------------
কেউ বলল বগা লেক যেতে লাগবে ৬/৭ ঘন্টা , কেউ বলল হাঁটতেও হবে ২/৩ ঘন্টা। নানারকম ভীতি সঞ্চারী কথা আসছিল কানে। কেউ বলল চাঁদের গাড়ীর ভাড়াই লাগবে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা। কেউ তো আবার বলেও ফেলল বগা লেকে শান্তি বাহিনী ধরে নিয়ে যেতে পারে। কোন নিশ্চয়তা নেই। এর মধ্যে আবার রহিম ভাইও ভয় পাচ্ছিলেন , তিনি স্পষ্ট মুখের উপর না বলতে পারলেও চাচ্ছিলেন আমরা কাল সকালের মধ্যেই যেন কক্সবাজার ফিরে যাই । তিনি ইতোমধ্যে বুঝে গেঝেন এই পাগলের দল সকালে থাকলেই শত বিপত্তি এড়িয়েও বগা লেকে রওয়ানা দিয়ে বসবে।
সফর সঙ্গীদের মাঝে সাবধানী, অতি সাবধানী আর দুঃসাহসী বিভাজনে ডিসিশান নেয়ার ক্ষেত্রে আরও জট পাকিয়ে যাচ্ছিল। খেতে খেতে যাই হোক মোটামুটি ডিসিশন হলো আশেপাশের দেখার মতো যা যা আছে এখন থেকে সন্ধ্যের মধ্যে ঘুওে আসব। রতে থাকবই। বগা লেকের সিদ্ধান্ত পরে হবে।
ইস্ তখনও যদি কেউ বলত বগা লেকে থাকার ব্যবস্থা আছে। তাহলে ঐ দুপুরেই ছুটতাম। থাকতাম রাতে। কেউ ঠেকে শেখে আর কেউ দেখে। আমরা দুটোই। আসলে ইনফরমেশন জ্ঞাপ থেকে ইনফরমেশন গ্যাদার করার মাঝে আলাদা একটা মজাও আছে।
হোটলে ঢুকে মোটামুটি ফ্রেশ হয়ে আমরা যখন দৃশ্য দর্শনের নেশায় রওয়ানা হলাম তখন তপ্ত দুপুর। ঘড়িতে ৩টার মতো। শুনেছি কাছেই পাহাড়ে ঝর্ণা আছে। সেখানে গোসল করব বলে গোসল ছাড়াই প্রিপারেশন নিয়ে বের হলাম আমরা।
গাড়ী ছুটে চলল। বান্দরবান শহর ছাড়িয়ে ধীরে ধীরে উঠে যেতে লাগলাম। পাহাড়ী পথ ধরে উপরে। পেছনে বান্দরবন শহরের একাশং। পাহাড়ী ঢালে ঘর বাড়ী দালান। আরেকটু এগিয়ে সামনে বায়ে গভীর খাদ। দূরে সারি সারি পাহাড়। মাঝে অনেকটা সমতল আর ছোট টিলার সমারোহ। এসবের মাঝেই স্পষ্ট দেখলাম পানির একটা আঁকাবাঁকা প্রবাহ। ওটাই বান্দরবানের বিখ্যাত সাঙ্গু নদী। আমরা ৩০০/৪০০ ফুট উপরে থাকায় নদীটাকে বেশ সরুই লাগছিল।
পথের ডানে ছোট ছোট পাহাড় আর টিলা চলে গেছে একদম কক্সবাজার চিটাগাং হাইওয়ে পর্যন্ত অনেক দূর। ডানে কাছেই একটা বেশ উঁচু পাহাড় এর উপর ছাউনী দেখতে পেলাম। ওটাই ‘নীলাচল’ । আরেকটি পর্যটন কেন্দ্র। উল্টো পথে মেঘলা যাবার সময় বামে নীলাচলের পথ চলে গেছে । এটি বেশ নতুন একটি স্থান । সূর্য ডোবা দেখার জন্যে ভালো। সময়ের অভাবে অবশ্য যাোয়া হয়ে ওঠেনি নীলাচল পাহাড়ে।
৫ কিমি পথ পাড়ি দিয়ে সামনে বায়ে পড়ল মেলিসা রিসোর্ট। বেশ বড় এলাকা ।ভেতরে অবশ্য ঢোকার ইচ্ছে হলো না । এখানে একটা পুলিশ ক্যামপও দেখা গেলো । আমাদের জিজ্ঞেসাবাদ করলো।
সামনে ছোট একটা বাজার মতো পাওয়া গেলো। পাশে দীর্ঘ সিড়ি নেমে গেছে নিচে পাথুড়ে খাদে। নিচের খাদে দেখলাম পানিতে গোসল করছে অনেক উপজাতি। এটিই সেই ঝর্ণা ধারা। নাম শৈল প্রপাত। বান্দরবান শহর হতে এর দূরত্ব চার(৪) কিমি। ঠিক করলাম চিম্বুক পাহাড় দেখে ফিরে আসার সময় নামব।
বান্দরবানে আসলে পাহাড়ে ওঠা হোক আর না হোক এখানে অবশ্যই আসা উচিৎ। পাহাড় ঘূরে আসি । ফেরার সময় জানাব --কারণ।
শৈল প্রপাত পেড়িয়ে যেতে যেতে রাস্তার দুধারে মাঝে মাঝে উপজাতিদের কুটির দেখতে পেলাম আমরা। জানলাম এদের সবাই ব্যোম উপজাতি। বান্দরবান শহরে এবং আশেপাশে পাহাড়ে মূলত ব্যেম আর মারমা উপজাতিদেরই আধিক্য।
উঠতে উঠতে আমাদের গাড়ী আকঁবাকাঁ পথ পেড়িয়ে বেশ উপওে উঠে গেলো। পাহাড়ের কোল ঘেষেঁ ঘেঁষে খাদের কিনার ধরে ধরে রাস্তা এগিয়ে গেছে। এখনও পর্যন্ত রাস্তার পিচ যথেষ্ট ভালোই পেলাম। পাহাড়ে পাহাড়ে দৃশ্যগুলোর মধ্যে এত ব্যাপক বৈচিত্র্যতা ছিল যে আমরা বার বার মুগ্ধ হয়ে তাকাচ্ছিলাম। কোথাও ঘন জঙ্গল। কোথাও বাঁশের ঘন বন। লম্বা লম্বা বাশঁ উঠে গেছে উঁচু পাহড়ে আরও উপরে। কোথাও পাহাড় ঢালে বিশাল বিশাল গাছ।
মাঝে মাঝে কিছু পাহাড়কে উলঙ্গ মনে হচ্ছিল। জুম চাষের জন্য আগুন দিয়ে পুড়িয়ে পাহাড়ের উপরের সব গাছ পালা পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে বলেই ওমন লাগছিল। নিচে খাদে তাকিয়ে অনেক পাহাড়কেই জ্বলতে দেখলাম। সম্ভবত এই কারনেই এই দীর্ঘ ভ্রমন পথের কোথাও বান্দরবানে আমরা একটা বন্য জন্তুও দেখিনাই। অবশ্য পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া পাহাড়গুলো বেশ লাগছিল। হঠাৎ আমাদেও পাশেই একটা বন পুড়তে দেখলাম। চোখে পেলাম ধোঁয়ার আঁচও। গাড়ী চালাতে গেলে এই আগুনের ব্যাপারটা খেয়াল রাখা উচিৎ ড্রাইভারের। বেশ উচূঁতে প্রসস্থ একটা স্থানে গাড়ী থামিয়ে নামলাম আমরা। অদূরে নিচে একটা টিলা জ্বলছিল। তার আগুনের ধোয়া আর মেঘ মিলেমিশে অভাবনীয় যে দৃশ্যেও অবতাড়না করল তাতে আমাদের নয়ন তো জুড়ালোই সাথে চারদিকের সুবজ আর সুবজে উজ্জীবীত হলো প্রাণ।
এই জায়গায় নামা মাত্রই সবার মোবাইলে নেটওয়ার্ক এর আবির্ভাব হলো। প্রয়োজনীয় ফোন করা শুরু করে দিল সবাই। আমার কেন জান কাউকে ফোন করতেই ইচ্ছে করল না। পাহাড়ের সৌন্দর্যে আমি মুগ্ধ হয়ে তুললাম কেবল ছবি। ডান দিকেদূরে চিটাগাং কক্সবাজার হাইওয়ে । মাঝে প্রতিবন্ধতা নেই , তাই এতো বেশী নেটওয়ার্ক। ।
এ্খান থেকে আরও কিছুদূর সামনে যেতেই পথ দুদিকে ভাগ হয়ে গেছে। বামে রুমা উপজেলার পথ। ওপথেই বগা লেক আর কেওকারাডং। আর ডানের পথ চলে গেছে চিম্বুক পাহাড় পেড়িয়ে থানছি উপজেলায় । ওদিকে থানছি পেরোলে বিজয় ( প্রাক্তন তাজিংডং) নামের পাহাড়েও যাওয়া যায় শুনলাম। জানলাম থানছি হতে পাহাড়ি পথে খুব কাছেই নাকি লোহাগড়া। ওতদূর যাবার সময় এবার হয়নি আমাদের। ডানে মোড় নিয়ে আর্মি ক্যাম্প থেকে অনুমতি নিয়ে এগিয়ে যেতেই চোখে ধরা পড়ল চিম্বুক পাহাড়। দৃশ্যমান এরিয়ার মধ্যে ওটাই সবচেয় উঁচু পাহাড়। পাহাড়ের উপর একটা অনেক উঁচু টাওয়ার দেখতে পেলাম। থানছির পথ এড়িয়ে হঠাৎ উপরে চিম্বুকের চূড়ায় উঠে গেলো আমাদের গাড়ী।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা মে, ২০০৭ বিকাল ৫:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

