২২ মার্চ, ২০১১ রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ৩৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, “আওয়ামীলীগ কখনোই পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ্ পরিপন্থী কোনো আইন প্রণয়ন করেনি, ভবিষ্যতেও করবে না”। এ বক্তব্য ইসলাম প্রিয় এবং অপ্রিয় উভয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে তা জোর দিয়েই বলা যায়। প্রধানমন্ত্রী আগ বাড়িয়ে কিছু অতিরিক্ত কথা বলার জন্যে বিভিন্ন সময় সমালোচিত হয়েছেন তা আমাদের সকলের জানা। কিন্তু ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আওয়ামীলীগের কুরআন ও সুন্নাহ্ বিরোধী আইন প্রণয়ন করা ও না করা নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন সে কারণে তিনি সমালোচিত হবেন কিনা তা ভবিষ্যতই বলবে। তবে তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের সাথে বক্তবটি যে বেমানান তা তাঁর সুহৃদরা মুখে না বললেও অন্তরে বিশ্বাস করবেন। কুরআন ও সুন্নাহ্ পরিপন্থী কোনো আইন প্রণয়ন না করার অর্থ প্রধানমন্ত্রী সঠিকভাবে উপলব্ধি করেছেন কিনা তাতে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কোন আইন যদি কুরআন ও সুন্নাহ্ পরিপন্থী না হয় তাহলে তা কুরআন ও সুন্নাহর পক্ষে হয়। আওয়ামীলীগ কি কুরআন ও সুন্নাহর পক্ষে কোন আইন কোন সময় প্রণয়ন করেছে? উত্তর আমাদের সবার জানা। তাহলে তিনি নতুন কোন তত্ত্ব প্রকাশ করতে চাচ্ছেন?
প্রথমেই আওয়ামীলীগ কোন আদর্শের ভিত্তিতে দেশ পরিচলানা করার জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ তা জেনে নেয়া দরকার। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেন প্যালেসে 'আওয়ামী মুসলিম লীগ' নামে প্রথমে এ সংগঠনটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। কিন্তু অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র ধারণ করার লক্ষ্যে দলটি পরবর্তিতে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে শুধুমাত্র ‘আওয়ামীলীগ’ হিসাবে যাত্রা অব্যহত রাখে। আর মুসলিম শব্দ থাকার কারণেই কোন দল ধর্মীয় আদর্শে উদ্বুদ্ধ তাও বলা যায়না যতক্ষননা তাদের সংবিধানকে (গঠনতন্ত্র) ধর্মীয় আদর্শের আলোকে সাজানো হয়। 'আওয়ামী মুসলিম লীগের' সংবিধানে তা ছিলওনা। 'আওয়ামী মুসলিম লীগ' আর ‘আওয়ামীলীগের’ মধ্যে নাম ছাড়া গুণগত কোন পার্থক্য নেই। কাজেই স্পষ্ট করে বলা যায় আওয়ামীলীগ কোন সময়ই ধর্মীয় আদর্শের ভিত্তিতে দল পরিচালনা করার জন্য অঙ্গিকারাবদ্ধ ছিলনা। একই সাথে এ কথাও বলা যেতে পারে আওয়ামীলীগ সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী কোন দলও নয়। এখন মুখে সমাজতন্ত্রের কথা বললেও আওয়ামীলীগ আসলে পুঁজিবাদী দর্শনে বিশ্বাসী একটি দল।
আমাদের প্রধানমন্ত্রী কুরআন ও সুন্নাহ্ পরিপন্থী আইন বলতে হয়তো ইসলামের ৫টি বুনিয়াদ যথা; শাহাদাহ্ (কালেমা), সালাত (নামাজ) সিয়াম (রোজা), হজ্জ ও যাকাতের বিরুদ্ধে কোন আইন প্রণয়নকে বুঝিয়ে থাকেন। প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর দলের নেতা কর্মীরা বুঝতে পারেননা অথবা বুঝার চেষ্টা করেননা কুরআন ও সুন্নাহ্ হচ্ছে মানব জাতির জন্য একটা পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। কাজেই ব্যক্তি জীবনের দৈনন্দিন কাজ-কর্ম, রাজনীতি পরিচালনা অথবা জীবনের অন্য যে কোন ক্ষেত্রে এমন আইন রচনা করা যা কুরআন ও সুন্নাহ্ সমর্থিত নয় তাই হবে কুরআন ও সুন্নাহ্ পরিপন্থী আইন।
প্রধানমন্ত্রী যদি নারী উন্নয়ন নীতিমালা কুরআন-সুন্নাহ্ বিরোধী নয় বলতেন তাহলে হয়তো আমরা আমাদের আলোচনাকে এখানেই সীমাবদ্ধ রাখতে পারতাম। কিন্তু তিনি যে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন তা হলো- আওয়ামীলীগ কখনোই পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ্ পরিপন্থী কোনো আইন প্রণয়ন করেনি, ভবিষ্যতেও করবে না। আওয়ামীলীগ অতীতে কুরআন ও সুন্নাহর আইনের ব্যাপারে কি করেছিল এবং ভবিষ্যতে কি করবে সেটাতে জোর দিচ্ছে বেশী। কিন্তু আমরা তাদের অতীতের কুরআন ও সুন্নাহ্ পরিপন্থী কর্মকাণ্ডের চেয়ে বর্তমান কর্মকাণ্ড নিয়ে বেশী উদ্বিগ্ন।
আওয়ামীলীগ পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ্ পরিপন্থী কোনো আইন অতীতে প্রণয়ন করেছিল কিনা এবং বর্তমানে করছে কিনা তা হবে আজকের আলোচনার প্রতিপাদ্য বিষয়। আর ভবিষ্যতে কি করবে সেটাতো পরের ব্যাপার।
এখানে আরো একটি বিষয় পরিস্কার করা দরকার বলে মনে করছি। তা হলো কোন আইন প্রণয়ন করা এবং প্রণীত আইন গ্রহণ করার মধ্যে মূলতঃ কোন পার্থক্য নেই। ১৯৭২ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সংবিধান রচনা, নতুন আইন প্রণয়ন এবং বৃটিশ ও পাকিস্তান আমল থেকে চলে আসা আগের আইন গুলি গ্রহণ যেটিই হোকনা কেন তা করেছিল আওয়ামীলীগ সরকার। এখন দেখতে হবে আওয়ামীলীগ সরকার যা প্রণয়ন করেছিল এবং আগে থেকে চলে আসা আইনের যেগুলি গ্রহণ করেছিল সেগুলি কুরআন ও সুন্নাহ্ বিরোধী কিনা।
সংবিধানে উল্লেখিত রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতির মধ্যে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরক্ষেতাবাদ কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী মতবাদ। সমাজতন্ত্র হচ্ছে একটি কুফরি মতবাদ। এ মতবাদে আল্লাহর অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হয়েছে। কুরআনকে ভূলভ্রান্তিতে ভরা মানুষের তৈরে একটি বই এবং নবী-রাসুলগণকে আল্লাহর পক্ষ থেকে অহী প্রাপ্ত মহাপুরুষ না মেনে অন্যান্য সাধারণ মানুষের মত বলে প্রচার করে। অতএব সমাজতন্ত্রকে মূলনীতির মধ্যে স্থান দেয়ার পরেও কি বলা যাবে আওয়ামীলীগ কুরআন-সুন্নাহ্ বিরোধী আইন প্রণয়ন করেনি?
ধর্মনিরপেক্ষতাবাদও আরো একটি কুফরি মতবাদ। এ মতবাদের প্রবক্তাগণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের কাজ-কর্ম বিশেষ করে রাজনীতি ও শিক্ষাকে ধর্মীয় প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার শিক্ষা দেয় এবং গণতন্ত্রের উপর ভর করে তা বাস্তবায়ন করে। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের এ শিক্ষা কুরআনের সার্বজনীনতাকে সাংঘাতিক ভাবে আঘাত হানে। তার পরেও কি আমাদেরকে বলতেই হবে আওয়ামীলীগ কুরআন ও সুন্নাহর বিরোধী নয়?
আল্লাহ্ পবিত্র কুরআনে বলেন, “চোর, পুরুষ বা নারী যেই হোক না কেন, উভয়ের হাত কেটে দাও। এটা তাদের কর্মফল এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। আল্লাহর শক্তি সবার ওপর বিজয়ী এবং তিনি জ্ঞানী ও সর্বজ্ঞ”। (সুরা মায়েদা : ৩৮)
চোরকে শাস্তি প্রদান করার ব্যবস্থা কোন ব্যক্তির নয় রাষ্ট্রকেই করতে হয়। অতীতের এবং বর্তমানের আওয়ামী সরকারের পক্ষে কেউ সাক্ষ্য দিতে পারবেনা তারা চুরি করার শাস্তি কুরআনের বিধান অনুযায়ী করেছিল। যদি তা না হয় তাহলে তাদের দেয়া চোরের শাস্তির বিধান কুরআনের বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক এবং তা প্রণয়ন করা বা মানা হচ্ছে কুরআনের পরিপন্থী।
আল্লাহ্ পবিত্র কুরআনে অন্য এক আয়াতে বলেন, “তাওরাতে আমি ইহুদীদের জন্য এ বিধান লিখে দিয়েছিলাম যে প্রাণের বদলে প্রাণ, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, দাঁতের বদলে দাঁত এবং সব রকমের যখমের জন্য সমপর্যায়ের বদলা। তারপর যে ব্যক্তি ঐ শাস্তি সাদকা করে দেবে তা তার জন্য কাফ্ফারায় পরিণত হবে। আর যারা আল্লাহর নাযিল করা আইন অনুযায়ী ফায়সালা করে না তারাই জালেম”। (সুরা মায়েদা : ৪৫)
আওয়ামী সরকারের বদলা নেয়ার বিধান কি কুরআনের অনুরূপ? যদি না হয় তাহলে তা হবে কূরআনের পরিপন্থী এবং আমরা নিশ্চিত ভাবেই বলতে পারি আওয়ামীলীগের প্রণিত আইন কুরআন থেকে উৎসারিত নয়।
পর্দার বিধান নিজে মানা এবং আপরকে মানার ব্যপারে উৎসাহিত করার ব্যাপারে কুরআন নির্দেশ দিয়েছে। কিছুদিন আগে কোর্ট পর্দার ব্যাপারে কি নির্দেশ দিয়েছে দেশের জনগণ তা জানে। এবং দেশের জনগণ এটাও জানে কোর্টের দেয়া নির্দেশ কুরআন ও সুন্নাহ্ পরিপন্থী। পর্দার ব্যাপারে দেয়া রায় আওয়ামীলীগাররা গ্রহণ করে নিয়েছে। কারণ তাদের নিকট আল্লাহর বিধানের চেয়ে কোর্টের রায় অধিক মর্যাদা পূর্ণ।
“ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী উভয়ের প্রত্যেককে এক শত বেত্রাঘাত করো। আর আল্লাহর দীনের ব্যাপারে তাদের প্রতি কোন মমত্ববোধ ও করুণা যেন তোমাদের মধ্যে না জাগে যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান আনো। আর তাদেরকে শাস্তি দেবার সময় মু’মিনদের একটি দল যেন উপস্থিত থাকে”। (আন নূর : ২) – আওয়ামী সরকার কি ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারীদের জন্য কুরআনের এ আইন মানছে?
নারী উন্নয়ন নীতিমালা এবং শিক্ষানীতি নিয়ে রাজপথ এখন উত্তাল। সরকার যতই বুঝানোর চেষ্টা করুক এগুলি কুরআন ও সুন্নাহ্ বিরোধী নয় কিন্তু জনগণ বিশেষ করে আলেম-উলামাগণ তা বাতিলের জন্য প্রাণপন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ধর্মপ্রাণ মানুষদের তারা যতই বোকা ভাবুক না কেন তাঁরা ঠিকই উল্লিখিত নীতিমালাগুলির ইসলাম বিরোধী চরিত্র উদ্ধার করেছেন।
নারী উন্নয়ন নীতিমালা যদি কুরআন ও সুন্নাহ্ পরিপন্থী না হয় তাহলে তো আওয়ামী সরকার নির্দিধায় বলতে পারে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে নারী উন্নয়নের জন্য সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিন্তু তা না করে জনগণের চোখে ধুলো দিয়ে ছল চাতুরির আশ্রয় নেয়া হচ্ছে কেন? আল্লাহর দৃস্টিতে নারী ও পুরুষ সমান তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। সমতা রক্ষা কিভাবে হবে সে জন্য আল্লাহ্ বিধানও দিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ্ সমান বলেছেন তাই নিজের ইচ্ছানুযায়ী কেটে-ছেঁটে সমান করবেন তাতো হয়না।
মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধূনিকি করণের নামে ইসলামের মুলে আঘাত করে ধর্মীয় শিক্ষার আসল উদ্দেশ্যকে সংকুচিত করলেও তা নিয়ে দেশের তৌহিদী জনতা কথা বলবেনা তা ভাবা উচিত নয়।
আওয়ামীলীগ সরকারের কুরআন ও সুন্নাহ্ পরিপন্থী কাজের কিছু উদাহরণ উপরে উল্লেখ করা হলো মাত্র। একই ভাবে আরো অনেক দলিল দেয়া যাবে যার দ্বারা প্রমাণ করা সম্ভব হবে আওয়ামীলীগ সরকার অতীতে ও বর্তমানে শতভাগ কুরআন ও সুন্নাহ্ পরিপন্থী আইন প্রণয়নে লিপ্ত ছিল এবং আছে।
পরের ঘাড়ে বন্দুক রেখে শিকার করার প্রবণতা এ সরকারের একটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে বিচার বিভাগ, আমলা, ধর্মের ছদ্মাবরণে কিছু তথাকথিত আলেম-উলামা এবং সরকারী বিভিন্ন বিভাগের কর্মচারীরা নিজেদের কার্য কলাপের মাধ্যমে সরকারকে খুশী রেখে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করে থাকে। বর্তমানেও আমরা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি লক্ষ্য করছি। অনেক সময় ঐসব আলেমগণের ও অন্যান্যদের ভূমিকাতে জনগণ বিভ্রান্ত হয়। সুবিধাবাদী কিছু আলেমকে পাশে রেখে বুঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকার ইসলাম বিরোধী নয়। আওয়ামীলীগ দলীয় ভাবে আদর্শ হিসাবে কুরআন ও সুন্নাহকে গ্রহণ করেনি এটা সর্বজন বিদিত। তাই কুরআন ও সুন্নাহ্ পরিপন্থী আইন প্রণয়ন করতে না চাইলে দলীয়ভাবে প্রথমে আদর্শ হিসাবে ইসলামকে গ্রহণ করতে হবে। তারপর জনগণকে বুঝানোর চেষ্টা করতে হবে আওয়ামীলীগ কুরআন ও সুন্নাহ্ পরিপন্থী আইন প্রণয়ন করবে না।
কপি পেষ্ট (আব্দুল মান্নান)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

