বরুণ চট্টোপাধ্যায়
জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে এক দাসী হটাৎ একদিন অতি চিত্কার করে উঠে দাঁতে দাঁ লেগে অজ্ঞান হয়েগেল ৷ নানান চেষ্টা করে জ্ঞান ফেরানোর পর সে বললে: সে নাকি কাদব্মরী দেবীকে দেখতে পেয়েছে৷ কাদম্বরী আত্মঘাতী হওয়ার বহুদিন পর এই ঘটনা ঘটে৷ আত্মঘাতীর আত্মা শান্তি পায় না, সে বার বার ফিরে আসতে চায় প্রিয়জনদের কাছে৷ তার প্রিয় ঘরবাড়িতে৷ কাদম্বরী দেবীকে নিয়ে একটা আতঙ্ক ঠাকুরবাড়ির দাস দাসীদের মধ্যে ছিলই৷ কেউ সচারচর যেত চাইত না সেই ঘরের দিকে যে ঘরে কাদম্বরী আফিম খেয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন৷ যে দাসীটি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে শেষ পর্যন্ত রহস্যটি বোঝা গেল৷ কাদম্বরীর প্রেতমূর্ত্তি নয়, সে দেখেছে কাশী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফনিভুষণ অধিকারীর কন্যা রাণুকে৷ অবশ্য দাসীর আতঙ্কিত হওয়াটা খুব অস্বাভাবিক ছিল না৷ যদি কাদম্বরী দেবী ও কিশোরি রাণুর ছবি পাশাপাশি রেখে দেওয়া যায় তবে দুজনের মুখের সাদৃশ্য দেখে বিস্মিত হতে হবেই৷ ফলে জোড়াসাঁকোর বাড়ির অলিন্দের আলোছায়া একটি নিরক্ষর সংস্কার প্রচ্ছন দাসীর ক্ষেত্রে রাণুকে হটাৎ দেখে কাদম্বরীর প্রেতমূর্ত্তি মনে হওয়াটা খুব অস্বাভাবিক নয়৷ শুধু এই নিরক্ষর দাসীর নয়, অনেক উচ্চশিক্ষিত সংস্কার মুক্ত মনের একাধিকবার বিভ্রান্ত হতে দেখা গেছে রাণুকে প্রথম দেখার পর৷ রাণুকে দেখে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথেরও মনে হয়েছিল নতুন বৌঠানের কথা৷ এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ বন্ধু কৃষিবিজ্ঞানী এলমহার্স্ট বলেছিলেন: "The girl(Rani) so vividly brought back to Tagore memory of his boyhood compandon that he begged the forther to leav e her behind as a guest of the poet's hoise. The relationship that developed was deep and lasting."
এই সম্পর্ক সত্যিই 'deep and lasting' অর্থাত ক্রমস গভীরতর হয়ে উঠে প্রায় একটি স্থায়ী সম্পর্কের মতো হয়ে ওঠে৷ রবীন্দ্রনাথ-রাণু বা বলা ভালো রাণু ও ভানুর সম্পর্ক এতটাই আলোচিত যে কয়েকবছর আগে এই সম্পর্কের ভিত্তিতে 'রাণু ও ভানু' নামে একটি উপন্যাস লেখেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যা অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়৷ সুনীলের উপন্যাসে কতটা ঐতিহাসিক সত্য ও কতটা কল্পনা আছে তা এখানে আলোচ্য নয়, উপন্যাসটির উল্লেখ করার উদ্দেশ্য পাঠকের কাছে রাণু (মূল নাম প্রীতি) অধিকারী ও রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক আজও কতটা আকর্ষণীয় তার ইঙ্গিত দেওয়া৷
কাদম্বরীকে রবীন্দ্রনাথ সারা জীবন মনে রেখেছেন৷ কাদম্বরীর স্মৃতি রবীন্দ্রনাথের আপন গোপন মনের মহামূল্যবান ঐশ্বর্য ও সৃষ্টির প্রেরণা, রাণুর মধ্যে কাদম্বরীর পুরুজ্জীবন ঘটেছে বলেই মনে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের৷ রাণুর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রথম পরিচয় চিঠির মাধ্যমে৷ রবীন্দ্রনাথ রাণুর প্রথম চিঠি পান 1937 সালের জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে৷ তখন রাণুর বয়স মাত্র নয় বছর৷ কিন্তু বয়সের তুলনায় তার পরিপক্কতা যে একটু বেশ তা রাণুর প্রথম চিঠি পড়লেই বোঝা যায়:
"প্রিয় রবিবাবু, আমি আপনার সব গল্পগুলো পড়েছি, আর বুঝতে পেরেছি কেবল ক্ষুধিত পাষাণটা বুঝতে পারেনি৷
............. আমার আপনাকে দেখতে খু ঊ ঊ ঊ ঊ ঊ ঊব ইচ্ছে করে৷ একবারে নিশ্চয় আমাদের বাড়িতে আসবেন কিন্তু৷ না এলে আপনার সঙ্গে আড়ি৷ আপনি যদি আসেন তবে আমনাকে আমাদের শেষের ঘরে শুতে দেব৷" প্রথম চিঠিতেই বিনা ভূমিকায় মন অভিমানের শুরু এই বালিকার যে এখনো ক্ষুধিত পাষাণ পড়ে বুঝতে পারে নি৷
পরেই মাসে চিঠিতে সে 'রবিবাবুর' সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আরো অনেকটাই বাড়িয়ে নিয়েছে:
"প্রিয় রবিবাবু,
আপনি এতদিন আমাকে চিঠি দেননি বলে খুব রাগ হয়েছিল কিন্তু আপনার চিঠি পেয়ে খুব খুশি হয়েছি৷ আমার ভাল নাম কি জানেন? প্রীতি৷ বেশ সুন্দর নাম না৷ ইস্কুলে সবাই আমাকে প্রীতি বলে ডাকে৷ কিন্তু আপনি আমাকে রাণু রাণু বলেই ডাকবেন৷ আপনার ও নামটা ভালো লাগে কিনা তাই বলছি৷"
রবীন্দ্রনাথ প্রথম প্রথম চিঠির শেষে লিখেছেন, 'শুভাকাঙ্খী, শ্রী শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তার পর তা পাল্টে হয়েছে 'শুভানুধ্যায়ী শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কখনো শুধু 'রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর'৷
1918 সালের 20শে ফেব্রুয়ারী রবীন্দ্রনাথের রেণুকাকে লেখা চিঠিটি সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাদের৷ এই চিঠিতে তিনি রেণুকে লিখেছেন, "দোষ আসলে আমার৷ তুমি সেই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেইচ তখন না হয় আর ত্রিশ চল্লিশ বছর আগেই জন্মাতে৷" এই চিঠির শেষে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন "তোমর প্রাচীন বন্ধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর"৷ এই চিঠি লেখার সময় রবীন্দ্রনাথের বয়স সাতচল্লিশ৷ রাণুর জন্মতারিখ 25শে অক্টোবর 1908৷ ত্রিশবছর আগে জন্মালে তাকে জান্মাতে হত 1887 সালে আর চল্লিশ বছর আগে জন্মালে জন্মাতে হত 1868 সালে৷ জ্যোতিন্দ্রনাথের সঙ্গে কাদম্বরীর বিবাহ 1868 সালেই, অর্থাত রবীন্দ্রনাথ কাদম্বরীকে প্রথম দেখেছেন 1868 তে, আর আশা করছে রাণু যদি ওই সময়েই জন্মাত! অর্থাত কাদম্বরীর সঙ্গে রাণুকে মিলিয়ে দেখতে শুরু করেছেন তার নয় বছর বয়স থেকেই আর একটি অস্পষ্ট সমাপত্তন হলো কাদম্বরীর বিবাহ, অর্থাত রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কাদম্বরীর যখন প্রথম পরিচয় হয় তখন কাদম্বরীর বয়স নয় বছর(5ই জুলাই 1859) সত্যিই যে কাদম্বরীর স্মৃতির সঙ্গে একাকার হয়েগিয়েছিল রাণুর অস্তিত্ত্ব, রাণু যে রবীন্দ্রনাথের কাছে কাদম্বরীর 'Resurrection' তা স্পষ্ট হয় 1919 এর এপ্রিল অথবা মে মাসে৷ যখন রাণুর সঙ্গে তার চিঠিরা আদান প্রদান চলছে দূর্বার গতিতে৷
গানটি অংশবিশেষ পাঠকদের উপহার দেওয়া যাক:
"এই বুঝি মোর ভোরের তারা এল সাঁঝের তারা বেশে৷
অবাক চোখে ওই চেয়ে রয় চিরদিনের হাসি হেসে৷
.................
সকালবেলা আমার হৃদয় ভরিয়েছিল পথের গানে,
সন্ধ্যে বেলা বাজায় বীণা কোন সুরে যে কেই বা জানে৷
পরিচয়ের বয়সের ধারা
কিছুতে আর হয় না হারা,
বারে বারে নতুন করে চিত্ত আমারে ভুলাবে সে৷''
ভোরের তারা অর্থাত 'শুকতার' বা শুক্রগ্রহ(venus) কে পূর্ব আকাশে দেখা যায় ভোরের ঠিক আগে, পশ্চিম আকাশে দেখা যায় সূর্যাস্তের ঠিক পরে৷ কাদম্বরী ধ্রুবতারা বা palar star, যা নিজের অবস্থানে স্থির থাকে৷ কিন্তু এখানে ভোরের তারা বলতে কাদম্বরীকেই বোঝানো হয়েছে যিনি আবার ফিরে এলেন 'সাঁঝের' তারা হয়ে, রাণুর মধ্যেদিয়ে৷
আবার চিঠি পত্রের প্রসঙ্গে ফিরে যাওয়া যাক৷ একটি চিঠিতে(সেপ্টেম্বর 1918) রাণু বেশ জোর দিয়ে বলেছে " আমি কিন্তু আপনাকে শুধু ভানুদাদা বলব৷ আর কবিদাদা নামটাও বেশ," রাণু রবীন্দ্রনাথকে অন্যনামেও ডেকেছে , 'রবিদাদা' বা 'দাদারবি'৷ রবীন্দনাথ মেনে নিয়েছে রাণুর আব্দার৷
"ভানু নামটা যদিও খুব সুশ্রাব্য নয় তবু ওটা একদা নিজেই গ্রহণ করেছিলুম, ওর আর একটুখানি সুবিধা আছে- ওটা 'রাণুর' সঙ্গে মিলে য়ায়- এক যে ছিল রাণু
তার দাদা ছিল ভানু৷"
অনেকগুলি চিঠি 'রবীদাদা বলে লেখার পর রবীন্দ্রনাথ ভানুদাদা নামটিই রাণুর বিবাহের আগে রাণুকে লেখা চিঠিতে ব্যবহার করেছেন৷ আবার রাণু যেমন রবীন্দ্রনাথের নাম বদলে দিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথও প্রস্তাব করেছেন রাণুর নাম বদলে দেওয়ার৷ 'প্রীতি'র জায়গায় করতে চেয়েছেনে গীতি৷ এ প্রশ্নও করেছেন যে "তোমাকে যদি 'প্রিয় রাণু' লিখি তাহলে কি রকম শোনায়?" রাণু রবীন্দ্রনাথকে ভানুদাদা বলে যে দ্বিতীয় চিঠি লিখেছিল(অক্টোবর 1818) তাতে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা যে দ্বিধাহীন ভাবে প্রকাশ করেছে৷
"আমি যখন প্রথম আপনাকে চিঠি লিখেছিলাম তখন আপনি আমার কাছে নিতান্তই কেবল রবিবাবুই বুঝি ছিলেন? তখনও আমি আপনাকে ভালোবাসতাম৷ কিন্তু তখনকার চাইতে এখন বেশী ভালোবাসি৷" প্রায় প্রতিটি চিঠির শেষেই রবীন্দ্রনাথকে 'চুমু' বা আদর দিয়েছে রাণু৷
শুধু নাম নয় রবীন্দ্রনাথের বয়সও পাল্টে দিয়েছে রাণু৷ 1918 এর 12ই জুলাই রবীন্দ্রনাথকে প্রায় হুকুম করে রাণু লিখেছে: হ্যাঁ শুনুনু কেউ বয়েস জিজ্ঞেস করলে বলবেন সাতাশ৷," রবীন্দ্রনাথ যে বয়সের এই পরিবর্তন স্বীকার করে নিয়েছেন৷ তার প্রমাণ- 28শে আগষ্ট 1918 সালে রাণুকে লেখা চিঠি - "..... কিন্তু যখন থেকে তোমার পঞ্জিকা অনুসার আমার 'সাতাশ' বছর বয়স হয়েছে তখন থেকেই বয়সের মানে আপনি ধরা দিয়ে কেটে বেড়াবার আর পথ পাইনি৷
রাণুর পঞ্জিকা অনুসারে শুধু কথার কথায় নয় রবীন্দ্রনাথের এই নতুন 'সাতাশ' বছর বয়সকে মনে প্রাণে গ্রহন করেছেন৷ বেড়েছে কাজের স্রোত, সৃষ্টিশিলতায় এসেছে নতুন উদ্যম৷ এক কথায় তার হারানো মানসিক ও দৈহিক যৌবন আবার ফিরে এসেছে স্বমহিমায়৷ এই 'সাতশ' বছর বয়স উপহার পাওয়াটি রবীন্দ্রনাথের জীবনের পরম সম্পদ৷ রাণুর বিয়ের বছর খানেক আগে (শিল্পপতি স্যার রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের ছেলে বীরেনের সঙ্গে রাণুর বিবাহ হয় 1925 সালে 28 জুন তারিখে) 'হারুণামারু' জাহাজ থেজে নির্মলকুমারী মহনলালবীশকে লেখা 5ই অক্টোবর 1924 তারিখে চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন
"জীবনের মাঝমহলে, যে কালটাকে বলে পরিণত বয়স, সেই সময়ে অনেক বড় বড় সংকল্প, অনেক কঠিন সাধনা অনেক মস্ত লাভ, অনেক মস্ত লোকসান, এসে জমেছিল৷ সব জড়িয়ে ভেবেছি, এইবার আসা গেল পাকা-পরিচয়ের কিনারাটাতে৷ সেই সময় কেউ যদি হটাত্ এসে জিজ্ঞাসা করতো "তোমার বয়স কত!" তা হলে আমার গোড়ার দিকের ছ্ত্রিশটা বছর সরিয়ে রেখে বলতুম, আমি হচ্ছি বাকিটুকু৷ অর্থাত আমার বয়স হচ্ছে কুষ্টির শেষদিকের সাতাশ৷"
আলোচিত ব্লগ
পণ্ডশ্রম

এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,
চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।
কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,
আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।
দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন
আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?
আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?
ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন
১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে
আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন
নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন
শৃঙ্খল মুক্তি আমার
শৃঙ্খল মুক্তি আমার

ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।