কয়েকদিন আগে আশুলিয়ায় ঘটে যাওয়া একটি নৈরাজ্য বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে দেশবাসী এবং সারা বিশ্বের জনগন দেখতে পেয়েছে, কিভাবে আমাদের দেশের প্রধান রপ্তানীখাত গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীতে জঘন্যতম ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালনা করা হয়েছে। চোখের সামনে পুড়ে চারখার হয়ে গেছে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি, উৎপাদিত পোষাক ও কাচামাল। মালিক যেমনি ভাবে ক্ষতিগ্রˉÍ হয়েছে তেমনি রুটি রুজির পথ বন্ধ হয়ে হাজার হাজার শ্রমিক আজ বেকার। মা বাবা বৌ বাচ্চা নিয়ে অনাহারে অর্ধাহারে নিদারুন কষ্টে জীবন যাপন করতে হচ্ছে। গার্মেন্টস কর্মীদের নামে যে নৈরাজ্য সংঘঠিত হলো সেই আন্দোলনের সময় গার্মেন্টস কর্মীদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোন দাবী নিয়ে আন্দোলনের কোন প্রক্রিয়াই ছিলনা। এমনকি এই আন্দোলনে গার্মেন্টস শ্রমিকদের প্রায় নব্বই শতাংশ মহিলার কেউই ছিলনা এবং পুরুষদের অধিকাংশই আন্দোলনে অংশ গ্রহন করেনি। ভাংচুরে অংশগ্রহন করেছিল বহিরাগত কিছূ যুবক। আর খোলা গার্মেন্টস ছাড়াও বন্ধ গার্মেন্টস, ঔষধ, সিরামিক, ব্লেড, প্লাস্টিক, পানীয়সহ অন্যান্য শিল্প কারখানাতে কেন হামলা করা হয়েছে। যে সকল গার্মেন্টসে যথাযথভাবে বেতন দেওয়া হয় সেখানেইবা কেন হামলা করা হল। নিজেদের কর্মক্ষেত্রকে শ্রমিকরা নিজহাতে এভাবে ধ্বংস করতে পারেনা কারন ফ্যাক্টরী ধ্বংস হয়ে গেলে শ্রমিকরা চাকুরী করবে কোথায়, চলবে কিভাবে? সুতরাং আন্দোলনের নামে যে নৈরাজ্য হয়েছে তা কেবলই গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলন নয়, এটি বাংলাদেশের শিল্প, অর্থনীতি, উন্নতি ও অগ্রগতির বিরুদ্ধে একটি পরিকল্পিত নৈরাজ্য। এজাতীয় হামলা শুধু আশুলিয়া নয় বেশ কিছু দিন থেকে থেমে থেকে গাজীপুর, সাভার, মিরপুর, নারায়নগঞ্জ সহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ঘটতে দেখা যায়।
এসকল ঘটনার পিছনে সত্যিই শ্রমিকদের কোন স্বার্থ থাকলে তার সমাধান নিশ্চই ধ্বংসলীলার মাধ্যমে নয়। সেরকম কিছু হলে অবশ্যই মালিক পক্ষকে কঠিন জবাব দিহিতার মধ্যে আনা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে যথার্থ পদক্ষেপ অতিসত্ত্বর নেয়া উচিৎ। কিন্তু মালিকের দুর্ব্যবহার এবং শ্রমিকের অধিকার বঞ্চনার ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে অন্যকেউ সুযোগ নিচ্ছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা জরুরী। পাশ্ববর্তী একটি দেশ বাংলাদেশের বাজারে ক্রীম, টুথপেষ্ট, ব্রাশ, শাড়ী, তৈল, চাল,ডাল,পেয়াজ, রসুন, মুরগী, গরুসহ প্রায় সব গুলো বাণিজ্যিক দিক দখল করে নিয়েছে। কিছুটা বাকী আছে শুধু পোষাকের ক্ষেত্রে। এখন সেই জায়গাটা দখল করার জন্যই তাদের এজেন্টদের দিয়ে এই ধ্বংসলীলা চালাতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। দেশের সবছে সম্ভাবনাময় খাত গার্মেন্টস শিল্পকে ধ্বংস করার অনৈতিক কাজে কারা অর্থ, বুদ্ধি, লোকবল, সমর্থন যুগিয়ে যাচ্ছে তাদের বের করে দৃষ্টান্ত মুলক শাˉিÍ দিতে হবে। ইতিপূর্বেও এহেন জঘন্য ঘটনা ঘটার পর চিহ্নিত অপরাধীদের কোন শাˉিÍ না হওয়ার কারনেই পুনরায় ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের পরিকল্পনা বাˉÍবায়নের উদ্যোগ নেয়। দেশবাসী এহেন ধ্বংসাত্বক সন্ত্রাসী কর্মকান্ডকে ঘৃনাভরে প্রত্যাখান করেছে। আমরা এই ধ্বংসলীলার তীব্র প্রতিবাদ জানাই।
গার্মেন্টস শিল্পের সমস্যা সমাধানে মালিক ও সরকারের প্রতি কতিপয় আহবানঃ ১. ভিবিন্ন টিভি চ্যানেলের ভিডিও ফুটেজ দেখে যারা এই সন্ত্রাসী কাজে অংশ নিয়েছিল তাদেরকে চিহ্নিত করে তাদের পরিচয় দেশবাসীর নিকট তুলে ধরে তাদেরকে এমন কঠিন শাˉিÍ দিতে হবে যেন আর কেউ কখনো সন্ত্রাসী কাজে না আসে। ২. প্রয়োজনে শিল্প এলাকায় লেবার কোর্ট বসিয়ে দ্রুত তাদের সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। ৩. ইন্ডাস্টিয়াল পুলিশ বাহিনী গঠন করে শিল্প কারখানার নিরাপত্তা জোরধার করা যেতে পারে। ৪. শিল্প কারখানা তৈরির সময় এমন ভাবে অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে যেন নৈরাজ্যকারীরা সহজেই ধবংসলীলা চালাতে না পারে এবং করতে পারলেও ক্ষতির পরিমান কম হয়। ৫. এছাড়া শিল্প এলাকার মধ্যেই ফায়ার সার্ভিস ষ্টেশন স্থাপন করা যেতে পারে। ৬. প্রত্যেক কারখানায় সিসিটিভির মাধ্যমেও কিছুটা সফলতা আসতে পারে। ৭. এছাড়া সম্ভাব্য দু®কৃতিকারী ও শ্রমিক নেতাদের মধ্যে কাজ করার জন্য আলাদা গোয়েন্ধা ইউনিটও গঠন করা যেতে পারে। এসব প্রচেষ্টার মাধ্যমে হয়ত কিছুটা সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। অবশেষে গার্মেন্টস মালিক সহ যারা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন তাদের প্রতি জানাই আন্তরিক সমবেদনা এবং এই ক্ষতিগ্রস্থ মানুষগুলো যেন পুনরায় তাদের ফ্যাক্টরী চালু করতে পারে সেজন্য তাদেরকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার জন্য সরকার ও ব্যাংক সমুহের প্রতি আহবান রইল। এছাড়া নিরিহ শ্রমিক যারা কোন অপরাধের সাথে জড়িত না থেকেও এখন তাদের ছেলেমেয়ে নিয়ে অতিকষ্টে দিনাতিপাত করছে তাদের ব্যাপারেও মালিক অথবা সরকারের পক্ষথেকে কোন একটা যৌক্তিক সমাধান করা উচিৎ বলে মনে করছি। যেমন অন্তত ক্ষতিগ্রˉÍ শ্রমিকদের জন্য রেশন চালু করা, অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ দেয়া, আংশিক অগ্রিম বেতন দেয়ার ব্যাবস্থা করা যেতে পারে।
লেখকঃ মানবাধিকার কর্মী ও
এমফিল গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


