somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটি নিরব ভালবাসার গল্প..........

১৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ১১:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বিশ্বাস


তীব্র রোদ। মাত্র আধ কিলো রাস্তা প্যাডেল চালিয়েই রাইসুর গায়ে ঘাম ঝরছে। তারপরও একটু আগে যে লোকটি যাত্রী হয়ে উঠেছে তার কথাবার্তায় মনে মনে না হেসে পারলনা।
কাছেরই কয়েকটি মসজিদ হতে একসাথে জোহরের আযান ভেসে এলো কানে। লোকটি কানে মোবাইল ধরে কথা বলেই চলেছে। এই সাত আট মিনিটের মধ্যেই তিন তিনটে কল হয়ে গেছে। এইটি চার নম্বর।
মালিবাগের আবুল হোটেলের সামনে রিকশা নিয়ে রাইসু বসেছিল। রাতে হালকা জ্বর ছিল গায়ে । ভাবছিল যাত্রাবাড়ীর ওদিকে একটা খ্যাপ পেলে ভালো হতো, হাফবেলাতেই রিকশা জমা দিয়ে বাড়ী ফিরবে। ঠিক তখনই তিরিশোর্ধ্ব এই লোকটি জিজ্ঞেস করল ‘ যাত্রাবাড়ী বিবির বাগিচা যাবি।’ তুই করে বললে সাধরণত নাই করে থাকে সে। হাজার হোক সে ইন্টার ফেল বলে কথা। তুমি বলুক , তুই কেনো। না বলার অবাধ স্বাধীনতা তো রিকশা ওয়ালাদের এই শহরে আছেই। এই মুহূর্তে না বলল না , বরং মাত্র ২০ টাকাতেই রাজী হয়ে গেল। ভাবল, ওর বউ সুলতা তো ওখানেই এক বাড়ীতে কাজ করে। দুইটায় সুলতার ছুটি। ওকে সাথে নিয়েই বাড়ী ফিরবে।
রিকশায় উঠেই সাথে সাথে প্রথম কলটি করে লোকটা। কথা শুনেই রাইসু বুঝল প্রেমিকার কাছে ফোন করেছে। মিষ্টি কথার ফুল ঝুরি ঝরছিল লোকটির কণ্ঠে। সে কত রকমের মন ভরানো কথা তার। রাখার আগে আলতো কিস। রাইসুর নিজের প্রেমের কথা মনে পড়ে যায়। কিন্তু পরণেই লোকটি আরেক নম্বরে কল করে। নাম ভিন্নতায় রাইসু বোঝে সেটি অন্য মেয়ে। কিন্তু মন ভরানো ডায়ালোগের কোন ভাবগত পরিবর্তন নেই। এই বার একটু অবাক হয়।
একটু পরেই মোবাইলেই কল আসে। সেই একই ধরনের মিষ্টি কথা। লোকটি বলে,‘ লক্ষ্মিটি আমার, প্লিজ এইতো মামার বাসায় যাব আর আসব। একটু বোঝ , কালকে ওখানে মানিব্যাগটা রেখে এসেছি। আধঘন্টা দেরি হবে। যেয়োনা প্লিজ।... অনেক অনেক আদর দিলেও রাগ ভাঙবেনা? ...’
তারপর এই চারনম্বর কল। ‘লক্ষ্মি ডার্লিং, পাঁচটার আগে পারবনা যে , মামার বাসায় যাচ্ছি। সময় লাগবেতো একটু । ওখান থেকে বের হয়েই তোমাকে নিয়ে যাব বসুন্ধরাতে , প্লিজ রাগ করেনা, হাস হাস..একটা কিস ..., এই তো।...’
সায়েদাবাদ পেরোচ্ছে এখন রাইসু আর লোকটি। রাইসু ভাবল ‘যাক লুইচ্চাটার মিথ্যে প্রেমের অভিনয় বন্ধ হলো বোধহয়।’ সাথে সাথেই আবার মোবাইলে বেজে উঠল।
‘কিরে রিপন , তুই হঠাৎ...’
রাইসু ভাবে, যাক এবার কোন মেয়ে নয়।
লোকটি বলে ওঠে.‘ শালিরে চেখে দেখার শখ ছিলরে বহুতদিনের। যা একটা মাল নারে। অসম্ভব ফিগার। মাথা পুরা ঘুরে যায়।’
রাইসু মনে মনে আরেকবার গালি দেয় লুইচ্চা বলে।
লোকটির কথা চলতে থাকে, ‘...আবার জিগায়, আমি আবার ফেল মারিরে।...তোরে পরশু বললাম না। মামীর এক চাচা মারা গেছেন , সেই উদ্দেশ্যে সবাই বিক্রমপুর গেছিল। বাসায় রেখে গেলেন আমারে। আমি তো এই তক্কেই ছিলাম। আমারে দেখে বড় লোকের মেয়েরাই সব কাইত আর ওটা তো কামের ছেড়ি। ...’
‘ না টাকা দেই নাই। এমনেতেই খুশি। ... ঠিক আছে , এরপরে খালি পাইলে তোরে ডাক দিব। ...’
সুলতার কথা মনে হয় রাইসুর। ভয় হয়। এইসব সভ্য সমাজের অসভ্য লোকগুলার জন্যে ভয় হয়। ভয় হয় ওর ওত সুন্দরী বউটার দিকে না আবার কোন কুকুর শিয়ালের দল নখর উচিয়ে ধরে। এমনিতেই বস্তিতে কতবার দুই নম্বরী কাজের প্রস্তাব করছে মাতারীরা। সব বলে দেয় ওকে সুলতা। ওখানেই তো ওদের ভালবাসার দৃঢ়তা - বিশ্বাস।
রিকশা পৌঁছে যায় বিবির বাগিচার এক নম্বর গলিতে। দুটো বাড়ী পেরিয়ে সামনের একতলা বাড়ীটার সামনে লোকটা যখন থামতে বলল পা দুটো যেন অবশ হয়ে এল রাইসুর। লোকটা নেমে বিশটা টাকা বাড়িয়ে দিয়ে চলে গেলো। পাথরের মতো হাতটা বাড়িয়ে টাকাটা নিল সে। বুঝতে পারলোনা কাঁদকেব না হাসবে।
একটু পরেই তার সম্বিত ফিরে এল। তখনও দুটো বাজেনি। মাথা কাজ করছে না। রিকশাটা সাইড করে পাশের দোকান থেকে একটা নেভি কিনে ধরালো। সিগারেটে একটা টান দিতেই মনে পড়ল সেই সব দিনের কথা সব। সুলতার বাড়ীর সামনে দিয়ে স্কুলে যেতে হতো। সে রোজ দাঁড়িয়ে থাকতো। ওভাবেই শুরু। কত মার খেয়েছে মার কাছে সুলতা পথে কাজ ফেলে দাঁড়িয়ে থাকার জন্যে। সেসব তুচ্ছ হয়ে যাচ্ছিল ধীরে ধীরে। প্রেমের গভীরতা ছিল ওমনই । সুলতার বিয়ে ঠিক হলো। দ ুগ্রামের কেউই মেনে নেয়নি ওদের প্রেমটাকে। পালানো ছাড়া উপায় ছিলনা। রাইসুর এক কথায় গ্রাম ছেড়ে সকল কে ভুলে চলে এল ঢাকায়। তারপর বিয়ে আর কষ্টকর জীবন দুজনার। কতদিন কত রাত গেছে না খেয়েই। সব কষ্ট দুজনা ভাগ করে নিয়েছে । নিয়েছে ছোট ছোট সুখ গুলোও। সেই সুলতা গতকাল ওই লুইচ্চাটার সাথে...না কি করে সম্ভব। রাইসু ভাবে, এত মধুর ভালবাসা তাদের, ভালোবাসা মানেই তো বিশ্বাস...বিশ্বাস ছাড়া কি ভালোবাস থাকে? কিন্তু...’
‘ কি ব্যাপার , তুমি এইহানে। জ্বর বাড়ছে নি। আরে হাতে ওটা কি পুড়তাছে। সিগারেট ধরাইছো আবার। ’
সুলতার দিকে তাকিয়ে হুশ ফেরে রাইসুর। সিগারেট টা হাত থেকে পড়ে যায়। মনে মনে বলে, ‘মাগী তাতে তোর কি?’ মুখে বলতে পারেনা।
‘চলো , বাড়ী চলো। সিগারেটের জন্যে শাস্তি পাইবা। ’
‘না যামুনা এহন, তুমি যাওগা। আমি খ্যাপ মাইরা আসি’
আরও কড়া কথা বলতে চায় রাইসু। পারেনা। মন বাধ সাধে। মানতেই চায়না। এইতো কত স্বাভাবিক আচরণ সুলতার । কিন্তু যা শুনল...
ঠিক তখনই সেই লোকটার কণ্ঠ কানে আসে, ‘ না মামী সে মিথ্যে বলছে..’
‘ বাইর হো তুই আমার বাড়ীর থেইক্যা, নাইলে তোর মামারে বলে দিমু , আমি সুলতারে চিনি, সে মইর‌্যা গেলেও মিথ্যে বলবনা। সত্যি প্রেমিক কখনও মিথ্যে বলেনা। তোর কত বড় সাহস আমার কাজের মেয়েরে কু প্রস্তাব দিস। বাইর হো।’
সুলতা রিকশায় উঠতে উঠতে বলে ওঠে,‘ ও তোমারে তো বলা হয়নাই, কালকা মালিকের ওই হারামজাদা ভাইগ্না আমারে কু...’
আর শোনার দরকার হয়না রাইসুর । রিকশার প্যাডেলে পা দিয়েই মনে মনে ভাবে, ‘ভালবাসা মাইনেই তো বিশ্বাস। ক্যান ভুইলা গেলো সে। ছি!’

---------
বি: দ্রঃ গল্প টি সাপ্তাহিক ২০০০ এর এ বছরের ভালবাসা সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল

১৮টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×