দীর্ঘ ৫ বৎসর পর দেশে গেলাম। আটলান্টিক পার হয়ে দীর্ঘ ২৫ ঘন্টা ভ্রমণ শেষে প্লেন যখন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মাটি স্পর্শ করল, নিজের অজান্তেই হাত তালি দিয়ে উঠলাম। আশেপাশের লোকজনের তাকানো দেখে নিজের অমন ছেলেমানুষী আচরণে খুব লজ্জা পেলাম।
"নম নম নম, সুন্দরী মম জননী বঙ্গভূমি"
আহ! আর মাত্র কয়েক মিনিট। দেখতে পাব আমার মাকে। আমার অতি প্রিয় মানুষদের কে।
লোকমুখে শুনেছিলাম, বিমান-বন্দরে বিদেশ ফেরৎ যাত্রীদের হয়রানীর কথা। অবাক হয়ে দেখলাম সব কিছু কি সুন্দরভাবে হলো। ইমিগ্রেশন অফিসারের কাছে নিজের বাংলাদেশী পাসপোর্ট দিলাম। মুগ্ধ হলাম তার পেশাদারিত্বিক আচরণে। সেখান থেকে লাগেজের সন্ধানে বেল্টে গিয়ে দাড়ালাম। অনেক দিন ধরে একটু একটু করে টাকা জমিয়ে, প্রচন্ড ঠান্ডার মধ্যেও অনেক মার্কেট ঘুরে, প্রিয়জনদের জন্য সামান্য কিছু উপহার নিয়েছিলাম। ভয়ে ভয়ে ছিলাম। ঠিক মত সব কিছু পাব কিনা।আধা ঘন্টার মধ্যে সব লাগেজ পেয়ে গেলাম। বেরুনোর সময়ে কাস্টম অফিসারদের হাতে ডিক্লারেশন ফর্ম জমা দিয়ে , এক রকম মুগ্ধতা নিয়ে নির্বিঘ্নে বেরিয়ে এলাম।
সামনে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে অতি প্রিয় মানুষদের প্রায় সবাই। অনেক কষ্টে চোখের পানি আটকালাম। এত বড় বয়সে সবার সামনে কান্নাকাটি শুরু করা নিশ্চয় সমীচীন হবে না। এই মুখগুলি আমার একাকী প্রবাস জীবনের চলার প্রেরণা।
মাকে নিষেধ করেছিলাম, বিমান বন্দরে আসতে। দঁড়িয়ে থাকা ভাড়া করা দুটা মাইক্রো নিয়ে সবাই রওনা হলাম বাসার উদ্দেশ্যে।
ঢাকা শহরের যানজট পাঁচ বছর আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। রাস্তা-ঘাট, বাতাসের ধুলোবালি নিশ্বাসের সাথে ভেতরে ঢুকছে। চারদিকে গাড়ীগুলো নিতান্ত অপ্রয়োজনীয়ভাবে হর্ণ বাজাচ্ছে। এই শব্দে কারো কিছু যায়-আসছে বলে মনে হচ্ছে না। মাইক্রোর মধ্যেও মাঝে মধ্যে প্রবল ঝাকুনি হচ্ছে। ড্রাইভার সাহেব মনে হলো রাস্তার কোন রিক্সাওয়ালা কে একটা গালি দিলেন। একটু অস্বস্তি লাগছিল, আবার সবকিছু কেমন যেন খুব পরিচিত আর আপন লাগছিল। ঘন্টাখানিক পর বাসায় পৌঁছলাম। মায়ের সাথে দেখা হতেই আর অশ্রু সম্বরণ করা সম্ভব হলো না।
দেখতে দেখতে কেটে গেল ৪ সপ্তাহ। এত দ্রুত কিভাবে সময় চলে গেল, বুঝলাম না। কত কিছু প্ল্যান করে গিয়েছিলাম। তেমন কিছুই করা গেল না।
আসবার সময় আবার, মানুষগুলির সেই করুণ দৃষ্টি। তাদের কাছ থেকে বিদায় নিলাম, মুখে হাসি হাসি ভাব নিয়ে। একবার ঘুরে গিয়ে আর পেছন ফিরে তাকালাম না, ভয়ে। আবার কবে দেখা হবে কে জানে।
"তারপর এই শূন্য জীবনে যত কাটিয়াছি পাড়ি
যেখানে যাহারে জড়ায়ে ধরেছি সেই চলে গেছে ছাড়ি।"
আবার সবার সাথে দেখা হবে তো?
ফিরে যাচ্ছি একা সেই দেশে যেখানে আমার জন্য কেউ অপেক্ষা করে নেই।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০১২ বিকাল ৩:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


