অবাক লাগে যখন আয়নায় দেখি নিজেকে আজকাল ...চোখের উপর চশমা থাকেনা, অথচ বিগত ১৭/১৮ বছর ধরে চশমা ছিল দেহেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশের মত। রাতে ঘুমানোর সময় আর গোসল বা চোখ এ পানি দেয়ার সময়টুকু বাদে কখনই চশমা খোলা হতো না। খুলবো কি করে চশমার পাওয়ার তো আর কম ছিলনা। ডান চোখে ছিল (-) ৫.৭৫ আর বাম চোখে (-) ৫.৫ পাওয়ারের চশমা শেষ চশমা ব্যবহারের কালে, সেটা ১৩ই ফেব্রুয়ারী ২০০৮ এর আগে।
একদম দিন তারিখ মনে নেই , তবে ১৯৯০ সালেই হবে, প্রথম চশমা উঠেছিল আমার চোখে। খুব মজা পেয়েছিলাম সেদিন সত্যি। চোখে একটু কম দেখতাম, বাসায় বলায় আব্বু আর আম্মু বকাও দিয়েছিলেন প্রথম প্রথম , বলেছিলেন চশমা পড়ার শখ হয়েছে বলেই ওমন বলতাম। একটু সত্যি যে ছিলনা তা না। আপু চশমা নিয়েছিল তারও আগে। একটু হিংসা তো হতোই।
কিন্তু ডাক্তার দেখানোর পর জানা গেলো চোখের দৃষ্টি শক্তির অবস্থা অত ভালনা তখন।প্রথম পাওয়ার লেগেছিল , ঠিক মনে পড়ছেনা।তবে সম্ভবত ২.২৫ ছিল মনে হয় দুচোখেই। প্রথম হিসেবে কিন্তু অনেক বেশী। প্রথম চশমা নিয়েছিলাম বায়তুল মোকারম মার্কেট থেকে মনে আছে আর ডাক্তারের নাম ছিল জাফরউল্লাহ।
যেহেতু কাশে মামুন নামে অন্য সহপাঠী ছিল তাই বন্ধু মহলে কানা মামুন নামটাও উচ্চারিত হয়েছে কদাচিৎ।
সেই যে চশমা পড়া শুরু হলো তারপর শুরু হলো অনবরত চশমা বদলানোর পালা আর চশমা সংক্রান্ত নানান ঘটন আর অঘটন পরবর্তীকালে।
প্রায়ই রাতে চশমা নিয়েই ঘুমিয়ে পড়তাম আর পিঠের নিচে পড়ে চশমা যেত বেঁকে , ভেঙেছেও কয়েকবার। ইন্টারের আগ পর্যন্ত গড়ে ২ বছরে তিনটে চশমা তো লাগতোই আমার। পড়ে অবশ্য চশমার প্রতি যতœবান হয়েছিলাম।
মাঝে মাঝে চশমা পড়তে খুবই বিরক্তও লাগতো। অবশ্য অভ্যাসটাও ভালই হয়েছিল। না হলে চশমা পড়েই ফুটবল , ক্রিকেট সব খেলাধূলায় চালাতাম নিয়মিত।
মনে পড়ছে কাশ সেভেনে থাকতে একবার এক বন্ধুর সাথে মারামারি করতে গিয়ে চশমার ডান্ডা ভেঙে ফেলেছিলাম। বাসায় বললে বকা দেবে বলে অনেকদিন জোড়া তালি দিয়েই ব্যবহার করতে হয়েছিল সেই চশমা।
আরেকবার ঘটেছিল মজার ঘটনা। সম্ভবত তখন কাশ নাইনে পড়ি। আমি তখন পাঁচতলার উপরে থাকি ব্যাংক কলোনীতে। নিচ থেকে এক ফ্রেন্ড ( বর্তমানে সে আমেরিকাতে আছে, যার চোখে সেই সময় থাকত প্লাস পয়েন্টের চশমা, দুমাস আগে দেশে এসেছিল , সেও এখন চশমা পড়েনা , আমেরিকাতেই লেসিক করিয়েছে) ডাকল , বারান্দায় দাঁড়ালাম। কেন যেন বন্ধুটি নিচ থেকে একটি ঢিল ছুড়েছিল, আর একদম সেটা বাম চোখের উপর যে কাচ চশমার সেখানে গিয়ে আঘাত করল। বাস চৌচির হলো। কপাল ভাল কাঁচ ভেঙে চোখে লাগেনি।
কাচের চশমার প্রতি অনীহাটা তখন থেকেই হয়তো শুরু হয়েছিল। ইন্টারের পর থেকে যত চশমা নিয়েছি তার সব ছিল প্লাস্টিকের গ্লাস। ওটাতে বেশ হালকা হয় চশমা আর পুরুত্বও একটু কমানো যায় । যাতে বোঝা যায়না অন্তত পাওয়ারের আধিক্য।
ও প্রথমের সেই ২.২৫ পাওয়ার বেড়ে উঠতে খুব একটা কার্পন্য করেনি। যতবার ই ডাক্তারের কাছে গিয়েছি পাওয়ার বেড়েছেই। ইঞ্জিনিয়ারীং পড়ার সময় পাওয়ার টা উঠেছিল ৫ এর উপরে।
৫.৭৫ আর ৫.৫ হওয়ার পর চশমার পাওয়ার বাড়ার দৌড় থেমেছিল। সেটা ২০০৪/২০০৫ সালের মত সময় থেকেই মনে হয়।
অতবছর পর চশমা যেমন নিত্য অভ্যাসের বস্তু হয়েছিল তেমনি চশমার পড়ার বাড়তি ঝামেলাটাও নিত্য হয়েছিল।
উহ! কত যে হ্যাসেল চশমা নামক একটি বাড়তি উপাদান সার্বণিক ব্যবহারের। চশমা নিয়ে কয়েকটা কবিতাও লিখে ফেলেছি অনেকবার।
২০০৪ সালে ছোটবেলার বন্ধু কয়েকজনার সাথে গিয়েছিলাম সেন্টমার্টিন দ্বীপে। সাথে আমেরিকা হতে আসা ঢিল মেরে সেই চশমা ভাঙা বন্ধুটিও ছিল। সেন্ট মার্টিনের স্বচ্ছ পানিতে সাঁতার কাটতে গিয়ে চশমা গেলো খুলে, কাছেই বন্ধু ছোট মামুন দাঁড়ানো ছিল। তাকে বলতেই সেই স্বচ্ছ পানির ভেতর সেটা খুঁজে উঠিয়ে হাতে দিল। ইস যদি না পেতাম কি কষ্টই না হতো। অর্ধকানা হয়ে যেতে হতো। সাথে আর কোন স্পেয়ার চশমা ছিলনা। এরপর থেকে কোথাও গেলে কখনও দুটো চশমা ছাড়া যেতাম না।
কত ছোট ছোট ঘটনা মনে পড়ে যাচ্ছে চশমা নিয়ে আমার চশমা পড়ার কালের। সব কি আর লেখা যায় এই স্বল্প পরিসরে সময় স্বল্পতায়!
মনে পড়ছে ২০০৫ সালে বিসিএস চাকুরীতে জয়েন করা আগে মেডিক্যাল টেস্টে গিয়েছিলাম মিডফোর্ট হাসপাতালে। সেদিন প্রথম প্রার্থী ছিলাম আবার আমি। ঢুকলাম চোখের ডাক্তারের চেম্বারে। ভাগ্য ভাল ঢোকার সাথে সাথে চশমার ভেতর দিয়ে দেখে নিলাম যে লেখা গুলো পড়তে হয় পাওয়ার টেস্টের জন্য।
ডাক্তারের এসিসটেন্ট মহিলাটি চশমা খুলে লেখা পড়তে বলল। আমি কিছু দেখছিলাম না কিন্তু মুখস্ত বলে গেলাম ।
আমার পরে যারা ছিল তারা সেটা আমার মুখ থেকে শোনার পর রুমে ঢোকার আগে শুনে শুনে মুখস্ত করে নিয়ে নিযে ঢুকছিল।কারন অনেকেরই চশমা পড়া ছিল। আমি আজও ঠিক বুঝিনি চশমা পড়া থাকার পরও কেনো চশমা খুলে পড়তে হবে।
ওহ! মজার একটা কথা বলা হয়নি। কাশ সেভেনে থাকতে ক্যাডেট কলেজের ভর্তি পরীায় উত্তীর্ন হয়ে মেডিক্যাল টেস্টে গেলাম। সেটা ছিল আদমজী ক্যান্ট . কলেজ। চশমা নিয়ে ঢুকিনি। ডাক্তার যখন লেখা পড়তে বলল , সবচেয়ে বড় লেখাটা ছিল যতদূর মনে পড়ে ইউ , আমি পড়েছিলাম পি। কাছে গিয়ে দেখেই নিজে লজ্জা পেয়েছিলাম এবং বুঝেছিলাম ক্যাডেটে পড়ার আশা সেখানেই শেষ।
যাক বলতে শুরু করলে বাড়তেই থাকবে।
শেষ করতেই যখন হবে, চশমা হীন কালের কথা একটু বলেই নেই। হঠাৎ কি মনে করে শখ হলো লেসিক করাব। যে ভাবা সে কাজ । ইতিমধ্যে এক বন্ধুর পাওয়ার ৮ এর উপরে দেখলাম লেসিক করিয়ে মোটা কাচের চশমা থেকে মুক্ত হয়েছে। তার কাছ থেকে ভাল করে খোঁজ নিলাম। চিনলাম ওএসবি লেজার ভিশন ,মিরপুর কেন্দ্র টি। সাহস করেই ছুটে গেলাম। ২০০০ টাকা খরচ করে চেক আপ করালাম। ডাক্তার বলল চোখের পেশী ঠিকই আছে। লেসিক করা যাবে। একটা ডেটও দিলেন। দিনটি ছিল ১৩ই ফেব্র“য়ারী। দুচোখের লেসিক খরচ লাগলো ৩২০০০ টাকা। সাথে এক বেকার বন্ধুকে নিয়ে গেলাম। কারন লেসিক করা পড় লম্বা ঘুম না দেয়া অবধি মোটামুটি কানাই থাকতে হবে জানতাম।
(লেসিক করা ২/৩ মিনিট সময় অণ্য রকম একটা অনুভূতি হয়েছিল, সেটা অন্য কোন পোষ্টে ব্যাখ্যা করব।)
সেই মিরপুর থেকে সিএনজি করে বাসায় এসে একটু চোখ খুলে দ্রুত খেয়েই দিয়েছিলাম ৫ ঘন্টা ঘুম। ঘুম থেকে উঠেই চশমা হীন জীবন শুরু।
একটু মজা হয়েছে আজকাল, হঠাৎ দেখে অনেকেই চিনতে পারেনা চশমা হীন এই আমাকে। বিষয়টা বেশ এনজয় করছি আজকাল।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

