অলৌকিক ঘটনা বলে আসলে কিছু কি আছে? হয়তো আছে, হয়তো নেই। কিন্তু আজ আমার দেখা, খুব কাছের মানুষের কাছে শোনা বা আমার অনুভূত কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা আপনাদের সাথে শেয়ার করতে চাই।
ঘটনা ১। ঘটনাটা আমার আব্বুর জীবনের। সময়কাল ১৯৫২-৫৬ হবে মনে হয়। তাঁর কাছ থেকে শোনা। আমার আব্বু (পরলোকগত, আল্লাহ তাঁর মাগফেরাত দিন) ছোটবেলায় একবার ফুটবল খেলতে গিয়ে মারাত্মক আহত হন। তাঁর পায়ে একটা হাড় (সম্ভবতঃ গরুর ভাঙা হাড়) ঢুকে যায়। ব্যাথার যন্ত্রনায় আব্বু অস্থির হয়ে গেলেন। সেই সময়ে ওইরকম গ্রামে উন্নত চিকিতসা ব্যাবস্থার কথা কল্পনাও করা যেত না। তাই গ্রামে যা হয় আর কি! নানা জনের পরামর্শে বিভিন্ন হোমিওপ্যাথি, ভেষজ, কবিরাজী চিকিতসা চলতে লাগল। পায়ের অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে লাগল। যন্ত্রণার মাত্রাও তীব্র থেকে তীব্রতর হতে লাগল। গায়ে প্রচন্ড জ্বর। এভাবে প্রায় দেড়-দুইমাস কেটে গেল। যন্ত্রনা পায়ের পাতা থেকে হাঁটু পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল। আব্বু সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী হলেন। পরিবারের সবাই আল্লাহ কে ডাকা শুরু করল।
আমার দাদা ছিলেন পীরভক্ত। তিনিও মুষড়ে পড়লেন আর আল্লাহ কে ডাকতে লাগলেন। অবশেষে, অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে, এলাকার বিজ্ঞজনদের পরামর্শে আব্বুকে নিয়ে যাওয়া হলো কোলকাতায়। কোলকাতার সেই সময়ের খুব নামকরা হাসপাতাল (নাম টা আমার ঠিক মনে পড়ছে না) এর একজন বিখ্যাত বিশেষজ্ঞ আব্বুর চেক আপ করলেন। এরপর যা বললেন, তার জন্য আমার দাদা মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি দাদা কে বললেন, আপনার ছেলের সম্পূর্ণ পা গ্যাংগ্রীন হয়ে গেছে। এর একমাত্র চিকিতসা পা টি হাটু থেকে কেটে ফেলতে হবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। আরো দেরী করলে গ্যাংগ্রীন সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়বে এবং অসম্ভব যন্ত্রনা নিয়ে আপনার ছেলে মারা যাবে।
আমার দাদা চরম বিমর্ষ হয়ে পড়লেন। তাঁর সবচেয়ে প্রিয় আদরের ধন সারাজীবন এক পা নিয়ে পঙ্গু হয়ে বেঁচে থাকবে, এটা তিনি মেনে নিতে পারলেন না। তিনি ডাক্তারের কথায় রাজী হলেন না। আব্বুকে আবার গ্রামে ফিরিয়ে নিয়ে আসলেন।
ঘটনা জেনে প্রতিবেশীরা আব্বুকে অনেক বোঝালো, যে ছেলের জীবন আগে। এই রকম আবেগের মূল্য দিতে গেলে ছেলেকে হারাতে হবে। যত শীঘ্র সম্ভব আবার কোলকাতায় নিয়ে পা কাটিয়ে নিয়ে আসার জন্য সবাই পরামর্শ দিল। কিন্তু, দাদু তার সিদ্বান্তে অটল।
আমার আব্বুর অবস্থা খুব দ্রুত আরো খারাপ হতে লাগল। আব্বু চিৎকার দিয়ে কাঁদতেন যন্ত্রনায়। সবাই তখন হাল ছেড়ে দিয়ে আব্বুর মৃত্যুর জন্য মানুষিক প্রস্তুতি নিতে লাগল।
এর মধ্যে হঠাত একদিন আমার দাদুর মুর্শিদ, যিনি এর আগে কখনোই দাদুর বাসায় আসেন নি, এসে উপস্থিত। আমার দাদু তাকে জড়িয়ে ধরে অনেক ক্ষণ কাঁদলেন। তিনি দাদুকে আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে বললেন।
ওই দিন বিকেলে তিনি আমার আব্বু কে দেখলেন। তারপর, কোথা থেকে কিছু মাটি নিয়ে এসে, কাদা মত বানিয়ে আমার আব্বুর পায়ের পাতা থেকে হাঁটু পর্যন্ত লেপে দিলেন। বললেন, এইরকম কিছু দিন থাক। তারপর উনি চলে গেলেন।
আল্লাহর কি খেলা। তারপর দিন থেকে আমার আব্বুর যন্ত্রনা কমে যেতে লাগল। আস্তে আস্তে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলেন।
আমি আমার দাদুকে কখনো দেখি নি। আমার আব্বুর পা না কাটার সিদ্ধ্বান্তের জন্য তার প্রতি আমার চির কৃতজ্ঞতা। আর সেই দরবেশ, তার সম্পর্কে আমি আব্বুর কাছে আর বেশি কিছু শুনি নাই।
থাক, আজ আর কিছু লিখতে ইচ্ছা করছে না। আমার আব্বুর কথা চিন্তা হলেই আমার চোখে পানি চলে আসে। অন্য ঘটনাগুলো আর একদিন বলব।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



