----------------------------------------------------
বেইলী ব্রীজটার উপর গাড়ী আসতেই নিচে চোখ যায় শৈলপ্রপাতে। উপর থেকেই বোঝা যাচ্ছিল পানি তেমন একটা নেই। প্রবাহটা বেশ অপ্রসস্থ এখন। তবে বর্ষাকালে প্রবাহ অনেক বেড়ে যায়। এর মধ্যে যে জায়গাটুকু একটু গভীর এবং পানি বেশী সেখানে উপজাতি মেয়েরা স্নানে নেমেছে উপর থেকেই দেখলাম।
ফর্সা আর ছোট ছোট চোখের সুদর্শন মেয়েগুলোর স্নান দৃশ্য হতে চোখ এড়াতে চাইলেও পর্যটকদের আড়চোখের দৃষ্টি যে মাঝে মাঝেই চলে যাচ্ছিল সে দিকে পর্যটক হিসেবে সেটা আমরাও অনুভব করলাম।
নিচে নামার জন্যে পর্যটন থেকে সুন্দর রেলিয়ের সিড়ি করে দেয়া হয়েছে। সিড়িতে নামার আগে পথের উপর উপজাতি মেয়ে আর শিশুরা পণ্যের পসার সাজিয়ে বসেছে। সেখানে দেখলাম বিক্রি হচ্ছে তাদের হাতে তৈরী নানান পোষাক , চাদর ঝুড়ি টুরি।
শৈলপ্রপাতের পেছনে পাহাড়ের প্রায় উপরে পড়েই যাচ্ছে সূর্যটা। আর ধরে রাখা যাবেনা তাকে বেশিক্ষণ বোঝা যাচ্ছিল।
সিড়ির পাশে একটা আম গাছ থেকে টুপ করে করিম ভাইয়ের সামনে আম পড়লো। করিম ভাই হাতে নিতেই একটা দ্বাদশী ব্যোম মেয়ে এসে বলল ওটা তার আম। সে পেড়েছ। করিম ভাই বলল , তুমি বাংলা জান। উত্তর এসেছিল দারুন, ‘কেনো জানবনা, আমরা এদেশের মানুষ না।’
শুনে ভাল লাগল কোন এক অজানা কারনে। উপজাতিদের বেশীর ভাগই যেখানে দেখি বৌদ্ধ সেখানে এই ব্যোম উপজাতির বেশীর ভাগই দেখলাম এখানে খ্রীষ্টান। একটু অবাক হলাম।
সিড়ি বেয়ে নিচে নামতেই মন জুড়ায়ে গেল। পাথড়ের ভাজগুলো যে এত সুন্দর চোখে না দেখলে বোঝানো যাবেনা। সেই ভাঁজ এর মাঝে শৈল প্রবাহ। সরু কিন্তু চটুল। এত সুরু প্রবাহে কি করে গোসল করব আমরা ভেবেই পেলাম না। আর যেখানটাতে একটু বেশী পানি জমে গভীরতা হয়েছে সেখানে চোখই মেলতে সবাই আড়ে আড়ে , গোসল করতে নামব কি করে। গোসলের চিন্তা সবাই বাদ দিলাম। চারপাশটা ঘুরে ঘুরে দেখলাম।
পূর্ব দিকটাতে মানে যে দিকটা হতে পানির প্রবাহ আসছে সেদিকে কিছুদূর এগোলাম। ঘন আধার সামনে। পাহাড়ের ভিতর চলে গেছে পাথড়ের দেয়াল। সেই ভেতর থেকে পানি আসছে। গা ছমছম করতে থাকায় বেশীদূর এগোনো গেলোনা। আশ্চর্য কোথায় কোন গহীন হতে পানি আসছে তো আসছেই, কোন বিরতি নেই।
ফেরার জন্যে উল্টো দিকে ঘুরে সামনে এগাতেই একটা তরুনীর বস্ত্র উন্মোচনের দৃশ্যে চোখ চলে গেলো। এই চোখ বড় সমস্যাজনক। না বেশীক্ষণ নিচে থাকলে আরও অনেক অনাহুত দৃশ্যে চোখ চলে যাবে অজান্তে , উপরে উঠেই এলাম সবাই।
উপজাতিদের দোকানে চায়ে চুমুক দিয়েই মনে পড়ল, পানি তো এই প্রপাতেরই। কিন্তু কি আর করার খেয়েই নিলাম। অসম্ভব মিষ্টি।
একটা ছোট মেয়ে আম পাড়ছিল। চাইতেই দিয়ে দিল। দাম নিলনা। যাক মুখের সেই অসম্ভব মিষ্টি ভাবটা কেটে গেলো।
এই শৈলপ্রপাত টা বান্দবান শহর হেত মাত্র ৮ কি মি দূরে। পাহাড়ে উঠতে অনেক রিক্স থাকলেও এখানে আসতে তেমন একটা রিক্স নেই। বান্দরবান শহরে এলে তাই অন্তত এই প্রপাত দর্শন মিস করা উচিৎ নয়।
সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। তাড়াতাড়ি না গেলে নীলাচল যাওয়া যাবেনা। কিন্তু বান্দরবান শহরে ঢুকে প্লান চ্যাঞ্জ হলো। ভাগ্যিস হয়েছিল না হলে বালাখালি আর যাওয়াই হতোনা।
বালাখালী শহরের অন্য প্রান্তে। ওদিক দিয়েই রাঙামাটির পথ। আমরা যাচ্ছিলাম বালাখালি বৌদ্ধ মন্দির দেখতে। পথে দেখলাম বান্দরবানের আর্মি আর পুলিশ ক্যাম্প। পাহাড়ের মাঝে সমতলে বেশ সুন্দর । পথের এপাশে আর অপাশে।
মন্দির টা একটা উচুঁ পাহাড়ের উপর। অনেক গুলো সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে হলো। পা সারাদিনের ধকলে যেন আর পারছিলনা উপরে উঠতে। কিন্তু উপরে উঠে মন্দিরের রূপ দর্শনে ভরে গেলো মন। মূল মন্দিরের উপরে উঠলাম কতৃপক্ষের অনুমতি আর অর্থ প্রদান পূর্বক ( ঠিক টিকিট টাইপ নয়)। অবশ্য সাথে আশফাক ভাই উঠতে পারলেন না। ওনার হাফপ্যান্টটা একদম হাঁটুর নিচে থাকায় ওনাকে না ওঠার অনুরোধ করলো বৌদ্ধ ভিুক মহাদয়। কি আর করার কষ্ট কওে নিচেই নেমে গেলেন।
আমরা উপরে উঠলাম যে কজন তারা তো ভীষণ মুগ্ধহলাম। চীন জাপানের ছবিতে দেখেছি এমন অপরূপ বৌদ্ধ মন্দির। বাংলাদেশে দেখলাম এই প্রথম। চারদিকে গোল করে বাউন্ডারী দিয়ে নিপুণ কারুকার্জে পুরো মন্দির তৈরী। ভেতরে ঢোকার অনুমতি না থাকলেও দরজা দিয়ে দেখলাম নিপুণ কারুকার্জ আর বৌদ্ধ মুর্তি। অনুমতি ছাড়া ছবি তোলা নিষেধ থাকলেও চুরি করে কিছু ছবি তোলার ইচ্ছে দমন করা গেলোনা।
অবশ্য আমারা নামার পর জীবন আর নাসিম দেখলাম অনুমতি নিয়েই ধুমছে ছবি তুলছে।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই মে, ২০০৭ সকাল ১০:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


