( লেখাটি ক্রিটিকস ম্যাগাজিনে অক্টোবর/নভেম্বর ২০০৯ সংখ্যায় প্রকাশিত)
গত রোজার ঈদের তিন/চার দিন আগের কথা, নারায়নগঞ্জ ২ নং গেইটের চৌরাস্তার পূর্ব পাশে বসে আছি ব্যাটারী চালিত থ্রি হুইলারে (এই বাহন নারায়নগঞ্জে বেশ চোখে পড়ে ইদানিং)। গন্তব্য মুক্তারপুর কাঠপট্টির গুদারাঘাট। ব্যাটারি চালিত ঐ বাহনে চারজনের সিট, দুজন মাত্র উঠেছি। সময় বয়ে চলেছে, সদ্য সমাপ্ত সকালবেলাতেও যাত্রী আসছেনা। রাস্তার একপাশ জুড়ে এই নতুন পরিবহণটির লম্বা লাইন রাস্তাকে আরও সরু করে দিয়েছে। হঠাৎ একটা কনষ্টেবল এসে গাড়ীতে একটা মোটা সোটা লাঠির গুতো দিয়ে বলল, ‘ছাড়্ ছাড়্..’-বলেই চলে গেলো, সাথে সাথে এল একজন রাগী পৌঢ় লোক, এবার লাঠির বাড়ী জোরে পড়ল বাহনের গায়, ‘‘ছাড় ...আর লোক লাগবো না এখন’। ড্রাইভার বাধ্যহয়ে দুজনকে নিয়েই ব্যাটারী চালু করল। তারপর সেকি গজ গজ, রাগ আর গালাগালি ড্রাইভারের কণ্ঠে; সেই রাগ নিয়েই বলল, “আইজক্যা চাঁদা দিমু না হালাগোরে, ঐ হালায় লাইনম্যান আমারে ধমকায়! রোজ রোজ ২০ টাকা কইরা দেই লাইনের লাইগ্যা, হেরপরও এই ব্যবহার...।”... সন্ধ্যায় ঠিকই তাকে ২০ টাকা দিতে হবে, এইটা সে যেমন জানে জানি তেমনি আমরা সকলে। আবার এও জানি ঐ টাকার থেকে ট্রাফিক পুলিশ, সার্জেন্টও বখরা নিয়ে থাকে। ঐ লাইনে ৮০ টার বেশী ঐ ধরনের গাড়ী নাকি নেমেছে। হিসেব কষলে মোট চাঁদার পরিমাণ কম হবে না। রাস্তা কার আর সেই রাস্তাায় ব্যাটারী অটোর লাইন বসিয়ে চাঁদা তুলছে কারা!
চাঁদাবাজির এই তো সামান্য এক ধরন মাত্র। এ দেশের প্রকৃত চাঁদাবাজির আদ্যপ্রান্ত বর্ননা করতে গেলে অনেকগুলো বইয়ের মোট মোটা ভলিউম তৈরী হয়ে যাবে। রাস্তার চাঁদাবাজীটা জনগণ প্রত্যক্ষ করে খুব বেশী। যাত্রাবাড়ী মোড় থেকে ঢাকার মূল কেন্দ্রে লোকাল বাসে নিয়মিত যাতায়াত করলেই বুঝবেন কিছু পয়েন্টে কিভাবে হাত পেতে অলিখিত রোড পার্মিট নামে চাঁদা দিতে হচ্ছে। না দিলে উপায় নেই গাড়ী আটকে দেবে। ট্রাফিক পুলিশ ওসব দেখবে না, কারন- এই হলো সিস্টেম। আবার গাড়ীর ফিটনেস বা অন্যান্য কাগজপত্র থাকে না , ফলে তাকেও ঘুষ এর সাথে চাঁদা কে একত্রে বরণ করতে হয় নানান স্থানে। এ চিত্র প্রায় সর্বত্রই এই ঢাকার, এই দেশের। হাইওয়েতে গেলে দেখা যাবে আরও ব্যাপক চাঁদাবাজী। ঢাকায় প্রবেশের বা বাহির হবার জন্য রয়েছে চাঁদা, বিশেষ করে মালবাহী গাড়ীতে তে। আর যাত্রীবাহী গাড়ীগুলোর জন্য সম্ভবত থাকে মাসিক হারে।
রোজার সময় ইফতার পার্টির নামে কত যে চাঁদাবাজি চলে এ দেশে তার খবর আর কতজনাই রাখে। যেসব সরকারী বা আধাসরকারী অফিসে বা কোম্পানীতে শ্রমিক ইউনিয়ন আছে, ইফতার পার্টির টাকা তারা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে চাঁদাবাজি করেই তোলা হয়। এ খুবই পুরাতন প্রাকটিস। পুরাতন বলেই এগুলো সিস্টেম হয়ে গেছে। ঈদ এলেই যে দেশে সর্বত্র আরও ব্যাপকহারে চাঁদাবাজির মহোৎসব শুরু হয়। ঢাকার এক ব্যবসায়ী এলাকায় রোজার সময় এক ব্যবসায়ীর ছেলের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে হুমকি দেয়া হলো, ৫০,০০০ টাকা না দিলে খালাশ হয়ে যাবে ছেলেটা। শেষে ১০,০০০ টাকায় এ রফা হয়েছিল। এটা তো জানা , অজানা আরও কত হাজার এই ঘটনা যে ঘটে প্রতি ঈদের আগে বা অন্য সময়ও।
আমরা জনগণ কি একবার ভেবেছি এই যে দেশের বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো হরহামেশা, নানা সভা, অনুষ্ঠান, ইফতারপার্টি করছে, তাদের এই সব খরচ কোথা থেকে আসছে? খুব স্বাভাবিক ভাবেই রাজনৈতিক দলগুলো অন্তত দলের জন্য কোন ব্যবসা পরিচাল না করে না যেখান থেকে তাদের খরচ আসতে পারে। সুতরায় খরচের একটাই উপায় বিত্তবানদের চাঁদা। দেশ পরিচালনা ও সেবার জন্য যাদের কর্ম তাদের শুরুতেই চাঁদা। এরপর আর চাঁদা থাকবেই বা না কেনো নিম্নস্তরে? এই ফাঁকে একটা সত্য কথা বলে দেই, এ দেশে চাঁদা দেয় মানুষ দুই কারনে, প্রথম- ভয় বা সমস্যা হতে পরিত্রান এর জন্য আর দ্বিতীয়ত-স্বার্থ সিদ্বির আশায়। রাজনৈতিক দলে চাঁদা যারা দেয় তারা যে নিঃসন্দেহে পরের টার কারনে দেয় তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
হিজরা নামের যে শ্রেণীকে সমাজ এবং স্বাভাবিক মানুষ অবজ্ঞা করে চলে তাদের জীবন চলে চাঁদাবাজীরই উপর। কোন এক কারনে মানুষ বিশেষ করে দোকানদাররা ভয় পেয়ে তাদের চাওয়ার আগেই কিছূ না কিছূ চাঁদা দিয়ে দেয়। এইখানে অজ্ঞাতে সমাজে তাদের অবাঞ্চিত ধারনার দূর্বলতাই বেশী কাজ করে বোধহয়। মাঝে মাঝে বাসাবাড়ীতে ও তারা হানা দেয়, কোন নতুন শিশু জন্ম হয়েছে জানলে তারা সেই বাচ্চা কোলে নিয়ে নেচে টেচে বড় অংকের চাঁদা আদায় করবেই।
আরেকটা বিশেষ চাঁদার কথা না বললেই নয়, খুব মর্যাদাময় চাঁদা সেটা। প্রতিটি জেলার ডিসির আওতায় এল.আর ফান্ড নামে একটা বিশেষ ফান্ড রয়েছে। এই ফান্ড জনগণের দেয়া চাঁদা থেকেই নাকি গঠিত হয়। শুনেছি ভিআইপি ব্যক্তিদের আপ্যায়ন ও সকলের অতিরিক্ত উদর পূর্তীর খরচ এইখান থেকে মেটানো হয়। বিগত তত্ত্বাবধায়ক আমলে এই ফান্ড নিয়ে কয়েকদিন পত্রপত্রিকায় খুব লেখা শুরু হতে যাচ্ছিল, তারপর একদিন হঠাৎ করেই বিষয়টির আলোচনা রহিত হয়ে যায়।
মহল্লার মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে এবং উন্নয়ন কাজ চলছে, নির্মাণ ব্যয় এবং পরিচালনা খরচের জন্য মসজিদ কমিটি সিদ্ধান্ত নিল , এলাকার সকল ভাড়াটিয়া দেবে প্রতিমাসে ৫০ টাকা আর বাড়ীওয়ালারা দেবে ১০০ টাকা করে। ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়, নেতিবাচক কোন কথা বলা যাবে না, বাধ্য ঠিক না একেবারে খাসদিলে পূণ্যের আশাতেই সকলে তাই দিয়ে চলেছে নির্ধারিত টাকা। এই ক্ষেত্রে আবার ছাপানো রিসিট ও দেয়া হয়ে থাকে। এই রিসিট দেখে আমার মাথায় হঠাৎ বুদ্ধি এলো , সারাদেশে যেভাবে অরাজকতার মাধ্যমে যত্রতত্র যাচ্ছেতাই ভাবে অসমতায় চাঁদাবাজী চলছে এবং খোদ গোড়াতেই একই গন্ডগোল বিদ্যমান তাই একটাই ভাল উপায়-- রেজিষ্টার্ড চাঁদাবাজ সৃষ্টির একটা পক্রিয়া তৈরী করে এই চাঁদাবাজিকে একটা সভ্যতার আদল দেয়া । ব্যবসা করার জন্য যেমন রেজিষ্ট্রেশন থাকে সেরক একটা ব্যবস্থা থাকবে। সেই রেজিষ্ট্রেশনের বিভিন্ন ভাগ থাকবে অর্থাৎ এক ধরনের চাঁদাবাজির জন্য এক এক ধরনের রেজিষ্ট্রেশন থাকবে, ফি থাকবে, নবায়ন থাকবে, এলাকা ভাগ থাকবে। সে ক্ষেত্রে সেই কমন সমস্যাটা আবার দেখা যাবে যে সমস্যার নাম তদবীর আর ঘুষ। তবুও জনগণতো অযথা হয়রানি হওয়া থেকে রক্ষা পাবে, যা চাঁদা দেবে সেটা তখন রিসিট নিয়েই দেবে। ইনকাম ট্যাক্স দেয়ার সময় সারা বছরের দেয়া চাঁদা খরচের মধ্যে ধরা যাবে। চাঁদার টাকা হতে একটা ট্যাক্স ও সরকার নিতে পারবে। সরকারের আয়ও বাড়বে।
সে ক্ষেত্রে ট্রাফিক আর সার্জেন্টের একটু সমস্যা হতে পারে, অবশ্য বাংগালী বহুত সেয়ানা , একটা আয়ের উপায় এরা বের করেই নেয়। এ দেশে ঢেউ গুণে ঘুষ খাওয়া লাগে না, বালু উড়িয়েও চাঁদাবাজী করতে পারে। বুঝলেননা - বালু উড়িয়ে মানে কি? তাইলে শুনন এক লোক সরকারী কোন এক অফিসের সুপারভাইজার , তার কাজ রাস্তা ঘাট , বা যেকোন রকম স্থাপনাকাজের সুপারভাইজিং করা। কিন্তু তাকে যেখানেই পাঠানো হয় সেখান থেকে চাঁদা তোলে ( ঘুষের গল্পে এটাকে ঘুষ বলেও চালানো যাবে, দুটোর মধ্যে মাঝে মাঝে মিল পাওয়া যায়) । চাঁদা না দিলে সে নানা খুঁত ধরতে থাকে, কাজের সমস্যা সৃষ্টি করতে থাকে। তাই তাকে দেখলেই কণ্ট্রাকটর তার নির্ধারিত চাঁদা বা ঘুষ হাতে গুঁজে দেয়। সে সোজা হেঁটে অন্য কাজে চলে যায়। এমন ভাবে চলতে চলতে একবার তার নামে সরকারের কাছে অনেক নালিশ চলে গেলো। সরকার তাকে বাধ্য হয়ে অফিসে এনে বসিয়ে দিল। এবার তো আরও বড় সুযোগ । ফাইলের গুরুত্ব অনুযায়ী তার চাঁদার রেট নির্ধারণ করা থাকে, কোন ফাইলই সে টাকা ছাড়া ছাড়ে না। আবারও নালিশ। এবার তাকে সরিয়ে দেয়া হলো। পাঠানো হলো ডিমশন করে বিভিন্ন কাজের স্থানে ইট, বালু পাহারা দেয়ার জন্য। শাস্তি সরূপ সেই কাজেই সে যেতে বাধ্য হলো। কিন্তু এ দেশে ইট বালু সবইতো রাস্তার উপরই রাখা হয়। হয়ে গেলো সুযোগ- তার চাঁদাবাজীর উপায়, বালু উড়িয়ে কোন গাড়ি গেলেই সে থামিয়ে ক্ষতিপূরণ দাবী করে , না দিলে বালু নষ্ট করার অভিয়োগে মামলা করবে বলে ভয় দেখায়। বাধ্য হয়ে এক সময় বালু মাড়ানোর আগেই গাড়ীচালকরা তাকে নির্দিষ্ট হারে চাঁদা দিতে শুরু করে দিলো। ...গল্পটা একটু সরল হলেও এদেশের সিস্টেমের চরিত্র এমনই নেতিবাচক বহু ক্ষেত্রে।
মদ্দ কথা যার যেখানে জোড় সে সেখানে চাঁদা আদায় করেই চলেছে। কোন স্থানে কোন সরকারী কাজ চলবে আর স্থানীয় দলীয় ক্ষমতাধররা এবং নানা স্তরের ক্ষমতাশালীরা সেই কাজের অর্থের থেকে চাঁদা আদায় করে না তেমন অবস্থাই বাস্তবে এ দেশে কম। কিন্তু ভুক্তভুগীরা কেউ মুখ খোলে না। সবাই দিচ্ছি, ক্ষমতা পেলেই আবার ঘুষ আর চাঁদায় বিত্তবান হওয়ার নেশায় গা ভাসাচ্ছি। এসবই পুরাতন , জানা কথাবার্তা আসলে, কিন্তু বদলাচ্ছে না কেউ । হয়তো সভ্যতা বাড়ছে বলেই ভাবছি বদলানো যাবে না অথবা হয়তো একদিন সত্যি সকল চাঁদা আদায়কারী হয়ে যাবে রেজিষ্টার্ট চাঁদাবাজ।
এ দেশের চাঁদাবাজীর কথা শেষ করা আমার সাধ্য নয়, শুধু শেষে এক সাংবাদিক বন্ধুর একটা কথা উদ্ধৃত না করলেই নয়; তাকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, “অনেক সাংবাদিকদের নামে বেশ বদনাম শোনা যায়, তারা নাকি পত্রিকায় বদনাম বা কুৎসা লিখে হেয় করার ভয় দেখিয়ে অনেকের কাছ থেকে নানা সুবিধা আর অর্থ লাভ করে থাকে? এরকম হলে সত্যটা কাগজে ফুটিয়ে তুলবে কে?” বন্ধুবর উত্তর দিয়েছিল, “কারও মনে দূর্বলতা থাকলেই সে ভয় পায়, আর ওমন কাজ করে যেসব সাংবাদিক তারা ঐ সুযোগটাই নেয়। সাংবাদিকদের তাই দোষ দিয়ে লাভ নেয়, যারা বড় বড় অন্যায় আর অর্থ মেরেকেটে খাচ্ছে তাদের থেকে সামান্যই সাংবাদিকরা ওভাবে নিয়ে থাকে...”।
আসলে আমাদের মন মানসিকার সাথে চাঁদাবাজি লেপ্টে গেছে। চাঁদাবাজি থেকে পরিত্রান তাই দুরুহই নয় অসম্ভব। কারন সবাই মেনে নেয় আর ধরেই নেয় এ দেশে এ সবই সিস্টেম।
///
মামুন ম. আজিজ
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জানুয়ারি, ২০১০ রাত ১২:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


