মাস দুয়েক পর-
চৈত মাসের প্রচন্ড গরম পড়েছে।আকমল মাস্টার শীতল বাতাসের টানে ছাতিম গাছটার নীচে এসে বসেন।দেখেন অনেকগুলো পেরেক ছাতিম গাছটায় বিঁধে আছে। সুলায়মানকে ডাকেন।বলেন-ও আরেকটি কথা,যে পর্যন্ত তোমার মেজাজ নিয়ন্ত্রনে থাকবে -কারো সাথে ভালো ব্যবহার করবে,একটি করে পেরেক এখান থেকে তুলে ফেলবে।
মাস দুয়েক পর আকমল মাস্টার দেখেন ছাতিমের গাছে আর কোনো পেরেক নেই।
তিনি ছেলেকে নিয়ে ছাতিম গাছের পাশে যান। তারপর বলেন-আমি খুশী হয়েছি। তোমার মেজাজের পরিবর্তন হয়েছে দেখে। যাদের সাথে প্রতিনিয়ত খারাপ ব্যবহার করতে ,রিকসা ড্রাইভার,কাজের মেয়ে, স্বজন, বন্ধু, পরিজন সবার সাথে ভালো ব্যবহার করছো।কিন্তু গাছটার দিকে চেয়ে দেখো-সেই বিঁধে যাওয়া পেরেকগুলো আর নেই ,কিন্তু দাগগুলো ঠিকই রয়ে গেছে।এ দাগুগুলো কিন্তু কখনোই মুছে যাবেনা। কখনোই না।
শারীরিক আঘাতের চিহ্ন যেমন দাগ রেখে যায়, মানসিক আঘাত,খারাপ ব্যবহার, কোনো তাচ্ছিল্য ,কোনো অবহেলা,অহমিকা,বড়ত্বের অহংকার,রাগের চোটে অসাবধানতাবশতঃ কোনো অর্বাচীন বাক্যও মানুষের মনে চিরস্থায়ী দাগ রেখে যায়।
সেদিন যে ড্রাইভারকে চড় মেরেছিলে বাজারে, মনে আছে?শুনেছি সে আর নেই, ট্রাকের চাপায় পড়ে মারা গেছে।আমার বড় কষ্ট হচ্ছে তোমাকে ক্ষমা করার মতোও আর কেউ পৃথিবীতে রইলো না। তাই, সবসময় ভুল করে যে আবার ক্ষমা চাইবে ,সে সুযোগ ও আর না আসতে পারে।
ইতোমধ্যে আমার বাস এসে দাঁড়িয়েছে। আমি বলি, হুম শুনলাম,আপনার গল্প।আমাকে এবার যেতে হবে। যদি ,আপনার নামটা বলেন-
লোকটি বলেন-আমার নাম হলো সুলাইমান। সেই আকমল মাস্টারের ছেলে।
বাড়ী ফিরার পথে গাড়িতে বসে আমি চিন্তা করছি-এই ছোট জীবনে কত জনের বুকে যে কত পেরেক বিঁধে রেখেছি, মুছাতো যাবেনা,কিন্তু সব তোলে ফেলার সময় পাবোতো?

(একটি ইমেইলের সূত্র অবলম্বনে)

 

বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ০৮ ই মার্চ, ২০০৮ সকাল ১১:২৮
ফারহান দাউদ বলেছেন: দাগগুলো আসলেই মুছে ফেলা যায়না বিহঙ্গ ভাই,মুখে হয়তো বলা যায়,কিন্তু আসলেই কি চলে যায়? দাগ থেকে যায়। খুব সুন্দর গল্পটির জন্য ধন্যবাদ।
২. ০৮ ই মার্চ, ২০০৮ সকাল ১১:৫৪
দোলাহাসান বলেছেন: খুব সুন্দর গল্প। ভাল লাগল। মনের দাগ বোঝার মত মানসিকতা কয়জনের থাকে। গল্পের জন্য ধন্যবাদ। ভাল থাকুন
৪. ০৮ ই মার্চ, ২০০৮ দুপুর ২:২৬
ৃৃমম বলেছেন: ভালো লাগলো। অনেক ধন্যবাদ বিহংগ সুন্দর শিক্ষণীয় একটা গল্প পড়ার সুযোগ করে দেবার জন্য। ভালো থাকুন।
৬. ০৮ ই মার্চ, ২০০৮ সন্ধ্যা ৭:০১
শফিউল আলম ইমন বলেছেন: অনেক সুন্দর গল্প।
ধন্যবাদ আপনাকে।
ভালো থাকুন।
৮. ০৮ ই মার্চ, ২০০৮ সন্ধ্যা ৭:২৮
মানব মানিক বলেছেন: বিহংগ দা
কেমন আছেন ?

অনেক দিন পরে আপনার ব্লগে ঢুকলাম।
গল্পটা ভালো লাগলো।

গাছটার দিকে চেয়ে দেখো-সেই বিঁধে যাওয়া পেরেকগুলো আর নেই ,কিন্তু দাগগুলো ঠিকই রয়ে গেছে।এ দাগুগুলো কিন্তু কখনোই মুছে যাবেনা। কখনোই না।

ভালো থাকবেন
ভালোবাসা নিয়ে।
১১. ০৯ ই মার্চ, ২০০৮ রাত ১০:০৫
মুকুল বলেছেন: সুন্দর গল্প। চিন্তার খোরাক জোগানো। *****
১২. ০৯ ই মার্চ, ২০০৮ রাত ১০:০৭
ভাঙা চাঁদ বলেছেন: দাগ কখনো মুছা যায় না, যদিও যায় , তাও কেবল মুছে গিয়েছে এমন একটা অভিনয় মাত্র।
১৩. ০৯ ই মার্চ, ২০০৮ রাত ১০:০৮
ভাঙা চাঁদ বলেছেন: অনেক দিন পরে আমার ব্লগে আপনার কমেনটস পেয়ে ভাল লাগছে মামা।
মামা কেমন আছেন?
১৪. ০৯ ই মার্চ, ২০০৮ রাত ১০:১৯
সারিয়া তাসনিম বলেছেন:

এত সুন্দর করে লেখো কেমন করে ? কেন সবাই এমন করে ভাবতে পারেনা ?

ভালো থেকো , প্রিয় পোস্টে রেখে দিলাম ।
১৫. ০৯ ই মার্চ, ২০০৮ রাত ১০:৫৭
সুলতানা শিরীন সাজি বলেছেন: "এই ছোট জীবনে কত জনের বুকে যে কত পেরেক বিঁধে রেখেছি, মুছাতো যাবেনা,কিন্তু সব তোলে ফেলার সময় পাবোতো? "...............
এমন করে ক'জনাই ভাবতে পারে।
গল্প ভালো লেগেছে........অনেক দিন পর এলেন।
ভালো আছেন তো?
কবিতা চাই ।শুভেচ্ছা।
১৬. ০৯ ই মার্চ, ২০০৮ রাত ১১:২২
মিরাজ বলেছেন: চমৎকার লেখা বিহংগ ।

নাড়া দেবার মত লেখা ।
১৭. ১৬ ই মার্চ, ২০০৮ বিকাল ৩:৪২
জাহান৮২ বলেছেন: খুবই শিক্ষনীয় গল্প।
১৮. ১৬ ই মার্চ, ২০০৮ রাত ৮:০৮
অজানা অচেনা বলেছেন: ভীষণভাবে নাড়া দেয়ার মতন লেখা! শিক্ষাটা যেন অন্তরে গেথেঁ নিতে পারি, সবাই।
১৯. ০৩ রা মে, ২০০৮ রাত ১০:১০
এরশাদ বাদশা বলেছেন: আপনার লেখাগুলো মাঝে মাঝে ঈশপের গল্প বলে ভ্রম হয়। এমন লেখা কজন লিখতে পারে, যে লেখাগুলো আমাদের মানুষ হতে শিখায়?

২০. ০৫ ই অক্টোবর, ২০০৮ রাত ৮:০৬
কুচ্ছিত হাঁসের ছানা বলেছেন: ভাই, সবাই কি এমন করে ভাবে? এমন করে ভাবতে পারলে তো....

মন ছুঁয়ে গেল আপনার লেখাটা। প্রিয়তে সরাসরি। +++
২২. ১৭ ই মার্চ, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:৪৪
গুহামানব বলেছেন: অনেক ভালো লেগেছে

 

মোট সময় লেগেছে ০.৯০৬৯ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
কারো কারো জীবন হঠাৎ করেই বদলে যায়,
আবার কেউ জীবনের ৃণ শোধে নিজেই জীবন বদলায়।,
কারো জীবনের ফানুস কালের আকাশে সারা দিন...
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

    কোন বিভাগ নেই