------------------------
আবার সেই পথ, সেই অবারিত সৌন্দর্য , সবুজ পাহাড়ে রোদের ঝিলিক , আগুন জ্বলতে থাকা পাহাড়ের ধোয়া দেখতে দেখতে ফিরে যেতে লাগলাম আমরা । সেই খাদ ছোয়া ভীতির পথে এবার নিচের দিকে নামার পালা। রিস্কটা টাই আগের চেয়েও একটু বেশী। মাথা টাও ধরেছিল। পেটে ভীষন ক্ষুধা। রুমা পৌঁছে একটু বিশ্রাম নিলাম সবাই। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছিল পথেই। রুমাতে একটু বেশী ক্ষণ পেলাম। ভয় হচ্ছিল বেশী বৃষ্টি হলে আবার পথে কোন সমস্যা হয় কিনা। গুড়ি গুড়িই ;এর বেশী আর হলো না বলে রা। আর্মি ক্যাম্পে এখানে আবারও ইনফর্ম করে আসতে হলো।
রুমার স্থানীয় হাসপাতালের একজন এমপ্লয়ি অনুরোধ করলেন বিশেষ ভাবে তাকে একটু আমাদের গাড়ীতে লিফট দেয়ার জন্যে। তিনি একজন ব্যেম উপজাতীয় লোক। অনুরোধ ফেলতে পারলাম না। অবশ্য লাভ হয়েছে তাকে নিয়ে । পথে বেশ মজার একটা রূপকথা শোনা গেলো তার কাছ থেকে।
রুমা হতে ফেরার পথে নদী তীরে এসে এবার আমারা পায়ে হেঁটেই পার হলাম। হাঁটুরও নিচে পানি। ওপারে সেই দূর্ধর্ষ দশ লেখা বড় ক্যাম্পটাতে ইনফর্ম করে আমরা এগিয়ে চললাম বান্দরবানের দিকে। উপজাতি লোকটা আর মাষ্টার সাহেব গল্প জুড়ে দিয়েছিলেন, বগা লেক নিয়ে গবেষণা চলছিল দুজনার।
মাষ্টার বলছিলেন, একটা বিশাল বড় পাহাড় নিচে ডেবে গেছে আর তাই লেকের নিচে ওত বড় বড় পাথরের স্তর। উপজাতি লোকটা বলছিলেন আরোও মজার তথ্য। কবে নাকি একজন সুইডিশ বিজ্ঞানী এসে বলে গেছেন, আটলান্টিক মহাসাগেরর সাথে এর তলার সংযোগ আছে। আমি আর সুমন হাসছিলাম মিটিমিটি। আশফাক ভাই তাল দিচ্ছিলেন। যুক্তিও দিচ্ছিলেন লোকটি। তার ভাষ্য মতে লেকের পানি নাকি রঙ বদলায় মাঝে মাঝে, আটলান্টিক এর পানিও নাকি তাই। কখনও নাকি লালচেও হয়। কিন্তু আমার মনে হয় সব পর্যটকদের সেটা দেখার দুভাগ্য হয়না। তার মানে কি ...গুজব।
তবে সবচেয়ে মজার রূপকথাটা যখন তিনি শুরু করলেন, শুনতে বেশ লাগছিল। তিনি তাদের উপজাতিগত যে বিশ্বাস লালিত তাদের মাঝে সেই পৌরাণিক গল্পটি বললেন।
অনেক দিন আগে বগা লেকের স্থানটিতে সাতটি পরিবার বাস করতো। তখনও লেক সৃষ্টি হয়নি। হঠাৎ এক সময় প্রায় প্রত্যেকদিনই রাতে তাদের গরু ছাগল কে যেন খেয়ে ফেলতে লাগল। তারাতো চিন্তিত। অবশেষে পাহাড়া বসিয়ে অনেক খুঁজে তারা দেখল একটি সাপ এসে এই কাজ করছে প্রতি রাতে। সাপটি বাস করে একটি গর্তের মধ্যে। গর্তটি খুঁজে পাবার পর তারা সেখানে বঁরশি পাতল। বরশিতে গাথঁল সাপের মুখ। এরপর টেনে তোলার পালা। সাত দিন সাতরাত সবাই মিলে কেবল টানল আর টানল, তাও সাপের শেষ নেই। আর না পেরে তারা যতদূর টেনে তুলেছিল সেইখানে কোপ দিয়ে কেটে ফেলল। তারপর সেই তোলা অংশ কেটে সব পরিবার ভাগ করে নিল খাওয়ার জন্যে।
এখন যে জায়গাটিতে আর্মি ক্যাম্প। সেই পাহাড়টির উপরে বাস করত এক বিধাব মহিলা। বিধাব মহিলাটির ভাগে পড়ল সাপের মাথা। আশ্চর্য মহিলাটি যখন মাথা কাটতে গেলো, মাথা কথা বলে উঠল। বলল , আমার চোখ গুলো কেটোনা। বিধাব ভয়ে মাথাটি উঠিয়ে রাখল। রাতে আবার কথা বলল মাথাটি। চোখ জ্বলছিল তার। বলল, তোমাদের গ্রামে আজকে অতিথি এসেছে না। বিধাব মাথা নাড়ল। মাথা বলল, ওদের কে রাতের মধ্যে বিদায় হতো বল। না হলে সকালে সবার সাথে ওরাও মারা যাবে, আর তুমি এই পাহাড়ের উপর থাকবে , তোমার কিছু হবেনা।
পরদিন সকালে এই লেকের সৃষ্টি হয় আর পুরো গ্রাম তলিয়ে যায়। বিধাবাও একা একা বেঁচে কি লাভ ভেবে সেও ঝাঁপ দিয়ে পড়ে মরে যায়।
সেই থেকে এই লেকের সৃষ্টি। সাপের সেই বাকী অংশ নাকি লেকের মাঝে এখনও আছে। দেখেছে অনেকেই ।
গল্প শুনতে শুনতে পথ প্রায় শেষ হয়েই এল। মাথা ভীষন ধরেছিল। অবশেষে বিকেল ৪টার দিকে আমরা বান্দরবান পৌঁছালাম। নীলাচল যাবার ইচ্ছে থাকলেও আর শরীরে কুলাচ্ছিলনা। খাওয়া দাওয়া সেরে দ্রুত রওয়ানা হয়ে গেলাম কক্সবাজারের পথে আমাদের এই পাহাড়ী ভ্রমন শেষে তিক্ত এবং মধুর স্মৃতি মনে ধারন করে ।
শেষ
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই মে, ২০০৭ রাত ৯:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


